।। আমি, আমার স্বামী ও আমাদের যৌনজীবন ।। - অধ্যায় ৮৪
(১৪/১)
অধ্যায়-১৪- ।। আমি মা হলাম ।।
(সতীর জবানীতে)
মানুষ মনে মনে যা ভাবে অনেক সময়ই তেমনটা হয় না। পরিস্থিতি পারিপার্শ্বিকতা মানুষের ইচ্ছাপূরনের ক্ষেত্রে অনেক সময়েই প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। ডাক্তারের কথা অনুযায়ী ফেব্রুয়ারীর ২৮ তারিখ আমার ডেলিভারি হবার কথার কথা ছিল। তাই সমীর আর বিদিশার বিয়ের দিন স্থির করা হয়েছিল ২০শে ফেব্রুয়ারী। ১৮ তারিখে সমীর ওরা শিলিগুড়ি চলে আসবে। ১৯ তারিখ শিলিগুড়িতেই তাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। দীপ ভেবে রেখেছিল ১৮ তারিখ সমীরদের সাথেই সে বিদিশার বিয়ে উপলক্ষে চলে আসবে, আর বিয়ের পর সে শিলিগুড়িতেই থেকে যাবে। আমার বাচ্চা জন্মাবার পর সে শিলং ফিরে যাবে।কিন্তু ১৪ই ফেব্রুয়ারী সকাল থেকেই আমার খুব অস্বস্তি হচ্ছিল। পেটের ব্যথাটাও অন্যান্য দিনের তুলনায় বেশী বলে মনে হচ্ছিল। দীপ তখন শিলঙে। বাবা আর দাদা দু’জনেই তখন বিদিশাদের বাড়ি। বিদিশার বিয়ের ব্যাপারে তারা জেঠু জেঠীমাকে সব ধরণের সাহায্য করে যাচ্ছিল। আমার অবস্থা দেখে মা বাবা আর দাদাকে সত্ত্বর ডেকে পাঠালেন। দাদা আর বাবা বাড়ি এসেই আমাকে নার্সিংহোমে নিয়ে গেল। ডাক্তার দেখে বললেন প্রসবের সময় ঘণিয়ে এসেছে। সেদিনই আমাকে নার্সিংহোমে ভর্তি করে দেওয়া হল। খবর পেয়ে বিদিশা, জেঠু, জেঠীমা সবাই নার্সিংহোমে এসে হাজির হল। বেলা এগারোটা নাগাদ দীপের অফিসে ফোন করে খবর দেওয়া হল। দীপ জানাল সে রাতের ট্রেনেই শিলিগুড়ি রওনা হচ্ছে। ডাক্তাররা বলল যদিও সময় হয়ে গেছে তারা আরও একটু সময় অপেক্ষা করে দেখতে চান, নরমাল ডেলিভারী হয় কি না। নাহলে পরের দিন সিজার করে ডেলিভারী করানো হবে। মা বাবাকে জোর করে রাতে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হল। সারারাত বিদিশা আর জেঠীমা আমার কেবিনে রাত জেগে কাটাল। দাদা কেবিনের বাইরে কোথাও বসে রাত কাটিয়েছে। রাত সাড়ে তিনটের দিকে আমার অসহ্য ব্যথা শুরু হল। খবর পেয়েই গাইনি আর সার্জন অল্প সময়ের মধ্যেই এসে হাজির হল। আমাকে যখন লেবার রুমে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন জেঠীমা দাদাকে বাড়ি থেকে মা, বাবাকে নিয়ে আসতে বলল। আধঘণ্টার মধ্যেই তারাও চলে এসেছিলেন শুনেছি। পরদিন সকালে দাদা ষ্টেশন থেকে দীপকে নিয়ে সোজা নার্সিং হোমে এসে পৌছল। এসে দেখলো টুকটুকে ফর্সা শ্রীজা আমার কোলে ঘুমিয়ে আছে। ১৫ই ফেব্রুয়ারী ভোর রাত ৪টে ৩০ মিনিটে শ্রীজা তার মাতৃ জঠর ছেড়ে বেড়িয়ে পৃথিবীর আলো বাতাসে এসে শ্বাস নিয়েছিল। নরমাল ডেলিভারীই হয়েছে শেষ পর্যন্ত। দীপের মুখ দেখেই বুঝতে পারছিলাম সারাটা রাত ট্রেনে এক ফোটাও ঘুমোয় নি সে। নার্সিংহোমের কেবিনে দীপকে ভেতরে রেখে সবাই বাইরে বেড়িয়ে যেতেই দীপ আমাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিল। সঠিক সময়ে আমার কাছে থাকতে পারেনি বলে ওর দুঃখের শেষ ছিল না। অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে শান্ত করে মেয়েকে কোলে তুলে ওর দিকে এগিয়ে দিলাম। কিন্তু দীপ ওকে কোলে না নিয়ে শুধু ওর কপালে একটা চুমু খেয়ে বলেছিল, সারা রাত জার্নি করে এসেছে। পোশাক না পাল্টে নবজন্মা শিশুকন্যাকে কোলে তুলে নেওয়া ঠিক নয়।আমি ওর ক্লান্ত মুখটার দিকে চেয়ে সামান্য হেসে ফিসফিস করে বললাম, “আমার শ্রীময় নয়, তোমার শ্রীজাই এসেছে আমাদের ঘরে। তুমি খুশী হয়েছ তো সোনা”?দীপের দু’চোখের কোনায় জল তখনও চিকচিক করছিল। আমার হাত দুটো নিজের দু’হাতের মুঠোয় আঁকড়ে ধরে উদ্গত কান্না চাপতে চাপতে বলল, “আমি খুব খুব খুশী হয়েছি, মণি। আমি বোধ হয় আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার পেলাম আজ তোমার কাছ থেকে। থ্যাঙ্ক ইউ, থ্যাঙ্ক ইউ ভেরি মাচ মণি”। দাদা, বিদিশা, জেঠু, জেঠীমা, দীপ সবাই শ্রীজাকে পেয়ে খুব খুশী। মা আর বাবা প্রাথমিক ভাবে একটু অখুশী হলেও পরে সকলের সাথে হৈ হৈ করতে শুরু করলেন। আমি নিজে একটা ছেলে চাইছিলাম। কিন্তু দীপ বরাবরই মেয়ে চাইছিল। দীপের ইচ্ছে পূর্ণ হয়েছে দেখে আমিও খুব খুশী হলাম।স্নান টান সেরে দীপ আবার নার্সিংহোমে আসতেই আমি ওকে বললাম, “সোনা, শোনো, আমার মনে হয় আসামে তোমাদের পৈতৃক বাড়িতে একটা খবর দিয়ে দাও। যোগাযোগ না থাকলেও একটা খবর দেওয়া দরকার। তোমার অফিসে তো জানাবেই। সেই সাথে শম্পাদি আর চুমকী বৌদিকেও জানিয়ে দিও”।দীপ শ্রীজাকে কোলে করেই ঝুঁকে আমার কপালে একটা চুমু খেয়ে বলল, “হ্যা মণি, শম্পাকে আর চুমকী বৌদিকে জানিয়ে দিয়েছি। আমি যখন এখান থেকে বাড়ি গিয়েছিলাম স্নান করতে, চুমকী বৌদি তখনই ফোন করেছিল। তাকে বলেছি। শম্পাকেও ফোন করেছি। ওরা সবাই খুব খুশী হয়েছে শুনে। আর চুমকী বৌদি কি বলল জানো? সে নাকি কালই শিলিগুড়ি চলে আসবে”।আমি একটু অবাক হয়ে বললাম, “ওমা সে কি? তারা তো আর তিনদিন বাদেই এখানে আসবে। এখন আসবার কি হল”?দীপ বলল, “আমিও তো সে’ কথাই বললাম। তা বৌদি বলল যে ওখানকার তার যা কিছু করনীয় ছিল তা প্রায় সবটাই সেরে ফেলেছে সে। তাই সে কালই রওনা হয়ে আসবে। সমীর ওরা আগের প্রোগ্রাম মতই ১৮ তারিখে আসবে”।বিদিশাদের বাড়িতে সেদিন বৌদির বলা কথাগুলো আমার হঠাৎ মনে পড়ল। চুপচাপ বসে সে কথাগুলো ভাবছিলাম। আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে দীপ জিজ্ঞেস করল, “কি হয়েছে মণি? কি ভাবছো বলো তো”?আমি জবাব দিলাম, “নাহ, তেমন কিছু না সোনা। ভাবছিলাম চুমকী বৌদির কথা। সেদিন বিদিশাদের বাড়িতে এমন কতগুলো কথা বলেছিল যে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। তখন মনে হয়েছিল যে ভদ্রমহিলা শুধু সেক্সী আর সুন্দরীই নয়। তার মনটাও ভারী সুন্দর”।দীপ মুচকি মুচকি হেসে বলল, “কি জানি, আমি তো তেমন কিছু বুঝিনি। কিন্তু আমাকে কাছে পেলেই যে সে আমার ওপর চড়াও হতে চায়, সেটাই শুধু বুঝতে পেরেছি”।আমি ঠাট্টা করে বললাম, “তার মানে হচ্ছে, তুমিও বৌদিকে দেখলেই তেমনটা ভাবো”।দীপও সামান্য হেসে বলল, “সেটাও পুরোপুরি অস্বীকার করতে পারব না। আসলে বৌদির মাই দুটো আমাকে খুব টানে গো” একটু থেমেই আবার বলল, “আচ্ছা মণি, এই পুচকুটাকে খাওয়াতে হবে না কিছু”?আমি জবাব দিলাম, “হ্যা একবার বুকের দুধ খাইয়েছি তুমি আসার একটু আগেই। ইশ মাগো, মা হতে গেলে কত কিছুই না সইতে হয় গো। নার্সটা কীভাবেই না টিপল আমার মাই দুটোকে”!দীপ চমকে উঠে বলল, “মানে? তোমার মাই টিপেছে? কী বলছ তুমি”?আমি হাত তুলে দীপকে আশ্বস্ত করে বললাম, “আঃ, আস্তে সোনা। চেঁচিও না। সব নতুন মা-দেরকেই এমনটা করে। মাই দুটো পাম্প করে অনেকটা দুধ বের করে ফেলে দিতে হয়। নাহলে বাচ্চা নাকি মাই চুষে দুধ পাবে না। এক লেডি ডাক্তার আমাকে আগেই এ কথা বলে দিয়েছিলেন। কিন্তু যে নার্সটা আমার মাইগুলো টিপছিল সে মাই দুটো টিপে টিপে দুধ বের করার সাথে সাথে বোঁটা দুটোকেও খুব করে চটকাচ্ছিল। আর বলেছিল, আপনার নিপল গুলো বেশ বড়ই আছে। বেবীর খেতে অসুবিধে হবে না। অনেক মায়েদের নিপলগুলো খুব ছোট ছোট থাকে বলে বেবীরা ঠিক মত চুষতে পারে না। আর জানো সোনা, নার্সটা কি দুষ্টু! আমায় কি বলল জানো? বলে কি আপনার বর এগুলোকে চুষে চুষে বড় করে দিয়ে ভালই করেছে”।দীপ অবাক হয়ে বলল, “অ্যা, এমন কথাও বলল ? তা তুমি মুখের মতো জবাব দিলে না কেন একটা”?আমি মুখ ভঙ্গী করে বললাম, “দেব না আবার? আমিও ছেড়ে দেব নাকি এমন কথা শুনে? আমিও ওর একটা মাই ধরে খুব জোরে টিপে দিয়ে বলেছি, বেশ করেছে। তাতে আপনার কি হল বলুন তো? আমার বর আমার মাই চুষবে না তো কি আপনার মাই চুষবে”?দীপ বেশ মজা পেয়ে জিজ্ঞেস করল, “ঠিক জবাব দিয়েছ। তা, সে তোমার কথা শুনে আর কিছু বলল না”?আমি হেসে বললাম, “হ্যাগো বলেছে। কিছুক্ষণ আমার মাই টিপে দুধ পাম্প করে ফেলার পর একটা নিপলের ডগা থেকে আঙুলের ডগায় একফোটা দুধ নিয়ে জিভে লাগিয়ে টেস্ট করে বলল, হু ঠিক আছে। এখন বেবীকে খাওয়াতে পারবেন আর বেবীর বাবাকেও খাওয়াতে পারবেন। কিন্তু খেয়াল রাখবেন বেবীর বাবাই যেন আবার সবটুকু শুসে খেয়ে না ফেলে। বেবীর পেটটাও কিন্তু ভরতে হবে। আর এখন থেকে বেবীকে অন্ততঃ ছ’মাস শুধু ব্রেস্টমিল্কই খাওয়াবেন। তাতে বেবীর অনেক উপকার হবে। অনেক ডাক্তার অনেক রকম পরামর্শই দেয়। কিন্তু আমাদের এখানে এ নির্দেশই দেওয়া হয়। তারপর ডাক্তাররা বলে দেবেন তোলা দুধ বা কৌটোর দুধ কবে থেকে কীভাবে খাওয়াবেন”। একটু থেমে আবার বললাম, “জানো সোনা, নার্সটার মাই ওভাবে টেপা বোধ হয় আমার ঠিক হয়নি। সে অবশ্য তাতে কোনোরকম রিয়াক্ট করে নি। কিন্তু ওর পরের কথাগুলো শুনে আমার মনে হয়েছে যে ওতো কেবল ওর ডিউটিই করেছে। আমার মাই নিয়ে খেলতে তো চায় নি, তাই না”?দীপ বলল, “ঠিক আছে। সে নিয়ে ভেব না। নার্সিংহোমের স্টাফদেরকে তো বখশিস দিতেই হবে। তাকে আলাদা করে না হয় একটু বেশী টাকা দিয়ে তার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিও। তাহলেই সব মিটে যাবে”।আমিও দীপের কথা মেনে নিলাম। যদিও আমার পোস্ট ডেলিভারি কোন সমস্যা হয়নি, তবু ডাক্তারের পরামর্শে ডেলিভারির পর আরো দু’দিন থাকতে হয়েছিল নার্সিংহোমে। ১৭ তারিখ বেলা এগারোটা নাগাদ বাড়ি ফিরলাম। বিদিশাদের গাড়ি করে আমি যখন মেয়েকে কোলে নিয়ে বাড়ি যাচ্ছিলাম, তখন দাদা আর দীপ চুমকী বৌদিকে রিসিভ করতে ষ্টেশনে গেল।নার্সিংহোম থেকে বেড়োবার আগে দীপ সেখানকার সমস্ত স্টাফকেই কম বেশী বখশিস দিয়েছিল। আমার হাতে ৫০০ টাকা দিল, সেই নার্সটাকে দেবার জন্যে। দীপ যখন আমাদের জিনিসপত্রগুলো গোছাচ্ছিল, তখনই সেই নার্সটা আমার কেবিনে এল। আমি তাকে ডেকে বললাম, “সিস্টার শুনুন। আমি সেদিন একটা ভুল করে ফেলেছিলাম। আপনি প্লীজ কিছু মনে করবেন না। আসলে আমার তো আগের কোন অভিজ্ঞতা ছিল না। আপনি প্লীজ এটা রাখুন। আমার বর খুশী হয়ে এটা আপনাকে দিয়েছে”।নার্সটা বোধ হয় আমার থেকে বয়সে সামান্যই বড় হবে। মিষ্টি করে হেসে জবাব দিল, “শুনুন ম্যাডাম। ডিউটি করতে গিয়ে আমাদের অনেক সময়ই এমন ধরণের পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। আমি কিন্তু শুধুই আমার ডিউটি করছিলাম। অবশ্য এটাও স্বীকার করছি যে আমার মত এমন নার্স আরো অনেক আছে যারা ডিউটি করতে গিয়ে অনৈতিক অনেক কিছুই করে থাকে। কিন্তু ও নিয়ে আপনি একদম ভাববেন না। ওসব আমাদের গা সওয়া হয়ে গেছে। আপনারাও ভুলে যান সে কথা। আজ এখান থেকে ছুটি পেলেন। বাড়ি যান। ভালো ভাবে থাকুন। নিজের প্রতি আর বেবীর প্রতি কোনরকম অবহেলা করবেন না। ভগবানের কাছে প্রার্থনা করছি, আপনি স্বামী সন্তান নিয়ে সুখে থাকুন। আর খুশী হয়ে আপনার বর যেটা আমাকে দিতে চাইছেন সেটা আমার তরফ থেকে আপনার বেবীকে উপহার দিলাম। ওর জন্যেই সেটা রেখে দিন”।আমি বুঝতে পারলাম সে কোন ভাবেই টাকাটা নেবে না। কিন্তু তার কথা শুনে আমার নিজেকে আরো একবার তার কাছে অপরাধী বলে মনে হল। দীপ এবার নার্সটাকে বলল, “ঠিক আছে সিস্টার, আপনার কথা মেনে নিয়েই এ টাকাটাকে আমাদের মেয়ের জন্যে রেখে দিলাম। কিন্তু একটা অনুরোধ করছি, রাখবেন প্লীজ”?নার্সটি জবাব দিল, “বেশ তো বলুন না”।দীপ বলল, “আমরা তো আর মিনিট পনেরোর মধ্যেই বেড়িয়ে যাব এখান থেকে। তার আগে আপনি আরেকবার আসবেন এ কেবিনে”?নার্স তার কব্জি ঘড়ির দিকে দেখে বলল, “ঠিক আছে আমি পনেরো মিনিট বাদে এসে আপনাদের সাথে দেখা করে যাব”।নার্স চলে যেতে দীপ বিদিশাকে ডেকে বলল, “বিদিশা, একটু হেল্প করবে প্লীজ। একজনকে একটা শাড়ি দিতে হবে, তুমি কি পছন্দ করে এনে দিতে পারবে? তুমি ফিরে এলে আমরা এখান থেকে বেড়োব”।বিদিশা কিছু একটা বলতে যেতেই আমি বললাম, “আরে ওই নার্সটা বখশিস নিতে রাজি হচ্ছে না। তাই দীপ ভাবছে ওকে একটা শাড়ি দিয়ে যাবে”।বিদিশা দীপের হাত থেকে টাকা নিতে নিতে বলল, “ঠিক আছে, দাও, আমি তাড়াতাড়িই ফেরার চেষ্টা করব”। বলে বেড়িয়ে গেল।কেবিনের বাইরে দাদাকে দেখতে পেয়ে দীপ তাকে বলল, “দাদা ট্রেনের খবরটা নিয়েছেন? চুমকী বৌদিকে তো ষ্টেশন থেকে আনতে হবে”। দাদা জবাব দিল, “হ্যা দীপ, এনকুয়ারীতে খবর নিয়েছি। বলেছে আধঘণ্টার মধ্যে ট্রেন পৌঁছে যাবে”।সুন্দর একখানা দামী তাঁতের শাড়ি প্রায় জোর করেই নার্সটার হাতে দিয়ে যখন আমরা নার্সিংহোম থেকে বেড়িয়ে এলাম তখন বাইরে এসে দাদা দীপকে বলল, “দীপ তুমি কি সতীর সাথেই বাড়ি যেতে চাইছ”?দীপ দাদার প্রশ্ন শুনে বলল, “কেন বলুন তো দাদা”।দাদা বলল, “না মানে, চুমকী বৌদির ট্রেন আসবার সময় হয়ে গেছে তো। তাই ভাবছিলাম এখানে তো দু’খানা গাড়ি আছে। সতী তো বিদিশাদের গাড়িতেই উঠছে। জেঠীমাও ও গাড়িতেই যেতে পারবেন। আমি তাহলে এ গাড়িটা নিয়ে NJP চলে যাই। তুমি যেতে চাইলে তুমিও ওদের সাথে যেতে পার বা আমার সাথে এ গাড়িতে বৌদিকে আনতেও যেতে পার”।দীপ আর দাদা বৌদিকে আনতে ষ্টেশনের দিকে রওনা হতে আমরা বিদিশাদের গাড়ি করে বাড়ির দিকে রওনা হলাম।চুমকী বৌদিকে নিয়ে দাদা আর দীপ যখন ঘরে ফিরে এল বেলা তখন প্রায় বারোটা। চুমকী বৌদির পেছন পেছন দাদা আর দীপ অনেকগুলো লাগেজের প্যাকেট নিয়ে ঘরে ঢুকল। চুমকী বৌদির জন্যে ওপর তলায় আমাদের গেস্ট রুমে থাকার বন্দোবস্ত করা হয়েছে। চুমকী বৌদি আমার সাথে দেখা না করেই ওপরে চলে গেল। আমি সেটা শুনে একটু অবাকই হলাম। আমাকে দেখবার জন্যে সে গৌহাটি থেকে শিলিগুড়ি চলে এল, আর আমার সাথে দেখা না করেই ওপরে চলে গেল! দাদা একবার আমার ঘরে ঢুকে আমরা ঠিক ঠাক আছি শুনে ওপরে চলে গেল। দীপ আমার কাছে এসে বসতেই আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কি গো, বৌদির শরীর টরীর ঠিক আছে তো? আমার সাথে দেখা না করেই গেস্ট রুমে চলে গেল যে”?দীপ আমাকে আশ্বস্ত করে বলল, “চুমকী বৌদি একদম ঠিক আছে মণি। সে স্নান টান সেরে তারপর তোমার কাছে আসবে বলেছে”।আমি আশ্বস্ত হয়ে বললাম, “বৌদিকে সে ঘরের সব কিছু দেখিয়ে টেকিয়ে দিয়েছ তো? সে তো এর আগে ওপরের ঘরটা দেখে নি”।দীপ হেসে বলল, “সে নিয়ে তোমাকে আর ভাবতে হবে না মণি। তুমি বোধ হয় ভুলে গেছ যে চুমকী বৌদির জা-ও এখন এ বাড়িতেই আছে। বিদিশা তার সাথে আছে”।আমি একটু হেসে বললাম, “ওহ, হ্যা তো, আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম। দিশা যখন আছে তখন আর চিন্তার কিছু নেই। আমার জন্যেও মেয়েটা যা করল, বাপরে! এক মুহূর্তের জন্যেও আমাকে নার্সিংহোমে একা থাকতে দেয় নি। শুধু নাওয়া খাওয়ার জন্যেই বাড়ি এসেছে। দিনরাত আমার সাথেই বসেছিল। বকাবকি করেও ওকে আমার কাছ থেকে সরাতে পারিনি”।দীপ প্রায় স্বগতোক্তির মত করে বলে উঠল, “সত্যি মণি, তোমার মত স্ত্রীর পাশাপাশি বিদিশার মত একটা বন্ধুও যে আমি পাব, এমনটা স্বপ্নেও ভাবিনি কখনও। আর দেখো, সেই বিদিশার দৌলতেই আবার চুমকী বৌদিকেও পেয়ে গেলাম আমরা। ভাবতে পারো? যার সাথে মাত্র মাস দেড়েক আগে তোমার পরিচয় হয়েছে, তাও শুধু দুটো দিনের জন্যে, সে তোমার মা হবার কথা শুনে পাঁচশ মাইল দূর থেকে ছুটে এসেছে! আমি তো ভাবতেই ইমোশনাল হয়ে পড়ছি”।আমি আমার কোলের পাশে শুইয়ে রাখা শ্রীজার দিকে একটু দেখে নিয়ে বললাম, “একেবারে ঠিক বলেছ সোনা। আমিও কিন্তু এতটা আশা করিনি। বিদিশা কাছে আছে, সে আমার পাশে থাকবেই এটা তো জানতামই। কিন্তু গৌহাটি থেকে বৌদি এভাবে ছুটে আসবে, এটা আমিও ভাবিনি”।“জানি জানি, আমি তো মঙ্গল গ্রহ থেকে আসা একটা অদ্ভুত জীব। তোমরা পৃথিবীর মানুষেরা আমায় বুঝবে কেমন করে”? বলতে বলতে চুমকী বৌদি আমার ঘরে এসে ঢুকল। গলা শুনে তার দিকে চাইতেই আরেক বিস্ময়। চুমকী বৌদির পেছন পেছন বিদিশাও এসে হাজির। আর তাদের দু’জনার হাতেই ছোট বড় নানা সাইজের পাঁচ ছটা করে প্যাকেট। তাদের দু’জনকে ওভাবে ঘরে ঢুকতে দেখে আমি আর দীপ পরস্পরের মুখের দিকে চাইলাম অবাক হয়ে। প্যাকেটগুলো ঘরের কোনার দিকে নামিয়ে রেখে চুমকী বৌদি প্রায় লাফ মেরে আমার পাশে এসে ঝুঁকে আমার পাশে শোয়ানো শ্রীজার দিকে তাকিয়েই যেন থমকে গেল। ঠিক তখনই শ্রীজাও হাত পা ছুঁড়তে ছুঁড়তে ‘কুই কুই’ করে চোখ পিটপিট করে তাকাল।চুমকী বৌদিও চোখ বড় বড় করে বলল, “ওমা, দেখ দেখ সতী, তোর মেয়ে তার মাসিমণির গলা শুনেই উঠে পড়েছে। আমার সোনা মা, এসো আমার কোলে এসো” বলে খুব সাবধানতার সাথে শ্রীজাকে কোলে তুলে নিয়ে ওর ছোট্ট কপালে একটা চুমু খেয়ে বলল, “ওলে লেলে লেলে লেলে, আমাল থোত্ত থোনা মা, আমাল থোত্ত থোনামণি, উমমম উমমমম উমমমম” বলে শ্রীজার ছোট্ট মুখটাকে আদরে আদরে ভরিয়ে তুলল।আমি চুমকী বৌদির কাণ্ড দেখে একেবারে স্তম্ভিত। দীপ আর বিদিশার দিকে চেয়ে দেখি ওদেরও একই অবস্থা। আমি এতটাই বিহ্বল হয়ে গিয়েছিলাম যে বৌদি যে আমাকে ‘তুই’ বলে সম্বোধন করল সেটাও খেয়াল করি নি। বৌদির মুখে চোখে এত খুশী ছিটকে বেড়চ্ছিল যে আমরা তিনজনেই হাঁ হয়ে তার শ্রীজাকে আদর করা দেখে যাচ্ছিলাম।অনেকক্ষণ শ্রীজাকে আদর করে বৌদি ওকে আমার কোলে দিয়ে বলল, “ধর তোর মেয়েকে। আমাকে এখন জেঠীমার কর্তব্য পালন করতে দে আগে” বলে ঘরের কোনায় নামিয়ে রাখা প্যাকেটগুলো কাছে টেনে এনে একটা একটা করে খুলে খুলে শ্রীজার হাতে ছুঁইয়ে আরেকপাশে রেখে দিল। আমরা তিনজন একেবারে হতবাক হয়ে বৌদির কাণ্ড কারখানা দেখে যাচ্ছিলাম। কত কিছু যে সে এনেছে শ্রীজার জন্যে! কোন প্যাকেটে বেবী কেয়ারের কাপড়, গেঞ্জী, প্যান্টি, কোন প্যাকেটে গরম জামা কাপড়, কোনটাতে টুপি, মোজা, আবার কোন প্যাকেটের ভেতর কাপড়ের নরম জুতো আর মোজা। একে একে অন্যান্য প্যাকেট গুলো খুলে টাওয়েলের সেট, মশারী, বেবী কসমেটিক্স, বডি অয়েল, অনেকগুলো পোশাকের সেট, কয়েকটা ন্যাপকিনের সেট, আরও কত কী। আমার তো দেখতে দেখতে চোখ ছানাবড়া হবার উপক্রম। সবার শেষ ছোট্ট একটা জুয়েলারীর বাক্স বের করে তার ভেতর থেকে একটা খুব সুন্দর দেখতে গলার চেইন বের করে শ্রীজার গলায় পড়িয়ে দিয়ে আবার ওকে কোলে নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরল।আমার গলা যেন প্রায় বন্ধ হয়ে আসছিল। আমার নবজন্মা মেয়ের প্রতি চুমকী বৌদির এ ব্যবহারে আমার দু’চোখ ছাপিয়ে জল আসতে চাইছিল যেন। মাথা নিচু করে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে আমি উদ্গত কান্নাকে ঠেকাবার চেষ্টা করলাম। বিদিশার মুখেও কোন কথা নেই। হঠাৎ টের পেলাম দীপ উঠে বাইরের রুমে চলে গেল। চুমকী বৌদির আর সেদিকে হুঁশ নেই। সে শ্রীজাকে আদর করতেই ব্যস্ত। বিদিশার দিকে মুখ তুলে চাইতেই বিদিশা আমাকে হাতের ইশারা করে বাইরের রুমে চলে গেল।উদ্গত কান্নাকে কণ্ঠরোধ করে চেপে রাখতে সফল হলেও চোখের জলের ধারাকে আটকাতে পারলাম না। জল ভরা চোখেই সদ্য মা হয়ে ওঠা এক রমণী দেখতে থাকল তার স্বল্প পরিচিতা আরেক রমণী তার নবজাত শিশুকন্যাকে আদর করছে, স্নেহ চুম্বনে ভড়িয়ে দিচ্ছে। হয়ত এটাই স্বাভাবিক। প্রত্যেক মা-ই নিজের সন্তানকে অপরের ভালোবাসা পেতে দেখলে অভিভূত হয়ে পড়ে। কিন্তু আমার জীবনে এমন অভিজ্ঞতা আগে কখনো হয় নি। এক মুহূর্তের জন্যে মনে হল চুমকী বৌদি যেন আমার দিদি, আমার আজন্ম পরিচিত খুব কাছের একজন, যে আমার খুশীতে আমার চেয়েও বেশী খুশী হয়েছে।সামনের ঘর থেকে হঠাৎ বিদিশার গলা শুনতে পেলাম। বিদিশা বলছে, “একি দীপদা, এ কি ছেলেমানুষি করছ বলো তো? কেঁদো না প্লীজ। সামলাও নিজেকে। কী হয়েছে বলবে তো”?বিদিশার গলা শুনে চুমকী বৌদিও চমকে উঠল। ভাল করে কান পাততেই একটা খুব চাপা গুমড়ে কান্নার শব্দ পেলাম। বুঝতে পারলাম দীপ বোধ হয় কাঁদছে। দীপের সঙ্গে এতদিন ঘর করে আমি জেনেছি যে ও বেশ শক্ত মনের মানুষ। কোনো কিছুতেই সহজে ঘাবড়ায় না। আর বিচার বিবেচনাও যথেষ্ট পরিপক্ক। তাকে এমনভাবে কাঁদতে দেখে আমিও কম অবাক হলাম না। কী হলো দীপের? কাঁদছে কেন ও? ওর মনে কি অজান্তে কোন ব্যথা দিয়ে ফেলেছি আমরা কেউ? আমার এমন ভাবনার মধ্যেই চুমকী বৌদি আমার কোলে শ্রীজাকে শুইয়ে দিয়ে বলল, “দাঁড়া, ভাবিসনে, আমি দেখছি” বলে সে-ও বাইরের রুমে চলে গেল।আমারও আর একা বসে থাকতে ইচ্ছে করছিল না ভেতরের ঘরে। আমারও ইচ্ছে করছিল ছুটে বাইরের ঘরে গিয়ে দীপকে দু’হাতে বুকে জড়িয়ে ধরি। কিন্তু মা আমাকে পই পই করে বলে দিয়েছেন, আগামী দশদিন এই ভেতরের রুম থেকে আমি যেন অন্য কোথাও না যাই। তাই মনে মনে চাইছিলাম বিদিশা বা চুমকী বৌদি জোর করে দীপকে এঘরে নিয়ে আসুক। প্রায় তিন চার মিনিট ধরে শুনলাম খুব চাপা গলায় চুমকী বৌদি আর বিদিশা কথা বলছে। আমার বুকের ভেতরের হৃৎপিণ্ডটা কোন এক অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল। আমি আর থাকতে না পেরে শ্রীজাকে কোলে নিয়েই বিছানা থেকে নামবার চেষ্টা করতেই বৌদির গলা শুনতে পেলাম, “এই তোর আবার কি হল? তুই আবার নামছিস কেন? আমরা তো এসে গেছি। তুই বোস”।মুখ উঠিয়ে দেখি বিদিশা আর চুমকী বৌদি দীপের দু’হাত ধরে আমার ঘরে এসে দাঁড়িয়েছে। দীপের মুখের দিকে চেয়ে দেখি ওর চোখের কোল দুটো বেশ ফুলে উঠেছে। কয়েকটা মুহূর্ত কেউ কোন কথা বলল না। আমিও প্রশ্ন চিহ্ন নিয়ে দীপের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। বুকের মধ্যে আমার তখনও দামামা বেজে চলেছে।আমিও কোন কথা না বলে দীপের দিকে একটা হাত বাড়িয়ে দিলাম। চুমকী বৌদি দীপকে টেনে এনে আমার পাশে বসিয়ে দিল। দীপ ততক্ষণে নিজেকে অনেকটাই সামলে নিয়েছে। কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম ওর হৃদয়ের কোনও এক গুপ্ত স্থানে প্রচণ্ড আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। কাছে আসতেই আমি দীপের একটা হাত প্রায় খামচে ধরে বলে উঠলাম, “কী হয়েছে তোমার সোনা? বলো আমাকে। আমি কি কিছু ভুল করে ফেলেছি? যদি তেমন কিছু করেই থাকি তাহলে সেটা আমাকে খুলে বলে বুঝিয়ে দাও। আমাকে শাস্তি দাও। নিজের মনের মধ্যে লুকিয়ে না রেখে আমাকে খুলে বলো সোনা। মেয়ে হয়েছে বলে তুমি কি দুঃখ পেয়েছ? আমার ওপরে রাগ করেছ”?দীপ চট করে একহাতে আমার মুখ চেপে ধরে বলল, “ছিঃ মণি, এসব কী বলছো তুমি? আমি কখনও তোমার ওপর রাগ করতে পারি? আর ছেলে হয়নি বলে আমার দুঃখ হতে পারে? আমি তো বরাবরই মেয়েই চাইছিলাম, সে কি তুমি জানো না? আমার কান্না পেয়েছিলো সম্পূর্ণ অন্য কারনে। তার সাথে তোমাদের কারুর কোন সংযোগ নেই” বলেই চুমকী বৌদির একটা হাত ধরে নিজের কপালে ঠেকিয়ে বলল, “থ্যাঙ্ক ইউ বৌদি। থ্যাঙ্ক ইউ ভেরি মাচ। তুমি জানো না আজ তুমি কী করলে”।চুমকী বৌদি বেশ অবাক হয়ে বলল, “ওমা, আমি আবার এমন কী করলাম? ওঃ, বুঝেছি। তোমার মেয়ের জন্যে এসব এনেছি বলেই বুঝি এ কথা বলছ? কিন্তু বিশ্বাস করো দীপ তোমাদের কাউকে দুঃখ দেবার জন্যে এসব কিছু করি নি আমি। তোমাকে আর সতীকে দেখার পর থেকে আমার কেন যেন মনে হচ্ছিল তোমরা আমার পরম আপনজন। তাই তোমাদের মেয়ে হয়েছে শুনে আমি আর থাকতে পারলাম না ছুটে না এসে। কিন্তু তোমরা যদি এতে সত্যিই দুঃখ পেয়ে থাক, তাহলে আমি ক্ষমা চাইছি তোমাদের সকলের কাছে”।দীপ বৌদির হাত ধরে বিছানার একপাশে বসিয়ে দিয়ে বলল, “ও কথা বোলো না বৌদি। এখানে বোসো। আমি বলছি সব খুলে। বিদিশা তুমিও এসো”।বিদিশাও এসে আমার আরেকপাশে বসতে দীপ বলল, “জানো বৌদি, খুব ছোট বেলায় বাবাকে হারিয়েছি আমি। বাবা চলে যাবার পর অভিভাবক হয়েছিল আমার বড়দা, যে আমার থেকে প্রায় পঁচিশ বছর বড়। স্কুল ফাইনাল পাশ করার পরেই আমার জীবনে একের পর এক বিপর্যয় আসতে শুরু করেছিল। আমার নিজের দুই দাদা ছিল। বড়দা থাকতেন মেঘালয়ে আর ছোড়দা থাকতেন আসামে। বড়দার আদেশে মেঘালয়ে গিয়ে কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম। কিন্তু প্রায় সমবয়সী ভাইপো আর বড় বৌদির অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে পড়াশোনায় মন দিতে পারি নি। বড়দা বড় বৌদি প্রায় তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। ফিরে এসে ছিলাম আসামে। সেখানেও ছোট বৌদি ভাল চোখে দেখতেন না আমাকে। বিধবা মা, যার হাতে আর্থিক, সাংসারিক বা প্রশাসনিক কোনও ক্ষমতাই ছিলনা, নিঃশব্দে আমার জন্যে কেবল চোখের জল ফেলতেন। ছোট বৌদির প্ররোচনায় ছোড়দাও একদিন আমাকে তাড়িয়ে দিলেন। তারপর তিনটে বছর শুকনো ঝরাপাতার মত শুধু এখানে সেখানে উড়ে ঘুরে বেড়িয়েছি। ওই তিন বছরে আমি বেঁচে থাকার জন্যে রিক্সা চালানো থেকে শুরু করে মুদির দোকান, বিনা বেতনের চাকরামী, টিউশানি কত কিছুই না করেছি। চুরি না করেও চোর অপবাদ মাথা পেতে নিতে বাধ্য হয়েছি। কার কোন পূন্য ফলে জানিনা, শেষ মেশ ব্যাঙ্কে চাকরীটা পেয়েছিলাম। চাকরি পাবার সাথে সাথে মা-র সমস্ত খাওয়া পড়া আর চিকিৎসার ভার নিজে হাতে তুলে নিয়েছিলাম। বছরে দু’বার গিয়ে তার সাথে দেখা করি। তারপর ধীরে ধীরে সতী, বিদিশা আর তোমরা আমার জীবনে এলে। ১৯৭৪ থেকে ১৯৮২, এ ক’টা বছর যে কীভাবে কাটিয়েছি সেটা ভাবলে এখন শুধু একটা দুঃস্বপ্নের মতই লাগে। একটানা পাঁচ দিন পেটে কোন দানাপানি পড়েনি আমার। আজ সেইসব আত্মীয় স্বজনদের সাথে আমার কোন যোগাযোগ নেই। কোন পূণ্যের ফলে সতীকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়েছি জানিনা। ঠিক তেমনি জানিনা, বিদিশা আমার কে, তুমি আমার কে? বন্ধু বান্ধব আত্মীয় পরিজন কত জনকেই তো দেখলাম। সব সম্পর্কগুলোই কেমন যেন ঠুনকো। তোমাদের সাথে আমার কী সম্পর্ক বলো তো? যে ছেলেটা একসময়ে পাঁচ দিনেও নিজের পেটে একটা দানা পর্যন্ত দিতে পারেনি আজ তার মেয়ে মায়ের পেট থেকে জন্মেই তোমার কাছ থেকে এতো সব উপহার সামগ্রী পেল। এ কার পূণ্য ফলে জানিনা”।একটু থেমে দীপ আবার আমার দিকে চেয়ে বলল, “আমার একটা প্রশ্নের জবাব দিতে পারবে মণি? আত্মীয়, স্বজন, পরিজন কাকে বলে? ওই যাদের সাথে আমার রক্তের সম্পর্ক থাকা সত্তেও যারা আমাকে তাদের নিজেদের কাছ থেকে রাস্তার কুকুরের মত তাড়িয়ে দিয়েছিল, তারা? না কি এই যে এ মুহূর্তে তোমার আমার পাশে বসে আমাদের সান্ত্বনা দিয়ে যাচ্ছে, এই বিদিশা চুমকী বৌদিরা”?আমি আর নিজেকে সামলে রাখতে পারলাম না। নিজের পরিবার আত্মীয় স্বজনদের সাথে দীপের যে কোন সম্পর্ক নেই সে কথা দীপ আমায় বিয়ের আগেই জানিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু বিয়ের পর এই তিন চার বছরে বিভিন্ন সময়ে শুধু আমার শাশুড়ি মা ছাড়া দীপের মুখে আর কারো কথা শুনিনি। দু’একবার প্রসঙ্গক্রমে তাদের কথা উঠে এলেও দীপ খুব চালাকী করে সেসব এড়িয়ে যেত। আমি বুঝতে পারতাম, যে কোন কারনেই হোক দীপ তাদের কথা আলোচনা করতে চায় না আমার সাথে। আমিও তাই কোনদিন ওকে জোর করিনি। আমার শাশুড়িকে দেখেছি আমি। খুব ধর্মপ্রাণা মহিলা। নিরামিশভোজী শাশুড়ি মা এখনও নিজের রান্না নিজে করে খান। আর ভাগবদ, গীতা, মহাভারত, রামায়ন পাঠ করেন বাড়ি বাড়ি গিয়ে। সেকালের ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত পড়া, কিন্তু তার হাতের লেখা দেখলে বই পুস্তকের ছাপানো অক্ষরগুলোকেও তুচ্ছ বলে মনে হয়। আমাকে খুব ভালোবাসেন। আমরা তাদের ওখানে গেলে নিজে হাতে রান্না করে আমায় খাওয়ান প্রতিবার।কিন্তু আজ চুমকী বৌদি ওর মনের ভেতরটাকে এমনভাবে আন্দোলিত করে দিয়েছে যে ওর মনের বদ্ধ আগল খুলে গেছে। তাই এসব কথা বলছে। কিন্তু ওই ‘পাঁচ দিন না খেয়ে থাকা’, ‘রিক্সা চালানো’, ‘চোর অপবাদ পাওয়া’ এ সব কথা শুনে আমি আর আমার চোখের জল আটকাতে পারলাম না। দীপের দুঃখের প্রতিটা কথা যেন আমার বুকের মধ্যে হাতুরীর ঘা হয়ে আঘাত করছিল। তাই দীপের মুখ চেপে ধরে আমি কেঁদে উঠে চিৎকার করে বলে উঠলাম, “দীপ, তুমি থামবে এবার? আর কিচ্ছুটি বোলো না। আমি আর শুনতে পারছি না। প্লীজ চুপ করো” বলে হু হু করে কেঁদে উঠলাম।বিদিশা একদিক থেকে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “কাঁদিস না সতী, চুপ কর”।চুমকী বৌদিও দীপকে বলল, “থাক দীপ। আর কিছু বোলো না। সতী যেভাবে কান্নাকাটি শুরু করেছে তাতে ওর শরীর খারাপ হয়ে যেতে পারে। এখনো তো ওর শরীর খুব উইক, তাই না? তাই থাক, এসব কথা বাদ দাও”।ওপর থেকে জেঠীমা(বিদিশার মা) আর মা প্রায় ছুটে এসে আমার ঘরে ঢুকলেন। দু’জনেই প্রায় একসাথে বলে উঠলেন, “কিরে সতী, কি হয়েছে? এমন করে চিৎকার করে উঠলি কেন তুই? ওমা, কাঁদছিস কেন তুই”? আমার কান্না আর চিৎকার শুনেই তারা ওপর থেকে পড়িমড়ি করে ছুটে এসেছেন।আমি লজ্জা পেয়ে চোখের জল লুকোতে শ্রীজাকে আমার পাশে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে উপুড় হয়ে বালিশে মুখ গুঁজে দিলাম। বিদিশা আর চুমকী বৌদি উঠে গিয়ে মা আর জেঠীমাকে ধরে সোফায় বসিয়ে দিয়ে বৌদিকে বলতে শুনলাম, “কিচ্ছু হয় নি, মাসিমা। আপনারা ব্যস্ত হবেন না। আমরা তো এমনি কথা বলছিলাম বসে বসে। দীপের জীবনের কিছু দুঃখের কথা শুনে সতী ঠিক সহ্য করতে পারেনি। কেঁদে ফেলেছে। আর কিছু নয়”।জেঠীমা আমার মাথার কাছে এসে মাথায় হাত দিয়ে বললেন, “বোকা মেয়ে। পুরোনো কথা শুনে কাঁদতে আছে? তুই এখন মা হয়েছিস। মেয়ের সাথে সাথে নিজের শরীরটার দিকেও তো খেয়াল রাখতে হবে তোকে। এভাবে কান্নাকাটি করলে তোর শরীর খারাপ হয়ে যাবে না? ওঠ দেখি। পাগলী মেয়ে কোথাকার। এমন সুন্দর বর পেয়েছিস, ফুটফুটে একটা মেয়ে পেয়েছিস। তোর আর দুঃখ কিসের রে”? আমি চোখ মুছে উঠে বসলাম। লাজুক চোখে সবার দিকে চেয়ে বোকার মত হেসে উঠলাম। দীপ একহাতে আমার একটা হাত মুঠো করে ধরে বলল, “সরি মণি, ভেরি সরি। তুমি আগে অনেকদিন আমার পরিবারের কথা জানতে চেয়েছ। কিন্তু আমি সব সময় এড়িয়ে গেছি। কখনো তোমাকে এসব কথা বলি নি। কারণ, আমি জানতাম, এসব কথা শুনে তুমি সইতে পারবে না। কিন্তু আজ চুমকী বৌদি আমার মনের বাঁধ ভেঙে ফেলেছে। তাই না চাইতেও কথাগুলো মুখ ফস্কে বেড়িয়ে গেল”।মা স্বস্তির শ্বাস ফেলে হেসে বললেন, “চুমকী আবার কী করল”?বিদিশা একটু সরে গিয়ে বলল, “এদিকে তাকিয়ে দেখো কাকীমণি। বৌদি তোমার নাতনীর জন্যে এতোসব কিছু নিয়ে এসেছে। পুচকিটার গলায় একটা সুন্দর সোনার চেইনও পড়িয়ে দিয়েছে এই দেখো” বলে শ্রীজার গলায় পড়ানো চেইনটা তুলে ধরে দেখাল।মা আর জেঠীমা দু’জনেই সেসব দেখে প্রায় আঁতকে উঠলেন। মা বললেন, “একি চুমকী। এ তুমি কী করেছ? অ্যাত্তো সব দেবার কি প্রয়োজন ছিল মা”?চুমকী বৌদি মা-র পায়ের কাছে মেঝেতে হাঁটু মুড়ে বসে মা-র কোলে হাত রেখে বলল, “আমাকে তুমি ‘মা’ বললে কেন”?মা চুমকী বৌদির মাথায় হাত রেখে বললেন, “ওমা, এ আবার কী প্রশ্ন? মেয়েকে তো মায়েরা মা বলে ডাকতেই পারে। তুমিও তো আমার মেয়ের মতই। আমিও তাই বলেছি”।চুমকী বৌদি মা-র হাঁটুর ওপর থুতনি চেপে রেখে মা-র চোখের দিকে চেয়ে বলল, “তার মানে তুমি আমাকে তোমার মেয়ের মত ভেবেই তো ‘মা’ বলেছো, তাই না? তাহলে তুমি নিজেই বলো তোমার ওই মেয়ে আর তোমার ওই পুচকু নাতনিটার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা কী দাঁড়াল? আরও কি বেশী খোলসা করে কিছু বলতে হবে আমাকে”?মা চুমকী বৌদির মুখটা দু’হাতে তুলে ধরে তার কপালে দুটো চুমু খেয়ে বললেন, “পাগলী একটা” বলেই জেঠীমার হাত ধরে বললেন, “চলো দিদি, এদের সাথে বেশীক্ষণ থাকলে আমরাও পাগল হয়ে যাব” বলে জেঠীমার হাত ধরে ঘর থেকে বেড়োতে বেড়োতে বললেন, “এই দিশা, চুমকী আর দীপকে নিয়ে খেতে আয় আগে। সারা রাত জার্নি করেও চুমকী এসে অব্দি কিচ্ছুটি মুখে দেয় নি। সতীর খাবার তো এখানেই পাঠিয়ে দেব। তোরা চলে আয় তাড়াতাড়ি। তোর মা আবার তোদের বাড়ি যাবার জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে”।আমি চুমকী বৌদির দিকে তাকিয়ে দুষ্টুমি করে বললাম, “তোমার মতলবটা কি বলো তো বৌদি? আমাকে ‘তুমি’ থেকে ‘তুই’ করে দিলে, আমার মাকে ‘মাসিমা’ থেকে ‘মা’ বানিয়ে ‘তুমি তুমি’ করে বলতে শুরু করলে। তোমার মতিগতি তো তেমন সুবিধের বলে মনে হচ্ছে না”।চুমকী বৌদিও ঠাট্টা করে বলল, “দাঁড়া, দাঁড়া, মঙ্গল গ্রহের বাসিন্দার মতিগতি তোরা পৃথিবীর লোকেরা কি চট করে বুঝতে পারবি? সে সব ধীরে ধীরে অনেকটা সময় গেলে বুঝতে পারবি। তবে আপাততঃ এটুকু জেনে রাখ, রাহু হয়ে তোদের ভেতরে প্রবেশ করছি। সারা জীবনেও আমার কবল থেকে রেহাই পাবি বলে মনে হয় না”। বলে নিজেই হো হো করে হেসে উঠল। আমি, বিদিশা আর দীপও তার সাথে হাসিতে যোগ দিলাম।দুপুরে খাবার পর জেঠু আর জেঠীমা দাদাকে সঙ্গে নিয়ে তাদের বাড়ি চলে গেলেন। চুমকী বৌদি বিদিশাকে যেতে দিল না। বিদিশার বিয়ের অনেক দায় দায়িত্বই দাদার কাঁধে পড়েছে। আমার প্রিয় বান্ধবী আর মা-ও বিদিশাকে নিজের মেয়ের মতই ভালোবাসে বলে দাদাও সহর্ষে সমস্ত দায়িত্ব বহন করে চলছে।ওপর তলায় তখন কেবল বাবা আর মা। তারাও খাবার পর তেমন কোন কাজ না থাকাতে একটু ভাতঘুম দেবার জন্যে তাদের শোবার ঘরে শুয়ে পড়তেই দীপ আর চুমকী বৌদি নিচে নেমে এল। বিদিশা আর আমি বসে বসে ওর বিয়ের কেনাকাটা নিয়ে একটু গল্প করছিলাম তখন।চুমকী বৌদি ঘরে ঢুকেই বিদিশা আর আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কি করছিস তোরা দুই বান্ধবী বসে বসে”?বিদিশা আমার পাশ থেকে উঠে সোফায় চুমকী বৌদির পাশে বসতে বসতে বলল, “তেমন কিছু না বৌদি। এই বিয়ের কি কি কেনাকাটা বাকি আছে এসব নিয়েই একটু কথা বলছিলাম”।চুমকী বৌদি বলল, “এ আলোচনা করার কি খুব দরকার আছে? তোর বাবা মা তোকে যা দেবে দেবে। তুই তো এখন আমাদের ফ্যামিলির সদস্যা হতে যাচ্ছিস। তোর যা যা প্রয়োজন সব কিছু পাবি। মা বাবার কাছ থেকে বেশী কিছু নিতে চাস নে। তারা ভালোবেসে যা দেবেন সেটাকেই তাদের আশীর্বাদ বলে দু’হাত পেতে নিবি। তাই ওসব আলচনা থাক। এবার আমি সতী আর দীপকে কিছু দরকারী কথা বলতে চাই। যেগুলো ওদের জানা খুবই প্রয়োজন এখন”।দীপ ভেতরের ঘরে না এসে সামনের ঘরেই থেকে গিয়েছিল বলে চুমকী বৌদি তাকে ডেকে বলল, “দীপ কি কোথাও বেড়োবে এখন”?বৌদির ডাক শুনে দীপ ভেতরের ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, “না বৌদি, এখন কোথাও যাবার প্ল্যান নেই। বিকেলে একটু বিদিশাদের বাড়ি যেতেই হবে। দাদা একা হাতে সব সামলাচ্ছেন”।আমি আমার বিছানায় শ্রীজাকে নিয়ে কাত হয়ে শুয়েছিলাম। বড় সোফাটায় বৌদি আর বিদিশা বসে ছিল। বৌদি দীপের হাত ধরে টেনে সোফায় তার পাশে বসিয়ে দিয়ে বলল, “বোসো দীপ। তোমার সাথে কথা আছে”।দীপ একবার আমার দিকে চেয়ে বৌদির পাশে বসে বলল, “তুমি কিন্তু বৌদি বড্ড বাড়াবাড়ি করে ফেলেছ। এত কিছু না আনলেও পারতে”।চুমকী বৌদি দীপের একটা হাত নিজের কোলের ওপর চেপে রেখে বলল, “সে ব্যাপারে কথা শেষ হয়ে গেছে দীপ। ওসব কথা আর টেনো না তো। এবার আমি যা বলছি সেটা শোনো। তুমি তো কাল এসেছ এখানে, কাল নিশ্চয়ই সতীর সাথে ঘুমোও নি”?দীপ জবাব দিল, “না না বৌদি, এখন কি আর ওর সাথে শোয়া যাবে? কাল দাদার সাথে দাদার ঘরেই শুয়েছিলাম। এ ক’টা দিন তো আলাদাই থাকতে হবে, তাই না”?চুমকী বৌদি বলল, “হ্যা একেবারে ঠিক। কিন্তু দশ পনেরো দিন পর হয়ত একসঙ্গে শুতেও পারবে। কিন্তু ওর সঙ্গে আবার সেক্স কবে থেকে করতে পারবে এ ব্যাপারে ডাক্তারদের সাথে কিছু কথা কি তোমরা বলেছ”?দীপ আমার দিকে চাইতেই আমি জবাব দিলাম, “না গো বৌদি, দীপকে আমি একবার বলেছিলাম ডাক্তারের সাথে এ ব্যাপারে কথা বলতে। কিন্তু লজ্জায় ও-ও কিছু বলে নি”।