আউট অফ কলকাতা - অধ্যায় ৩১
পর্ব ৩১
"ধমমমমম!" করে একটা প্রচণ্ড আওয়াজ করে বোমটা এসে পড়লো সেই ভাঙা ফ্লাইওভারটার ওপর | আগে থেকেই নিজের দেহ রেখে দিয়ে থাকলেও বম্ব পরার জন্য সাথে সাথে আরও কিছুটা অংশ ভেঙে এইদিক ঐদিক ছিটকে পড়লো | তবে তার নিজের অজান্তেই সেই অবশিষ্ট শেষ শক্তি দিয়ে আগলে রইলো তার ভেতরের থাকা আশ্রয়কারীকে |আকাশের বুক চিরে একটার পর একটা ফাইটার প্লেনের যাওয়ার আওয়াজ হতে লাগলো আর তারি সাথে সাথে মনে হতে লাগল যেন পুরো মাটিটাই কেঁপে উঠল | মাঝে মধ্যে আবার দূর থেকে গুলি চলার আওয়াজও ভেসে আসতে লাগলো | কার ভাগ্যে যে সেই হতভাগ্য গুলি লেখা ছিল সেটা কেউই জানল না । চারিদিকের অবস্থা দেখে মনে হতে লাগল যেন এই পৃথিবী এইবার শেষ হয়ে যেতে চলেছে, দুঃখে আভিমানে নিজের মুখ ফিরিয়ে নিতে চেলেছে তারি বাসিন্দাদের দিক থেকে | সূর্যের আলো তখন অনেকটাই ক্ষীণ হয়ে এসেছিলো আর সেই সবের মধ্যেই নিজেদের বাঁচাতে সেই ভাঙা ফ্লাইওভারের নিচে আশ্রয় নিয়ে ছিল একটা পরিবার, তবে তার মধ্যে এখন শুধু অবশিষ্ট একটি মাত্র প্রান | বম্বিঙয়ের ফলে ফ্লাইওভারটার জায়গায় জায়গায় ফাটল ধরে গেছিলো আর সেই রকমই একটা ভাঙা ফাটলের অংশ দিয়ে এক চিলতে রোদ এসে পড়ল সেই অবশিষ্ট ব্যক্তির মুখের ওপর | বম্বিঙ্গের ফলে তার সারা শরীরে মুখ ধুল বালি লেগে সাথে সাথে রক্তাও লেগে ছিল, তবে সে রক্ত তার নিজের নয় | নিজের মায়ের দেহটাকে নিজের বুকের সাথে আঁকড়ে ধরে ধুলো বালির মধ্যে বসে ছিল সেই ছোট ছেলেটা, কারণ সে জানতো যে যাই হোক না কেন তার মা তাকে সব কিছুর থেকে রক্ষা করবে । তারই হাত কতক দূরে রক্তাক্ত ছিন্ন বিছিন্ন অবস্থায় পড়েছিল আরেকটা দেহ । তার বাবার | দুঃখে, বেদনায় ক্লান্তিতে সে নিজের চোখ দুটো আর খুলে রাখতে পারছিলো না । সে বুঝেও বুঝতে চাইছিল না যে তার বাবা মা আর কোনোদিন তার সঙ্গে কথা বলতে পারবে না, তারা এখন চিরনিদ্রায় আচ্ছাদিত । হঠাৎ দুর থেকে পাথর খসার আওয়াজ পেয়ে চকিতে সেই দিকে তাকাল সে আর সাথে সাথে দূর থেকে একটা ছায়ামূর্তি তারই দিকে এগিয়ে আসতে দেখল । সেই দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ভয়ে নিজের মায়ের দেহটাকে নিজের বুকের সাথে আরও জোরে আঁকড়ে ধরল সে | তবে ভয় পেলেও সেই দিকেই একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকল সে। ছায়ামূর্তিটা তারই দিকে আস্তে আস্তে এগিয়ে আসতে লাগলো তবে সেটাকে দেখে তার মনে হল যেন সে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে | সূর্যের শেষ কিরণ তার ওপর পড়তেই সেই ছায়ামূর্তিটাকে পরিষ্কার দেখতে পেল সে তবে দেখে সাধারণের চেয়ে অনেকটাই বেঁটে বলে মনে হল ছেলেটার | একসময় ছায়ামূর্তিটা তার একদম সামনে চলে আসতেই সে বুঝতে পারলো যে সেটা কোন বেঁটে লোক নয় আসলে একটা বাচ্চা, তারই সমবয়সী... । সে আস্তে আস্তে তার সামনে এসে পাথরের ওপর ধপ করে বসে পড়লো | ছেলেটা আস্তে আস্তে নিজের চোখ তুলে ওর মুখের দিকে তাকাতেই দেখল যে তার কপাল বেয়ে একটা সরু রক্তের ধারা নেমে আসছে...তার সেই রুপ দেখেই ছেলেটা খুব ভয় পেয়ে গেল : "কে তুই...?" ছেলেটা চেঁচিয়ে উঠল "আমি...? কেউ না..." হালকা অস্ফুট কণ্ঠে বলে উঠল মেয়েটি । "কি চাস তুই...আমায় কি করবি তুই..." আবার চেঁচিয়ে বলে উঠল ছেলেটা "আমি তোকে কিছুই করবো না..." মেয়েটা বলে উঠল "হ্যাঁ...আর তুই আমার কিছু করতেও পারবি না......আমার মা বাবা আমার সঙ্গেই আছে...." বলে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল নিজের মায়ের দেহটাকে| মেয়েটা করুন দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে পৃথিবীর সব থেকে প্রাচীন সত্যিটা তাকে বলে উঠল ঃ "তোর...বাপ মা আর নেই রে...নেই আর...." নিজের মাথা ঘুরিয়ে দূরে পরে থাকা সেই রক্তাত দেহটার দিকে তাকাল মেয়েটা | "না...না....না, তুই মিথ্যে বলছিস...এইত আছে, আমার কাছেই আছে...এই তো..এই তো....। ওহ মা..মা চোখ খোলো...ওহ মা চোখ খোলো তোমার..." বলতে বলতে কেঁদে ফেলল ছেলেটা । নিজের জীবনের সব থেকে বড় সত্যিটা কে এতক্ষণ ধরে অস্বীকার করার পর শেষমেশ সেটা কে মেনে নিতে বাধ্য হল সে । "না....নেই" বলে তার কাছ থেকে তার মায়ের দেহটা ধরে সরিয়ে দিয়ে পাশে মাটিতে রেখে দিলো সে আর তারপরই ছেলেটাকে জড়িয়ে ধরল | "আমায় একা রে...রেখে কেন চ...চলে গেলে তোমরা..." বলে হাউহাউ করে কেঁদে উঠল ছেলেটা । "চুপ...কর, আমি আছি তো নাকি..." মেয়েটা বলে উঠল 'তুই...তুই কে..?" আবার সেই একি প্রশ্ন করে উঠল ছেলেটা "জানি না..." "তুই কোথায় থাকিস...? তোর বারি কোথায়...? ""জানি না..." তবে এইবার তার নিজের চোখের কোন বেয়ে অশ্রুধারা বেরিয়ে এলো । "তাহলে...তুই এখানে কি করছিস...? এখানে তো সবাই মারপিট করছে.....তুই এখানে থাকলে মোড়ে যাবি তো...." ছেলেটা ভয়ে বলে উঠল । "তুই চল না আমার সাথে....তোকে আমার সাথে নিয়ে যাবো আমি...আমার বন্ধুদের কাছে...ওখানে অনেকে..." নিজের মুখের কথাটা শেষ করবার আগেই আরেকটা বোম্ব এসে আঁচড়ে পড়লো সেই ফ্লাইওভারটার ওপরে আর সাথে সাথে ওপর থেকে কংক্রিটের একটা বিরাট চাঙড় ভেঙে পড়ল । তবে ভাগ্যক্রমে, তাদের কিছু হল না..."চল এখন থেকে এখুনি, এখন থাকলে আমরা কেউই আর বাঁচবো না....চল " বলে ছেলেটার হাতটা চেপে ধরে দৌড়োতে আরম্ভ করল সেই ছোট মেয়েটা | নিজের মা বাবার দিকে শেষবারের জন্য একবার তাকাতেই ছেলেটার চোখে জল চলে এল তবে এখন তারও নিজের প্রাণের ভয় হতে লাগল আর তাই সেও মেয়েটার সঙ্গে দৌড়তে লাগল । তাদের প্রাণের ভয় এতটাই ছিল যে খালি পায়ে দৌড়োতেও ওদের কোনও রকম কষ্টই হল না | "কোথায়...কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস আমাকে...? " দৌড়োতে দৌড়োতে ছেলেটা প্রশ্ন করে উঠল | "ডাক্তার কাকুর কাছে...." বলে আরও জোরে ওর হাতটা চেপে ধরে দৌড়োতে লাগল মেয়েটা | কিছুদূর ঐরকম যেতে না যেতেই সামনে কয়েকটা লোক নজর পড়ল ওদের আর সেটা পড়তেই ভাঙা একটা দেওয়ালের পেছনে লুকিয়ে পড়লো মেয়েটা । তারপর নিজের বন্ধুর হাতটা টেনে ধরে নিচে বসিয়ে দিলো | সেই লোকগুলোকে সে আগে দেখেছে আর সে জানতো যে তারা ভালো নয়....সেই লোকগুলোই মেরে ছিল তার বন্ধুদের |দেওয়ালের পেছনে লুকিয়ে থাকতে থাকতে বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন আসতে লাগল সেই ছেলেটার মনের মধ্যে । সাথে সাথে নিজের মুখ খুলে কথা বলতে যেতেই ওকে বাধা দিয়ে ওর মুখের ওপর হাত দিয়ে চেপে ধরল মেয়েটা | তারপর নিজের ঠোঁটের সামনে আঙ্গুল তুলে ধরে ওকে কথা বলতে বারুন করল আর ঠিক তক্ষণই সেই ভাঙা দেওয়ালের ওই পার থেকে তাদের কানে কিছু কথা ভেসে এলো :"মেজর জেনারেল স্যার, আই....আই এম রিয়েলই সরি টু টেল ইউ দিস বাট, আমাদের ডি কোম্পানির অনেক জওয়ানই আইদাড় কিল্ড ইন একশান বা সিভিআরলি ইনজিওর্ড স্যার......তারা এরকম ভাবে আর কন্টিনিউ করতে পারবে না স্যার....আই এডভাইস ইউ...." দেওয়ালের ওই পাশ থেকে কেউ একজন বলে উঠল । "ফাক ইওর এডভাইস ক্যাপ্টেন....যারা গেছে, গেছে...ভালো হয়েছে, তবে যারা এখনো বেঁচে আছে তাদের কে লড়াই চালিয়ে যেতে বলবে এন্ড দ্যাটস মাই অর্ডার আর...যে আমার এই অর্ডার মানবে না....শুট দেম...." চেঁচিয়ে বলে উঠলেন মেজর জেনারেল । "কিন্তু...কিন্তু মেজর..স্যার...ওরা" কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারলো না সেই ব্যক্তিটি "নো মোর ওয়ার্ডস, ক্যাপ্টেন....নো মোর ওয়ার্ডস, নাও...হোয়াট এবাউট দা ইনফরমেশন আই ওয়ান্টেড....রেজিস্টেন্সের কি অবস্থা....?" গম্ভির গলায় বলে উঠলেন মেজর জেনারেল"আমরা...আমরা, এখনও ওদের এইচ কিউয়ের ঠিকানা বের করতে পারিনি...স্যার....কিন্তু" ক্যাপ্টেন আপ্রস্তুত হয়ে বলে উঠলেন "আর সেটা তুমি এত বড়ো মুখ করে আমাকে বলতে এসেছ.. ব্লাডি ফাকিং ইডিয়ট!!! " মেজর চেঁচিয়ে উঠে নিজের টেবিলে রাখা কাঁচের পাপার ওয়েটটা ছুঁড়ে দেওয়ালে আছাড় মারলেন আর সাথে সাথে সেটা ভেঙে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেল । "মেজর জেনারেল স্যার....প্লিজ....স্যার...আপনি..আপনি শান্ত হন । আপনি কোনও চিন্তা করবেন না, আমরা..আমরা কিছুক্ষণের মধ্যেই ওদের ঠিকানা জোগাড় করে ফেলবো...আই গিভ ইউ মাই ওয়ার্ড মেজর, কিন্তু...কিন্তু স্যার তারপর কি করবো আমরা? মানে ওদের কে ধরে আমাদের ক্যাম্পে প্রিসনার্স বানাবো, তাইতো...?" ভয়ে অনিশ্চিত কণ্ঠে উঠলেন সেই ক্যাপ্টেন "নো ক্যাপ্টেন....ওদের ঠিকানা জানতে পারলেই আমরা ওদের এইচ কিউয়ে রেড করবো, অন ফুট.... তারপর ওদের আর ওদের শরণাপন্ন প্রত্যেকটা পুরুষ, মহিলা...বাচ্চাকে শেষ করে ফেলবো আমরা.." হিংস্র ঠাণ্ডা কণ্ঠে বলে উঠলেন মেজর জেনারেল "কি...?" অবাক বিস্ময়ে মেজর জেনারেলের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন ক্যাপ্টেন, "কিন্তু স্যার, দ্যাটস...দ্যাটস নট ফেয়ার, আমি...আমরা..""ফাক অফ ক্যাপ্টেন...তোমায় যেটুকু তোমাকে কাজ দেওয়া হয়েছে সেটা তুমি করো...নিজের পেগ্রেডের বাইরে নাক গলাতে এসো না...আই উইল ফাকিং ডেস্ট্রয় ইউ.....নাও ফাক অফ !!!" বলে ক্যাপ্টেনের উনিফরমের কলার ধরে টানতে টানতে টেনে হিঁচড়ে তাকে ঘরের বাইরে বের করে দিলেন উনি, তারপর সজোরে নিজের ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিলেন । মেয়েটা বয়সে অনেকটাই ছোট হলেও মেজর আর ক্যাপ্টেনের কথাপকথন শুনে বুঝতে পারলো যে কি বিপদ তার আর তাদের বন্ধুদের সামনে ঘনিয়ে আসতে চলেছে...."আমাদের...আমাদের...এখুনি এখান থেকে পালতে হবে....আমায় আমার বন্ধুদের বাঁচাতে হবে.....চল এক্ষুনি চল..." বলে উঠে দাঁড়িয়ে ছেলেটার দিকে তাকাতেই দেখল যে তার পা দিয়ে রক্ত বেড়িয়ে মাটিটা ভিজে লাল হয়ে গেছে । "একি!! তোর পা দিয়ে তো রক্ত বেরোচ্ছে..." বলে সাথে সাথে মাটিতে বসে পরে ছেলেটার পায়ের পাতাটা নিজের কোলের ওপর তুলে নিলো মেয়েটা | তার পাটা নিজের কোলে তুলতেই সে দেখল যে ওর পায়ের তলায় একটা বড়ো লোহার টুকরো ঢুকে রয়েছে |"এটাকে...বার করতে হবে" ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল মেয়েটি আর সাথে সাথে সেও নিজের মাথা নাড়িয়ে নিজের সম্মতি জানাল। "তবে এই নে...আমার হাতটা শক্ত করে চেপে ধর..." নিজের হাতটা তার দিকে বাড়িয়ে বলে উঠল মেয়েটা... "তবে, তোর যতই ব্যথা লাগুক না কেন একদম চেঁচাবি না...ঠিক আছে?" ছেলেটা আবার নিজের মাথা নাড়াল, তারপর নিজের হাত বারিয়ে শক্ত করে মেয়েটার হাতটা চেপে ধরল | সব কিছু ঠিক থাক করে দেখে আস্তে আস্তে সেই লোহার টুকরোটাকে তার পায়ের ক্ষত থেকে টেনে বের করতে লাগলো মেয়েটা তবে আশ্চর্যের বিশয় হল এই যে, যতই ব্যাথা লাগুক না কেন ছেলেটার নিজের মুখ দিয়ে টু শব্দটাও বের করলো না । শুধু তার চোখের কোন বেয়ে অঝোরে জল ঝরতে লাগলো | লোহার টুকরোটা পুরোটা বেরতেই ক্ষতর জায়গাটা দিয়ে আস্তে আস্তে রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগলো আর সেটা দেখে মেয়েটা নিজের জামা থেকে কিছুটা কাপড় ছিঁড়ে ওই ক্ষতর জায়গাটার ওপরে বেঁধে দিলো |"তোর লাগেনি তো...?" বলে ছেলেটার মুখের দিকে তাকাতেই সে নিজের হাত দিয়ে নিজের চোখের জল মুছে নিলো, তারপর নিজের মাথা নাড়িয়ে 'না' জানাল । "ঠিক আছে...তাহলে...চল এবার..." বলে আস্তে আস্তে দুজনে মাটি থেকে উঠে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই হঠাৎ ওপর দিক থেকে একটা বিকট আওয়াজ শুনতে পেল | সেই আওয়াজ লক্ষ্য করে সেই দিকে তাকাতেই তারা বুঝল যে সেটা তাদেরই দিকে ধেয়ে আসছে আর সাথে সাথেই ওদের পাশে সেই রকেটের মতন দেখতে জিনিসটা এসে পড়ল | সেই রকম জিনিস আগেও দেখে থাকার কারণে ভয়ে নিজের বন্ধুর হাতটা চেপে ধরে দৌড়নোর চেষ্টা করল মেয়েটা কিন্তু কিছুদূর যেতে না যেতেই সেই রকেটের মতন জিনিসটা 'দুম' করে ফেটে গেল | "স্যার, স্যার...তাড়াতাড়ি চলুন......খুব খারাপ অবস্থা ওদের.." দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে বলে উঠল একজন আর সেটা শুনেই ঘরের ভেতরে থাকা বেক্তিতি ঘর থেকে দৌড়োতে দৌড়োতে বেরিয়ে এল । বাইরে এসে করিডোরের দিকে তাকাতেই দেখল যে ঘরের মেঝেতে রক্তাক্ত অবস্থায় দুটো ছোট দেহ শোয়ানো রয়েছে | বেক্তিটি সঙ্গে সঙ্গে তাদের সামনে ঝুঁকে পরে তাদের দুজনের কব্জি ধরে তাদের নারী পরীক্ষা করতেই চমকে উঠল ঃ "তাড়াতাড়ি!!!! ওদের ভেতরে নিয়ে এসো..তাড়াতাড়ি !!! নার্স !!! " চেঁচিয়ে উঠলেন সেই বেক্তি ওখানে সামনা সামনি যারাই ছিল সঙ্গে সঙ্গে জরও হয়ে সবাই মিলে ধরা ধরি করে সেই বাচ্চা দুটোকে ভেতরে অপারেটিং রুমে নিয়ে গেল | তবে তাদের অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে তাদের দেখে অনেকেই আশা ছেড়ে দিলো | "কোথায়...কোথায় পেলে ওদের...? কোথায় ছিল ওরা..? " অপারেটিং টেবিলের ওপর জিনিস পত্র গোছাতে গোছাতে জিজ্ঞেস করে উঠলেন সেই বেক্তি | "ওই শালা বানচোদ দেড়.....সরি ডাক্তার-কাকু....ওই শালাদের ক্যাম্পের কাছে প্যাট্রোল করার সময় আমরা ওদেরকে খুঁজে পেলাম....শেলিং হওয়ার সময় ওরা ওইখানে ছিল...মানে.." "মানে ভুল সময়ে ভুল জায়গায়..." বলে বাচ্চা গুলোর দিকে করুন দৃষ্টিতে তাকালেন ডাক্তারটা, "হে ভগবান..আর কত নিষ্ঠুর হবে তুমি...এরা কি দোষ করেছে...এদেরকে এরকম শাস্তি দিচ্ছ কেন..." বলে প্রায় কেঁদেই ফেললেন ডাক্তার-কাকু "ডাক্তার-কাকু আপনি...""মানু. ওদের অবস্থা...." নিজের কথা শেষ করতে পারলেন না ডাক্তার-কাকু "ডাক্তার-কাকু আপনি...আপনি কিছু করে ওদের কে বাঁচান, আপনি আমাদের ভগবান...পারলে আপনিই পারবেন..." বলে ডাক্তারের পায়ে লুটিয়ে পড়ল সেই লোকটা, তারপর হাত জোর করে বলে উঠল "আমরা আর কাউকে মরতে দেখতে চাইনা স্যার...বিশেষ করে ওদের কে তো নয়ই ""ঠিক..ঠিক আছে মানু...তুমি যখন নিজের হাল ছারনি তখন আমিও আমার প্রাণপণ চেষ্টা করবো... আই উইল গিভ মাই বেস্ট....তবে তোমরা এবার সবাই প্লেজ বাইরে যাও...নার্স এদিকে..." তার কথা শুনে সবাই তাড়াহুড়ো করে সেই ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই নার্স ভেতর থেকে অপারেটিং রুমের দরজাটা বন্ধ করে দিলো আর সাথে সাথে অপারেটিং রুমের সামনের বাল্বটা জলে উঠল | দূরে কোথাও আবার একটা বোম্ব ফাটার আওয়াজ ভেসে এলো ওদের কানে কিন্তু সে সবে ওরা সবাই অভ্যস্ত হয়ে গেছিলো | "মানু, বাচ্চা দুটোর....অবস্থা দেখে..." নীরবতা ভঙ্গ করে পাশ থেকে একজন বলে উঠল "মেলা ফ্যাচফ্যাচ করিস না কানের কাছে....আর তুই ভুলে যাচ্ছিস যে তোর সেই অবস্থা থেকেও ডাক্তার-কাকু তোকে বাঁচিয়ে ফিরিয়ে এনেছিল..." বলে তার দিকে তাকাল মানু "সে তো বটেই...আমি তো হাল ছেড়েই দিয়েছিলাম....""আমি ছাড়ি নি....ডাক্তার-কাকু ছাড়েন নি....ওরা কেউই ছাড়ি নি......আজকেও ছাড়বে না..." বলে সেই অপারেটিং রুমের সামনে জ্বলে থাকা বাল্বের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকল মানু । প্রতিটা মুহূর্ত যেন ওদের কাছে দিন বরাবর বলে মনে হতে লাগল | মনে হল এই বুঝি দরজা খুলে ডাক্তার-কাকু বেরিয়ে আসবেন আর বেড়িয়ে এসেই তাদের কে সেই খারাপ সংবাদটা শোনাবেন....ঘণ্টা তিনেক পর হঠাৎ আলোটা বন্ধ হয়ে যেতেই দরজা খুলে বাইরে বেড়িয়ে এলেন ডাক্তার-কাকু আর বেরিয়েই দেখলেন সবাই তার ঘরের বাইরে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে | সবার মুখেই উদ্বিগ্নতার ছাপ...জিজ্ঞাসু চোখে ডাক্তার-কাকুর মুখের দিকে তাকিয়ে যেন বুঝতে চাইছে সেই ঘরের অবস্থাটাকে...."ডাক্তার-কাকু, কি হল? ওরা....ওদের" গলা দিয়ে আর কোনও আওয়াজ বেরল না মানুর ডাক্তার-কাকু নিজের মাথা নাড়িয়ে বললেন "দে আর স্টেবেল ", ডাক্তারের মুখের কথা শেষ হতে না হতেই সবাই আনন্দে উল্লাসে ফেটে পারলো | মানু দৌড়ে এসে ডাক্তার-কাকুকে জড়িয়ে ধরল আর তাই দেখে ওখানে থাকা সবাই ডাক্তার-কাকুকে ওপরে তুলে ধরল | "আরে.!! আরে..বাবারে... ঠিক আছে....ঠিক আছে....খুব খুশি তোমরা...বুঝেছি...বাবা এটা ইনফামারী...আস্তে আস্তে..." কেউ তার কথা শুনেছেনা দেখে ডাক্তার-কাকু আসল ওষুধের প্রয়গ করলেন, "তবে এইবার কিন্তু আমার কোমর ভেঙে যাবে...এই রকম করলে" বলতেই আবার সবাই মিলে ডাক্তার-কাকুকে আস্তে আস্তে নিচে নামিয়ে আনল | নিচে নেমে মুখে একটা স্বস্তির হাসি এনে ডাক্তার-বাবু বলে উঠলেন " ওরা..ওরা সুস্থ হয়ে উঠলে আমাকে বরঞ্চ পাঁঠার মাংস খাইও....তাতে আমি খুশি হবো বেশি....কিন্তু ওরা কে বা কোথা থেকে এসেছে সেটার কি কোনও খবর আছে তোমাদের কাছে...মানে দুটো বাচ্চা ওইরকম জায়গায়..কি করে..? " "না ডাক্তার কাকু....আমরা যখন ওদের কে পেলাম তখন ওই রক্তাত অবস্থায় ওদেরকে দেখে আমরা কিছু বুঝতে পারিনি...অবশ্য এমনি হলেও হয়তো চিনতে পারতাম না...তবে রেডার শালাকে একবার বলে দেখা যেতে পারে...মানে ওর মতন..." মানু বলে উঠল "জানি...জানি, তোমাদের রেডারকে আমি খুব ভালো করেই জানি...তবে আশ্চর্যের বিষয় কি জানো তো মানু ; ওই বাচ্চা মেয়েটাকে আমি চিনি...." "আপনি চেনেন...ওকে? সেটা...সেটা তো খুবই খুশির খবর....""সেটা খুশির খবর কিনা জানি না তবে আমি যখন সোনাগাছির যৌন পল্লীতে সজাগতা প্রোগ্রাম করাতে যেতাম তখন ও আমার কাছে দৌড়ে আসত জানাতও...আমাকে জড়িয়ে ধরে ডাকু ডাকু বলে ডাকত..." বলতে বলতে হেসে ফেললেন ডাক্তার-কাকু, "তবে সে..সব অনেকদিন আগেকার কথা...আর ওই রকম জায়গাতে থাকলে মেয়েদের যেমন অবস্থা হয়, ঠিক সেই একই অবস্থাই হয়ে ছিল ওর মায়ের...""ওহ! আর...আর ওই ছোট ছেলেটা...? ওকে...ওকে চেনেন না আপনি...? ওর পোশাকআশাক দেখে তো বড়ো ঘরের মনে হল...কিন্তু ওইরকম জায়গায়..." মানু বলে উঠল "না...ওর ব্যাপারে আমি কিছু জানি না মানু, তবে কেন জানো তো ওর মুখটা......মুখটা দেখে খুবই চেনা চেনা মনে হল । কোথায় যেন দেখেছি আগে...মানে সেটা মনে হচ্ছে....কিন্তু মনে..." আর হঠাৎই সেই মুখটা মনে পড়তেই ডাক্তার-কাকুর মাথা ঘুরে গেল | সেই চাপ না সামলাতে পেরে প্রায় মাটিতে যাচ্ছিলেন এমন সময় মানু এগিয়ে এসে ওনাকে ধরে ফেলল । তার সেই অবস্থা দেখে সবাই মিলে ধরাধরি করে বাইরের চেয়ারের ওপরে ওনাকে বসিয়ে দিলেন, তবে তাদেরকে বাধা দিয়ে ডাক্তার-কাকু তাড়াহুড়ো করে বলে উঠলেন "আমি ঠিক আছি একদম...তোমরা চিন্তা করোনা... তবে তুমি, মানু ..তুমি শিগগিরি..শিগগিরি থার্ড ফ্লোরে যাও...আমি যেটা ভাবছি যদি সেটাই হয় তাহলে...তাহলে" আস্তে আস্তে বলে উঠলেন ডাক্তার-কাকু । "তাহলে..তাহলে কি ডাক্তার-কাকু ? থার্ড ফ্লোরে কি আছে? কে আছে ওখানে? মানে কাকে খুঁজবো আমি ওখানে গিয়ে..কাকে কি বলবো?" মানু একটার পর একটা প্রশ্ন করে যেতেই ডাক্তার-কাকু ওর হাতটা খপ করে চেপে ধরলেন | "থার্ড ফ্লোরে...একদম শেষের ঘরে যে মহিলাটি আছে তাকে...তাকে বল..." অস্ফুট সরে বলে উঠলেন ডাক্তার-কাকু "কে...? মিস..চ্যাটার্জী ? উনি তো নার্স...তবে..." অন্ধকারে কিছু খুঁজে পাওয়ার আশায় মানু বলে উঠল "হ্যাঁ...চ্যাটার্জী...দীপা, আর সম্ভবত ওই বাচ্চা ছেলেটা ওরই ভাগ্নে, রুদ্র..." সেই ঘরের দিকে ইশারা করে বললেন ডাক্তার-কাকু । "মানে.... মানে ওকেই খুঁজতে উনি মাঝেমধ্যে এইদিক ওইদিক বেরিয়ে যান...? কিন্তু্...কিন্তু তাহলেও আপনি কি করে...কি করে শিওর হলেন যে সেই..." "আমি ওদের ফ্যামিলি ডক্টর মানু...আমার এই হাত দিয়েই ওর আর ওর দিদির নাড়ি কেটেছিলাম আমি..."