নায়িকা হওয়া part 1 - অধ্যায় ১৪
নায়িকা হওয়া (দ্বিতীয় খণ্ড) বিপদের সময়েই জীবনে সঠিক বন্ধুর পরিচয় পাওয়া যায়। ঐন্দ্রিলা সেটা বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর হাড়ে হাড়ে বুঝতে পেরেছে। ঢাকা শহরে ওর এমন কোন আত্মীয় স্বজন নেই যার বাসায় গিয়ে ক'দিনের জন্য আশ্রয় নিতে পারে।
স্কুল কলেজের কোন বন্ধু বা বান্ধবীর সাথেও যোগাযোগ নেই ওর। বিয়ের পর থেকে সবার সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলো। এখন জীবনের কঠিন মুহূর্তে এসে বুঝতে পারছে যে স্বামীর ঘর বাদে ওর আসলে যাওয়ার কোন জায়গা নেই। কিন্তু যে ঘর থেকে একবার বেরিয়ে এসেছে সে ঘরে তো ফিরে যেতে পারে না। যে করেই হোক ওকে নিজের পায়ে দাঁড়াতেই হবে। কিন্তু কী করবে সে? কোথায় যাবে এত রাতে?
রাতের ঢাকা শহরে ওর মতো যুবতী একটি মেয়ের পক্ষে একা রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করা মোটেও নিরাপদ নয়। ঔন্দ্রিলা একবার ভাবলো হোটেলে রুম ভাড়া নিয়ে রাতটা কাটিয়ে দেবে। কিন্তু খুব একটা নিরাপদ হবে না ভেবে সে চিন্তাও বাদ দিয়ে দিলো। কী করা যায় সেটা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মনে পড়ে গেলো একজনের কথা। মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠলো ওর। ফোন বের করে কন্টাক্ট লিস্ট থেকে কল দিলো। দুই বার রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে সাড়া পাওয়া গেলো।
'হ্যালো, কে বলছেন?'
'হ্যালো, কবিতা বলছো? আমি ঐন্দ্রিলা বলছি।'
'আরেএএএ বেবিগার্ল, কতদিন পর কথা হচ্ছে। কী খবর তোমার?'
'বেশি ভালো নয়।'
'কী হয়েছে?' কবিতার কন্ঠে নির্ভেজাল দুশ্চিন্তার ছাপ পাওয়া গেলো। মেয়েটা সত্যিই ঐন্দ্রিলার প্রতি খুবই আন্তরিক।
'আমি খুব বিপদে পড়েছি। I need your help right now.'
'অবশ্যই। কী করতে হবে বলো শুধু।'
'আমাকে এই মুহূর্তে একটি বাসা খুঁজে দিতে হবে।আমি স্যুটকেস নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি।'
'তাই নাকি! এত রাতে তোমার বাসা প্রয়োজন। ওয়েট আ মিনিট। আমি একটু ভেবে নিই। হুমম... আসলে এত রাতে ভাড়া বাসা পাওয়া ডিফিকাল্ট হবে। তবে তুমি চিন্তা করো না। এই মুহূর্তে তুমি হোটেল গোল্ডসিটিতে চলে আসো। আমি এখানেই আছি। Don't worry darling. সব ঠিক হয়ে যাবে।'
ঐন্দ্রিলা যেন বুকে অনেকটাই জোর পেলো। একটি সিএনজি নিয়ে সোজা চলে গেলো হোটেল গোল্ডসিটিতে। বিরাট আয়তনের ফাইভ স্টার সমমানের হোটেল এটি। পার্কিং এ দামি দামি ব্রান্ডের গাড়ি পার্ক করে রাখা। কয়েকজন সিকিউরিটি গার্ড ঘোরাফেরা করে নজর রাখছে। চারিদিকে ঝকঝকে আলোয় আলোকিত। ঐন্দ্রিলা অনেকটা নিরাপদ বোধ করলো এখানে। কবিতাকে কল দেওয়ার পর কবিতা ফোনের ওপাশ থেকে রিসিপশনে গিয়ে নির্দিষ্ট রুম নাম্বার বলতে বললো। এই ব্যাপারটায় ঐন্দ্রিলার বেশ খটকা লাগলো। সে প্রত্যাশা করেছিলো কবিতা হয়তো নিজে এসে ওর সাথে দেখা করবে।
সে যাক। এই মুহূর্তে কবিতার নির্দেশমত কাজ করা ছাড়া ওর কোন উপায় নেই।
রিসিপশনে রুম নাম্বার বলার সাথে সাথে সুদর্শন একটি ছেলে হাসিমুখে বললো, 'ইয়েস ম্যাম। আপনার ব্যাপারে আমাদের ইনফর্ম করা আছে। আসুন আমার সাথে।'
ছেলেটি ওকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চললো লিফটের দিকে। লিফট ওদের দুজনকে ছয় তলায় পৌছে দিলো। অলিগলির মতো নানান করিডোর পেরিয়ে ওকে একটি রুমের সামনে নিয়ে এলো ছেলেটি। ঐন্দ্রিলা নিজের হাতে কলিং বেল টিপলো।
দরজা খুলে কবিতা বেরিয়ে এসেই উচ্ছ্বসিত ভঙ্গিতে জড়িয়ে ধরলো। ঐন্দ্রিলার মনে হলো যেন অনেকক্ষণ পর একজন আপন মানুষকে কাছে পেলো।
স্যুটকেসটি রুমের ভিতরে রেখে বিদায় নিলো ঐন্দ্রিলাকে এস্কোর্ট করা হোটেল বয়। তারপর কবিতা হাত ধরে ওকে ভিতরে নিয়ে গেলো। ভিতরকার সাজ সজ্জা দেখে ঐন্দ্রিলা রীতিমত অবাক হলো এটা ভেবে যে এত বিলাসবহুল স্যুটের খরচ কী করে কবিতা বহন করছে।
কবিতা ওকে বিছানায় বসিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁটিয়ে সব শুনে নিলো। তারপর বললো, 'তার মানে তুমি আপাতত তোমার স্বামীর কাছে যেতে চাচ্ছো না তাই তো?' ঐন্দ্রিলা হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো।
'বেশ, তাহলে তোমার প্লান কী?'
'আমার চাকরি দরকার। নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই আমি। তবে তার আগে দরকার মাথা গোঁজার ঠাঁই।'
'ভেরি গুড ডিসিশন। আমি তোমার সাহসের তারিফ করি। তোমাকে সবরকম সহযোগীতা আমি করবো। তবে আজ রাতটা তুমি এই হোটেলেই কাটাও। আমি এই রুমটি তোমার জন্য বুক করেছি। আগামীকাল সকালে দেখা হবে আমাদের।'
এই বলে কবিতা ওকে গুডনাইট জানিয়ে চলে গেলো। সম্পূর্ণ ব্যাপারটিই ঐন্দ্রিলার কাছে কেমন যেন রহস্যময় মনে হলো। তবে অনেক রাত হয়ে গেছে দেখে সেও আর বেশি কিছু ভাবতে চাইলো না। জামা কাপড় পালটে একটা নাইটি পরে শুয়ে পড়লো। মনে মনে প্রার্থনা করতে লাগলো আগামী দিনটা যেন ভালো যায় তার। তবে ঘুম ওর চোখে আসি আসি করেও আসছে না যেন। বারংবার শান্তনুর মুখটা ভেসে উঠছে ওর মনে। স্বামীর প্রতি একটা চাপা অভিমান ভারি পাথরের চেপে রইলো ঐন্দ্রিলার বুকের মাঝে।
(চলবে)