নীল সাহেবের কুঠি - অধ্যায় ১
নীল সাহেবের কুঠি
“আপনারা কি এখানে থাকবেন বলে ঠিক করে নিয়েছেন”, সামনে বসে থাকা দম্পতির দিকে জিজ্ঞাসু চাহুনি নিয়ে চেয়ে রইলেন বাড়িটির বর্তমান মালিক রমাপদ মল্লিক। মাঝবয়সী দম্পতির মধ্যে পুরুষটির নাম অপরেশ পুরকায়স্থ আর তাঁর স্ত্রী শ্রীমতি সুনন্দা পুরকায়স্থ। সুনন্দার পাশে অপরেশকে খুব একটা খারাপ মানায় না, কিন্তু খুবই গোবেচারা গোছের স্বামী বলে মনে হয়। চেহারা মিনিট খানেক ধরে জরিপ করে নেবার পর রমাপদ বলতে শুরু করে, “আসলে আমি আর আমার স্ত্রী…মানে…আমার প্রাক্তন স্ত্রী এই বাড়িটাকে কিনে একটু মেরামত করে বিক্রি করে দেবার কথা ভেবেছিলাম, শেষপর্যন্ত সেটা আর হয়ে উঠলো না।”
“আমাদেরও প্ল্যান কিছুটা সেইরকমেরই…দেখা যাক কি হয়”, অপরেশ রমাপদর হাত থেকে কাগজখানা নিয়ে সাইন করে দিলো, “মেরামতির সাথে সাথে ভাবছি আমরা থেকেও দেখব।”
রমাপদও কাগজখানাতে নিজের জায়গাগুলোতে সাইন করে প্রশ্ন করলো, ”আপনাদের ছেলে মেয়ে নেই?”
“আমাদের তিনটে সন্তান রয়েছে”, সুনন্দা উত্তর দেয়, “বড়ছেলের বিয়ে হয়ে গেছে বছর দুয়েক আগে, সে আর আমাদের সাথে থাকে না, আলাদা বাসা করে নিয়েছে, ওর পরে যমজ আছে”।
- “যমজ মেয়ে আছে আপনাদের?”, রমাপদ জিজ্ঞেস করে।
“না। একটি মেয়ে আর একটি ছেলে”, সুনন্দা জবাব দেয়, আর অবাক হওয়ার সুরে পালটা প্রশ্ন করে, “আপনি এসব জিজ্ঞেস করছেন কেন?”
একটু অপ্রস্তুত হয়ে রমাপদ বলে, “না না…এমনিই জিজ্ঞেস করছিলাম, কিছু মনে করবেন না”। তারপর একটু থেকে ধীর গলায় বলে, “এই বাড়িটা কিন্তু আপনাদের ধৈর্যের পরীক্ষা নেবে, আর আপনাদের মধ্যেকার সম্পর্কগুলোরও”।
কোনরকম ভাবে জলদি জলদি কাগজগুলোতে সাইন করে দিয়ে আজকের মতন বিদায় নিতে পেরে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল সুনন্দা। বেরনোর সময়টাতে সুনন্দা পেছন ফিরে রমাপদ’র দিকে তাকালো, একি লোকটা এরকম পাগল পাগল চাহুনি দিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে কেন? বিড়বিড় কি করে কি সব বলে চলেছে, মনে মনে হচ্ছে ওর পানেই যেন গালিগালাজ করে চলেছে। এইরকম অদ্ভুত লোকের সাথে পাল্লা পড়েনি কোনদিন। বিশাল বাড়িটার গন্ডি থেকে বেরনোর সময় একটা ঠান্ডা বাতাস কেন সুনন্দার কানে কানে কিছু বলে গেল, বাড়িটা কেনার সিদ্ধান্ত ঠিক না ভুল সেটা সময়ই বলবে।
***
“বুঝলে, এই বাড়িটার না একটা অন্যরকম ব্যাপারস্যাপার আছে”, একটা তৃপ্তির হাসি নিয়ে অপরেশ ওর স্স্ত্রীকে বলে। ইংরেজ জমানার এই জমিদার বাড়িটার জৌলুষ এখন অনেকটাই হারিয়ে গেছে, কিন্তু চেষ্টা করলেই এটার মেরামতি করে কোন মালদার পার্টিকে বিক্রি করে দেওয়া যাবে, নিদেনপক্ষে হোম-স্টে করে দিলে কলকাতা থেকে টুরিস্টদেরও আনাগোনা লেগে থাকবে। ছাদের উপরে দুটো কামান এখনও নিজেদের মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
“তোমার কিরকম মনে হচ্ছে?”, অপরেশ নিজের বউকে জিজ্ঞেস করে।
-“আমার তো এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না, এত বড় বাড়িটা আমরা জলের দামে পেয়ে গেলাম”, সুনন্দা এগিয়ে এসে স্বামীর পাশে দাঁড়ায়। নিজের হাতটা বেড় দিয়ে বরের কোমরে রেখে ওর গালে চুমু দিয়ে বলে, “আই এয়াম প্রাউড অফ ইউ”, পেছনে ফিরে ওদের গাড়ির দিকে তাকিয়ে আওয়াজ দিয়ে ডাকে, “কি রে তোরা নামবি না? দেখে যা আমাদের বাড়িটা কেমন?”
“আসছিই…”, এই বলে সন্তু নিজের ফোনটা পকেটস্থ করে গাড়ি থেকে নামে, “ওয়াও! আর সাব্বাস, এত্ত বড় বাড়ি, এতো পুরো রাজপ্রাসাদ”। সন্তু’র আসল নাম সম্বিৎ, ভালোবেসে ওর মা-বাবা ওকে সন্তু বলেই ডাকে। ছোট খাটো পাতলা গড়নের ছেলেটাকে দেখলেই পড়াকু বলে মনে হয়। একঝাঁক কোঁকড়ানো চুল কপাল থেকে সরিয়ে মা’কে জিজ্ঞেস করে, “কতগুলো রুম আছে এখানে?” বাড়িটা থেকে চোখ ফেরাতে পারছে না সন্তু, বিভিন্ন রকম কারুকার্য ওকে আশ্চর্যরকম ভাবে টানছে। এর আগে এরকম বনেদী বাড়ি নিজের চোখে দেখেনি। ছবিতে সে বাওয়ালির রাজবাড়ি দেখেছে, কিন্তু এই প্রাসাদোপম বাড়িটাকে একটু সাজালে ওকেও হার মানাবে।
“সব মিলিয়ে বাইশটা ঘর আছে, সন্তু”, সুনন্দা গিয়ে ছেলের পাশে দাঁড়ায়, আর বলে চলে, “সাতটা বেডরুম, পাঁচটা টয়লেট, চারটে বসার ঘর, একটা লাইব্রেরী,একটা রান্নাঘর, একটা ডাইনিং হল,একটা বৈঠকখানা আর প্রবেশের সময় মস্ত উঠোনখানা তো রয়েছেই”।
মনে মনে হিসেব করে কিন্তু মেলে না, সন্তু জিজ্ঞেস করে, “উহু, একুশখানা ঘর হচ্ছে আমার হিসেবে”, মায়ের টানা টানা বাদামী চোখ গুলোর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, “আরেকটা ঘর কোথায়?”
“বৈঠকখানার পাশে একটা ঘর আছে, যেটা নাকি সবসময় তালা মারা থাকে, সেটার নাকি চাবি নেই, বাড়ির আগের মালিকের কাছে ওটা খুঁজেছিলাম কিন্তু ও বলেছিলো সেটা নাকি হারিয়ে গেছে”, ওর মা সন্তুকে বলে।
“বাহ! একটা রহস্য এর গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে”, নিজের উচ্ছ্বাস আর চাপা রাখতে পারছে না সন্তু। “মিনি, এদিকে আয়, দেখে যা…”, পেছনে ওর বোনকে ডাক দেয়।
“আসছি, এক মিনিট”, মিনি এতক্ষন গাড়িতেই বসে মোবাইল ঘাটাঘাটি করছিলো। সন্তুর মতনই মিনি রোগা গড়নের, যৌবনের ছোঁয়া এখনও লাগেনি ঠিকমতন। পেছনের থেকে অন্য একটা গাড়ির হর্নের শব্দে চেয়ে দেখল ওর বড়দাদা একটা মিনিট্রাক নিয়ে হাজির, দাদা রজত নিজেই চালাচ্ছে পাশে বউদি ললিতা বসে আছে। সন্তুও লক্ষ্য করেছে ওদেরকে, ললিতা বউদিকে দেখলেই আজকাল ওর বুকটা কেমন যেন একটা আনচান করে ওঠে।
“দাদারও এখানে আসার কথা ছিল? জানতাম না তো!”, সন্তু ওর মা’কে জিজ্ঞেস করে।
“হ্যাঁ, মজদুররা এখনই চলে আসবে, প্যাকারদের গাড়িটা আজকে ব্যস্ত ছিল, তাই ওকেই বললাম, কিছু জিনিসপত্র আজকেই পৌঁছে দিতে।” ওর মা ভাবে হয়তো সন্তু ওর বড়দার খুব নেওটা, কিন্তু সন্তু ওর দাদাকে খুব একটা পছন্দ না, কথায় কথায় ওকে হ্যাটা করার একটা বাজে স্বভাব আছে রজতের।
কাছে এসেই মজার ছলে ভাইয়ের কাঁধে একটা ঘুসি মারলো রজত, “কি রে? কবে বড় হবি আর মায়ের আতুপুতু আদর খাওয়া থামাবি? আয়, চল একটু হেল্প করবি জিনিসগুলো নামাতে।” বেশ জোরেই মেরেছিল ওর দাদা, কিন্তু মুখ ফুটে কিছু আর বলল না সে।
ওর দাদা আর বাবা মা সামনে এগিয়ে গেছে বাড়ির দিকটাতে। সন্তু আর ওর দাদা চেহারা আর স্বভাবে অনেকটাই আলাদা, সন্তুর যেমন রোগা পাতলা ফিগার, সেখানে রজত সুঠাম দেহের অধিকারী, কনফিডেন্ট আর লোকের উপরে নিজের জোর চালাতে পারে। সন্তু সেদিক থেকে খুবই লাজুক, ঘরোয়া আর মৃদুভাষী।
“আহা রে, কত জোরেই না মারলো”, ললিতা বৌদি এসে সন্তু কাঁধে হাত রেখে আলতো করে বোলায়, যেখানে রজত মেরেছিলো সেই জায়গাটাতে।
“লেগেছে বুঝি?”, ওর বৌদি জিজ্ঞেস করলো। বৌদিকে অনেকটা ওই টলিউডের মিমি নামের নায়িকাটির মতন দেখতে, মুখখানা ওইরকমই কিন্তু শরীরখানা আরও ভরাট, ললিতা বউদির কথায় যেন লজ্জা পেয়ে যায় সন্তু, উত্তরে মাথা নেড়ে না বলে।
“কি গাম্বাট সাইজ রে!”, পাশে ওর বোন মিনিও এসে দাঁড়িয়েছে এই খেয়াল করলো।
-“তুই বাড়িটার কথা বলছিস না বড়দার কথা বলছিস”, সন্তু মিনিকে জিজ্ঞেস করল।
“উফফ, বাড়িটার কথা বলছি…”, মিনির কথা শেষ না হতেই সন্তুর মাথায় আলতো করে চাটি মেরে ললিতা বলে, “আমার বরটাকে গাম্বাট বললি!!”, কিছুক্ষন চুপ থেকে সন্তু বলে, “হ্যাঁ, বললাম”। তিনজনেই চুপ, কিন্তু পরক্ষনেই সিরিয়াস থাকার অভিনয়টা আর ধরে রাখতে পারে না ললিতা, ফিচ করে হেঁসে ফেলে, সাথে দুই ভাইবোনও। ওরাও বাড়িটার দিকে পা ফেলে এগিয়ে যায়।
****
যদিও মজদুররাই বেশিরভাগ আসবাবপত্র ঠিকঠাক করে রেখেছে, সব জিনিসপত্র নামাতে নামাতে সন্তু আর ওর পরিবারের সবাই ঘেমে নেয়ে একাকার। প্রায় গোটা দিন লেগে গেছে গোছগাছ করতে।
দোতলা’র সবথেকে বড় শয়নকক্ষটাতে ঠিক হলো, অপরেশ আর সুনন্দা শোবে। ওই তলারই ধারের দিকের ঘরটা সন্তু নিয়েছে নিজের পছন্দ করে। সন্তুর ঘরেরই উপরে ছাদের দিকে একটা ঝুলবারান্দা সমেত ঘর আছে, সেটা বেশ পছন্দ হয়েছে মিনির। দোতলার হলের একপ্রান্তে অপরেশ আর সুনন্দার ঘরটা আর হলের বিপরীত প্রান্তে রজত আর ললিতার ঘর। মাঝে মাঝে চলে এলে ওদের যাতে কোনরকম অসুবিধা না হয়, তাই এরকম ব্যবস্থা।
সবাই খাওয়া দাওয়ার পর কিছুক্ষন গল্পটল্প করে নিজের নিজের ঘরে চলে গেলো। সন্তু নিজের ঘরে ঢুকে মনে হলো ঘামে ওর টিশার্টটা পুরো ভিজে রয়েছে, গরমও আছে, এই সময় স্নান করে নিলে ভালোই হয়। বাক্স প্যাঁটরা থেকে জামা কাপড় তোয়ালেটা বের করে বাথরুমের দিকে হাঁটা লাগালো। বাথরুমটাও দেখার মতন, আগেকার ব্রিটিশ জমানা ডিজাইনের আয়না, অনেকটাই বড়, ঘরটার ঠিক মাঝে একটা চিনামাটির বাথটাবও আছে। জলের কলটা চালিয়ে গুনগুন করে সুর ভাঁজতে থাকল সন্তু, আর অপেক্ষা করতে থাকল কখন বাথটাবের জল ভর্তি হবে।
নিচের তলার কিচেনে নোংরা বাসনগুলো ধুতে থেকে একমনে সুনন্দা চিন্তা করে যাচ্ছে, এই রান্নাঘরটাকে কিভাবে সাজানো হবে। হটাৎ যেন একটা ঠান্ডা বাতাস যেন ওর কানের পাশ দিয়ে বয়ে গেলো, গায়ে যেন কাঁটা দিয়ে উঠলো। যেন পেছন থেকে কেউ এসে ওর পাছাটাকে মুঠো করে ধরে চাপড় ও মারলো, “উফফ, কি করছোটা কি? ছেলেপুলেরা দেখে ফেলবে তো!”, সুনন্দা যেন একটু জোরেই বলে ফেলল।
“কিগো? কিছু বলছো?”, অপরেশের গলার আওয়াজটা কিন্তু ডাইনিং রুম থেকে ভেসে এলো, ওখানে ললিতাকে সাহায্য করছে সে টেবিলটা পরিষ্কার করতে।
সুনন্দার বুকটা ধড়পড় করে উঠলো, পেছনে তাকিয়ে দেখে কই কেউই নেই তো রান্নাঘরে। বেসিনের কলটা বন্ধ করে এদিক ওদিক ভালো করে লক্ষ্য করে দেখে। না কোথাও কি কিছু ভুল হলো তাহলে, কারুর একটা স্পর্শ সে ঠিকই যেন অনুভব করেছিলো। নাহ, গোটা দিন যা খাটাখাটুনি গেল, ওর মাথাটা নেহাতই কাজ করছে না মনে হয়।
“আহ! গা’টা পুরো ঘামে চপচপ করছে, একটু স্নান করে নিলে মন্দ হয় না”, এই ভেবে যেই না বাথরুমে ঢুকেছে দেখে সেখানে আগের থেকে সন্তু ঢুকে রয়েছে। সন্তু এতক্ষন টাবের জলে গা এলিয়ে শুয়ে ছিলো, পেছনে মা’কেই দেখে কোনক্রমে হাতটা দিয়ে নিচেরটা ঢাকা দেবার চেষ্টা করে বলে, “উফফ, মা তুমি একটু দেখে ঢুকবে না”
লজ্জায় সুনন্দাও নিজের মুখটা অন্য দিকে ফিরিয়ে নেয়, “সরি সোনা…হট করে ঢুকে পড়লাম…”, তারপর খেয়াল করে বলে, “বুদ্ধুরাম একটা, নিজেই বাথরুমের দরজাটা তো বন্ধ করবি…তা না…মাকে খালি শুধু সুধু দোষ দেওয়া।”
সন্তুর পুরুষাঙ্গটা একটু ছোটই আর সেটাকে নিয়ে বরাবরই সে হিনমন্যতায় ভোগে। আর ওর মা’ও মনে আজকে জেনে ফেলেছে, লজ্জায় মাটির ভিতরে সিধিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে, “মা, তুমি এবার বেরোও তো”।
“যাচ্ছি বাবা, যাচ্ছি”, সুনন্দা জলদি জলদি ওখানে থেকে বের হয়ে আসে আর দরজাটা বন্ধ করে দেয়। ছেলের ওটা না চাইতেও চোখে পড়ে গেছে, গড়পড়তার ছেলেদের থেকে তো বেশ ছোটই। কই, ওর বাবার ওটা তো সেরকম না, আকারে খুব একটা বড় না হলেও ঠিকঠাকই। ইসস! বাবুর যে হবে, এরকম আকাশপাতাল ভাবতে ভাবতে সুনন্দা নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালো।