রুপকথা নয় (Completed) - অধ্যায় ১০

🔗 Original Chapter Link: https://xforum.live/threads/রুপকথা-নয়-completed.4039/post-511758

🕰️ Posted on Thu Sep 05 2019 by ✍️ Arunima Roy Chowdhury (Profile)

🏷️ Tags:
📖 1129 words / 5 min read

Parent
Part X | দশম পর্ব। রুপাই নদী আমার কাছে নতুন নয়, কাল অনুদি আমাকে দেখালো রুপাইয়ের এক নতুন রূপ। কবিরা এভাবেই দেখে তাদের চারপাশে প্রতিনিয়ত ঘটে চলা সাধারণ ঘটনাকে। বলেন্দ্র মোহনের ডায়েরি পড়তে পড়তে যেভাবে বিস্মৃত অতীত জীবন্ত হয়ে ওঠে চোখের সামনে রুপাই যেন নিরন্তর লিখে চলেছে সেইভাবে সময়ের দিনলিপি। মলিনাবৌদির কথা শুনে অনুদি কিছু মনে করেনি।মলিনাবৌদির থেকে অনুদির স্পর্শ আলাদা। নিজের বুকে আমার মাথা চেপে ধরে আদর করেছিল।সুর্য বা আগুণের তাপ নয় অনুদির বুকে এক অন্য রকম তাপ যা মনকে উজ্জীবিত করে।সব মেয়ের বুকেই এরকম উষ্ণতা থাকে? বোজোদি যখন জড়িয়ে ধরতো এরকম হত।ঠোটে স্পর্শ এখনো যেন লেগে আছে। ভাবছি একবার লাইব্রেরিতে ঘুরে আসবো, বরেনদার সঙ্গে কথা বলতে বেশ লাগে।বরেনদা কবি নয় অফিস থেকে ফিরে লাইব্রেরি খুলে বসে বইয়ে ডুবে থাকেন সারাক্ষণ।আমাকে দেখেই বরেনদা জিজ্ঞেস করলেন, কি ব্যাপার মনোজমোহন? অনেকদিন পরে এলে? দাদার সঙ্গে যোগাযোগ হল? --শুনেছি দাদা এদেশে ফিরেছে।এখনো যোগাযোগ হয়নি। --কাল কোথায় গেছিলি? ছোটো অঞ্চল কোনো খবর চাপা থাকে না বললাম,অনুদির সঙ্গে মাজদিয়া। রুপাইনদী ওদিকটা অন্যরকম। আপনি দেখেছেন বরেনদা? --হিজলতলিতে অনেক ময়লা জমেছেরে--নদীর চেহারা বদলে দিয়েছে।আক্ষেপের সুর বরেনদার গলায়। বরেনদার কথা কখনো কখনো দুর্বোধ্য মনে হয় বুঝতে পারিনা।তা হলেও শুনতে ভাল লাগে। একটা বই পালটে বেরোতে যাবো বরেনদা জিজ্ঞেস করেন, সেদিন মানিকের দোকানে কি হয়েছিল রে? মনে পড়ল সেদিন কেলোর সঙ্গে গোলমালের কথা। বললাম, মানিকদার সঙ্গে কথা বলছি কেলো এসে ফালতু চমকাতে এল--। --ওদের এড়িয়ে চলাই ভাল,সমাজের দুষ্ট ক্ষত। তারপর কি ভেবে বললেন, গায়ে ময়লা পড়লে তো গা ঝাড়া দিতেই হবে। লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে পার্টি অফিস অতিক্রম করে কিছুটা যেতেই ভোলা এসে দাঁত বের করে বলল, মনাদা খেল জমেছে।হি-হি-হি। --তোর চাকরির কিছু হল? --ধ্যুৎ কল্যাণদা দেবে চাকরি? ফিস ফিস করে বলল, এবার কল্যানদার ক্যালানি খাবার সময় হয়ে এসেছে।হি-হি-হি। --কে ক্যালাবে? --নকুড় দালালের সঙ্গে কিচাইন হয়ে গেছে,শালা পালটি খেয়ে এখন রঞ্জিতদাসের গ্রুপে ভিড়েছে,হি-হি-হি। ভোলা এসব কি কথা বলছে?ওর এতে এত আনন্দ কিসের? ভোলার বিধবা মা লোকের বাড়ী কাজ করে ছেলের মুখে অন্ন যোগায়।মা চিরকাল থাকবেনা,কি করবে তখন ভোলা, কে দেখবে ওকে? বললাম, তোর এসব কথায় কাজ কি? চিরকাল চামচাগিরি করে কাটাবি? কিছু একটা করার চেষ্টা কর। ভোলার মুখ করুণ হয়ে যায়। ভোলাকে রেখে এগিয়ে যাই 'কিছু একটা কর' কথাটা কানের মধ্যে অনুরণিত হতে থাকে। আমি কি ভোলার থেকে আলাদা? খুব অসহায় মনে হয় নিজেকে। মনে হয় রুপাইয়ের ধারে গিয়ে বসে রূপকথা শুনি। --মনাদা-মনাদা। পিছন ফিরে দেখলাম ছুটতে ছুটতে আসছে ভোলা। আবার কি গোপন কথা বলতে আসছে।হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বলল,তোমাকে ডাকছে। --তোকে বলেছি না আমি কারো হুকুমের গোলাম না? --যাঃ বাবা আমাকে বলছো কেন? দিদিমণি বলল তাই বললাম। ভোলা একটু মনক্ষুন্ন। দিদিমণি? তাকিয়ে দেখলাম দূরে দাঁড়িয়ে আছে অনুরাধাদি। কাছে যেতে বলে,কানে আজকাল কম শুনিস নাকি? --আমি আজকাল কম শুনি কম দেখি, অনুদি আমি দিনদিন যাচ্ছেতাই হয়ে যাচ্ছি। --যা বলছি মন দিয়ে শোন,খালি পাকা-পাকা কথা। ভেবেছিলাম সকালে আসবি,তোর কিসের যে এত ব্যস্ততা বুঝিনা।আজ তো হলনা--কাল সক্কালে উঠে শিয়ালদা এই ঠিকানায় চলে যাবি। সুদেষ্ণা আমার বন্ধু, ওকে এই বইটা আর চিঠিটা দিবি। কি বলে মন দিয়ে শুনবি।কিরে বুঝেছিস? বইটা নিয়ে দেখলাম প্রচ্ছদে লেখা 'রুপকথা নয় ।' তার নীচে অনুরাধা বসু। --তোমার বই? --হ্যাঁ। কাল অবশ্যই যাবি।সন্ধ্যেবেলা বাড়িতে আসবি, মনে আছে তো? --সেই কবিদের ব্যাপার? আমি কি করবো বলো?ইতস্তত করি। -- আমি বলছি তুই আসবি। একটা জিনিস পরীক্ষা করে দেখতে চাই। অনুদির চোখে রহস্যের আলো ঝিলিক দিয়ে গেল। কবিদের বোঝা মুস্কিল, কখন যে কি মুডে থাকে।বুকের উষ্ণতার কথা মনে এল। ডাক্তার সেনের অ্যাটেনড্যাণ্ট নিরঞ্জন বাবু তক্কে তক্কে ছিলেন বোধহয়, চেম্বার অতিক্রম করতে যাব এসে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি এই রাস্তা দিয়ে যাও না আজকাল? --মাঝে মাঝে যাই,কেন? --একবার উপর থেকে ঘুরে যাও। --আরেক দিন যাবো।আজ দেরী হয়ে গেছে। --গরীবকে কেন বিপদে ফেলবে? দেখা দিয়েই চলে যেও। --এর মধ্যে বিপদের কি আছে?বলছি তো আরেকদিন যাব। --মালিকের মেয়ে বলে কথা--কদিন ধরে বলেছে--। নিরঞ্জন বাবু মানুষটা খারাপ নয়।এতকরে বলছেন বয়স্ক মানুষ।উপরে উঠে গেলাম। বসার ঘরে কেউ নেই। আমি ঢুকতে মিসেস সেন এলেন বললেন,অনেকদিন পরে এলে। কেমন আছো? --ভালই। আপনি? --ওই একরকম। দিয়া তোমার খোজ করছিল। তোমার মোবাইল নেই? --বেকার ছেলে মোবাইল দিয়ে কি করবো?ও কলেজ থেকে ফিরেছে? --পরীক্ষা হয়ে গেছে এখন তো কলেজ যাচ্ছেনা। জানতাম না দময়ন্তীর ডাকনাম দিয়া। দিয়া মানে কি প্রদীপ? মিসেস সেন চলে যাবার আগে বললেন,তুমি বোসো। দময়ন্তীর পরীক্ষা হয়ে গেছে? কোনো খবরই রাখিনা। দময়ন্তী ঘরে ঢুকল,পরনে পায়জামা গায়ে ছোট জামা রুক্ষ চুল। আরও বাচ্চা লাগছে দেখতে। ভাবলেশহীন গম্ভীর মুখ। ঝগড়াঝাঁটি করেছে নাকি?ওকে দেখলেই সঙ্কুচিত বোধ করি, কখন কি বলে তার ঠিক নেই। সব সময় গোমড়া মুখো। ওকে একদিন একটা হাসির সিনেমা দেখতে বলবো। চায়ের কাপ হাতে সোফার উলটো দিকে বসে বলল, আজকাল নাকি কাব্যচর্চা শুরু করেছো? --তা পারলে তো নিজের একটা পরিচয় হতো। --কথার যাদুতে আমাকে ভোলাতে পারবেনা। অনুরাধা বসুর সঙ্গে মাজদিয়া যাও নি? তোমার চেয়ে কত বড় জানো? --বড় তো কি হয়েছে? --ন্যাকামি করবে না।যথেষ্ট বুদ্ধি হয়েছে তোমার। -- তুমি কি যা-তা বলছো? অনুদি আমাকে স্নেহ করে,শুনলে কি ভাববে বল তো? --ভাবলো তো বয়ে গেল! আমি কাউকে ভয় পাইনা। --উরই বাবাঃ দিয়া জ্বলে উঠেছে--। মজা করার লোভ সামলাতে পারিনা। ভ্রু কুচকে আমাকে দেখে বলে, দিয়া? এ নাম কি করে জানলে?আমি তো তোমায় বলিনি? --তোমার আপত্তি আছে? তাহলে বলবো না। --না আপত্তি নেই কিন্তু সবার সামনে বলবে না। শোনো বেশি চালাকি করবে না, আমাকে তুমি ফাকি দিতে পারবে না জেনে রেখো। --তোমাকে কেন,আমি কাউকে ফাকি দিতে চাইনা। আচ্ছা তুমি বলো আমি কি তোমার সঙ্গে কখনো বিশ্বাস ভঙ্গ করেছি? --তোমাকে বিশ্বাস করিনা তুমি কি বিশ্বাস ভঙ্গ করবে?দেখি তোমার হাতে ওটা কি বই? বইটা নিয়ে উল্টে-পাল্টে দেখে আমাকে জিজ্ঞেস করে,সন্দীপ মজুমদার কে? --আমি কি করে বলবো? --কবি অনুরাধা বসু বইটা তোমাকে দেয়নি, জনৈক সন্দীপবাবুকে দিয়েছে? তাকে পৌঁছে দেবার দায়িত্ব তোমার? বুঝলাম ক্ষেপে আছে,সব কথার সব সময় গুরুত্ব দিতে নেই।সিঁড়িতে পায়ের শব্দ শুনে ঘুরে দেখি ডাক্তার সেন ঢুকছেন।যাক বাঁচা গেল আপাতত জেরা হতে মুক্তি! আমাকে দেখে ডাক্তার সেন ভ্রু কুচকে জিজ্ঞেস করেন,তোমাকে আগে কোথায় দেখেছি? কেমন চেনা লাগছে মুখটা। --অনেকদিন আগে বাবাকে নিয়ে চেম্বারে এসেছিলাম--। --ওঃ হ্যাঁ মনে পড়েছে,তোমার এক দাদা বিদেশে থাকে--।তা তুমি কি করো? --বছর দুই আগে গ্রাজুয়েশন করেছি। --এখন তাহলে পোষ্ট গ্রাজুয়েশন? --আজ্ঞে না।এখন কিছু করিনা। --মানে বেকার? চাকরির চেষ্টা করতে পারো।বেকার বসে বাবার ঘাড়ে--স্যরি তোমার তো আবার বাবা নেই। আচ্ছা তোমরা কি--অন্তত রাস্তার ধারে একটা জায়গা নিয়ে দোকান দিতে পারো? দেখো ভাগ্য কোথায় নিয়ে ফেলে--ভাগাড়ে না রাজপ্রাসাদে? ফুসে ওঠে দময়ন্তী,তুমি ওকে অপমান করছো? --চুপ করো! অনেক অপমান তোমরা করেছো। আমি আর অপমানিত হতে চাইনা। ডাক্তার সেন চোয়াল চেপে বলে আড়চোখে মেয়েকে দেখে ঘরে ঢুকে গেলেন। দময়ন্তীর মুখ লাল মাথা নিচু করে বসে আছে। --দিয়া আমি কিছু মনে করিনি। --তুমি মনে করবে কেন, আমি মনে করেছি। নিজের মোবাইলটা হাতে গুজে দিয়ে বলে, এইটা রাখো।আমি দিয়েছি কাউকে বোলনা। --এইটা আবার-?দিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে কথা শেষ করতে পারিনা। অন্যঘরে চলে গেল। মিসেস সেন ঢুকলেন, চা নিয়ে। --তুমি একা বসে আছো? দিয়া কোথায়? --ও পাশের ঘরে গেল। আমি দ্রুত চায়ে চুমুক দিয়ে বললাম,আমি আসি? --ওমা সেকি!তোমাকে একলা বসিয়ে বুঝিনা বাপু--আচ্ছা বাবা আবার এসো। আমি চা খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম। দময়ন্তী যেন প্রদীপের মত--দিব্যি জ্বলছে হাওয়ায় নিভু-নিভু আবার দপ করে জ্বলে ওঠে।ড.সেনের কথায় এত ক্ষেপে গেল কেন? আমি আগে কখনো মোবাইল ব্যবহার করিনি,কিভাবে কি করতে হয় জানি না। রাস্তায় নেমে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখি দারুণ জিনিসটা। কাউকে বলতে মানা করেছে দিয়া।কেউ জিজ্ঞেস করলে কি বলবো মাথায় আসে না।
Parent