রুপকথা নয় (Completed) - অধ্যায় ৫
Part V |পঞ্চম পর্ব।।
অনেক ধকল করে বাবাকে নিয়ে ন্যাশনালে পৌছালাম, দময়ন্তী আগেই ব্যাবস্থা করেছিল ভর্তি করতে অসুবিধে হল না।
পরের দিন মাকে নিয়ে গেলাম হাসপাতালে,মাকে দেখে বাবার মুখে হাসি ফোটে। জিজ্ঞেস করেন,কেমন আছো?
--এ সময় যেমন থাকার। উদাসীন গলায় মা বলে। বাবার হাত চেপে ধরে নিচু হয়ে মা জিজ্ঞেস করে, তুমি কিছু বলবে?
বাবা আড়চোখে আমাকে দেখলেন। মনে হল বাবা কিছু বলতে চান।আমি একটু নিচু হলাম,তোকে অনেক গালমন্দ করেছি মাকে দেখিস।
--ও আবার কি কথা? মা বলে।
বাবা চোখ বুজে হাসলেন,তারপর চোখ খুলে বললেন,এবার যাও অনেকদূর যেতে হবে।
ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে অবাক হলাম দময়ন্তীকে দেখে। সাত সকালে দময়ন্তী আমাদের বাড়িতে কি মনে করে?
--এসো।
--না তুমি আমার সঙ্গে চলো।
--কোথায়?
মা হয়তো অনুমান করেছে কিছু একটা আমাকে বলল, মনু তুই যা।
ভূতগ্রস্তের মত দময়ন্তীকে অনুসরণ করি। হাসপাতালে পৌঁছে বুঝতে পারি কি সর্বোনাশ হয়ে গেছে সাদা কাপড়ে ঢেকে রেখেছে বাবাকে। দময়ন্তী আমার সঙ্গে ছিল সারাক্ষণ আশপাশে তাকিয়ে দেখি দময়ন্তী নেই। নিজেকে ভীষণ একাকী বোধ করি। একটু আড়ালে গিয়ে নিজেকে সামলাতে পারিনা ফুঁপিয়ে কেদে ফেললাম। কে যেন একটা রুমাল এগিয়ে দিল তাকিয়ে দেখলাম দময়ন্তী।
--ফ্যাচ ফ্যাচ করে কেদো নাতো--কথায় কথায় কান্না পছন্দ করিনা।
কান্না থেমে যায়। অবাক হয়ে ভাবি কি বলছে কি বাবা মারা গেলে কাদবো না? 'তোমার পছন্দ-অপছন্দে কি এসে যায়' কথাটা ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বলতে পারিনা।
রুপাইয়ের পাড়ে বাবাকে দাহ করা হল।বেচে থাকলে বোঝা যায়না। একজন যে এতখানি শূন্যতা উপহার দিতে পারে জানা ছিলনা।দুটো ভাই আমরা ,দাদার দিনরাত্রি সময়টুকু আজ আমাদের থেকে আলাদা।বাবার শরীর ধীরে ধীরে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল,চিতায় জল ঢেলে পিছনে না তাকিয়ে বেরিয়ে গেলাম শ্মশান ছেড়ে। দাদার বন্ধু সুগতদা আমার সঙ্গে ছিলেন ছায়ার মত সারাক্ষণ।বাবার অফিস-কলিগ কেউ কেউ এসেছিলেন।তাদের কাছে শুনলাম,মণিদা ছিলেন অন্য রকম। মা কাঁদেনি বোবা দৃষ্টি মেলে কি যেন ভাবছে যেন ডুবে আছে কোন অচিন জগতে।
অফিস কলিগদের সাহায্য মায়ের পেনশন ধার্য হল সাড়ে-ছ হাজার টাকা।এই খড়কুটো আমাদের কাছে সাত রাজার ধন মানিক। দাদার পাঠানো টাকা আসেনি। কদিন পর কল্যাণ ঘোষ এসেছিলেন।সঙ্গে ছিল শিবে আর কেলো।
আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন,মণিদা ছিলেন অজাত শত্রু, আজীবন সংগ্রামী। তারপর কেলোকে ইশারা করতে শিবে কাঁচকলার ছড়া আর চাল নামিয়ে রাখল। আমার দিকে ফিরে বললেন, আজ আসিরে। কাজ মিটে গেলে একবার আসিস পার্টি অফিসে।আসি বউদি।
তারপর মোটরবাইক ফটফটিয়ে সবাই চলে গেল।জীবনের উপর দিয়ে এতবড় একটা ঝড় বয়ে গেল মাকে দেখলে মনেই হয়না। নির্বিকারভাবে ডুবে আছে দৈনন্দিন কাজের ব্যস্ততায়। বরেনদার কথা মনে পড়ল ভাল-মন্দ সব ঘটনাকে সহজভাবে দেখবি,কোন কিছুই আকস্মিক নয়। স্বাভাবিক নিয়মে ঘটে। পরশুদিন ঘাট কাজ উঠোনে ত্রিপল দিয়ে চালা করা হয়েছে।মা বলল, মনা, লিস্ট মিলিয়ে সবাইকে বলবি,কেউ যেন বাদ না যায়।
বাড়ী বাড়ি ঘুরে কার্ড বিলি শেষ করেছি খান কয়েক কার্ড বাকি। কলকাতায় গিয়ে বাবার অফিসেও নেমতন্ন সেরে এসেছি। দময়ন্তীর সঙ্গে পথে দেখা,কিছু বলার আগেই বলল, মনু আমাকে কার্ড দিতে হবেনা, আমি যাবনা।
খুব খারাপ লাগল বললাম, খুব বিরাট কিছু আয়োজন করিনি কিন্তু যতটুকু করছি আন্তরিকভাবেই করছি।
--রাগ কোরনা, এরকম অবস্থায় কারো বাড়ী গিয়ে একপেট খাওয়া আমার ভাল লাগে না। মাসীমাকে বোলো পরে একদিন যাবো।
--সে তুমি যা ভাল বোঝো করবে।
অবশিষ্ট কার্ডগুলোয় চোখ বোলাতে দেখি বিজয়া। ওহো ছেড়ে এসেছি বিজয়ামাসী মানে মায়ের দুরসম্পর্কের মামাতো বোন। যোগাযোগ তেমন নেই।মার কাছে গল্প শুনেছি মহিলা খাণ্ডারনি টাইপ।আবার পিছন দিকে যেতে হল। বেড়া দিয়ে ঘেরা দোচালা টিনের বাড়ি। বেড়ার দরজা ঠেলে ঢুকতে গিয়ে কানে এল দুই মহিলার গলা। একটি বাজখাই আর একটি শান্ত।
বাজখাইঃ ফের মুখে মুখে চোপা? যমের অরুচি বাজা মাগি--মর মর।
শান্তঃ মরার বয়স তো আপনার ভরা যৌবন আমার কোন দুঃখে মরতে যাবো আমি?
বাজখাইঃ তাহলে আশনাই করতে সুবিধে খানকি মাগি কোথাকার--।
শান্তঃ সকাল বেলা মুখ খারাপ করবেন না বলে দিচ্ছি।
বাজখাইঃ কেনরে তোর ভয়ে?
বিজয়ামাসির ছেলে অতুলদার বড়বাজারে কাপড়ের দোকান আছে বলে ভাল ঘরে বিয়ে দিয়েছিল। পরে জানাজানি হয় নিজের দোকান নয় কাপড়ের দোকানের মাইনে করা কর্মচারি। তাই নিয়ে ঝামেলা হয়েছিল। বৌদির ভাইরা ষ্ণডাগণ্ডা বলেছিল হেপো রোগীটাকে মেরে বোনের আবার বিয়ে দেবে।অতুলদার বুকের হাড়পাঁজরা বের করা ব্লাডারের মত ফুলে আছে পেট খাটাখাটনি করলে ফ্যস ফ্যস হাঁপাতে থাকে।
ভিতরে ঢুকবো কিনা ভাবছি নাকি ফিরে যাবো? মায়ের আদেশ সবাইকে কার্ড দিবি তোর বাবার মঙ্গলের কথা মনে রাখবি বাবা।গলা খাঁকারি দিয়ে হাঁক দিলাম, অতুলদা-আ---।
ভিতরে বচসা থেমে গেল।বিজয়ামাসি কর্কশ গলায় বলেন,ক্যারা ভর দুপুরবেলা চিল্লাচিল্লি করে?
--আমি হিজলতিলির মনা, হেমের ছেলে।
মাসী বেরিয়ে এসে আমাকে আপাদ মস্তক দেখে বলল, কে মরল রে?
--তোমাকে বলিনি মণিমেশোর কথা? অতুলদা বেরিয়ে এসে বলে। কলকাতা যাবে বলে তৈরি হয়ে এসেছে।
--অ।কবে মল্লো রমণি?
দরজার আড়াল থেকে একটা মুখ সরে গেল। ডাগর চোখ মেলে আমাকে দেখছিল। অতুলদা বলল, চলিরে মনা ট্রেনের সময় হয়ে গেছে। তুই এবার পরীক্ষা দিয়েছিস না?
--হ্যাঁ ,যেও অতুলদা মা বারবার করে বলে দিয়েছে।
--হ্যা-হ্যা তুই বস আমি আসি।
অতুদা চলে গেল। মাসিকে বললাম, আমি আর বসবো না অনেক কাজ পড়ে আছে।
--হ্যাঁরে হেমের আর একটা ছেলে কি যেন নাম? সে কোথায়?
--সরোজ বিদেশে থাকে আসার অসুবিধে আছে।আসি--তোমরা যেও।
বাড়ী থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নেমেছি কানে এল,ঠাকুর-পো। বেড়ার ধারে গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে অতুলদার বউ রেবতী। সত্যি ভরা যৌবন পানের মত মুখাকৃতি ঢলঢলে চোখ। এগিয়ে গিয়ে বললাম, মাসিকে নিয়ে আসা চাই কিন্তু বউদি।
--তোমার মাসির কথা জানিনা। তুমি যখন বলেছ আমি নিশ্চয়ই যাবো।
বাড়ি ফিরে মার মুখে শুনলাম, দময়ন্তী এসেছিল একটু আগে। এক কাপ চা ছাড়া কিছু খায়নি। অনেক্ষন ছিল মায়ের সঙ্গে গল্প করেছে। মা খুব খুশি,অত বড় ঘরের মেয়ে একফোঁটা দেমাক নেই। খুটিয়ে খুটিয়ে জিজ্ঞেস করছিল কিভাবে কি করছি। বড় লক্ষ্মীমন্ত মেয়ে।
দময়ন্তী এসেছিল? অদ্ভুত লাগে ওর আচরণ। সবাই ওকে ভাল বলে তাহলে বাবা-মার সঙ্গে অমন আচরণ করে কেন?কি ছটফটে জলি মেয়ে বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই মনের মধ্যে প্রতিনিয়ত চলছে ভাঙ্গাচোরা।
আত্মীয়স্বজন আসতে শুরু করেছে।রেবতী বৌদিকে নিয়ে বিজয়া মাসিও এসে পড়েছে। অতুলদা কলকাতায় গেছে সন্ধ্যেবেলা আসবে। দুহাতের অনামিকায় কুশাঙ্গুরীয় পরে পুরোহিত মশায়ের সঙ্গে মন্ত্রোচ্চারণ করছি। রান্না ঘরের দায়িত্ব সামলাচ্ছে রেবতী বউদি।একফাকে আমাকে কালো চা দিয়ে গেছে।মা অতিথি আপ্যায়ন করছে। সুগতদা-রিনাবোউদি অনুদি আশুস্যর পাড়ার অনেকেই এসেছেন।বাবার অফিসের কলিগরা অবেলা আসবে। পিণ্ডদানের সময় পুরোহিত জিজ্ঞেস করেন,সাত পুরুষের নাম জানা আছে?
মা এসে বলল, চার পুরুষ জানা আছে।
--ব্যস ব্যস ওতেই হবে। যথা নামে দিয়ে চালিয়ে নিচ্ছি।
খাওয়া দাওয়া সারতে সারতে বেশ রাত হল। হ্যাজাক এনে রাখা হয়েছিল বিদ্যুতে ভরসা নেই। পরদিন দুপুর বেলা বিজয়া মাসি ফেরার তোড়জোড় করছেন মা বলল, বিজুদি রেবাকে কদিন আমার কাছে রেখে যাও।কতকাজ পড়ে আছে একা-একা--।আগে তো কোনদিন একা থাকিনি।তোমার অসুবিধে হবে?
--নাহ অসুবিধের কি আছে।তবে ঘরে তোর আইবুড়ো দামড়া আছে,একটু চোখে-চোখে রাখিস। বউমার আবার হাড়ীমারা অভ্যেস আছে।
মা একটু ইতস্তত করে কি বলবে বুঝতে পারেনা। এইধরনের আলাপে অভ্যস্ত নয়।বিজয়া মাসি বলেনি বিষের পুটুলি নিয়ে কদিন থাক বুঝতে পারবি কি জ্বালায় জ্বলছি।তোরা কেবল আমার দোষ দেখিস।