তুমিই আমার মা.... - অধ্যায় ৯
পর্বঃ ০৯
অর্নবের চোখ দুটো রাতের আলোয় জ্বলছে—ভেতরে যেন আগুন, তবুও মুখে অদ্ভুত শীতলতা। হাসপাতালের করিডোরে সেই এক মুহূর্তের ছবিটা এখনো ভাসছে—বাবার পোড়া শরীর, মায়ের কণ্ঠে হাহাকার।
সবকিছু শেষ হয়ে গেছে যেন।
এখনও পর্যন্ত অর্নবের ঘুম হয় না।
গত ক’দিন ধরে ঘরের ভেতর অদ্ভুত শব্দ শোনে সে—রাতে দরজা বন্ধ, আলো নিবিয়ে মায়ের ঘরে কিছু আওয়াজ হয়, সে জানে। একদিন সাহস করে ঢুকতে গিয়ে বুঝেছে মা একা আছে, কিন্তু সেই একাকিত্বের গলায় চাপা ব্যথা আছে, যা শব্দ হয়ে ওঠে।
তারপর থেকেই অর্নবের মনে অদ্ভুত ভয় আর অপরাধবোধ তৈরি হয়। সে মায়ের দিকে তাকাতে পারছে না ঠিকমতো।
কিন্তু আজ সকালে তার চোখে ধরা পড়ে একটা ছোট খাম — মায়ের আলমারির ড্রয়ারে।
পুরনো রিপোর্ট।
রিপোর্টে লেখা আছে, “Hormonal imbalance, psychogenic stress, periodic crisis every 15 days.”
শব্দগুলো কিছুই বোঝে না অর্নব।
সে রিপোর্টটা ব্যাগে ঢুকিয়ে ডাক্তারখানায় চলে যায়।
ডাক্তার একজন বৃদ্ধ মানুষ, গম্ভীর মুখে রিপোর্টটা হাতে নিয়ে চশমা ঠিক করেন।
“তুমি কে রোগীর?”
অর্নব একটু থমকে বলে, “আমি ওনার ছেলে… মানে, দত্তক নেওয়া।”
ডাক্তার মাথা নেড়ে বলেন, “ঠিক আছে, বসো।”
তারপর কয়েক মিনিট চুপচাপ রিপোর্টটা উল্টেপাল্টে দেখে তিনি বলেন,
“দেখো বাবা, তোমার মায়ের শরীর আর মানসিক অবস্থার মধ্যে একটা ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে অনেক বছর ধরে। এই সমস্যাটা এমন, যেটা শুধু ওষুধে পুরোপুরি সারে না। এর সঙ্গে গভীর মানসিক একাকীত্বও যুক্ত।”
অর্নব অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে, “মানে?”
ডাক্তার হালকা নিঃশ্বাস ফেলেন, “মানে, মানুষ যখন অনেক বছর মানসিক ও শারীরিকভাবে দমিয়ে রাখে নিজেকে, তখন শরীর কিছু অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখায়। তোমার মা হয়তো এমন একটা পরিস্থিতিতে আছেন যেখানে মানসিক চাপের সঙ্গে হরমোনের ভারসাম্য হারিয়ে যাচ্ছে।”
অর্নবের কণ্ঠ ভারী হয়ে যায়, “এটা কি বিপজ্জনক?”
“বিপজ্জনক হয়, যদি দীর্ঘদিন ধরে এমন থাকে,” ডাক্তার বলেন।
“তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। নিয়মিত পরামর্শ, একটু মানসিক সমর্থন, একটু যত্ন—এই জিনিসগুলো দরকার।”
অর্নবের মনে তখন ঝড়।
মায়ের প্রতি যত রাগ, ভুল বোঝাবুঝি, সবকিছু কেমন উবে যায়।
তার জায়গায় ভয়—মা অসুস্থ, মায়ের ভেতর কিছু চলছে যা সে বোঝে।
ডাক্তার চুপচাপ তাকে কিছু পরামর্শ দেন—“তুমি তোমার মায়ের সঙ্গে সময় কাটাও। তাকে হাসাও। তাকে বোলো, সে একা না। কিন্তু ছেলে হিসেবে তুমি তোমার মাকে শুধু মানসিক স্বস্তি দিতে পারবে বাকিটা………”
অর্নব কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞাসা করে, “বাকিটা কি।”
ডাক্তার বলে, “সময় আসলে বুঝবা। মায়ের পাশে থাকো আপাতত।”
অর্নব উঠে দাঁড়ায়, ঠোঁট কাঁপছে। “আমি কি মাকে আবার আগের মতো ফিরে পাবো, ডাক্তার?”
বৃদ্ধ লোকটা হালকা হাসেন, “যে ছেলে নিজের মায়ের জন্য কাঁদে, সে তো আগেই তার মাকে পেয়ে গেছে। ঈশ্বর সব ঠিক করে দেবেন।”
বাড়ি ফিরে অর্নব নিঃশব্দে দরজা খোলে।
দুপুরের আলো ঘরে এসে পড়েছে, সুমিতা জানালার পাশে বসে আছে।
চুল এলোমেলো, চোখ লাল।
সে কিছু না বলেই ছেলের দিকে তাকায়।
অর্নব ব্যাগটা নামিয়ে বলে, “মা…”
সুমিতা তাকায় না, শুধু বলে, “খেয়েছিস, সোনা?”
“না।”
“খেয়ে নিস, আমি একটু পর বসছি।”
অর্নব চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। মায়ের মুখে শান্তির ছায়া নেই, যেন মাটি শুকিয়ে গেছে অনেকদিনের রোদে।
তার বুক ফেটে কান্না আসে, কিন্তু বলে না কিছু।
মা উঠে গেলে হঠাৎ বলে ফেলে—
“তোমাকে বিয়ে দেওয়া উচিত মা।”
সুমিতা থমকে দাঁড়ায়। কয়েক সেকেন্ড নিস্তব্ধতা, তারপর হঠাৎ সে ঘুরে দাঁড়িয়ে এক ঝটকায় বলে ওঠে—
“চুপ কর!”
অর্নব হতভম্ব।
সুমিতা এগিয়ে আসে, চোখে আগুন, ঠোঁটে কাঁপুনি।
“তুই জানিস না আমি কী পার করছি, তুই জানিস না আমি কীভাবে দিন কাটাই। তুই আমার ছেলে, এই কথাটাই তো আমার ভরসা। এখন তুই বলছিস আমাকে বিয়ে দিতে? মাথা ঠিক আছে তোর?”
অর্নব কিছু বলতে চায়, কিন্তু কণ্ঠ আটকে যায়।
তার চোখে জল চলে আসে।
সুমিতা এক মুহূর্তের জন্য চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে, তারপর আস্তে আস্তে এগিয়ে এসে অর্নবের মাথায় হাত রাখে।
“সোনা, আমি তোকে ছাড়া আর কিছু চাই না। তুই আমার সব। বিয়ে করে কি হবে। বাকিটা জীবন এভাবে চলুক সোনা। তুই শুধু মায়ের সাথে থাকিস।”
অর্নব সেই মুহূর্তে বুঝতে পারে—এই নারী শুধু তার মা না, এক ভেতর থেকে ভেঙে পড়া মানুষ, যিনি নিজেকে ভেতরে ভেতরে চেপে রেখেছেন অনেক বছর ধরে।
রাত বাড়ে।
অর্নব বারান্দায় বসে আছে।
তার চোখে এখন ভয়, দুঃখ আর অদ্ভুত একটা দায়বোধ।
মায়ের ঘরে আলো নিভে গেছে, কিন্তু মনের মধ্যে হাজার আলো জ্বলে ওঠে।
সে ভাবে—
“বাবা, তুমি কেন মাকে এমন একা রেখে গেলে?”
তারপর মাথা নিচু করে বসে থাকে, অনেকক্ষণ।
হঠাৎ চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।
বাইরে রাতের অন্ধকার, কিন্তু তার বুকের ভেতর যেন সূর্য ফেটে পড়েছে—একটা নতুন উপলব্ধির, নতুন দায়িত্বের আলো।
—------------
সকালটা অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল। বারান্দার শুকাতে দেওয়া কাপড়গুলো নরম রোদে ভিজে যাচ্ছিল, কিন্তু অর্নবের চোখে আজ যেন কিছুই স্পষ্ট হচ্ছিল না। আগের দিন ডাক্তারের মুখে শোনা কথাগুলো এখনও কানে বাজছে—
“তোমার মায়ের শারীরিক অবস্থা মানসিক চাপের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। অনেক বছর দমিয়ে রাখা জৈব প্রবৃত্তি তাকে অসুস্থ করে তুলছে। এমন অবস্থায় ওর পাশে এমন কাউকে থাকা দরকার, যে ওকে পূর্ণ সঙ্গ দেবে।”
ডাক্তার শান্ত স্বরে বললেও অর্নবের মনে কথাটা যেন বজ্রপাতের মতো লেগেছিল।
সে ভাবছিল— “এমন কথা আমি আবার কীভাবে মাকে বলবো! কীভাবে বলবো যে মা, তোমার বিয়ের দরকার? একবার বলেই তো আমাকে ধমক খাওয়া লেগেছে।”
ঘরে ঢুকে মা’কে দেখল, জানালার পাশে চুপচাপ বসে আছেন। মুখে একরাশ ক্লান্তি, চোখে অদ্ভুত এক শূন্যতা।
অর্নব একবার চেয়ে আবার মুখ ফিরিয়ে নিলো। গলার কাছে একটা দলা এসে আটকে গেলো— “এমন মানুষটাকে আমি কীভাবে অন্যের হাতে তুলে দিই? মাকে ছাড়া আমি কিভাবে থাকবো এই বাড়িতে। আমার দম বন্ধ হয়ে যাবে।”
বিকেলে মা তাকে ডেকে বলে,
— “খাবি না অর্নব? সারাদিন কিছু মুখে দিচ্ছিস না।”
অর্নব কিছু বলতে চাইলেও গলা শুকিয়ে যাচ্ছিল।
— “হুম… পরে খাবো।”
— “কী হয়েছে তোর?”
— “কিছুনা মা…”
সুমিতা ছেলের মুখে কিছু একটা লুকোনো দেখলেন। কাছে গিয়ে অর্নবের মাথায় হাত রাখলেন,
— “তুই আমাকে কিছু বলছিস না কেন? কালকে হঠাৎ বিয়ের কথা বললি এরপর থেকে কেমন চুপ হয়ে আছিস যে!”
এই ছোঁয়াতেই অর্নবের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
সে জানে, এই স্পর্শ তার জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। অথচ এখন সেই মায়ের জন্যই সে এমন এক সিদ্ধান্ত ভাবছে, যা বলার ভাষা তার নেই।
রাতে সে বারান্দায় বসে ছিল অনেকক্ষণ। চারপাশে নিস্তব্ধতা, কেবল ভেতরের ঘর থেকে শোনা যাচ্ছিল মায়ের হালকা কাশির শব্দ।
মাথার ভেতর ঝড় বয়ে যাচ্ছিল— “বাবা মারা গেছেন মাত্র পনেরো দিন, মা এখন একা, আমি তাকে এমন কথাটা কীভাবে বললাম আর এটা নিয়ে জোর দেবোই বা কিভাবে?”
মনে হচ্ছিল, যদি বলেই ফেলে— “মা, তোমার বিয়ে দেওয়া উচিত, নিজের জন্য, আমার জন্য।”— এটা নিয়ে বেশি চাপ দিলে হয়তো মা রেগে যাবে, হয়তো কষ্ট পাবেন, হয়তো সম্পর্কটাই ভেঙে যাবে।
অর্নব নিজের ঘরে ঢুকে আলো নিভিয়ে দিলো। জানালার ওপাশে মৃদু বাতাসে পর্দা দুলছে।
সে চোখ বন্ধ করে শুনছে— মায়ের ঘরে হয়তো মোবাইলে গান চলছে, ধীরে ধীরে রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুর ভেসে আসছে।
গানটা ছিল —
“বঁধু তুমি জানো না কেমন লাগে…”
সেই সুরের সঙ্গে মিলেমিশে যাচ্ছিল তার বুকের ভারি নিঃশ্বাস।
সে ভাবছে, “আমি কীভাবে জোর করবো এসব নিয়ে… আমি তো ওর ছেলে, এমন কিছু নিয়ে জোর করা অসম্ভব।”
তারপর নিজেকেই প্রশ্ন করল, “কিন্তু যদি না বলি, তবে মায়ের কষ্ট বাড়বে না?”
রাতটা কেটেছিল নিদ্রাহীনভাবে।
ভোরের আলোয় মা দরজায় নরম কণ্ঠে ডাকলেন—
— “অর্নব, ওঠবি না?”
অর্নব আধো ঘুমে চমকে উঠল।
— “হ্যাঁ মা… উঠছি।”
সুমিতা হেসে বললেন,
— “তুই কেমন যেন গুম হয়ে গেছিস ইদানীং। আমার দিকে তাকাস না পর্যন্ত।”
অর্নব চুপ করে রইল।
মায়ের চোখে এখনো সেই কোমল স্নেহ, অথচ সে জানে না কীভাবে বোঝাবে নিজের মনের অস্থিরতা।
তার মধ্যে অপরাধবোধও আছে— “আমি মা’কে এমনভাবে ভাবছি কেন? আসলে আমার কি করা উচিৎ!”
সেদিন দুপুরে এভাবেই কেটে গেলো।
অবশেষে সন্ধ্যার পর সিদ্ধান্ত নিলো— সে চেষ্টাই করবে মাকে রাজি করাতে।
কিন্তু রাতে যখন মা তার পাশে বসে খাচ্ছিলো, তখন অর্নবের ঠোঁটের কাছে গিয়ে শব্দগুলো আটকে গেল।
— “মা, আমি ভাবছিলাম…”
সুমিতা তাকালেন,
— “কি ভাবছিলি?”
— “না, কিছু না…”
তারপর নিঃশব্দে উঠে গেল ঘরে।
পেছন থেকে সুমিতা চেয়ে রইলেন ছেলের দিকে, মনে হচ্ছিল ছেলেটা যেন দিন দিন দূরে সরে যাচ্ছে।
সেদিন রাতে অর্নব নিজের বিছানায় শুয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিল। জানালার বাইরে নিস্তব্ধ রাত, দূরে কুকুর ডাকছে।
সে বুঝে ফেলেছে — যতটা সহজ মনে হয়েছিল, ততটা সহজ নয়।
একজন ছেলের মুখে “মাকে বিয়ে দেওয়া উচিত” এই শব্দগুলো আসা মানেই নিজের ভেতরের সব সম্পর্ককে ভেঙে ফেলা।
সে নিঃশব্দে ফিসফিস করে বলল,
“না মা, আমি পারবো না তোমাকে বিয়ে দিতে।” আবার ভাবে যে মাকে বিয়ে না দিলে মাকে চিরদিনের জন্য হারিয়ে ফেলতে পারে।
এসব ভাবতে ভাবতে তারপর চোখ বন্ধ করল, কিন্তু ঘুম আর এল না সারারাত।
দিনের আলোটা যেন আগের চেয়ে ভারী লাগে। বাড়ির প্রতিটি কোণে এখন নিস্তব্ধতার একটা ঘন পর্দা। জানালার পাশে বসে সুমিতা চুপচাপ বাইরে তাকিয়ে থাকে।
হালকা বাতাস বইছে, জানালার পর্দা একটু নড়ে উঠছে। অর্নব নিজের ঘরে বসে ছিলো, কিন্তু হঠাৎ শুনতে পেল মায়ের দরজা ধীরে ধীরে খোলা হচ্ছে। সে নিঃশব্দে বাইরে এসে দাঁড়াল। দরজার ফাঁক দিয়ে দেখল, সুমিতা টেবিলের ওপর একটা পুরোনো অ্যালবাম খুলেছে—বাবার কিছু ছবি, তাদের একসাথে থাকা সময়ের। মৃদু আলোয় তার মুখে ঝরে পড়েছে একরাশ বেদনা।
অর্নবের বুকটা ভারী হয়ে গেল। সে ভেতরে ঢুকে বলল,
“মা, ঘুমাওনি এখনো?”
সুমিতা চমকে তাকাল, হাসি দেওয়ার চেষ্টা করল।
“ঘুম আসছে না রে। পুরোনো কিছু ছবি বের করেছিলাম, ভাবলাম একটু দেখি।”
অর্নব চুপ। সে এগিয়ে গিয়ে অ্যালবামটা বন্ধ করে মায়ের পাশে বসে। দু’জনেই কিছুক্ষণ নিরব। তারপর হঠাৎ তার মনে এল সেই চিন্তা—মাকে একা রাখা কি ঠিক?
কিন্তু কিভাবে বলবে?
কীভাবে বলবে, “মা, তুমি আবার নতুন করে শুরু করো”?
একজন ছেলে, যার মা এমন নিঃসঙ্গ, তাকে বিয়ে দেওয়া যেন নিজের বুক চিরে দেওয়া।
তবু তার ভেতরটা ছটফট করছে।
সে নিচু গলায় বলল,
“মা... তুমি একা থাকতে পারবে?”
সুমিতা অবাক হয়ে তাকাল,
“একাই তো আছি রে।”
“মানে... একদম একা থাকা কি কষ্ট হয় না?”
সুমিতা একটু হেসে বলল,
“কষ্ট তো অনেক কিছুরই হয় অর্নব, কিন্তু সব কষ্টের নাম দেওয়া যায় না।”
অর্নবের গলা কেঁপে গেল।
“যদি... কেউ থাকতো পাশে?”
সুমিতা একটু থেমে চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলল,
“সবাই কি পাশে থাকে রে? অনেকে পাশে থেকেও দূরে থাকে। তোর বাবার মতো…”
তার কণ্ঠ ভেঙে গেল।
অর্নব চোখ নামিয়ে ফেলল। সে বলতে পারল না নিজের মনের কথাটা—
যে কথাটা তার বুকের ভেতর আগুনের মতো জ্বলছে।
সে শুধু মৃদু স্বরে বলল,
“আমি আছি তো, মা।”
সুমিতা তাকিয়ে রইল ছেলের দিকে। তারপর নিঃশব্দে তার মাথায় হাত রাখল, বলল,
“তুই আছিস বলেই তো বেঁচে আছি।”
বাতাসটা যেন থমকে গেল। অর্নব হঠাৎ অনুভব করল, মায়ের এই কণ্ঠে এক গভীর একাকিত্ব লুকিয়ে আছে—যেটা শব্দে বোঝানো যায় না।
রাত বাড়ে। ঘরের বাতি নিভিয়ে সুমিতা শুয়ে পড়ে, কিন্তু অর্নবের ঘুম আসে না। বারবার মনে হয়, মায়ের মুখে আজ যে হাসিটা দেখল—সেটা যেন খুব জোর করে টেনে আনা। একটানা ছাদের দিকে তাকিয়ে সে ভাবতে থাকে—
“মা কেমন করে এত শক্ত থাকে?”
তার বুকের ভেতর একটা দোলাচল, একটা অদ্ভুত টানাপোড়েন। মা যেন শুধু মা নয়—তার জীবনের একমাত্র অবলম্বন, তবুও সে কিছু বলতে পারে না।
বাইরে তখন ভোরের আলো ফুটছে। অর্নব জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। রোদ উঠছে ধীরে ধীরে। ঘরের ভেতর মায়ের নিঃশ্বাসের মৃদু শব্দ ভেসে আসছে। সেই শব্দে যেন এক অজানা শান্তি, কিন্তু সঙ্গে এক গোপন কষ্টও মিশে আছে।
সে ফিসফিস করে বলে,
“তুমি একা নও, মা... আমি আছি।”
—-----------------
ভোরের আলো জানালার পর্দা পেরিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকছে। সুমিতা এখনো ঘুমিয়ে। তার মুখে এমন এক শান্তির ছায়া, যা অর্নবকে থমকে দেয়। সে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে — যেন বহু বছরের এক বোঝাপড়া, এক নীরব চুক্তি চলছে তাদের মধ্যে।
সকালে চা খেতে খেতেই সুমিতা বলল,
“তুই ঠিকমতো ঘুমাসনি, তাই না?”
অর্নব একটু হেসে বলল,
“না, তেমন না। মাথাটা ভার লাগছে।”
“অন্য কিছু চিন্তা করছিস? আমাকে নিয়ে যা ভেবেছিস তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেল।”
অর্নব চুপ। কাপের ভেতর চায়ের ধোঁয়া উড়ছে, কিন্তু তার দৃষ্টি হারিয়ে গেছে অন্য কোথাও।
সে আসলে এখনো রাতের সেই কথাগুলো থেকে বেরোতে পারছে না।
যেভাবে মা বলেছিল, “সব কষ্টের নাম দেওয়া যায় না” —
ওই কথাটা যেন বারবার ফিরে আসে মাথায়।
দুপুরে বাবার অফিসে বেরোনোর সময় সুমিতা তার শার্টটা আয়রন করে দিচ্ছিল। হঠাৎ আঙুলে একটু গরম লোহা ছুঁয়ে যায়, সুমিতা হালকা চিৎকার করে উঠল,
“উফ্!”
অর্নব ছুটে গেল —
“আহা! দেখাও দেখি, পুড়েছে?”
সে মায়ের হাতটা নিজের হাতে নিয়ে ফুঁ দিতে লাগল। এরপর মায়ের ছ্যাক লাগা আঙ্গুল নিয়ের মুখের মধ্যে নিয়ে চুষতে লাগলো। এমন আতর্কিত ঘটনায় সুমিতা ব্যাথা পাওয়ার সাথে সাথে অস্বস্তি পাচ্ছিলো অনেক। তবুও মার্তৃত্বের বাধনের জন্য কিছুই বললোনা।
কিছু বলল না, শুধু তাকিয়ে রইল ওর মুখের দিকে। সেই দৃষ্টিতে এক মুহূর্তের জন্য সময় যেন থেমে গেল।
তাদের চোখে চোখ পড়তেই দু’জনেই সরে গেল, এক অস্বস্তি ছুঁয়ে গেল ঘরটাকে।
রাতটা নেমে এলো ধীরে ধীরে। বাইরে বৃষ্টি শুরু হলো, মৃদু শব্দে ছাদের টিনে টুপটাপ আওয়াজ।
সুমিতা জানালার পাশে বসে, কপালে হাত রেখে কিছু ভাবছে। অর্নব ঘরে ঢুকল ধীরে, বলল —
“বৃষ্টি হলে তোমার মাথা ব্যথা করে, তাই না?”
সুমিতা হেসে বলল,
“হ্যাঁ রে, এখনো করে। তোর বাবার সময়ও এমন হতো।”
বাবার নামটা শুনেই ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
অর্নব চুপচাপ পাশে বসে পড়ল। বাইরে বজ্রপাত হলো, আলো এক ঝলক এল ঘরের ভেতর।
সুমিতা একটু কেঁপে উঠল, অর্নব অচেতনভাবে তার হাতটা ধরে ফেলল।
মুহূর্তটা যেন দীর্ঘ হতে লাগল —
সুমিতা আস্তে বলল,
“অর্নব, তুই অনেক বড় হয়ে গেছিস।”
অর্নব উত্তর দিতে পারল না। তার চোখে জমে থাকা হাজার কথা, হাজার অনুভব—
কিন্তু মুখে একটাও শব্দ এল না।
কিছুক্ষণ পর সুমিতা হাত সরিয়ে উঠে গেল।
“ঘুমোতে যা, দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
অর্নব ঘরে ফিরে এলো, কিন্তু ঘুম এল না সারারাত।
জানালার ফাঁক দিয়ে বাতাস ঢুকছে, বৃষ্টির গন্ধে ভরে গেছে ঘর।
তার মনে হলো, কিছু একটা বদলে যাচ্ছে তাদের মধ্যে —
চুপিচুপি, নিঃশব্দে।
চলবে…………