যেমন করে চাই তুমি তাই/কামদেব - অধ্যায় ৮
।।৮।।
রাহেলা-বিবির যেমন কথা তেমন কাজ।সন্ধ্যে বেলা পুলিশ নিয়ে হাজির।মোবারক সাহেবকে সেলাম করে কনষ্টেবল বলে,গূস্তাকি মাফ ছ্যর।বলদেব কে তারে ডাকেন।
--মানু বলারে পাঠায়ে দে।মোবারক সাহেব রাহেলা চাচির দিকে মুখ ফিরিয়ে থাকেন।
বলদেব আসতে তাকে দারোগা সাহেব জিজ্ঞেস করে,তোমার জিনিসপত্র কই?
বলদেব বোবা চোখে মানোয়ারার দিকে তাকায়।মানোয়ারা বলে,জিনিসপত্রের মধ্যে একখান তোরঙ্গ,ওর ঘরেই আছে।
--ওর ঘরটা কোথায়?
মানোয়ারা পুলিশকে ভিতরে নিয়ে যায়।ঘরের এককোনে একটা টিনের স্যুটকেশ তালা দেওয়া।চাবির খোজ করতে মানোয়ারা বলদেবকে ডেকে আনে।বলদেব বলল,চাবি হারায়ে গেছে।
সন্দিহান চোখে বলদেবকে এক নজর দেখে দারোগা বলল,এইটা বাজেয়াপ্ত করলাম।
টিনের বাক্স সহ বলদেবের কোমরে দড়ি বেধে নিয়ে যেতে উদ্যত হ'লে বলা বলে, আসি কত্তা আপনে ভাববেন না।নসিবে যা আছে তাই হবে।রাহেলা চাচির দিকে তাকিয়ে বলল,আসি চাচি?
বলদেবের চোখ কাকে যেন খোঁজে, অশ্রুভেজা চোখ নিয়ে মানোয়ারাবিবি তখন অন্তরালে।
সারা রাত মোবারক সাহেব ঘুমাতে পারেন না।নাসুক্রিয়া বেরহম আউরত,এক রাতের মধ্যেই সব ভুলে গেলি।মোবারক সাহেবের নিজেকে অপরাধী মনে হয়। সকাল হতেই পোশাক পরে বেরোবার জন্য তৈরী।মানোয়ারা জিজ্ঞেস করে,ভাই জান কই যান?
--থানায়। বেশি দেরী হলে তোরা খেয়ে নিস।মোবারক রাস্তায় নামে।
মানোয়ারা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে।অনেকেই আসে খবর নিতে।কেউ জিজ্ঞেস করল,চাচির বাসায় গেছিল কোন কামে?
মানোয়ারার মনেও সেই প্রশ্ন তবু কিছু বলতে হবে তাই বলে,তার কি বোধ ভাস্যি আছে,কোনটা কাম কোনটা অকাম বুঝলি কথা ছেলনা কোন বাড়ি না যায়।এমন হবে তাকি জানতো?
মানোয়ারা বলার ঘরে ঢোকে।কিছুই ছিলনা তবু মনে হয় ঘরখান খা-খা করতিছে।বেলা বাড়ছে মানোয়ারা রসুই ঘরে ঢোকে।চুলার ধোয়ায় চোখে পানি এসে যায়।আচলে চোখ মোছে মানোয়ারা।বলার সাহচর্যে জীবনে বাচার ইচ্ছে ফিরে পেয়েছিল। বাইরে ভাইজানের গলা পেয়ে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে এসে দেখল ভাইজান একা।মানোয়ারা সপ্রশ্ন চোখে তাকাতে মোবারক সাহেব বললেন,সদরে চালান করে দিয়েছে।
বলদেবকে ধরে নিয়ে যাবার পর সারা গ্রামে নেমে আসে এক অপরাধবোধের ছায়া।মোবারক সাহেব নিজেকে দোষী মনে করেন।কেন তিনি চাচীর বাসায় বলারে পাঠালেন।তার আশ্রয়ে ছিল তিনি রক্ষা করতে পারলেন না।দিন অতিবাহিত হয়।মহিলা মজলিশ বসে কিন্তু জমে না।কেউ ভেবে পায়না রাহেলাবিবির বাড়ি বলা গেছিল কোন কামে। তারে না ডাকলি আগ বাড়ায়ে কারো বাড়ী যাবার লোক না। কার দোষ কার উপর চাপালো কে জানে?
কোনোকিছুই এক জায়গায় স্থির থাকে না।আজকের যৌবন কালকে পৌঢ়।এই দুনিয়ায় সতত চলছে নিত্য নাটের খেলা।এক শিল্পি এক শিশুর পবিত্র মুখের ছবি আকেন।সেই শিল্পী দীর্ঘকাল পরে এক নৃশংস পাপীর ছবি আকেন।জানা গেল অনেক কাল আগে আকা সেই পবিত্র শিশুই পরবর্তীকালের নৃশংস পাপী।জন্মের সময় কাদার তাল।তারপর সেই কাদা দিয়ে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে মাটির প্রতিমা।নিতাই পাল সময়ের চাহিদা অনুযায়ী প্রতিমা গড়তে থাকে।
বলদেব চালান হয়ে গেল সদরে।সদরে বড় সাহেব জয়নাল জিজ্ঞেস করেন,কি চুরি করেছো?
--জ্বি কিছুনা।
--তাহলে এখানে আসছো ক্যান?
--জ্বি চুরির অপরাধে।
--কি চুরির অপরাধে?
--সেইটা ছ্যর রাহেলাবিবি বলতে পারবে।
--চুরি করেছো তুমি বলবে রাহেলাবিবি?
--আমি চুরি করি নাই তানার অভিযোগে আমারে ধরছে।
সকালবেলা কার পাল্লায় পড়লেন? বিরক্ত হন জয়নাল সাহেব।উল্টাপাল্টা কাদের ধরে নিয়ে আসে। লোকটার চেহারা দেখে মনে হয়না চোর।দীর্ঘকাল পুলিশে আছেন অন্তত এটুকু অভিজ্ঞতা হয়েছে। জয়নাল জিজ্ঞেস করেন, তুমি চৌধুরিবাড়ি কাজ করতে?
--জ্বি।
--কি কাজ করতে?
--যখন যে কাম দিত।
পাগলটা বলে কি? এর সঙ্গে সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয়না। বেকসুর খালাস পেয়ে গেল বলদেব।দুইদিন হাজতবাসে ও.সি.সাহেবের নেক নজরে পড়ে গেছে।মানুষটা সরল, পুলিশের হাজতে এদের মানায় না। দু-একটা কথা বলেই বুঝেছেন, মানুষের মন ছাড়া আর কিছু চুরি করার সাধ্য নাই।হাজত থেকে বের করে জিজ্ঞেস করেন, এখন কোথায় যাবে? বাড়ি কোথায়?
--জ্বি, স্মরণে পড়েনা।
--তা হ'লে কোথায় যাবে?
--এইখানে থাকা যায় না?
ও.সি. হেসে ফেলেন।এমন লোকের নামে যে চুরির অপবাদ দেয় তারেই হাজতে ভরে দেওয়া দরকার। কি করবেন লোকটাকে নিয়ে ভাবতে বসেন।চোর বদমাশ নিয়ে কারবার এই রকম মানুষের সাক্ষাৎ যেন নির্মল বাতাসে শ্বাস টানা।সবাই অবাক হয়ে দেখে স্যর হাসতেছেন।এইটা একটা বিরল ঘটনা।
--দেখ থানা বড় নোংরা জায়গা।
--ছ্যর আপনে অনুমতি দিলে আমি পরিষ্কার করে নেব।
জয়নাল সাহেব চাকরি জীবনে বহুত কিসিমের অপরাধী দেখেছেন কিন্তু এই লোকটা একেবারে অন্য রকম।এই শহরে যাবে কোথায়?
থানা পরিষ্কার করা দু-একজনের কাজ না, সেই ব্রিটিশ আমল থেকে জমা ময়লা। ও.সি. সাহেবের চোখে কি জল এসে গেল? ঠোটে ঠোট চেপে এক মুহুর্ত ভেবে বলেন, সরকারি চাকরি করবা? লেখাপড়া কত দূর করেছো?
--জ্বি মেট্রিক পাশ।
--বলবা এইট পাশ।
--ছ্যর মিছা কথা বলতে পারিনা।
--মিছা কথার কি হল?এইট পাশ না করে এক লাফে কেউ মেট্রিক পাশ করতে পা্রে?
--জ্বি।
তার এক বন্ধু রাশেদ মিঞা, পদস্থ সরকারি অফিসর।রাশেদরে বললে মনে হয লোকটার একটা গতি হতে পারে।যেই ভাবা সেই কাজ।বন্ধুকে ফোন করলেন।
--হ্যালো?
--আমি জয়নাল--।
--বল কি খবর? ট্রান্সফার প্রবলেম?
--আরে না-না।একটা অন্য কাজে ফোন করেছি।
--তা জানি।কাজ পড়ছে তাই মনে পড়ল বন্ধুরে।কি কাজ বল?
--তোর অফিসে একটা লোককে ঢুকাতে হবে মাইরি।
--সরকারি অফিস, কামে-অকামে রোজই কত লোক ঢুকছে বেরোচ্ছে--লোকটারে ঢুকায়ে দে।
--মস্করা না, পিয়ন-টিয়ন যা হোক কিছু।যদি পারিস খুব ভাল হয়।
--লোকটা তোর কে?রাশেদ সাহেবের সন্দিগ্ধ প্রশ্ন।
--আমার কেউ না।চুরির অপবাদে ধরা পড়ে ছিল--লোকটা বেকসুর।
--শাল-আ ! চোর-বদমাশ ঢুকায়ে বদনাম করতে চাও? আচ্ছা তোর চোর-বদমাশের প্রতি দুর্বলতা কবে থেকে হল? রাশেদ কিছুটা অবাক।
জয়নাল সাহেব চুপ করে থাকেন। কি উত্তর দেবে বন্ধুকে? ছোট বেলা থেকে মারকুট্টে বলে বন্ধু-মহলে তার পরিচিতি। আজ তার মুখে কথা নেই।
--কিরে জয়, আছিস তো?রাশেদ জিজ্ঞেস করেন।
--হাঁ। শোন রাসু তোকে একটা কথা বলি তুই হাসিস না।গম্ভীরভাবে বলেন, এত বছর পুলিশে কাজ করার সুবাদে নানা চরিত্রের মানুষ কম দেখলাম না।কথা শোনার আগেই বলে দিতে পারি কি বলতে চায়।
--সে আমি জানি।আমার বিবির ব্যাপারে তোর প্রেডিকশন খুব কাজে লেগেছে।ভারী সন্দেহ বাতিক।
--সেইটা কিছুনা,মেয়েরা একটু সন্দেহ বাতিক হয়।বিশেষ করে বাচ্চা-কাচ্চা না হইলে অলস মনে কু-চিন্তা আসে।যাক তুই তো জানিস আমার দয়া মায়া কম।নিজের মেয়ে আমার কাছে থাকে না। থানার বড়বাবূ--এরে ধমকাই তারে ধমকাই, নিজেরে কিইনা কি ভাবতাম।অথচ এই লোকটার সঙ্গে কথা বললে সন্দেহ হয় নিজেকে যা ভাবি আমি সত্যিই কি তাই?
-- ইণ্টারেষ্টিং !লোকটা কে দেখতে হচ্ছে।জয় তুই ওকে পাঠিয়ে দে।আর এক দিন আয় না----।
--যাব যাব,এখন রাখছি।
--এক মিনিট।জয় তুই এতক্ষন কথা বললি একটাও খিস্তি দিসনি।
ফোন কেটে দেয়।হা-হা-হা করে হাসি শোনা যায়।বড়বাবু হাসেন দেখে অন্যান্য কর্মচারিরা অবাক হয়।বাস্তবিক ও.সি.-কে হাসতে খুব কম দেখা যায়।দারোগাবাবুর পিটানির ভয়ে দাগী অপরাধীরও প্যাণ্ট ভিজে যায়।
বলদেবের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করে,তোমার মাল পত্তর কই?
--জ্বি মানুঅপার কাছে।
জয়নাল দারোগা কি বলবে বুঝতে পারেনা।একজন কনেষ্টেবলকে বল্লেন,চোউধুরীবাড়ির থেকে ওর জিনিসপত্র এনে দিতে।
বেশ কিছুদিন পর রাহেলাবিবি আবিষ্কার করে সাবুর হায়েজ বন্ধ হয়ে গেছে।এইটা অত্যাশ্চার্য খবর। খবরটা শ্বশুর বাড়ী পৌছে যায় সময়মতো।খবর পেয়ে বিবিরে নিতে রশিদ আসে।খুশিতে বিবির গলায় হার পরিয়ে দেয়। রাহেলাবিবি ড্যাবডেবিয়ে তাকিয়ে দেখে এতো সেই হার।
সাবিনা বলল,এই হার কোথায় পেলে?
বউ ফেলায়ে থুয়ে গিলিও হার তো ফেলায় দেওয়া যায়না এই নিষ্ঠুর সত্যটা চেপে গিয়ে রশিদ বিবিকে বলে,আম্মু বলছিল আবার বিয়া করতে হার লাগবো তাই নিয়া গেছিলাম। রাহেলাবিবি কথাটা চেপে যাবার চেষ্টা করলেও সারা গ্রামে রাষ্ট্র হয়ে যায় সাবিনা হার খুজে পেয়েছে।সবাই স্বস্তিবোধ করে বলদেব চুরি করে নাই।শঙ্কা ছিল তারা বলারে একটু বেশি বিশ্বাস করে নাই তো।
রাহেলাবিবি খবরটা মুবারক সাহেবকে দিতে গেলে কথাটা নাশুনেই তাকে কুকুরের মত তাড়িয়ে দিয়েছে।বলা শহরে কাজ পেয়েছে শুনে মোবারক সাহেব খুশি যাক ছেলেটার একটা গতি হল।ছেলেটার প্রতি খুব মায়া পড়ে গেছিল।
সরকারি দপ্তরে বলদেবের চাকরি হয়ে গেল। ক্লাস ফোর ষ্টাফ--এদের কাজের সীমা-পরিসীমা নেই।ফাইল যোগান দেওয়া, পানি দেওয়া, রাস্তার দোকান থেকে বাবুদের নাস্তা কিনে আনা এমন কি সাহেবের বাড়ির কাজ পর্যন্ত।বলদেব নিয়মিত অফিস যায় আসে।কাজ কাম তেমন নাই বসে বসে সময় কাটতে থাকে।
একদিন বড় সাহেবের ঘরে ডাক পড়ল।বলদেব ঢুকতে সাহেব বললেন,কি করছিলে?
--ঠোঙা পড়ছিলাম।
--মানে?
--এক ঠোঙা মুড়ী আনিছিলাম খেয়ে ঠোঙাটা পড়তেছিলাম।
রাশেদ অবাক হন জয়নাল ঠিকই বলেছিল ছেলেটি অদ্ভুত।জিজ্ঞেস করলেন,মুড়ি খাচ্ছিলে ভাত খেয়ে আসোনি?
--তাড়াতাড়িতে ভাত খেয়ে আসতি পারিনি।
পিয়ন বেয়ারার সঙ্গে বেশি কথা বলা ঠিক নয়।মুড়ি খাওয়ার পর সেই ঠোঙা ছিড়ে পড়ছিল।রাশেদ সাহেব বললেন,তুমি এক কাজ করো। নীচে গাড়ীতে গিয়ে বসো।আমার বাড়ীতে যাবে মেমসাহেব যা বলে তুমি করে দিও।
--জ্বি সাব।
--কোথায় যাচ্ছো কাউকে কিছু বলার দরকার নাই।
--জ্বি সাব।বলদেব নীচে নেমে গেল।