।। আমি, আমার স্বামী ও আমাদের যৌনজীবন ।। - অধ্যায় ৬৭

🔗 Original Chapter Link: https://xforum.live/threads/।।-আমি-আমার-স্বামী-ও-আমাদের-যৌনজীবন-।।.35679/post-3316868

🕰️ Posted on Wed Aug 11 2021 by ✍️ soti_ss (Profile)

🏷️ Tags:
📖 4717 words / 21 min read

Parent
বিদিশা রাস্তার দিকে নজর রেখে ড্রাইভ করতে করতে বলল, “নো চান্স দীপদা। লটকা লটকি করবার মত ছেলের কি আর অভাব আছে? কিন্তু এমন কাউকে এখনো পাই নি যার গলা ধরে আমি লটকে যেতে পারি। আরেকটা দীপ পেলে তো কবেই লটকে যেতাম”। তারপর ................ (১২/২) আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কেমন পার্টনার খুঁজছো বলো তো”?​​বিদিশা বেশ গম্ভীরভাবে জবাব দিল, “চাইলেই কি আর সব পাওয়া যায় দীপদা? সতীর মত কপাল কি সবার হয়? মন তো চায় ঠিক তোমার মত একজনকে পেতে। ঠিক তোমার মত না পেলেও অন্ততঃ তোমার মত খোলা স্বভাবের খোলা মনের কাউকে পেতে ইচ্ছে করে খুব। নইলে আমরা যে ধরণের জীবন যাপন করেছি তাতে যে কোন সময় অশান্তি হতে পারে সংসারে” একটু থেমেই আবার বলল, “ওহ, তোমাকে বা সতীকে এখনও একটা কথা বলা হয়নি। জানো দীপদা, সৌমীর অবস্থা নাকি খুব খারাপ”।​​আমি চমকে উঠে বললাম, “খারাপ মানে? কী হয়েছে ওর? ওর তো গত বছরই বিয়ে হল। শ্বশুর বাড়ি তো শুনেছি ব্যান্ডেল না ওদিকেই কোথায় যেন”।​​বিদিশা বলল, “ব্যান্ডেল নয়, উত্তরপাড়া। কোলকাতার কাছেই। দাঁড়াও গাড়িটা পার্ক করে নিই, তারপর নেমে বলছি। হাতে তো এখনো মিনিট পনেরো সময় আছে, চলো”।​​স্টেশনের প্রাইভেট কার পার্কিংয়ে গাড়ি রেখে লক করে আমরা গাড়ির পাশেই দাঁড়ালাম। বিদিশা বলল, “বিয়ের কয়েক মাসের মধ্যেই সৌমী জানতে পারে ওর বরের স্বভাব চরিত্র ভাল না। PWD-তে ভালো বড় পোস্টে চাকরি করে। মদ আর বাইরের মেয়ে মানুষ ছাড়া ওর চলেই না। পাড়ায় বেপাড়ায়, রেস্টুরেন্টে, হোটেলে, এমন কি মেয়েদের সাথে স্ফূর্তি করতে না কি রেড লাইট এরিয়াতে প্রস্টিটিউটদের কাছেও যায়। মাস কয়েক আগেও যখন এসেছিল তখন বলছিল ও নাকি খুব চেষ্টা করছে মানিয়ে নিতে। কিন্তু স্বামীকে শোধরাতে পারবে বলে মনে খুব একটা ভরসা পাচ্ছে না। সতীকে নিয়ে তোমাকে নিয়ে আমরা বন্ধুরা কত খুশী। আর সৌমীর কথা ভেবে আমার যে কী কষ্ট হয়, সেটা তোমাকে বলে বোঝাতে পারব না দীপদা। আর নিজের জন্যে কোন সম্মন্ধের খবর এলেই সৌমীর কথা ভেবে মনে বড় ভয় হয় আজকাল”।​​আমি সব শুনে স্বগতোক্তির মত বলে উঠলাম, “হে ভগবান, এমন মিষ্টি হাসি খুশীতে ভরা একটা ফুটফুটে মেয়ের কপালে তুমি এই লিখেছিলে ? সত্যি যাবার সময় মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল বিদিশা। ঈশ্বর ওর মঙ্গল করুন। এই প্রার্থনাটুকু ছাড়া আমরা আর কী করতে পারি বল”? একটু থেমে ঘড়ির দিকে দেখে বললাম, “সময় হয়ে গেছে আমার বিদিশা। আমি আসছি তাহলে, তুমি সাবধানে ড্রাইভ করে যেও, কেমন”?​​বিদিশা দু’হাতে আমার একটা হাত ধরে বলল, “তুমি পৌঁছেই কিন্তু ফোন করবে সতীকে। আর শোনো দীপদা... সৌমীর কথা বলে মনটা খুব ভার হয়ে গেল....... যাবার আগে আমাকে আদর করে একটু চুমু খাবে দীপদা”?​​আমি চমকে উঠে বললাম, “কী বলছো তুমি বিদিশা! এখানে এমন একটা খোলা জায়গায় সেটা করা মোটেও ভাল হবে না”।​​বিদিশা আমার হাত ধরে টানতে টানতে গাড়িটার পেছন দিকে যেতে যেতে বলে, “কিচ্ছু হবে না দীপদা। এই গাড়ির পেছনে.... এখানে কেউ দেখবে না। আর দেখলে দেখুক গে। আই ডোন্ট কেয়ার। আমি আমার বন্ধুকে কিস করতেই পারি”।​​আর কথা বলে সময় নষ্ট না করে আমি বিদিশার ঠোঁট দুটো নিজের মুখের মধ্যে পুরে নিয়ে একটু চুষে দিয়ে বললাম, “খুশী তো এবার? এখন যাও, সাবধানে যেও। সতীকে বোলো আমি গৌহাটি পৌঁছেই ওকে ফোন করব। আর ওকে বোলো ঠিক ঠাক ডাক্তারের অ্যাডভাইসগুলো যেন মেনে চলে। আসছি....বাই....ভাল থেক”।​​ষ্টেশনের সিঁড়ি বেয়ে উঠে গিয়ে এনকুয়ারি কাউন্টারের দিকে যেতে যেতে পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখলাম বিদিশার গাড়িটা পার্কিং থেকে বেড়িয়ে গেল।​​দু’নম্বর প্লাটফর্মে কামরূপ এক্সপ্রেস দাঁড়িয়ে ছিল। আমি নিজের রিজার্ভড সীট খুঁজে নিয়ে হকারের কাছ থেকে একটা খবরের কাগজ নিয়ে সীটে বসে চোখ বুলাতে লাগলাম। মিনিট খানেক পরেই শ্যাম বর্ণা চুড়িদার পড়া এক মহিলা পাশের সীটে এসে বসেই আমার মুখের দিকে অবাক চোখে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করল, “আরে, বিশ্বদীপ না”?​​আমি আশ্চর্য হয়ে মহিলার দিকে অপ্রস্তুত ভাবে চেয়ে বললাম, “হ্যা.... কিন্তু মাফ করবেন, আমি আপনাকে ঠিক......”​​মহিলা নিজের চোখ থেকে চশমাটা খুলতে খুলতে বলল, “কি? চিনতে কষ্ট হচ্ছে এখনও? অবশ্য তুমি কবেই বা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখেছ”!​​আমি ভদ্রমহিলার মুখের দিকে একটু সময় দেখে নিয়েও ঠিক চিনতে পারলাম না। কিন্তু তার মুখটা আমার বেশ পরিচিত মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল বেশ কিছুদিন আগে ভদ্রমহিলাকে কোথায় যেন দেখেছি! আর সেটা একদিনের দেখা নয়। অনেক দিন অনেক বার মেয়েটাকে দেখেছি। কিন্তু ঠিক কিছুতেই মনে করতে পারছিলাম না। আমি অসহায়ের মত বলে উঠলাম, “আই এম সরি, ম্যাডাম। মনে হচ্ছে কোথায় যেন দেখেছি। কিন্তু সত্যি আপনাকে সঠিক চিনতে পারছি না”।​​ভদ্রমহিলা এবারে মিষ্টি করে হেসে বলল, “আরে আমি শম্পা। শম্পা ভৌমিক। আমরা একসাথে কলেজে পড়তাম। একেবারেই চিনতে পারছ না”?​​নামটা শুনেই আমি চিনতে পারলাম। কিন্তু আমার কলেজের সহপাঠিনী শম্পার মুখের যে ছবিটা আমার মনে ভাসছিল তার সাথে এ ভদ্রমহিলার মুখের একদম মিল খুঁজে পাচ্ছিলাম না আমি। রোগা পাতলা শম্পা নামের কালো মেয়েটা খুবই সাধারণ দেখতে ছিল। দু’বার মুখ ঘুরিয়ে দেখার মত মুখশ্রী ছিল না তার একেবারেই। ক্লাসের সব ছেলেই কোন না কোন মেয়ের পেছন লাগত। কিন্তু শম্পা নামের ওই মেয়েটার পেছনে কেউ কোনদিন লাগত না। পেছনে লাগবে কি, কালো বেটে খাটো রোগা পাতলা মেয়েটার দিকে কেউ আকৃষ্টই হত না। বুকটাও ছিল প্রায় সমতল। আর এ ভদ্রমহিলা তো মোটেও কালো নন। গায়ের রঙ বেশ উজ্জ্বল শ্যাম বর্ণের মনে হচ্ছে। আর মুখটা তো প্রায় ফর্সাই বলা যায়। চেহারাতেও বেশ চটক আছে, বেশ সেক্সি দেখতে। চুলগুলোও বেশ সিল্কি, আর সপাট নেমে এসেছে পিঠের ওপর। আর শম্পার চুলগুলো ছিলো রুক্ষ আর খুব কোঁকড়ানো। কিন্তু চোখ দুটো সত্যি কিছুটা মিলছে। ওই শম্পার চোখ দুটোও এমনি শান্ত আর গভীর ছিল।​​আমি অবাক চোখে মহিলার দিকে চেয়ে বললাম, “সত্যি বলছ? তুমি সত্যিই শম্পা? তোমার চেহারার এত পরিবর্তন হয়ে গেছে যে আমি কেন, সবাই তোমাকে চিনতে ভুল করবে। এখন কোথায় আছ? মেঘালয়েই না অন্য কোথাও? বিয়ে টিয়ে করেছ”?​​শম্পা হাত তুলে আমাকে থামাতে থামাতে কিছুটা হেসে বলল, “ধীরে, ধীরে, বাব্বা, প্রশ্নের বন্যা বইয়ে দিচ্ছ তো একেবারে। একটু আগে তো চিনতেই পারছিলে না। সবার আগে বলো তুমি এখানে কেন”?​​আমি উচ্ছাস কমিয়ে বললাম, “আমার শ্বশুর বাড়ি এখানে। দেশবন্ধু পাড়ায়। বৌকে নিয়ে এসেছিলাম। ও কিছুদিন এখানে থাকবে। ওকে রেখে ফিরে যাচ্ছি শিলং। আমার এখন ওখানেই পোস্টিং। তা, তুমি এখানে কি ব্যাপারে”?​​শম্পা মুচকি হেসে বলল, “তোমার মত আমারও শ্বশুর বাড়ি এখানেই। মাটিগাড়ায়। সে এল আই সি-তে কাজ করে। গৌহাটিতে পোস্টেড এখন। ওর একটা ট্রেনিং পড়েছে দিল্লীতে। পরশুদিন এখান থেকে রওনা হয়ে গেছে। আমি ওর সাথেই এখানে এসেছিলাম। এখন ফিরে যাচ্ছি গৌহাটি। তোমাকে পেয়ে ভালই হল। একটা মনের মত সঙ্গী পেলাম সাড়া রাস্তার জন্যে। তা বিয়ে কবে করেছ? ছেলেমেয়ে কিছু হয়েছে”?​​ট্রেন তখন স্টেশন থেকে ছেড়ে দিয়েছে। আমি একটু হেসে বললাম, “এখনও কিছু হয়নি। তবে হয়ত আর দু’আড়াই মাসের মধ্যেই কিছু একটা হবে। আর বিয়ে করেছি এইটি সিক্সের মার্চে”।​​শম্পা খুশী হয়ে আমার হাত ধরে বলল, “ম্যানি ম্যানি কনগ্র্যাচুলেশন্স ইন অ্যাডভান্স দীপ। আই উইশ ইউ এ ভেরি ভেরি গুডলাক। তা তোমার বউ দেখতে নিশ্চয়ই খুব সুন্দরী, তাই না”?​​আমি নিজের পকেট থেকে ওয়ালেটটা বের করে সেটা মেলে ধরলাম শম্পার মুখের কাছে। বললাম, “এই হচ্ছে আমার বেটার হাফের ছবি। সতী”।​​শম্পা ওয়ালেটটা হাতে নিয়ে খুব মন দিয়ে সতীর ছবিটা দেখতে দেখতে নিজের মনেই বলে উঠল, “বাঃ, কী সুন্দরী গো? দারুণ দেখতে তো! অবশ্য তোমার সঙ্গে এমন একটা মেয়েকেই মানায়। কিন্তু এ তো ....” বলে আনমনে কিছু একটা ভাবতে লাগল।​​ও যে কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল, সেটা বুঝতে পারলেও আমি ওকে সে ব্যাপারে কোন কথা বললাম না। অনেকক্ষণ ধরে সতীর ছবিটা দেখে আমার হাতে ওয়ালেটটা ফিরিয়ে দিতে দিতে শম্পা বলল, “সত্যি, তোমার বৌ দেখতেও যেমন মিষ্টি, নামটাও ঠিক ততটাই মিষ্টি, সতী। বাঃ। তোমার সঙ্গে দারুণ মানিয়েছে”। একটু থেমেই মুচকি মুচকি হাসতে হাসতে শম্পা বলল, “একটা কথা বোধহয় তোমাকে কেউ কখনও বলেনি দীপ। আজ বললে কারো কোনো ক্ষতি হবে না, তাই বলছি। আমাদের ক্লাসের সব মেয়েই কিন্তু মনে মনে তোমার জন্যে পাগল ছিল। কিন্তু তুমি তো মেয়েদেরকে তোমার ধারে কাছে ঘেঁসতেই দিতে না। কোনদিন তোমাকে কোন মেয়ের সাথে কথা বলতে দেখিনি আমরা। কিন্তু আজ তোমার বৌয়ের ছবি দেখে আমার মনে হচ্ছে সত্যি তোমার উপযুক্ত বউ-ই পেয়েছো তুমি। আমাদের ক্লাসের সবচেয়ে সুন্দরী ছিল মিতা। মনে আছে তোমাত ওকে? সে-ও অন্য সব মেয়ের মত তোমাকে পেতে চাইত। কিন্তু সেও তোমার বৌয়ের মত এত সুন্দরী ছিল না”।​​আমি শম্পার কথা শুনে হাসতে হাসতে বললাম, “অ্যা, তাই না কি? সত্যি এ ব্যাপারটা তুমি না বললে জানতেই পারতাম না কখনো” তারপর একটু ঠাট্টার সুরে বললাম, “তা তুমিও কি সেই দলে ছিলে নাকি”?​​শম্পাও হাসতে হাসতে বলল, “পাগল”? বেশ কিছুক্ষণ হেসে, বেশ কষ্টে হাসি থামিয়ে বলল, “সত্যি বলতে লজ্জা নেই আজ দীপ। সেই বয়সটা তো আমরা দু’জনেই অনেক আগেই পেড়িয়ে এসেছি। এখন আমরা দু’জনেই ফুল্লি গ্রোন আপ, ম্যাচিওরড অ্যান্ড ম্যারেড। তা সে দলে ছিলাম না বললে সেটা মিথ্যেই বলা হবে। কিন্তু তুমি তো জানোই আমি ছিলাম আমাদের ক্লাসের সবচেয়ে কুৎসিত দেখতে। কোনদিন কোন ছেলে আমার মুখের দিকে তাকাত না। আর বামন হয়ে চাঁদ ধরার মত প্রচেষ্টা করার দুঃসাহস আমার ভেতরে ছিল না। তবে বলতে পারো, সে দলে থাকলেও আমি ছিলাম লাইনের সবার শেষে”।​​শম্পার অকপট স্বীকারোক্তি শুনে আমি একটু লজ্জাই পেলাম। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখতে দেখতে কিছুটা অপ্রস্তুতের মত বলতে লাগলাম, “এই যাহ্‌, এভাবে বলছ কেন ? আমি তো তেমন কোন কেউকেটা ছিলাম না। খুবই সাধারন একটা ছেলে ছিলাম আর পাঁচ জনের মত। কিন্তু তোমার একটা কথার বিরোধিতা করব না। আমি সত্যিই ইচ্ছাকৃত এবং খুব সচেতন ভাবেই মেয়েদের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতাম। তবে এর পেছনে সম্পূর্ণ আলাদা কারণ ছিল। তোমরা যদি ভেবে থাকো আমি অহঙ্কারের বশবর্তী হয়ে বা কোনরকম ঘৃণা বশতঃ মেয়েদেরকে এড়িয়ে চলতাম তাহলে সেটা তোমাদের একটা ভুল। এখন আমি আগের মত নেই আর। তাই তোমাকে পরিষ্কার করেই বলছি ব্যাপারটা। কারো সাথে হৃদয়ঘটিত ব্যাপার ঘটে যাবার ভয়েই আমি তেমনটা করতাম। কারন আমার ভবিষ্যৎ তখন একেবারেই অনিশ্চিত আর আঁধারে ঢাকা ছিল। কাউকে ভালোবেসে তার কাছ থেকে দুরে সরে গিয়ে কষ্ট পেতে রাজি ছিলাম না। আর নিজেরাই তো দেখেছ, সেকেণ্ড ইয়ারের পরীক্ষার রেজাল্ট খারাপ হতেই আমি পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছিলাম। তোমরা সবাই আমাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গিয়েছিলে। আরও একটা বছর বাদে আমার কলেজে যাওয়ার পাটই চুকেবুকে গিয়েছিল চিরদিনের জন্য। নেহাত মাধ্যমিকে ফার্স্ট ডিভিশন পেয়েছিলাম বলে কপাল গুনে ব্যাঙ্কে একটা চাকুরী পেয়ে নিজের জীবনটার একটা হিল্লে করতে সক্ষম হয়েছি”।​​আমি থামতেই দু’জনেই খানিকক্ষণ চুপচাপ হয়ে রইলাম। তারপর শম্পা বলল, “আমার যতদুর মনে পড়ে, আর্টস সেকশনের বিণী রায় ছাড়া তুমি অন্য কোন মেয়ের সাথে কথা বলতে না। অবশ্য বিণীর সঙ্গে যে তোমার তেমন কোন সম্পর্ক ছিল না সেটা আমরা সবাই জানতাম”।​​চৌদ্দ পনেরো বছর আগেকার কলেজ জীবনের নানা কথা আমার মনে ভিড় করে আসছিল। শম্পার কথা শুনে বললাম, “আসলে বিণীর বড় ভাই সুমন্ত তো আমাদের সাথেই সাইন্স সেকশনে পড়ত। আর সে ছিল আমার খুব কাছের বন্ধু। সুমন্তর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ত্ব এখনও অটুট আছে। আর একই ব্যাঙ্কে আছি বলে মাঝে মধ্যেই আমাদের দেখা সাক্ষাতও হয়। সুমন্তর সুবাদেই বিণীর সাথে কথা বলতাম। ওদের বাড়িতেও যাতায়াত ছিল আমার। তাই ওর সাথে কিছু কথাবার্তা হতই আমার। কিন্তু আজ এতদিন বাদে এখানে ট্রেনের মধ্যে তোমার সাথে দেখা হওয়াতে আমার কী যে ভালো লাগছে, সেটা তোমাকে আমি বলে বোঝাতে পারব না। কলেজ ছাড়ার পর এই প্রথম কোন সহপাঠিনীর সাথে আমার দেখা হল। সত্যি ভেতরে ভেতরে একটা অদ্ভুত রোমাঞ্চ হচ্ছে”।​​শম্পাও উচ্ছসিত ভঙ্গীতে বলল, “আমারও ঠিক তাই মনে হচ্ছে দীপ। এত বছর বাদে হঠাৎ করে এভাবে তোমাকে দেখতে পাব, এ কথা একবারের জন্যেও মনে হয় নি আমার। ইশ, এখন আমার খুব আপসোস হচ্ছে, ষ্টেশনে ঢোকার আগে তখন যদি তোমার সাথে কথা বলতাম, তাহলে তোমার বৌকেও সামনা সামনি দেখতে পেতাম”।​​আমি অবাক হয়ে শম্পার দিকে চেয়ে বললাম, “ষ্টেশনের বাইরে তুমি আমায় দেখতে পেয়েছিলে”?​​শম্পা বলল, “হ্যা তো, কিন্তু একটু সন্দেহও হয়েছিল যে তোমার মতই দেখতে অন্য কেউ হবে হয়ত। তাই তখন কিছু বলি নি। আর দেখো, কী ভাগ্য আমার ! তোমার ঠিক পাশের সীটটাই আমার কপালে পড়েছে। তোমার বউ তোমাকে ষ্টেশনে ছাড়তে এসেছিল বুঝি, তাই না”?​​আমি খোলা খুলি হেসে বললাম, “ওহ মাই গড, তুমি ভুল করছ শম্পা। তুমি যাকে দেখেছ, মানে যে মেয়েটা আমার সঙ্গে ছিল সে আমার স্ত্রী নয়। আমার স্ত্রীর ছোট বেলার বান্ধবী। আমার বউয়ের কথায় আমাকে ড্রপ করতে এসেছিল। খুব ভাল মেয়ে, একেবারে আমার বউয়ের মতই ফ্রী অ্যান্ড ফ্রাংক। আর খুব মিষ্টি স্বভাবের মেয়ে”।​​শম্পা আমার দিকে একটু ঝুঁকে ঈষৎ চাপা গলায় বলল, “হুম, সে যে ফ্রী, ফ্রাংক আর মিষ্টি সেটা আমি দেখেই বুঝেছি। খোলা জায়গায় যা করছিলে দু’জনে মিলে, তার সবটাই দেখেছি”।​​আমি একটু অবাক হয়ে বললাম, “কী দেখেছো তুমি”?​​শম্পা তেমনি ভাবে চাপা গলায় বলল, “গাড়ির পেছনে গিয়ে দু’জনে যা করেছ ঠিক সেটাই দেখেছি। খুব ভাল সম্পর্ক তোমাদের দু’জনের সেটা বুঝতে বাকি থাকেনি। তবে এখন ভেবে অবাক হচ্ছি আমাদের ক্লাসমেট দীপের এতটা উন্নতি কিকরে হল। কিন্তু তোমার স্ত্রী কি জানে তার সাথে তোমার এমন মধুর সম্পর্কের কথা”?​​আমি কয়েক সেকেণ্ড চুপ করে থেকে বললাম, “আমি আমার বৌয়ের কাছ থেকে কোন কথাই গোপন করি না। তার সামনেও আমরা এমন ভাবেই মেলামেশা করি। আসলে ওই যে উন্নতির কথা তুমি বলছ, সেটা সম্ভব হয়েছে কেবল আমার স্ত্রীর জন্যেই। আজও গৌহাটি পৌঁছেই সব কথা তাকে ফোন করে জানাব আমি। তোমার সাথে এভাবে দেখা হয়ে যাবার কথাটাও বলব তাকে”।​​শম্পা মুচকি হেসে বলল, “সত্যি তুমি ভাগ্যবান। এমন সুন্দর বৌয়ের সাথে সাথে এমন মিষ্টি শালী ক’জনের ভাগ্যে জোটে? কিন্তু তাই বলে খোলা জায়গায় অমন করতে তোমার একটুও দ্বিধা হল না? আমার মত আরো অনেকেই হয়তো দেখে থাকতে পারে”?​​আমি শান্ত স্বরে বললাম, “আসলে। ব্যাপারটা একটু অন্য রকম হয়ে দাঁড়িয়েছিল তখন। আমি চলে যাচ্ছি বলে ওর মনে আমার স্ত্রীর মতই কিছুটা ব্যথা তো ছিলই। কিন্তু তার সাথে সাথে ওদের আরেক বান্ধবীর একটা দুঃখের কথা বলতে বলতে ওর খুব মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। তাই আমার কাছে অমন দাবী করে বসলো ও। আর আমিও যাবার সময় ওকে কষ্ট দিয়ে যেতে চাইছিলাম না। তাই যে কেউ দেখে ফেলতে পারে, এ ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও শালীনতার মাত্রা ছাড়িয়ে অমনটা করতে হয়েছে আমায়। কিন্তু আমাদের দু’জনের মাঝে ওকে নিয়ে কোন সমস্যাই নেই। আর শুধু ও-ই নয়। ওদের আরো দু’ তিনজন বান্ধবী আছে, তাদের সাথেও আমার একই রকম মিষ্টি সম্পর্ক। আর আমার বৌও সবটাই জানে। সুতরাং ভেবো না যে আমি বৌকে ফাঁকি দিয়ে শালীদের সাথে অবৈধ প্রেম করে বেড়াচ্ছি”।​​শম্পা কয়েক সেকেণ্ড আমার মুখের দিকে চেয়ে বোধহয় বুঝবার চেষ্টা করল যে আমি কতখানি সত্যি কথা বলছি। তারপর আস্তে করে বলল, “যদিও অনধিকার চর্চার মত মনে হবে, তবুও বলছি, এমন কী হয়েছিল যাতে করে তোমাকে কার পার্কিংএর মত একটা প্রায় খোলা জায়গায় ও কাজ করতে হল”?​​আমি সরল মনে বললাম, “আরে কী বলছো তুমি শম্পা। আমরা তো একসাথে পড়া বন্ধু। বন্ধু বন্ধুর কাছে কিছু জানতে চাইতেই পারে। একে তুমি অনধিকার চর্চা বলছ কেন”? একটু থেমে আশেপাশের যাত্রীদের ওপর নজর বুলিয়ে বললাম, “ট্রেনের মধ্যে আপনজনদের জীবন নিয়ে আলোচনা করতে ভয় হয়। আশে পাশের লোকেরাও শুনে ফেলার সম্ভাবনা থাকে। তুমি একটু আমার দিকে ঘুরে বসবে প্লীজ। আমি নিচু গলায় কথাগুলো বলছি”।​​শম্পা একটু পাশ ফিরে আমার অনেকটা মুখোমুখি বসতেই আমি গলার স্বরটাকে আয়ত্তে রেখে বললাম, “আমার স্ত্রীর আরেক বান্ধবী, সৌমী। মেয়েটার বিয়ে হয়েছে বছর খানেক আগে। ভালো ছেলে দেখেই সম্মন্ধ করে ওর বাবা মা বিয়ে দিয়ে ছিলেন। আমরা তো পড়ে থাকতাম সেই মেঘালয়ে। তাই ওর বিয়ের পর ওর সাথে আমাদের যোগাযোগ প্রায় নেই-ই বলা যায়। আজ এই ষ্টেশনে আসতে আসতে বিদিশা, মানে যাকে তুমি আমার সাথে দেখেছ, সে জানাল ওই মেয়েটার জীবনটা বিয়ের পর সুখের হয় নি। বিয়ের ছ’মাসের মধ্যেই ও জানতে পারে যে ওর স্বামীর অনেক বদ অভ্যেস আছে। মদ আর মেয়ে মানুষ ছাড়া সে নাকি একটা দিনও থাকতে পারে না। তার স্ত্রী যথেষ্ট সুন্দরী হলেও বাইরের মেয়ে মানুষ নিয়েই নাকি তার দৈনন্দিন জীবন কাটে। এরা হচ্ছে আমার স্ত্রীর চার ছোটবেলার বান্ধবী। আমার বিয়ের সময় বাকি তিনজনেই তখন অবিবাহিতা ছিল। আমার বিয়ের আগেই, যখন মেয়ে দেখতে এসেছিলাম, তখন থেকেই এদের সবার সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল। এরা সবাই আমার স্ত্রীর মতই সরল এবং খোলামেলা স্বভাবের। আমার সাথেও বাকি তিনজনের খুবই আন্তরিক সম্পর্ক। এদের চার বান্ধবীদের মধ্যে অবশ্য শুধু বিদিশাই বিয়ে করেনি এখনও। বিদিশার মুখে ওর এসব কথা শুনে আমার মনটা সত্যি খুব ভারী হয়ে গিয়েছিল। বিদিশারও কান্না পেয়ে গিয়েছিল। আমি চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম ও একা একা ড্রাইভ করে ঠিকমত বাড়ি ফিরতে পারবে কি না। তখনই ও অমন বায়না ধরে বসল। তবে তুমি ভেবনা যে সঙ্গে আমার স্ত্রী ছিল না বলেই আমি অমনটা করেছিলাম। আমার স্ত্রী সঙ্গে থাকলেও আমি সেটা করতাম। কিন্তু স্ত্রী সঙ্গে ছিল না বলে আমি ওকে ফিরিয়ে দিতে পারিনি। আমার স্ত্রী থাকলে ও নিজেই আমাকে সেটা করতে বলত। কাল সারাটা দিন আমরা তিনজনে একসাথে কাটিয়েছি। আমিও সেটা না করলে সারাটা রাস্তা ধরে মনটা খচখচ করত আমার। তাই অমনটা করেছি”।​​আমি এইটুকু বলে থামতে শম্পাও বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর বলল, “সত্যি এমন কাছের কারুর জীবনে যদি এমন ঘটনা ঘটে সেটা বুকে বড় বেশী করে বাজে গো। আমি তো মেয়েটাকে চিনিই না, তবু তোমার মুখে একথা শুনে আমারও মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল দীপ। কিন্তু কী করবে বল, যার কপালে যা লিখে দিয়েছেন বিধাতা, সে আর কে খণ্ডাবে বলো? শুধু ঈশ্বরের কাছে মিনতি জানাই ওর দুঃখের দিন যেন খুব তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায়”।​​আমিও ভাঙা ভাঙা গলায় বললাম, “আমিও ঠিক এই কথাটাই বিদিশাকে বললাম। এর চেয়ে বেশী তো আর কিছু করার নেই আমাদের। তোমার মত অজানা অচেনা একটা মেয়ের শুভেচ্ছা যেন ওর কাছে গিয়ে পৌঁছয়”। একটু থেমে আমি আবার বললাম, “তোমার সাথে আজ যদি এখানে দেখা না হত তাহলে সারাটা রাস্তা সৌমীর কথা ভাবতে ভাবতেই ভারাক্রান্ত মন নিয়েই শিলং পর্যন্ত যেতে হত আমাকে”।​​শম্পা প্রসঙ্গ পাল্টে বলল, “তোমার বৌয়ের ছবি দেখে আর এমন মিষ্টি স্বভাবের কথা শুনে, আর সেই সঙ্গে তার বান্ধবীদের কথা শুনে তোমার বউকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে দীপ। আমার সাথে যোগাযোগ রাখবে? তোমার বউ ফিরে এলে আমি ওর সাথে দেখা করতে চাই। অবশ্য তোমার যদি আপত্তি না থাকে”।​​আমি চট করে বললাম, “আরে আপত্তির কথা উঠছে কোথায়? সতী নিজেও আমাকে অনেকদিন বলেছে যে আমার সঙ্গে পড়া মেয়েদেরকে দেখতে ওর খুব ইচ্ছে করে। কিন্তু তুমি তো জানোই বিণী বাদে আর কোন মেয়ের সাথেই আমার আলাপ ছিল না কলেজ জীবনে। বিণীরও বিয়ে হয়ে গেছে। ও এখন শুনেছি আগরতলায় আছে। আর তাছাড়া এতদিন বাদে কে কোথায় আছে সে তো আমার নিজেরই জানা নেই। তোমায় দেখে সতীও খুব খুশী হবে। কিন্তু এখন তো তোমাকে ও সতীকে দু’জনকেই মাস তিন চার অপেক্ষা করতেই হবে। সব কিছু ভালোয় ভালোয় মিটে গেলে ওকে নিয়ে আসবার সাথে সাথেই তোমাকে খবর দেব। তুমি তোমার কন্টাক্ট নাম্বার থাকলে আমাকে দিয়ে দাও এখুনি। আমি নোট করে নিচ্ছি। শিলঙে আমাদের বাড়িতে কোন টেলিফোন নিইনি। কারণ খুব বেশীদিন বোধহয় শিলঙে থাকাও হবে না। শুনতে পাচ্ছি খুব শিগগীরই নাকি আমার গৌহাটিতে ট্রান্সফার করার একটা সম্ভাবনা আছে। তাই ভেবেছি, মাস ছ’য়েকের মধ্যে আর ফোন কানেকশন নিচ্ছি না। তবে তোমাকে আমার অফিসের ফোন নাম্বারটা দিয়ে যাচ্ছি। অফিস টাইমে আমাকে সে নাম্বারে পাবে। অবশ্য যদি ছুটিতে না থাকি আর যদি অন্যত্র ট্রান্সফার না হয়ে যাই” বলে পকেট থেকে নোট বুক বের করে একটা কাগজে ফোন নাম্বার লিখে শম্পাকে দিয়ে, শম্পার বাড়ির ফোন নাম্বারটা নোট বুকে লিখে নিয়ে বললাম, “সত্যি, এতদিন বাদে তোমাকে দেখে আমার যে কী ভালো লাগছে, সে তোমায় আমি বলে বোঝাতে পারছি না শম্পা”। ​​আমি পরিপূর্ণ দৃষ্টি মেলে শম্পার দিকে দেখতে দেখতে বললাম, “এতক্ষণ শুধু আমার কথাই বলে গেলাম। এবার তোমার কথা কিছু বলো শুনি। যদিও তোমার মুখ দেখে বুঝতে পারছি তুমি বেশ সুখেই আছ। কিন্তু সবার আগে বলো, তুমি নিজের আগের চেহারার এমন আমূল পরিবর্তন কী করে করে ফেললে? আমি তো তোমাকে চিনতেই পারিনি। আর আমার বিশ্বাস আমার পুরোনো বন্ধুরা কেউই তোমাকে চিনতে পারবে না। কী করে সম্ভব করলে এমনটা”?​​শম্পা একটু হেসে বলল, “মানে তুমি বলতে চাইছো কালো কুৎসিত সেই রোগা পাতলা মেয়েটা যার দিকে কোন ছেলে তাকাতেও চাইত না, তার চেহারার এত পরিবর্তন কি করে হল, তাই না”?​​আমি একটু অপ্রস্তুত হয়ে আমতা আমতা করে বললাম, “না না, ছি ছি শম্পা। আমি কিন্তু সত্যি......”​​শম্পা আবার নিষ্পাপ হাসি হেসে বলল, “আরে এতে এত অপ্রস্তুত হবার কী আছে দীপ? এটাই তো সত্যি, তাই না? তখন আমার যে চেহারা ছিল তাতে নিজের প্রতি আমার নিজেরই বিতৃষ্ণা এসে গিয়েছিল। আমাদের ক্লাসে সবাই আমার চেয়ে সুন্দরী ছিল। আমি তো ছার, তুমি তো তাদের দিকেও তাকাতে না। কিন্তু আজ তুমি আমার পাশে বসে আছো, এটা ভেবেই ভগবানকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। এমন যে কোনদিন হতে পারে, এ তো স্বপ্নেও ভাবিনি আমি”। কিছুটা দম নিয়ে শম্পা আবার বলল, “শোনো, বলছি আমার রূপান্তরের গল্প। বিএসসি ফাইনাল দেবার পর বাবা মার সাথে ঘুরতে গিয়েছিলাম সিমলা। সেখানে গিয়ে বাবার এক দুর সম্পর্কের বোনের সাথে দেখা হয়। বাবার সাথে বহু বছর তার যোগাযোগ ছিল না। তিনি পেশায় একজন বিউটিসিয়ান ছিলেন। সিমলা থেকে যখন আমাদের ফিরে আসবার কথা, তখন পিসি নিজেই আগ্রহ করে বাবা মার সাথে পরামর্শ করে আমাকে রেখে দিলেন তার কাছে। পিসির খুব অন্তরঙ্গ এক ক্লায়েন্ট ছিল যিনি পেশায় ছিলেন এক জিম ইন্সট্রাক্টার। নিজের চিকিৎসার সাথে সাথে পিসি তার সেই জিম ইন্সট্রাক্টার বন্ধুর কাছেও আমাকে পাঠাতে শুরু করলেন। দিন পনেরো যেতে না যেতেই আমি নিজের মধ্যে পরিবর্তন দেখতে পেলাম। ছ’মাসেই তার পরিচর্যায় আর সিমলার আবহাওয়ায় আমার চেহারা আমূল বদলে গেল। ছ’মাস বাদে যখন বাড়ি ফিরে এলাম তখন বাবা মাও আমাকে চিনতে পারেনি”।​​এতটা বলে শম্পা থামল। তারপর সুন্দর করে হেসে বলল, “এই হল আমার কায়া পাল্টানোর গল্প। এর পর রমেণের প্রেমে পড়লাম”।​​এটুকু বলেই শম্পা বেশ শব্দ করে হেসে উঠল। আশে পাশের যাত্রীরাও শম্পার দিকে তাকাতে শম্পা নিজেকে সামলে নিয়ে হঠাৎ নিজের পার্স খুলে দুটো ক্যাডবেরির প্যাকেট বের করে একটা আমার হাতে দিয়ে বলল, “এটা ধরো। একটু পরে বলছি। সবার অ্যাটেনশন এখন এদিকে”।​​শম্পার হাত থেকে ক্যাডবেরি নিয়ে আমি মুখে পুরলাম। একটু বাদে নিজের ওপর থেকে অন্যান্য সহযাত্রীদের চোখ সরে যেতে শম্পা আবার বলতে লাগল, “যে মেয়েটার দিকে আগে কোন ছেলে দ্বিতীয় বার তাকিয়ে দেখত না, সিমলা থেকে ফেরার পর সে দেখতে পেলো চেনা অচেনা সবাই বার বার তার দিকে তাকাচ্ছে। যেখানেই গেছি সেখানেই দেখেছি ছোট বড় সব বয়সের পুরুষদের লালসার দৃষ্টি আমার সারা শরীরের ওপর ঘুরে বেড়াত। এক বছর আগেও যেসব ছেলেদের সামনে দিয়ে যাবার সময় তারা একনজর আমার দিকে দেখেই মুখ ঘুরিয়ে নিতো তারাই বছর ঘুরতে না ঘুরতেই পেছনে আমার অস্তিত্ব বুঝতে পেরে বার বার পেছন ফিরে আমার দিকে দেখতে শুরু করল। ব্যাপারটা আমি বেশ উপভোগ করছিলাম সেই দিনগুলোতে। অনেক ছেলেই আমাকে প্রেম নিবেদন করতে শুরু করল। কিন্তু আমার মনে যার ছবি এঁকে নিয়েছিলাম আরো অনেক আগে, জেগে ঘুমিয়ে যাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতাম তার আর দেখা পেলাম না। বিয়ের বয়স পেড়িয়ে যাচ্ছে দেখে বাবা মার পছন্দ করা রমেণের সাথেই গাঁটছড়া বাঁধলাম বছর পাঁচেক আগে। অবশ্য বিয়ে করার আগে বছর খানেক প্রেম করে নিয়েছি। ওর বোনের বিয়ে না দিয়ে নিজে বিয়ে করতে চায় নি। বিয়ের সময় রমেণ মেঘালয়েই ছিল। গৌহাটিতে বদলি হয়ে এসেছি বছর দুয়েক। লাচিত নগরে একটা ফ্ল্যাটও কিনেছি আমরা ছ’সাত মাস আগে। তারপর থেকে নিজের ফ্ল্যাটেই আছি স্বামীকে নিয়ে। মোটামুটি এই। আর ওহ, একটা পয়েন্ট বাকি রয়ে গেছে, তাই না? বাচ্চা নিতে চাইছি এখন আমরা দু’জনেই। কিন্তু এখনো কিছু হয় নি। আশায় আছি। ব্যস, আমার গল্প শেষ”।​​আমি এতক্ষণ মন দিয়ে শম্পার কথা শুনছিলাম। ও থামতেই বলে উঠলাম, “বাঃ, সত্যি শম্পা তোমার গল্প শুনে খুব ভাল লাগল” বলে মনে মনে আরো একটু কি ভেবে বললাম, “তবে শম্পা, তোমার ওই পিসি কিন্তু বলতে গেলে তোমার নবজন্ম দিয়েছেন”।​​শম্পা মিষ্টি হেসে বলল, “একেবারে সত্যি কথা বলেছো তুমি দীপ। তারপর থেকে ওই পিসিকে আমি মামনি বলে ডাকি”। মাথা নিচু করে কিছু সময় বাদে আবার বলল, “সে পিসিকে না পেলে আমার জীবনটা যে কোন পথে যেত, তা ভেবে এখন আমি শিউরে উঠি”।​​আমি খুব খুশী হয়ে বললাম, “পুরোনো বন্ধুরা কেউ ভাল আছে শুনলে নিজেরও সুখ হয়। ট্রেনে উঠে তোমাকে পেয়ে আর তোমার কথা শুনে আমার সত্যি খুব আনন্দ হচ্ছে। তোমার সাথে দেখা না হলে সারাটা রাস্তা আমাকে মন ভারী করে মুখ বুজে কাটাতে হত। কিন্তু শেষ একটা কথা যা আমার জানতে ইচ্ছে করছে সেটা তুমি উহ্যই রেখে গেছ। ব্যাপারটা একটু বেশী ব্যক্তিগত। তাই মুখ ফুটে তোমাকে জিজ্ঞেসও করতে পারছি না”।​​শম্পা তার সুন্দর ভ্রূ দুটো ওপরে উঠিয়ে বলল, “বারে, এত বছরে কত কীই তো হয়েছে জীবনে। তোমার কৌতুহল মেটাতে যেটুকু বলা দরকার ছিল তা তো প্রায় মোটামুটি সবই বললাম। তুমি এবারে ঠিক কোন কথাটা জানতে চাইছ বলো তো”?​​আমি একটু আমতা আমতা করে বললাম, “না মানে, আমি তো নিজে স্কুল বা কলেজ জীবনে কোন মেয়ের সাথে কথা বলতাম না। তোমার সাথেও তাই। আজ এতদিন পরে এমন এক বন্ধুর সাথে এই ট্রেনে বসে এমন অন্তরঙ্গ ভাবে গল্প করতে করতে আমি ভুলেই গিয়েছিলাম যে আমাদের মধ্যে সত্যি তেমন অন্তরঙ্গ সম্পর্ক তো সত্যিই নেই, যার সুবাদে আমি অমন ব্যক্তিগত ব্যাপারে তোমাকে প্রশ্ন করতে পারি। আই অ্যাম রিয়েলি সরি শম্পা। যাকগে, এসব ছেড়ে বল দেখি আমাদের ক্লাসের মেয়েরা আর কে কোথায় আছে? কারো সঙ্গে এখনো যোগাযোগ আছে তোমার”?​​শম্পা কয়েক সেকেণ্ড চুপ করে থেকে বলল, “যোগাযোগ সেভাবে কারুর সাথেই নেই। সবারই বিয়ে হয়ে গেছে। একমাত্র নিপুই আছে মেঘালয়ে। ও একটা স্কুলে চাকরি পেয়ে আরেক স্কুল টিচারকে বিয়ে করে ওখানেই আছে এখনো। শ্বশুর বাড়ি নর্থ বেঙ্গলে কোথাও। কিন্তু ওর বরও মেঘালয়ে আরেকটি স্কুলের টিচার। ওরা দু’জনেই একসাথেই আছে। এ ছাড়া আর কারুর খবর তেমন জানি না। আচ্ছা তোমার মমতার কথা মনে আছে দীপ”?​​আমি বললাম, “হ্যা হ্যা, মনে আছে। ও তো আমাদের সাইন্স সেকশনেই ছিল। মাধ্যমিকে মেঘালয়ের মধ্যে টপ ফাইভের মধ্যে ছিল। বেশ ছোটোখাটো ফর্সা মত ছিল মেয়েটা। তাই না”?​​শম্পা একটু অবাক হয়ে বলল, “আরে ! তোমার তো দেখছি বেশ মনে আছে ওর কথা। আমি তো ভাবতাম তুমি কোন মেয়ের সাথে কথা যেমন বলতে না তেমনি কারো দিকে চোখ তুলে তাকাতেও না”।​​আমি একটু হেসে বললাম, “তুমি যেমনটা ভাবছো তেমন কোনও ব্যাপার নয় শম্পা। আসলে ওর কথা মনে আছে একটা অন্য কারণে। তা ওর কথা ওঠালে কেন বল তো”?​​শম্পা ঠোঁট টিপে হেসে বলল, “বারে, তোমার সাথে পুরোনো বন্ধুদের কথা বলবো আর মমতার কথা উঠবে না, এ কি হতে পারে”?​​আমি অবাক হয়ে বললাম, “মানে”?​​শম্পা আগের মতই ঠোঁট টিপে টিপে বলল, “তুমি তো কারুর কোন খবর রাখতে না। কে তোমাকে পছন্দ করতো, কে তোমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতো। কিন্তু আজ দেখতে পাচ্ছি সে তোমার মনের এক কোণে ঠিক রয়ে গেছে”।​​আমি শম্পার কথা শুনে পুরোনো ঘটনা মনে করতে করতে বললাম, “আরে না শম্পা, তুমি ভুল ভাবছো। আমি বললাম না, ওকে মনে আছে আমার অন্য একটা কারনে। আচ্ছা শোনো বলছি। আমরা যখন প্রি-ইউনিভার্সিটি সেকেণ্ড ইয়ারে পড়তাম, তখন মমতা একদিন কেমিস্ট্রি ল্যাবরেটরিতে নিজের হাতের ওপর এসিড ফেলে দিয়েছিল। ব্যাপারটা খুবই সিরিয়াস ছিল। ওর হাতটা নষ্ট হয়ে যেতে পারত সেদিন। কিন্তু আমি ঠিক পাশের সীটেই থাকাতে আমার চোখে পড়ে গিয়েছিলো ঘটনাটা। সঙ্গে সঙ্গে আমি অ্যাল্কালাইন ট্রিট দিয়ে ওর হাতটাকে নষ্ট হওয়া থেকে বাঁচাতে পেরেছিলাম। এর পর আরেক বার সেকেণ্ড ইয়ারের প্রমোশনাল টেস্টের সময় আরেকদিন জুলোজি প্রাক্টিকাল টেস্টে কক্রোচের ডিসেক্সন করতে দিয়েছিল। মমতা ডিসেক্সন করতে পারছিল না। ওর আসলে ঘেন্না করছিল। কিন্তু প্র্যাক্টিকালে মার্ক্স না পেলে তখন ডিটেইনড করে দেওয়া হত। নিরূপায় হয়ে ও আমার কাছে সাহায্য চাইতে ইনভিজিলেটরের চোখ এড়িয়ে আমি নিজের ডিসেক্সনটা কমপ্লিট করে মমতার ট্রের সাথে আমার ট্রেটা বদলে দিয়ে নিজে আরেকবার ডিসেক্সন করে নিয়েছিলাম। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস তো তোমরা সবাই দেখতে পেয়েছ। মমতা ফাইনালে ফার্স্ট ডিভিশন পেয়ে বি এস সি তে প্রমোশন পেয়েছিল। আর আমি পরীক্ষায় ফেল করেছিলাম। আর তার পরের বছরই আমার কলেজে পড়া শেষ হয়ে গিয়েছিল। এখন তুমি বলো, কলেজের ওই ঘটণা কি আমি ভুলতে পারি”?​​এবারে শম্পা অবাক হয়ে বলল, “কী বলছ তুমি দীপ? তুমি যে ব্রিলিয়ান্ট ছিলে তা তো আমরা জানতামই। আমাদের সবার ধারণা ছিল সাইন্স সেকশনের তুমি, সুমন্ত আর মমতা তিনজনেই ফার্স্ট ডিভিশনে পাবে। তোমার রেজাল্ট খারাপ হওয়াতে আমরা সবাই খুব হতাশ হয়েছিলাম জানো? কিন্তু মমতাকে তুমি এভাবে হেল্প করেছিলে এ কথা আমরা কেউ শুনিনি। তুমি সত্যি বলছ দীপ”?​​আমি মুচকি হেসে বললাম, “ইয়ার্কি ঠাট্টার সময় ছাড়া আমি কখনো মিথ্যে কথা বলিনা শম্পা। আর এতো বছর বাদে মিথ্যে কথা বলে কার কী লাভ হবে বলো? মেয়েটা পড়াশোনায় খুব শার্প ছিল। পরে আসাম ইউনিভারসিটি থেকে ফিজিক্সে ফার্স্ট ক্লাস সেকেণ্ড হয়ে মাস্টার্স করেছে শুনেছিলাম। জানিনা তারপর ও কোথায় আছে কী করছে”।​​শম্পা বলল, “আমি ওর সম্পর্কে শেষ শুনেছিলাম, যখন ও মাস্টার্স করছিল তখন কোন এক অ্যাসামিজ ছেলের সাথে নাকি প্রেম করত। মাস্টার্স কমপ্লিট করার পর ওর আর কোনো খবর পাই নি। কিন্তু এটা কি তুমি জানতে যে মমতা তোমায় ভালোবাসতো”?​​আমি খুব অবাক হয়ে বললাম, “কী বলছো তুমি শম্পা! তুমি নিশ্চয়ই আমার সঙ্গে ঠাট্টা করছ। যে মেয়েটার সাথে ওই দু’দিন ছাড়া আমি আর কখনো কোথাও কথা পর্যন্ত বলিনি, সে আমাকে ভালোবাসতো? না না, এ হতেই পারে না”।​​শম্পা আমার কথা শুনে মুচকি মুচকি হাসতে হাসতে বলল, “আমি ঠাট্টা করছি না দীপ। আমি সিরিয়াসলি বলছি। তুমি না জানলেও ব্যাপারটা সত্যি। আর পরের কথাটা শুনে তুমি আরও অবাক হবে জানি”।​​আমি আবারও অবাক বিস্ময়ে চোখ প্রায় কপালে তুলে বললাম, “আর কী বলবে”?​​শম্পা গলাটা আরো নামিয়ে আমার কানের কাছে ঝুঁকে বলল, “তুমি যদি ওকে বিয়ে না-ও করতে তবু তোমার সাথে প্রেম করতে রাজি ছিল ও” বলে মুচকি মুচকি হাসতে লাগল।​​আমার তখন চোখের সামনে ভুত দেখার মত অবস্থা। অনেকক্ষণ বিস্ময়ে বোবা হয়ে থাকার পর বললাম, “ওহ মাই গড, এ আমি কী শুনছি? এ যে আমি স্বপ্নেও ভাবি নি”!​​শম্পা কৌতুহলী সুরে জিজ্ঞেস করল, “তুমি সত্যি এ’সব জানতে না? ও তোমাকে কোনদিন কিছু বলেনি দীপ”?​​আমার যেন অবাক হবার আর শেষ নেই। বললাম, “না তো! তোমাকে তো বললাম ওই কেমিস্ট্রি আর জুলোজি প্রাক্টিকালে ওই দু’বার ছাড়া ওর সাথে আমার আর কোনদিন কথা হয় নি। আর তুমি বলছ.....। উঃ আমি সত্যি ভাবতে পারছি না”।​​শম্পা এবারে খুব শান্ত গলায় বলল, “তুমি আর কবে কার খবর রাখতে? আগেই তো বললাম, শুধু মমতা কেন, আমাদের ক্লাসের অনেক মেয়েই তখন মনে মনে তোমাকে ভালোবাসতো। আমার কথা তো আগেই বললাম, স্কুল কলেজে পড়বার সময় কোন ছেলেই আমার দিকে তাকাত না। কিন্তু আমার মনেও একটা প্রশ্ন ছিল তখন থেকেই। তুমি মেয়েদেরকে সব সময় এড়িয়ে চলতে কেন। মেয়েদের প্রতি এমন উদাসীনতা সে সময় অন্য কোন ছেলের মধ্যে দেখিনি। আজ অবশ্য সে জবাব তোমার কাছে পেয়েছি। কিন্তু ষ্টেশনের বাইরে তোমাকে দেখেও যে চিনতে পারিনি তার একটা কারণ এটাও। আমি যে দীপকে জানতাম সে মেয়েদের কাছ থেকে সব সময় পঁচিশ গজ দুরে থাকত, আর এখানে সে কি না নিজের স্ত্রীর এক বান্ধবীকে ওভাবে অমন খোলা জায়গায়...। তাই তো একবার সন্দেহ হলেও মন থেকে সে সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিয়েছিলাম। তা সত্যি দীপ, আমার যেমন বাইরের রূপটা পালটে গেছে তেমনি তোমার ভেতরের স্বভাবটাও পুরোপুরি বদলে গেছে”।​​সারাটা পথ দুই পুরোনো বন্ধু মিলে বিভিন্ন ঘটনার স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে গৌহাটি গিয়ে যখন পৌছলাম রাত তখন সাড়ে নটা। ট্রেন সাড়ে তিন ঘন্টা লেটে পৌছেছে। ট্রেন ঠিক সময়ে এলে আমি শিলং পৌঁছে যেতে পারতাম রাত দশটার মধ্যে। কিন্তু তখন আর হোটেলে ওঠা ছাড়া আমার সামনে আর কোন উপায় ছিল না। অফিসের বেশ কয়েকজন কলিগের বাড়িতেও গিয়ে উঠতে পারতাম, কিন্তু এত রাতে হঠাৎ করে কারুর বাড়ি গিয়ে ওঠা মানে তাদেরকে বিব্রত করে তোলা। আমার সেটা ঠিক পছন্দ নয়। তাছাড়া আকাশ তখন মেঘলা, ঝিরিঝিরি বৃষ্টিও পড়ছিল তখন। এমনিতেই নভেম্বর মাস শেষের দিকে। তার ওপর অসময়ের বৃষ্টিতে ঠাণ্ডা আরও জাঁকিয়ে বসেছে।​
Parent