আউট অফ কলকাতা - অধ্যায় ২৪
পর্ব ২৪
টি সেন্টারে সেই এস্কেপ লিফ্ট এসে থামল অন্ধকার গহ্বরের মধ্যে। অন্ধকারটা এতটাই ঘন ছিল যে সব কিছুই যেন ফাঁকা বলে মনে হতে লাগলো ওদের | কে বা কারা তাদের জন্য সেখানে অপেক্ষা করছে সেটা না জানতে পেরে টর্চটা ভয়ে জ্বালতে পারল না রুদ্র |
"রু.....এইবার জ্বাল টর্চটা..."দীপা ফিসফিস করে বলে উঠল
"নাহ.....দাড়াও..আরও কিছুক্ষণ, অন্তত ৭৫% শিওর হতে দাও..দাড়াও" দীপাকে বলে উঠলো রুদ্র
অনেক্ষন অপেক্ষা করার পর শেষে রুদ্র খুব চকিতে টর্চটা এক মুহূর্তের জন্য জেলে আবার বন্ধ করে দিলো | তারপর আরও কিছুক্ষণ পর অবশেষে টর্চটা ওপরে মেলে ধরে জ্বলতেই তারা দেখতে পেলো যে তারা একটা টানেলের মধ্যে রয়েছে। টর্চটা নিচের দিকে নামিয়ে এনে আলোটা মাটিতে ফেলতেই কিছুটা দূরে রেল লাইন দেখতে পেল ওরা , তবে সেটা পুরোটাই পরিত্যক্ত | তিনজনে সেই টানেল অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে যেতে লাগলো তবে টর্চ বন্ধ করে | মাঝে মধ্যে সামনের পথটা দেখার জন্য এক মুহূর্তের জন্য টর্চটা ফ্ল্যাশ করে আবার এগিয়ে যেতে লাগলো ওরা | খালি পায়ে হাঁটার তাদের অভ্যাস ছিল কিন্তু এই অন্ধকারের মধ্যে কোথায় কিসের ওপর পা পড়ছিল তাদের অজানা ছিল | এইরকম হাটতে হাটতে অবশেষে তারা এসে একটা চৌমাথাতে পৌঁছল। রুদ্র টর্চের আলো জ্বালিয়ে প্রতিটা রাস্তার দিকে একবার একবার করে আলো ফেলতে লাগল |
"কোন দিকে?" ফিসফিস করে বলল দীপা।
"জানি না! জানলে এখানে এরকম দাঁড়িয়ে থাকতাম" বলে টর্চের আলোটা আবার জ্বালিয়ে রাস্তা গুলোর দিকে মেলে ধরল রুদ্র
"ওই....ওইটা কি....." বলে দীপা আঙ্গুল তুলে একদিকে ইশারা করল
"জানি না....তবে দেখে দরজার মতন মনে হচ্ছে..."
"চল...ওই দরজার কাছটায় চল, দেখি একবার,"
দূর থেকে দরজা মনে হলেও সামনে গিয়ে দরজার অস্তিত্ব দেখতে পেলো না ওরা | আরেকটু সামনে যেতেই একটা ছোট্ট ঘর দেখতে পেলো ওরা, নোংরা এবং সম্পূর্ণ খালি এককালে এর ঢোকার মুখে দরজা থাকলেও এখন শুধু দরজার ফ্রামটাই অবশিষ্ট | ভেতরে ঢুকে একটা কোনে গিয়ে টর্চটা জ্বালিয়ে দিলো রুদ্র | সারাদিনের সেই ভয়ানক মুহূর্তের পর এই ভাঙাচোরা ঘরটা তাদের অনেকটাই নিরাপদ মনে হল |
"এইটা হয়তো একসময় মেনটেনেন্স রুম ছিল....দেখ ওই ইলেকট্রিক প্যানেলটা..." বলে দেওয়ালের ওপর ভাঙা মরচে ধরা একটা প্যানেলের দিকে ইশারা করল দীপা
"তিস্তা...ঠিক আছে তো?" রুদ্র হঠাৎ প্রশ্ন করল
দীপা মাথা ঘুরিয়ে তিস্তার ক্ষতর জায়গাটা ভালো করে আবার চেক করে নিয়ে ওর পাল্স মেপে দেখল "হ্যাঁ....আপাতত রক্ত বেরোনো বন্ধ করতে পারলেও ওর ভেতরে আটকে থাকা গুলিটা বের করতে হবে আমাদের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব..."
"ঠিক আছে" বলে রুদ্র টর্চটা ঘুরিয়ে ঘরের এইদিক ঐদিক কাজে লাগানর মতন কিছু খুঁজতে লাগলো | টর্চের আলো হঠাৎ দীপার উপর পড়তেই তার অবস্থা দেখতে পেলো রুদ্র, তবে ভালো লাগার থেকে সম্ভবত খারাপই লাগলো ওর। দীপা উলঙ্গ তো ছিলই তাছাড়া তার শরীর জুড়ে লেগেছিল লাল রক্ত। কিছু কিছু জায়গায় রক্ত শুকিয়ে গিয়ে বাদামি রঙের মতন হয়ে গেছিলো আবার কিছু জায়গায় তখনও টকটকে লাল ছিল | আলোটা আরেকটু নিচে নামাতেই রুদ্র দেখল যে পাণ্ডে-জির ছাড়া কিছুটা বীর্য দীপার যোনির মুখ দিয়ে বেরিয়ে তার উরু বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল। দীপার ওই অবস্থা দেখে রুদ্রর খুবই কষ্ট হল আর সাথে সাথে নিজের পরনের কুর্তা শার্টটা খুলে ওর হাতে ধরিয়ে দিলো তবে প্যান্টটা খুলতে যেতেই দীপা ওকে বাধা দিলো।
"না...না," দীপা তাকে থামিয়ে বলে উঠলো। "তোর প্যান্ট আমার হবে না রু, ওটা অনেক লম্বা আর আমার পাছা দিয়ে ওটা ঢুকবে না, তবে তোর এই কুর্তা যথেষ্ট কাজ করে দেবে আমার জন্য, তুই একটু তিস্তাকে ধর সোনা..." বলে তিস্তাকে রুদ্রর কাছে দিয়ে হাতের কুর্তাটা নিজের মাথা দিয়ে গলিয়ে পরে নিলো দীপা | কুর্তাটা পড়লেও সেটা দিয়ে বেশি কিছু একটা কাজ হল না দীপার, কারণ তার পুরো পাছাটা তখনও বেরিয়ে রইলো।
"যাহ! পেছনটা বেরিয়ে রইলো যে...."
"অরে কিছু হবে না... এখানে তোমাকে দেখার মতো কেউ আছে বলও? তবে......এবার কি করবো আমরা ? মানে রাস্তা..."
"আমাকে একটু চিন্তা করতে দে দাঁড়া..." বলে গভীর ভাবে চিনতে করতে লাগলো দীপা
কিছুক্ষণ সেইরকম কেটে যাওয়ার পর হঠাৎ দীপা ঘুরে রুদ্রর দিকে তাকিয়ে বলল
"কোনও ধরণের ম্যাপ ছাড়া এই টানেল-গুলর মধ্য দিয়ে পথ খুঁজে পাওয়া ইস ইম্পসিবল.....আমাদের কাছে ইট ইস অসম্ভব সো"
"এই... কি বললে? ম্যাপ?? দাড়াও দাড়াও....আমার মন বলছে যে এই ব্যাগে আমি একটু আগেই একটা ম্যাপ দেখেছি আর তাছাড়া পাণ্ডে-জিরা যদি এত পরিকল্পনা করেই থাকেন তবে তিস্তা ম্যাপের ব্যাপারটা মিস করবে না...এই টর্চটা ধরো একটু " বলে রুদ্র আস্তে আস্তে ব্যাগের চেন খুলে এইদিক ঐদিক খুঁজতে লাগলো আর সত্যি একটা ম্যাপ বেরিয়ে পড়লো কিছুক্ষণের মধ্যে !
"তিস্তা ইস ব্রিলিয়ান্ট না...?"
"একদম...তবে এবার ম্যাপটা দেখা একবার....." দীপা বলে উঠলো
"এইতো....এই দ্যাখো" বলে দীপার সামনে ম্যাপটা মেলে ধরল রুদ্র "আমরা এই...এইখান দিয়ে এসেছি এতক্ষণ আর এই হল ওই সামনের জংশনটা মানে চৌরাস্তা আররররর......এইতো....এই বাঁ দিকের রাস্তাটা ধরে এগোলেই"
"চল..রাস্তা যখন পেয়ে গেছি তখন আর দেরি করা ঠিক হবে না" বলে তিনজনে আবার সেই ঘর থেকে বেরিয়ে সেই চৌরাস্তাতে এলো তারপর সেখান থেকে বাঁদিকের রাস্তা ধরে আস্তে আস্তে এগিয়ে যেতে লাগলো|
"টর্চটা বন্ধ করে দে....এখানে আর লাইন নেই...হাটতে তেমন অসুবিধে হবে না আর...." দীপা ফিসফিস করে বলে উঠল
ম্যাপটা অনুসরণ করতে করতে সেই পরিত্যক্ত অন্ধকার টানেলের মধ্যে দিয়ে ওরা খালি পায়ে হেটে চলল | অজ্ঞান অবস্থাতে থাকার জন্য তিস্তা নিজের শরীরে সব ভার দীপার ওপর ছেড়ে দিয়েছিলো | প্রায় ঘণ্টা দুই ওই ভাবে হাঁটার পর, তাদের নাকে একটা ভেজা স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ ভেসে আসতে লাগলো কিন্তু সেটা কিসের গন্ধ সেটা ওরা বুঝতে পারলো না | তবে আশ্চর্য ভাবে কিছুদূর চলার পর সেই গন্ধটা আস্তে আস্তে কমে যেতে লাগলো | রুদ্র টর্চটা জ্বালিয়ে চারিদিকে দিকে আলো ফেলতেই দেখতে পেলো যে ওপরের দেওয়াল গড়িয়ে জল পড়ছে |
"এটার মানে বুঝতে পারলে...?" ভেজা দেওয়ালের দিকে ইশারা করে রুদ্র প্রশ্ন করে উঠলো
"আমরা এতক্ষণে নদীটা পেরলাম..তাই তো ?"
"হ্যাঁ....আর আসা করি বেশি দূর যেতে হবে না আমাদের, চলো.."
তবে আরও কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার পরে ওদের যাওয়ার রাস্তা শেষ হয়ে গেল | দেখে ডেড-এন্ড মনে হলেও ওরা জানতো সেটার নিশ্চয়ই অন্য কোনও মানে আছে...হয়ত গুপ্তপথ আবার...
"কোন দিকে এবার রুদ্র...?"
"দাঁড়াও." বলে ম্যাপটার ওপর আলো ফেলে এইদিক ওদিক করে দেখতে লাগলো রুদ্র | তারপর আলোটা নিচে মাটির দিকে ধরতেই একটা ট্র্যাপ-ডোর দেখতে পেলো ওরা | রুদ্র নিজের মুখে করে টর্চটা ধরে দুহাতে দরজার হাতলটায় আস্তে করে চাপ দিতেই দরজা খুলে গেল | দরজা খুলতেই ওরা নিচের দিকে নেমে যাওয়ার সিঁড়ি দেখতে পেলো|
"আমাদের কাছে এছাড়া আর কোনও চয়েস নেই রুদ্র, এখন দিয়েই যেতে হবে আমাদের..." বলে আগেই তিস্তাকে নিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল দীপা
"আরে!..টর্চটা তো নাও...দেখতে..."
"লাগবেনা..আমার চোখ সয়ে গেছে.."
রুদ্র ভেতরে ঢুকে সেই ট্র্যাপ-ডোরটা বন্ধ করে দিয়ে দীপার পেছন পেছন যেতে লাগলো | টর্চের আলতা দীপার ওপরে পরতেই দীপার সেই কলসির মতন পাছা দেখতে পেল রুদ্র। সিঁড়িটা কিছুদূর ঐরকম সোজা হয়ে নিচে নেমে যেতে লাগলো তারপর হঠাৎ আবার ওপর দিকে উঠতে লাগলো | শেষমেশ একটা দরজার সামনে এসে পৌঁছল ওরা তবে সেই দরজাতে না ছিল কোনও ছিটকিনি না ছিল কোনও লক | রুদ্র টর্চটা বন্ধ করে দিয়ে আস্তে করে দরজা ঠেলতেই দরজাটা খুলে গেল আর বাইরের ঠাণ্ডা বাতাস এসে লাগলো তাদের শরীরে | অতক্ষণ সেই গুমোট অন্ধকার অবস্থায় থাকার পর সেই জলইও ঠাণ্ডা বাতাস অনুভব করে তাদের সারা শরীর জুড়িয়ে গেল |
দরজা দিয়ে বেরিয়েই প্রথম যে জিনিসটা তাদের চোখে পড়লো সেটা হল একটা পুরনো পরিত্যক্ত বাড়ি | এইদিক ঐদিক তাকাতে ওরা বুঝতে পারলো যে সেখানে সেই বাড়িটা ছাড়া আর কোনও কিছুর চিহ্ন ছিল না, আর তারপরই বুঝতে পারল যে সেইটাই পাণ্ডে-জির পুরনো সেফ হাউস | আস্তে আস্তে সেই বাড়ির দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে নিজের টর্চটা আবার একবার জ্বাললও রুদ্র |
"একি...কোনও লক নেই তো..তাহলে...?"
"এখানে লক করার প্রয়োজন হয়না রু, এই জায়গায় কে আসবে বলে তোর মনে হয় বলতো..?"
"কিন্তু রাস্তা দিয়ে লোকজন এলে..."
"এই রাস্তা দিয়ে লোকজন আর যাতায়াত করে না..ওই দ্যাখ" বলে দূরে ভাঙ্গা ফ্লাইওভারের দিকে ইশারা করল দীপা
রুদ্র আর দেরি না করে দরজাটা ঠেলা দিতেই একটা বিকট আওয়াজ করে খুলে গেল দরজাটা | বাড়িটার ভেতরটা সেই টানেলের মতন গুমোট অবস্থায় ছিল আর অনেকদিন যে কেউ সেখানে পা রাখেনি সেটাই তার প্রমাণ ছিল | রুদ্র দরজাটা বন্ধ করে তার সামনে একটা ভাঙা টেবিল টেনে চেপে দিলো | তিস্তাকে একটা ঘরে মধ্যে নিয়ে গিয়ে দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসিয়ে দিলো দীপা | আরেকবার তিস্তার পাল্সটা চেক করে নিজের মাথা নাড়ল দীপা তারপর সটান উঠে রুদ্রর কাছে গেল |
"না না....তুমি...তুমি কি করে করবে? তুমি তো আর ডাক্তার নয়..."
"তবুও....আমাদের চেষ্টা করতে হবে রুদ্র, নাহলে অনেক দেরি হয়ে যাবে...বোঝার চেষ্টা কর প্লিজ.."
"মানে তুমি বলতে চাইছ যে ওই সিনেমাতে যেমন দেখায় ঐরকম করবে তুমি? সুপ্ত প্রতিভা নাকি...তোমার ডাক্তারি করা...? "
"রুদ্র, ইয়ার্কি মারিস না, যেটা বুঝিস না সেটা নিয়ে কথা বলিস না | এটা একটা প্রাণের ব্যাপার সেটা বুঝতে পারছিস না তুই ?" শক্ত গলায় বলে উঠলো দীপা
"আমি ইয়ার্কি মারছিনা....তুমি তিস্তাকে যতটা ভালোবাসো আমি ঠিক ততটাই ভালোবাসি, তাই....."
"ওসব সেন্টিমেন্টের কথা রাখ এখন, তোকে আগে যেটা খুঁজতে বলেছি সেটা খোঁজ | ইটস ভেরি ইম্পরট্যান্ট রুদ্র নাহলে...."
"নাহলে কি মারা..."
"এইবার কিন্তু আমার হাত চলবে রুদ্র...আর সেটা আমি একদমই করতে চাইনা...তিস্তার জন্য...প্লিজ রু..."
রুদ্র সেই উভয়সঙ্কটের মুহূর্তে এসে কিছুক্ষণ চুপ করে ভাবে তারপর অবশেষে দীপার কথা মেনে নিলো আর সেই সব জিনিসগুলো খুঁজতে লাগলো | অবশেষে একটা রাফ সার্জারি করার সব জিনিসপত্র জোগাড় করে ফেললো ওরা |
"নে এবার ওর ওই উন্ডটার ওপরে লাগানো কাপড়টা কেটে দে" রুদ্র একটা ভাঙা কচি দিয়ে কোনও মতে সেই কাপড়ের টুকরোটা কেটে আস্তে আস্তে সরিয়ে দিতেই ওদের সামনে তিস্তার ক্ষতটা ফুটে উঠলো | ইসসস কত নৃশংস ভাবেই না ওকে গুলি করেছে ওই গুণ্ডাটা |
"ঠিক আছে, এবার ওকে জাগাতে হবে...দাঁড়া.....তিস্তা...এই...তিস্তা, তিস্তা ওঠো" দীপা একবার বলে কোন সারা না পাওয়ায় তারপর আবার একবার ডাকল | এই রকম অনেক্ষন ধরে ওকে ঝাঁকিয়েও কোনও ফল না মেলায় দীপা ওর চোখে মুখে জলের ঝাপটা দিতে বলল রুদ্রকে | রুদ্র সামনের টেবিলের ওপর রাখা নোংরা বোতল থেকে হাতে জল নিয়ে ঝাপটা দিতেই, তিস্তা নিজের চোখ খুলল | তার শরীর থেকে অনেকটা রক্ত বেরিয়ে যাওয়ার ফলে সে খুবই দুর্বল হয়ে গেছিল , এতোটাই দুর্বল যে নিজের চোখের পাতা অব্দই খুলে রাখতে পারছিল না সে |
"তিস্তা?...অ্যাই তিস্তা...আমাদের কে চিনতে পারছ তো..এই তিস্তা..." কোনও উত্তর না দিয়ে কোনও রকমে ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো তিস্তা |
"ও...কথা বলছে না কেন?" রুদ্র কাঁদো কাঁদো গলায় বলে উঠল
"এই তিস্তা....তুমি ওকে চেনও না? ওর নাম জানো না তুমি?" রুদ্রর দিকে ইশারা করে প্রশ্ন করলো দীপা
তিস্তা কিছুক্ষণ রুদ্রর দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ একটা অস্ফুট স্বরে বলে উঠল "রু..."
"হ্যাঁ....আর..আর আমাকে ? আমার নাম কি?"
"দীপ...পা" আবার হালকা অস্ফুট স্বর ভেসে এলো তিস্তার গলা দিয়ে
"এইতো সোনা..কিচ্ছু হয়নি তোমার কিন্তু তিস্তা..." বলে তিস্তার মাথায় হাত রাখল দীপা "উই নিড টু অপারেট অন ইউ, তোমার কাঁধ থেকে ওই গুলিটা বার করতে হবে"
কোনও কথা না বলে নিজের মাথাটা নাড়াল তিস্তা তারপর হঠাৎ রুদ্রর দিকে তাকিয়ে ওকে কাছে আসতে বলল | রুদ্র কাছে আসতেই তিস্তা নিজের হাত দিয়ে রুদ্রর হাতটাকে শক্ত করে চেপে ধরল |
"আমি এখানেই আছি তিস্তা....আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাচ্ছি না..." বলে তিস্তার সামনে বসলো রুদ্র
ঘর থেকে খুঁজে পাওয়া লাইটারটা জ্বালিয়ে তার ওপর একটা ছুড়ি ধরল দীপা, ওটাকে স্টেরাইল করার জন্য| রুদ্র এক হাতে টর্চটাকে আর আরেক হাতে তিস্তার হাত শক্ত করে চেপে ধরল | ছুড়িটা স্টেরাইল করা হয়ে গেলে দীপা তার ওপর একটা ভাঙা চিমটে গরম করতে লাগলো | তারপর একটা কাপড়ের টুকরোকে অল্প জলে ভিজিয়ে ওর ক্ষতর জায়গাটা পরিষ্কার করে দিলো |
"তিস্তা, আই হোপ ইউ আর রেডি...খুব লাগবে সোনা, খুব কিন্তু যতই লাগুক প্লিজ চেঁচাস না | চেঁচালে সব কিছু বিগড়ে যাবে আমাদের" এই বলে তিস্তার গালে হাত বোলাল দীপা | "রেডি?"
"হুম" তিস্তার এতক্ষণে এই প্রথম শক্ত ভাবে বলে উঠলো তিস্তা তবে তার কথা শেষ হতে না হতেই সেই ক্ষতর জায়গাতে অপারেট করতে আরম্ভ করল দীপা | যতই দীপা গভীরে যেতে লাগলো ততই তিস্তা রুদ্রর হাতটা জোরে চেপে ধরতে লাগলো | ব্যথায় যন্ত্রণায় তিস্তার চোখ দিয়ে জল বেরোতে থাকলেও একটা টু শব্দ বের করল না মুখ দিয়ে ।।
"আরও একটু কাটতে হবে" বলে ছুড়িটা দিয়ে ওই ক্ষতর মুখটা আরও কিছুটা কেটে দিলো দীপা আর সাথে সাথে সেই নতুন ক্ষত দিয়ে টকটকে লাল রক্তর ধারা গড়িয়ে পড়তে লাগলো ।
"এ তুমি করছ বলতো, মেরে দেবে নাকি ওকে" রুদ্র রাগে চেঁচিয়ে উঠলেও, ওর কথায় কোনও সারা দিলো না দীপা | ক্ষতর মুখটা হাঁ করিয়ে চিমটেটাকে আবার গরম করে সেই ক্ষতর মধ্যে ঢুকিয়ে দিলো দীপা | তিস্তার ব্যথায় চেঁচাতে না পেরে রুদ্রর হাত ধরে ছটফট করতে লাগলো আর তার সেই করুন অবস্থা দেখে রুদ্রর নিজের চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে এলো | অনেক্ষন পর অবশেষে তিস্তার ক্ষত থেকে গুলিটা বার করতে সক্ষম হল দীপা তবে তিস্তা তখন প্রায় অজ্ঞান অবস্থাতে বসে | দীপা আবার ওই জায়গাটা ভাল করে মুছিয়ে দিলো ।
"এইবার..এইবার কটারাইস করতে হবে ওই জায়গাটা"
"মানে....?"
"মানে ওর ক্ষতটার মুখটা বন্ধ করতে হবে যাতে না ইনফেকশন হয়"
"কি..কি করে করবে তুমি...ওটা?" ভয়ার্ত কণ্ঠে দীপাকে প্রশ্ন করল রুদ্র যদিও সে জানত যে কোন ভালো কিছু উত্তর পাবেনা দীপার কাছ থেকে....
"পুড়িয়ে"
"মানে??"
"পুড়িয়ে...বার্ন..." ঠাণ্ডা ভাবে বলে উঠল দীপা
"না না একদম না, আর না....আর ওকে কত কষ্ট দেবে না তুমি.."
"আমারও ওকে এই অবস্থাতে দেখতে একদম ভাল লাগছে না কিন্তু কটারাইস না করলে ওই জায়গা থেকে ইনফেকশন হয়ে ও মরেও যেতে পারে, সেটা নিশ্চয়ই তুই চাস না বল? " দীপা চেঁচিয়ে বলল
"না...চাইনা..কিন্তু আমি..."
"ব্যাস তাহলে চুপ...একদম চুপ" বলে রুদ্রকে থামিয়ে দিলো দীপা | তারপর নিজের হাতের ছুরিটা এলকোহল দিয়ে ধুয়ে আবার লাইটারের ওপরে ধরল গরম করার জন্য তবে এবারে আরও একটু বেশিক্ষণের জন্য | ছুড়িটা গরম হতে হতে একদম আগুনের মতন লাল হয়ে জ্বলতে লাগলো |
"এইবার আগের থেকেও বেশি কষ্ট হবে তিস্তা, কিন্তু আমার কিচ্ছু করার নেই সোনা..." বলে গরম ছুড়িটা ক্ষতর কাটা জায়গার ওপর চেপে ধরল দীপা | ছুরিটা সেখানে লাগতেই "ফোঁসসস" করে একটা বিশ্রী আওয়াজ করে উঠলো আর সাথে সাথে যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে তিস্তা চেঁচিয়ে উঠল | তবে দীপা একদম প্রস্তুত ছিল সেই ব্যাপারে, তিস্তা চেঁচিয়ে উঠতেই ও সাথে সাথে নিজের হাত দিয়ে ওর মুখটা চেপে ধরল | সেই দারুণ ব্যথায় যন্ত্রণায় তিস্তা আবার আগের মতন অচৈতন্য হয়ে গিয়ে রুদ্রর কাঁধে এলিয়ে পড়লো আর আবার সব কিছু আগের মতন নিস্তব্ধ হয়ে গেল |
ভয় আর উত্তেজনায় তিন জন্যেই একদম ঘেমে স্নান করে গেছিলো আর তার ওপর সেই বাড়িতেও কোনও ইলেক্ট্রিসিটির লাইন ছিল না | দীপা তিস্তার ক্ষতটাকে ভালো ভাবে পরীক্ষা করে যখন সন্তুষ্ট হল তখন ঘড়িতে বাজে ১টা | রুদ্র তখনও তিস্তার হাতটা চেপে ধরে ছিল, তারপর কিছুক্ষণ বাদে নিজের মাথাটা তিস্তার মাথার উপর এলিয়ে দিয়ে চোখ বুঝে বসলো |
দীপা আস্তে আস্তে মেঝের ওপর থেকে উঠে টর্চটা নিয়ে বাথরুমের দিকে গেল | বাড়ির প্রতিটা কোন নোংরা জঞ্জালে ভর্তি ছিল তাই খুব সাবধানে এগতে হচ্ছিলো তাকে | হঠাৎ নাকে একটা ভোঁটকা পচা গন্ধ আস্তেই দীপা নিজের নাক হাতে করে চাপা দিল | বাথরুমে ঢুকে নিজের কুর্তাটা খুলে কমোডের ওপর বসতে যেতেই সেই গন্ধের উৎস খুঁজে পেলো দীপা | কমোডের কালো জলের মধ্যে একটা ইঁদুর মোড়ে পোঁচে ভাসছিল তবে সেটা তার কাছে কিছু নতুন নয় | বস্তি বাড়িতে থাকা কালীন ওকে আর রুদ্রকে এরকম অনেক কিছুই দেখতে হয়েছিল যা দেখলে সাধারণ মানুষের অন্নপ্রাশনের ভাত উঠে আসতো | নিজের ঘেন্নাটেন্নার সব জলাঞ্জলি আগেই দিয়ে দিয়েছিলো দীপা তাই আর দেরি না করে কমোডের মধ্যে থেকে ইঁদুরটার লেজটা ধরে ওপরে তুলে বাইরে জানালা দিয়ে ফেলে দিলো | তারপর নিজের হাতটা সেই কুর্তাতে মুছে কমোডে বসে পেছাব করতে আরম্ভ করল | সামনের কলের পেঁচটা আস্তে করে ঘোরাতেই প্রথমে একটা সাঁইসাঁই আওয়াজ হল তারপর ভগ ভগ করে কালো রঙের জল বেরোতে লাগলো | কিছুক্ষণ ঐরকম জলটা ছেড়ে দেওয়ার পর পরিষ্কার জল বেরতে লাগল। দীপা সেই কলের নিচে বসে নিজের সারা শরীর থেকে রক্তের সমস্ত চিহ্ন ধুয়ে মুছে ফেলল তারপর উঠে কুর্তাতে নিজের গা হাত মুছে বাথরুম থেকে বেরোল দীপা |
সামনের ছোট জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকাতেই দূরে...অনেক দূরে কয়েকটা উঁচু উঁচু বিল্ডিঙে আলো জ্বলতে দেখল দীপা | সেইরকমই একটা বহুতলে আজকে তাদের সঙ্গে এমন কিছু ঘোটে ছিল যেটা সে হয়তো কোনোদিনই ভুলতে পারবে না আর | হাল্কা হাল্কা ঠাণ্ডা বাতাস সেই জানালার দিয়ে দীপার নগ্ন শরীরকে স্পর্শ করতে লাগল আর সেই বাতাসে দীপার শরীর ভেসে যেতে লাগলো | সারাদিনে এতক্ষণে ওর মনটা একটু শান্ত হল | পা টিপে টিপে রুদ্রদের ঘরের সামনে যেতেই বুঝতে পারলো যে বাকি দুজন নিদ্রায় মগ্ন হয়ে গেছিল |
আস্তে আস্তে সেই ঘরের মধ্যে ঢুকে তিস্তার পাশে দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসলো দীপা | ওদের দুজনকে শান্তিতে ঘুমোতে দেখে ওর মনটা একটা ভীষণ তৃপ্তিতে ভোরে গেল |
"অনেক কষ্ট দিয়ে ফেললাম আজকে তোকে" বলে তিস্তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো দীপা | বসে থাকতে থাকতে নিজের অজান্তে কখন যে ও ঘুমিয়ে পড়লো সেটা নিজেই বুঝতে পারলো না দীপা |