আউট অফ কলকাতা - অধ্যায় ৩৫

🔗 Original Chapter Link: https://xforum.live/threads/আউট-অফ-কলকাতা.42012/post-3040078

🕰️ Posted on Mon May 31 2021 by ✍️ Anuradha Sinha Roy (Profile)

🏷️ Tags:
📖 2898 words / 13 min read

Parent
পর্ব ৩৫​ "আর? আর কি লাগবে..? " বিছানার এক পাশ থেকে প্রশ্ন করে উঠল রুদ্র​ "একটা ছোড়া বা কাটারি জাতিও কিছু একটা..."​ "ছোড়া? এইতো আমার কাছে আছে...." বলে সাথে সাথে ব্যাগ-পাকের ভেতর থেকে নিজের কোমরের বেল্টটা বার করল তিস্তা | তারপর সেই বেল্টের পিছনদিক থেকে ওর সেই ছোড়াটা বের করে দীপার সামনে তুলে ধরল | ​ "হমম...এমনি ঠিকই আছে, কিন্তু আমাদের এর থেকেও বড়ো কিছু একটা লাগবে | মানে বুঝতেই তো পারছিস আমাদের বোন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যেতে হবে আর সামনের রাস্তা ক্লিয়ার করার জন্য একটা ধারাল কিছু একটা দরকার..." দীপা বলে উঠল ​ "হ্যাঁ...সেটা তো বুঝেছি কিন্তু জায়গাটার ব্যাপারে আমরা এখনও কিন্তু ঠিক করে ফিগার আউট করে পারিনি...মানে জায়গাটা কোথায়? সেখানে যাওয়ার রাস্তা জানলেও সেটা ঠিক করে পিন পয়েন্ট না করে সেখানে যাওয়া বেশ বিপদ জনক..." বলে এক মুহূর্ত থামল রুদ্র ," আমি বলি কিনা, যে এখানে আরও কিছুদিন থেকে সেই জায়গার ব্যাপারে আর সেটার এক্স্যাক্ট লোকেশন বার করে তারপর সেইদিকে যাই..." ​ "দেখ রু...প্রথমত এইখানে বসে থেকে আমরা কিছু করতে পারবো না | সেকেন্ডলী আমাদের ট্রায়েল এন্ড এরর মেথড ফলো করতে হবে নাহলে সেই জায়গা কোনোদিনই খুঁজে বের করতে পারবো না আমরা, তাছাড়া তোর কাছে তো সব কিছুই ওই ফোনে তোলা রয়েছে,তাহলে ? তাহলে কিসের এত ভয় " ​ "ভয় নয় নিজেদের সেফটির জন্য বলছে...তবে আমাদের যে কতদূর হেটে যেতে হবে সেটা এখনও ঠিক করে বুঝতে পারছিনা আমি | তবে...তবে আমি ভাবছিলাম যে যদি লেক দিয়ে আমরা ঢোকার চেষ্টা করি তাহলে কেমন হয়... মানে একটা নৌকা করে..." রুদ্র বলে উঠল | ​ "নৌকা..? নৌকা কোথা থেকে পাবি তুই? আর লেক দিয়ে যাওয়াটা কি নিরাপদ হবে রু ? তোর কি মনে হয় যে লেক দিয়ে গেলেই সেই জায়গাটা চোখে পরে যাবে আমাদের? খুঁজে পেয়ে যাবি ওই গাছ পালার মধ্যে? আর তার ওপর লোকেরা ওইখানে সব মাছ ধরতে যায়, তাই নাকি?" একটা পর একটা যুক্তি লাগিয়ে প্রশ্ন করে গেল দীপা | ​ "নাহ! এখন সেখানে আর কেউ মাছ ধরতে যায়না...দীপা " হঠাৎ করে চতুর্থ ব্যক্তির কণ্ঠস্বর পেয়ে সেই আওয়াজ লক্ষ্য করে সেই উদ্দেশ্যে তাকাতেই ডাক্তার-কাকুকে তাদের ঘরের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল ওরা | উনি যে একটু আগেই এসেছেন সেটা তার হাঁপানি দেখেই বোঝা যাচ্ছিল | তাকে সেইরকম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে দেখে দীপা এক লাফে বিছানা থেকে নেমে বলে উঠল : ​ "একি?..একি ডাক্তার -কাকু আপনি, বাইরে দাঁড়িয়ে কেন? ভেতরে আসুন...এখানে আসুন না...বসুন না আমাদের সাথে..."​ "হ্যাঁ ডাক্তার-কাকু, এসো না ভেতরে...তোমারি তো বাড়ি" বলে তিস্তার দিকে তাকিয়ে হাসল রুদ্র ​ দীপাকে উঠতে দেখে ডাক্তার-কাকু সাথে সাথে বলে উঠলেন , " আরে! না...না...একদম, একদম ব্যস্ত হোশ না তোরা | তোরা সবাই নিজেদের এই কাজের কথা আলোচনা করছিস আর তার মধ্যে আমি থেকে কি করব বলত? আমি...আমি এসেছিলাম তোদের বলতে যে রাতের খাবারটা রেডি হয় গেছে আর কাল সকালে তোরা তাড়াতাড়ি বেরবি তাই তাড়াতাড়ি খেয়ে নেওয়াটাই বেটার হবে"​ "একদম! আমরা...এক্ষুনি যাচ্ছি" দীপা বলে উঠল, তারপর হঠাৎ সেই কোথা মনে পড়তেই আবার বলল "তবে ডাক্তার-কাকু, আপনি ওই লেকের ব্যাপারে কি যেন একটা বলছিলেন..." ​ দীপার কথা শুনে ডাক্তার-কাকু ঘরের দোরগোড়া থেকে ভেতরে ঢুকে এলেন | তারপর আস্তে আস্তে ওদের বিছানার সামনে এসে ওদের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন "হ্যাঁ, ওই লেকে এখন আর তেমন কেউ মাছ ধরতে যায়না, তার কারণ লেকের ডান পাশটা মানে পূর্ব দিকটা পুরোটাই নষ্ট হয় গেছে | নষ্ট হয়ে গেছে বলা ভুল হবে, বরঞ্চ নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে বোমা ফেলে ফেলে আর তার ওপর জলেরও স্তর বেড়ে যাওয়াতে আরই কেউ ওই দিকে মাছ ধরতে যায়না..." ​ "তাহলে ব্যাপারটা আরও শক্ত হয়ে গেল আমাদের জন্য, তাইতো...?" পাশ থেকে রুদ্র বলে উঠল ​ "হমম...আরও শক্ত " ​ ওদের চিন্তিত চিত্ত দেখে ডাক্তার-কাকু বলে উঠলেন "এই....বাচ্চারা, আমি নিচে যাচ্ছি | খাবারটা ঠাণ্ডা হয়ে গেলে খেতে ভালো লাগবেনা কিন্তু তাই আর দেরি না করে চলে আয়, ঠিক আছে? খালি পেটে কিন্তু চিন্তা ভাবনা করে কোথাও পৌঁছতে পারবিনা , হে..হে..হে"​ বলে বিছানা থেকে নেমে আস্তে আস্তে ওদের ঘর থেকে চলে গেলেন ডাক্তার-কাকু | দীপাকে ওনাকে চলে যেতে দেখেই রুদ্রর দিকে ঘুরে প্রশ্ন করল : ​ "আর গাড়িতে ঠিকঠাক তেল আছে তো..?"​ "হ্যাঁ কালকের জন্য যথেষ্ট আছে আর সেরকম বুঝলে ডাক্তার - কাকুর কাছ থেকে কিছুটা চেয়ে নেবো..." রুদ্র বলে উঠল ​ "আর খাবার জিনিস পত্র? জল? খাবারের পরিমাণ কম হলেও জল ইস মাস্ট | জঙ্গলের মধ্যে কিন্তু ডিহাইড্রেট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা সব থেকে বেশি আর তার ওপর এখন শীতকাল তাই নিজেদের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণে জল রাখা খুবই দরকার" তিস্তা বলে উঠল ​ "হ্যাঁ...ওসব ঠিক ঠাক নিয়ে নিয়েছি আমি, আমার কাছে দুটো আর তোদের কাছে একটা একটা করে বোতল থাকবে..তাই আশা করি বেশি অসুবিধে হবেনা..."​ "পরে ভারী হয়ে যাবেনা তো...?" রুদ্র বলে উঠল ​ "জল তো খেতে খেতে ফুরবে তাহলে ভারী কি করে হবে? আর তোদের ওই প্লাস্টিকের বড়ো প্যাকেটগুলো নিতে বলেছিলাম সেগুলো নিয়েছিস...?" দীপা প্রশ্ন করে উঠল ​ "হ্যাঁ হ্যাঁ প্লাস্টিকের ব্যাগ নিয়ে নিয়েছি আর ফোনেও চার্জ দিয়ে নিয়েছি...."​ "তাহলে কালকে, আমাদের শেষ অভিযানের জন্য সব কিছু রেডি তো ? " তিস্তা বলে উঠল ​ "হ্যাঁ এজ অফ নাও, তবে জানি না কাল কি হতে চলেছে আমাদের সাথে তবুও সব কিছুর জন্যই আমি রেডি..." শক্ত গলায় বলে উঠল দীপা ​ "আমরাও" রুদ্র আর তিস্তা একজোট হয়ে বলে উঠল ​ রাত্রের খাবারের কথা ডাক্তার-কাকু আগেই বলে গিয়েছিলেন তাই আর বেশি দেরি না করে ওরা সবাই নিচে নেমে এলো | রকমারি খাবার না হলেও রান্না খুবই ভালো করতেন ডাক্তার-কাকু | রান্না করে করে ওনার রান্নার হাতটা এতটাই ভালো হয়ে গেছিলো যে ওদের মনে হল যেন চাটতে চাটতে প্লেটটাই খেয়ে ফেলবে ওরা | ডাইনিং টেবিলে বসে ওরা চারজনে ভালোই গল্পগুজব করতে করতে নিজেদের সুস্বাদু খাবার উপভোগ করছিল এমন সময় হঠাৎ খেতে খেতে নিজের জায়গা থেকে উঠে পড়ল দীপা | দীপাকে ওরকম আচমকা উঠে পড়তে দেখেই ডাক্তার-কাকু অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন : ​ "কি হল দীপা? উঠে পড়লি যে? ভালো লাগছে না খাবার? " ​ ডাক্তার-কাকুর কথা শুনে তার দিকে তাকিয়ে দীপা বলল "আমি...আমি একটু আসছি কাকু...আমার একটা কাজ আছে" বলে ওখান থেকে দৌড়ে বেরিয়ে গেল দীপা ​ "এ মা..কি হল? ওই রকম দৌড়ে চলে গেল কেন দীপা দি? কি এমন জরুরি কাজ আছে ? " তিস্তা বলে উঠল |​ "হ্যাঁ...তাই তো, খেতে খেতে ওই রকম কে উঠে যায়....? " ডাইনিঙের দরজার দিকে তাকিয়ে রুদ্র বলে উঠল | ​ "দাঁড়া...দাঁড়া, আমি গিয়ে দেখছি..." বলে চেয়ার থেকে উঠে দীপাকে খুঁজতে গেলেন ডাক্তার-কাকু | ​"কি হল মেয়েটার আবার? এমন কি কাজ আছে যেটা এক্ষুনি করার দরকার হল..." নিজের মনে গজগজ করে বলে উঠলেন ডাক্তার-কাকু, তবে তাকে খুঁজতে বেশি দূর যেতে হল না ওনাকে | ওপরে দুতলায় যাওয়ার সিঁড়ির পাশে যে বাথরুম ছিল তারই দরজার সামনে উনি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন দীপাকে | আস্তে আস্তে তার কাছে গিয়ে তার মাথায় নিজের হাতটা রেখে জিজ্ঞেস করলেন : ​ "কিরে দীপা, কি হল...? শরীর খারাপ লাগছে নাকি?" ​ ডাক্তার-কাকুর কথা শুনে দীপা বকে উঠল "না..না..ডাক্তার-কাকু তেমন কিছুই নয়, আসলে পেটটা গুলিয়ে গেছিল...মানে বুঝতেই তো পারছেন, আজকে সারাদিন বাড়ির বাইরে এইদিক ওইদিক করতে হয়েছে..."​ "হ্যাঁ..সে আর বলতে" বলে দীপার চোখের পাতার তলাটা টিপে তারপর ওর কব্জি ধরে পালস দেখলেন ডাক্তার-কাকু "পেটে-ফেটে মোচড় দিচ্ছে না তো? বাইরে কিছু খেয়েছিলি নাকি আজকে?"​ "না..না আমরা কিছুই খাইনি আজকে...."​ "আচ্ছা আচ্ছা বুঝেছি, তবে এখন ডাইনিং রুমে চল..." ​ "কিন্তু আমার আর কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না, ডাক্তার-কাকু..." দীপা বলে উঠল ​ "সে তো জানি, তোকে কিচ্ছু খেতে হবেনা চল | তুই শুধু ওখানে গিয়ে বস, নাহলে ওরা আবার চিন্তা করবে" ডাক্তার-কাকুর মুখে সেই কথা শুনে আস্তে আস্তে আবার সেই ডাইনিং রুমে ফিরে গেল দীপা | তাকে দরজা দিয়ে ডাইনিঙের ভেতরে ঢুকতে দেখেই তিস্তা প্রশ্ন করে উঠল : ​ "কি? কি হয়েছে দীপা দির, ডাক্তার-কাকু ?" ​ "আরে না....তেমন কিছুই না, এমনি সারাদিনের ধকল আর অনিয়মের করে খাবার জন্য অ্যাসিড হয়ে গেছে, তবে চিন্তার কোনও কারণ নেই" বলে ডাইনিং টেবিলের পাশের আলমারির ড্রয়ার খুলে একটা ট্যাবলেটের স্ট্রিপ বার করেন ডাক্তার-কাকু, তারপর ,"এইনে...এইটা খেয়ে নে..." বলে সেই অ্যাসিডের ট্যাবলেটটা ধরিয়ে দিলেন দীপার হাতে | দীপা নিজের মুখে একটু খানি জল নিয়ে সেই ট্যাবলেটটা খেতেই কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার আগের মতন সুস্থ বোধ করতে লাগল | তবে তাকে না খেতে দেখেই রুদ্র বলে উঠল : ​ "এই তুমি আর খাবে না?"​ "না, আমার আর খেতে ইচ্ছে করছে না...."​ "ওহ! তাহলে আমি খেয়ে নেবো..তোমার খাবারটা" দীপার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল রুদ্র | ​ "হ্যাঁ...কিন্তু তুই পারবি...?" ​ "হমম..."​ পরের দিন তাদের কে অনেক সকালে উঠতে হবে জেনে খাওয়া দাওয়া শেষ হতে না হতেই রুদ্র আর তিস্তা ওপরে নিজেদের নিজেদের ঘরে শুতে চলে গেল | তবে যেহেতু কালকেই তারা সেখান থেকে চলে যাবে তাই সোফাতে বসে ডাক্তার-কাকুর সঙ্গে গল্প জুড়ে দিলো দীপা | একটা কথা থেকে আরেকটা কথা উঠতে উঠতে পুরনো দিনকার কথা সব মনে পরে যেতে লাগল দুজনের | যে মানুষগুলো তাদের চিরদিনের জন্য ছেড়ে চলে গেছে তাদের কথা মনে পড়তেই দুজনেরই মন ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ল | ​ "তবে শিলা, শিলা আজকে বেঁচে থাকলে খুবই খুশি হতো রে, দীপা..." ডাক্তার-কাকু বলে উঠলেন ​ "শিলা...? " সেই প্রথম ওই নামটা শুনল দীপা | তবে তার চেনা কারুর মধ্যে সেই নামের কেউই ছিল না, তাই নিজের মনের অন্ধকারকে দূর করতে ডাক্তার-কাকুকে প্রশ্ন করল " কে? কে শিলা ডাক্তার-কাকু...?"​ ডাক্তার-কাকু দীপার মুখ থেকে সেই প্রশ্ন শুনে প্রথমে একটু অবাক হলেন তারপর ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বলে উঠলেন, " হ্যাঁ..সেই তো..তুই তাকে চিনবি কি করে? শিলা..? শিলা হল আমাদের তিশার মা, মানে ওই তিস্তার মা" বলে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন ডাক্তার-কাকু, তারপর আবার বলে উঠলেন " জানিস তো দীপা মেয়েটা খুবই ভালো ছিল, মানে অন্যদের মতন একদমই ছিল না | আমি যখনি যেতাম ওদের বাড়িতে সব সময়ই দেখতাম যে সে তার নিজের মেয়েকে আগলে রয়েছে...কিন্তু..কিন্তু" বলে থেমে গেলেন ডাক্তার-কাকু । ​ "কিন্তু কি ডাক্তার-কাকু...?"​ "কিন্তু ওকেও আমি বাঁচাতে পারিনি, দীপা...তবে ওর সেই অসুখের হাত থেকে কেউই ওকে বাঁচাতে পারতো না.....তবুও" বলে দুঃখে নিজের মাথাটা নিচু করে নিলেন ডাক্তার-কাকু, "আজকে ও বেঁচে থাকলে নিজের মেয়েকে এই অবস্থাতে, মানে তোদের সঙ্গে দেখলে নিশ্চয়ই খুবই খুশি হত"​ "হ্যাঁ..ডাক্তার-কাকু, সব মা রাই সব সময়ই তাদের সন্তানের সব কর্মেই খুশি হয়" দীপা বলে উঠল ​ দীপার মুখ থেকে সেই কথা শুনে হঠাৎ ডাক্তার-কাকু বলে উঠলেন "তবে দীপা, একটা কথা...." ​ "কি?..কি কথা ডাক্তার-কাকু..?" ওনাকে থেমে যেতে দেখে বলে উঠল দীপা ​ "ওটা কার দীপা...?" ডাক্তার-কাকু বলে উঠলেন ​ "কি..কি কোনটা? কার ?" থতমত খেয়ে বলে উঠল দীপা​ দীপার কথা শুনে নিজের চোখ থেকে নিজের চশমাটা খুলে পাশের টেবিলে রাখলেন ডাক্তার-কাকু, তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে উঠলেন, "দেখ দীপা,তুই পেশায় চার্টার্ড একাউন্টেন্ট হলেও তুই নিজেও অনেক দিন ধরেই মেডিসিন নিয়ে নাড়াচাড়া করেছিস | তাই, তাই নিজের মধ্যে হওয়া জিনিসগুলো তুই একটু হলেও নিশ্চয়ই বুঝতে পারছিস, আর সেটাও বুঝতে পেরেছিস নিশ্চয়ই"​ "মানে...?" দীপা অবাক হয়ে ডাক্তার-কাকুর মুখের দিকে তাকাল "হোয়াট ডাজ হি মিন..." নিজের মনকে নিজেই প্রশ্ন করে উঠল দীপা | ​ "মানে...? মানেটা তুই নিশ্চয়ই জানিস দীপা, কিন্তু সেটাকে হয়তো এখনও স্বীকার করতে পারছিস না, তাই তো...? " হালকা হেসে বলে উঠলেন উনি ​ ডাক্তার-কাকুর কথার কুল কিনারা না করতে পেরে তার মুখের দিকে কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকল দীপা, চিন্তা করতে লাগল কি হতে পারে সেই কথার কারণ , কেন বলছেন তিনি সেই কথা? আর হঠাৎ করেই সেই কারণটা দীপার মাথায় আসতেই সে বলে উঠল "ডাক্তার - কাকু, আমি..আমি কি প্রেগন্যান্ট ?" ​ দীপা যে তার কথা বুঝতে পেরেছে সেইটা দেখে খুশি হয়ে ডাক্তার-কাকু বললেন "হ্যারে মা, তাই তো মনে হয় ....তবে অবশ্য এই..এই বুড়ো বয়েসে এসে ভুলও হতে পারে আমার..."​ "আরে! না..না..ভুল হতে যাবে কেন.." দীপা তাকে বাধা দিয়ে বলে উঠল ​ "তাহলে...তাহলে তুই নিজেও মানছিস? তুই নিজেও মানছিস যে তুই মা হতে চলেছিস?" বলে নিজের জায়গা থেকে উঠে দীপাকে জড়িয়ে ধরলেন ডাক্তার-কাকু ," এই হাত দিয়েই সেই ছোট্ট তোকে ধরেছিলাম আমি দীপা...আর আজ তোরই..তোরই....খুব, খুব ভালো খবর দীপা !!!" খুশিতে ফেটে পরে ডাক্তার-কাকুর বলে উঠলেন আর তার চোখ বেয়ে অঝোরে ঝরে পড়তে লাগল অশ্রু ধারা | ​ কিন্তু অন্যদিকে দীপা বুঝতে পারল না সে ওনাকে কি বলবে, মানে তার কাছে সেটা একদমই একটা নতুন অভিজ্ঞতা | ভয় আনন্দ অনিশ্চয়তা মাখানো একটা অবস্থায় কি বলবে না বলবে সেটার ব্যাপারে ভাবতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল সে এমন সময় হঠাৎ ডাক্তার-কাকু আবার একটা প্রশ্ন করে বসলেন: ​ "কিন্তু দীপা মা, বাচ্চাটা...কার ? মানে হু ইস দা ফাদার, দীপা...."​ দীপা জানতো যে এইরকমই একটা প্রশ্ন তার জন্যে অপেক্ষা করছে তাই একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে উঠল "পাণ্ডে-জি, মোস্ট প্রব্যাবলি...."​ "কি? পাণ্ডে-জির...?" বলে উনি অবাক বিস্ময়ে তাকালেন দীপার দিকে " কিন্তু..কিন্তু উনি! " বলতে গিয়েও আবার থেমে গেলেন ডাক্তার-কাকু ​ "কিন্তু কি? কি ডাক্তার-কাকু?"​ "নাহ...কিছু না, তবে..তবে তুই মোস্ট প্রব্যাবলি বললি কেন ? তুই কি শিওর নোস্ সেই ব্যাপারে ?"​ "না..মানে ওই ৭৫% মতন শিওর আমি যে এটা পাণ্ডে-জিরি " দীপা হালকা সূরে বলে উঠল ​ "দীপা, প্রেগন্যান্সিতে ৭৫% বলে কিছু হয়না, ইটস অলওয়েজ আইদার এ হান্ড্রেড পার্সেন্ট অর ইটস জিরো, কিন্তু...তবুও" বলে আবার নিজের চিন্তায় হারিয়ে গেলেন ডাক্তার-কাকু | ওনাকে সেই রূপ চিন্তামগ্ন হতে দেখে দীপা বলে উঠল :​ "কি হল ডাক্তার-কাকু, কি ভাবছেন এইরকম করে?"​ দীপা কথায় সেই চিন্তা ভেঙে যেতেই ডাক্তার-কাকু বলে উঠলেন " নারে মা কিছুনা, তবে তোর...তোর সঙ্গে কি পাণ্ডে-জির বিয়ে টিয়ে...." ​ "না..না ডাক্তার-কাকু, ওসব..ওসব কিছুই নয় | উনি জাস্ট একটা বায়োলজিক্যাল সাকসেসর চেয়েছিলেন, মানে নিজের সন্তান আর আমি সেটা দেওয়ার জন্যই ওনাকে সাহায্য করেছিলাম..." দীপা বলে উঠল ​ "বায়োলজিক্যাল সাকসেসর !!!" বলে দীপার দিকে বিস্ময়ে তাকালেন ডাক্তার-কাকু | ​ "হ্যাঁ..ডাক্তার-কাকু, কিন্তু...কিন্তু বেচারির ভাগ্য দেখুন, সন্তান সুখ ভোগ করার আগেই কেমন চলে যেতে হল ওনাকে..."​ "সন্তান সুখ....হমম | সত্যি, সত্যি রে মা সব কিছুই ওই ভাগ্য, কারুর ভাগ্যে থাকে সন্তান সুখ আবার কারুর ভাগ্যে থাকে সেই অন্ধকূপ..." শান্ত গলায় বলে উঠলেন ডাক্তার-কাকু ​ "সত্যি তাই ডাক্তার-কাকু..."​ "আমার ভাগ্যেও সেই সুখ কোনোদিনই ছিল না দীপা, তবে আমি সেই সুখ না পেয়েও তোদের সবাই কে পেয়ে সুখী ছিলাম কিন্তু পাণ্ডে-জি? পাণ্ডে-জি তো সব কিছু পেয়েও কোনও সুখই পেলেন না...."​ "হমম" দীপা বলে উঠল , তারপর হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বলল "ডাক্তার-কাকু আমরা তো কালকেই চলে যাবো...তুমি একা একা ঠিক থাকতে পারবে তো...?" ​ "ওরে মা আমায় নিয়ে চিন্তা করিস না, তবে জানিস তো কালকেই আবার সেই স্বপ্নটা দেখলাম আমি...সেই যে আলোটাকে দেখেছিলাম আমি, আমার চোখের সামনে, আমার...আমার মনে হয় যে এইবার আমার সময় হয়ে এসেছে রে.."​ "আবার? আবার তুমি বাজে বকতে আরম্ভ করলে ?" দীপা চেঁচিয়ে উঠল "আমাকে এত সুন্দর একটা খবর জানবার পরেও, এই রকম কথা তুমি কি করে বলছ ডাক্তার-কাকু? আর তোমার এখন কোথাও যাওয়া চলবে না, আমি তোমায় যেতে দেবে না..." ভারী গলায় বলে উঠল দীপা ​ "কেন রে মা? আমার মতন বুড়োর কাছ থেকে তোর আর কি দরকার থাকতে পারে...?​ "আছে..দরকার আছে...এখনও..." বলে একটা ঢোঁক গিলল দীপা, তারপর আবার বলে উঠল "আমার এই বাচ্চাটাকে এই পৃথিবীতে আনতে আমায় সাহায্য করতে হবে তোমায় ডাক্তার-কাকু...আমি চাই যাতে তুমিই আমায় সেই সাহায্য করো..."​ "দীপা মা, আমি আজ আছি কাল নেই...আমার কথার এখন আর কোনও দাম পাবি না রে মা..তুই এই রকম দিব্বি আমায় দিস না মা, আমি আমি...." বলে আবার কেঁদে ফেললেন ডাক্তার-কাকু ​ "আমি কিচ্ছু জানি না, তোমাকে সেটা করতেই হবে..." শক্ত গলায় বলে উঠল দীপা ​ "জানি না, সেটা সম্ভব হবে কিনা তবে তোর এই কথাটার দাম রাখার চেষ্টা আমি নিশ্চয়ই করব দীপা..." বলে টেবিলের ওপর থেকে কাঁচের গ্লাসটা নিজের হাতে তুলে নিয়ে ঢকঢক করে জল খেতে লাগলেন ডাক্তার-কাকু | তার গলা দুঃখে বেদনায় শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল | তার সেই অবস্থা দেখে দীপা বলে উঠল : ​ "তুমি..তুমি আমাদের সঙ্গে ওইখানে যাবে ডাক্তার-কাকু? মানে, আমি জানিনা ওখানে কি অবস্থাতে, কি জায়গাতে আমরা থাকব তবে তুমি আমাদের সাথে ওইখানে গেলে আমাদের তিনজনেরই খুব ভালো লাগত..."​ "নাহ..নাহ রে দীপা" ঠাণ্ডা গলায় বলে উঠলেন ডাক্তার-কাকু, " সেই যুদ্ধ চলাকালীন এখানে এসে নিজের আস্তানা গুঁজে ছিলাম তারপর এখন থেকে আর কোথাও যায়নি আমি আর তাই আমি চাই আমার এই শেষ জীবনটা এখানেই কাটাতে | এমনি বেশ ভালোই আছি আমি জানিস তো, মানে খুবই শান্তি এখানে" বলে বাইরের দিকে ইশারা করলেন উনি "বাইরে মাঝেমাঝে একটা দুটো হরিণের পালও আসে জানিস তো..ওই সরু নদীটা থেকে জল খায় আবার..আবার ময়ূরও আসে...." বলতে বলতে থমকে দাঁড়ালেন ডাক্তার-কাকু। ​ "তবে কি জানিস তো মা, মাঝেমধ্যে একটা জিনিস খুব..খুব বিরক্ত করে আমায় | সেই জিনিসটা হল এই একাকীত্ব | একটা যদি সঙ্গী পাওয়া যেত তাহলে..." বলে একটা দীর্ঘশ্বাস নিলেন উনি, তারপর আবার বলে উঠলেন " কিন্তু...কিন্তু কালকে এই তোরা যে এইখানে এলি তাতে আমার মন প্রাণ একেবারে ভোরে গেল রে মা...আমার সারা জীবনের সব দুঃখ সব বেদনা সব আক্ষেপ সব ধুয়ে মুছে গেছে রে...."​ "ডাক্তার-কাকু তুমি...তুমি ওইরকম করে বোলো না" বলতে বলতে দীপার চোখ দিয়েও জল বেরিয়ে এলো |​ "এই দেখেছ..দেখেছ মেয়ের কাণ্ড? এই অবস্থায় কাঁদতে নেই মা, আমাদের সবাই কার খারাপ হবে তাতে " বলে নিজের হাত দিয়ে দীপার চোখের জল মুছিয়ে দিলেন উনি, তারপর আবার বললেন "শোন মা...নিজেদের খুব খেয়াল রাখবি আর বিশেষ করে তোর নিজের শরীরের যত্ন নিবি, তবে সেটা বলার প্রয়োজন হবে না ওই দুজন থাকতে" বলে মাথা ঘুরিয়ে দোতলার দিকে ইশারা করলেন ডাক্তার-কাকু ," তবে দীপা..রুদ্রর কি আর কোনও প্রব্লেম হয়েছিল...পরে ?"​ "কি প্রব্লেম? ওহ না..তবে.." নিজের কথা শেষ করার আগেই ডাক্তার-কাকু বলে উঠলেন ​ "তবে ওর সেইদিন কার ঘটনার কথা কিছুই মনে পড়েনি, তাই তো..?"​ "হ্যাঁ একটুও না, মাঝেমাঝে যেন মনে হয় যে সেইদিনের কথাগুলো কেউ ওর মন থেকে মুছে দিয়েছে তবে..তবে আমিও চাই যাতে সেইদিন কার ঘটনা ওর একটুও না মনে পরে " উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল দীপা ​ "হ্যাঁ...ও যদি ভালো থাকে, তাহলে ওকে সেই কথা মনে করানোর কোনও দরকারিই নেই | জানিস তো দীপা, চাইল্ডহুডে ওইরকম সিভিয়ার কিছু ট্রমা হলে সেই সিচুয়েশন থেকে বাঁচার জন্য বা খাপ খাওয়ানোর জন্য অনেক সময় ব্রেন সেই মেমোরিটাকে লক দায়....আর আমার যতদূর আন্দাজ রুদ্রর ক্ষেত্রেও সেইরকমই কিছু হয়েছে | তবে আমি মনে করি সেটা ভালোর জন্যেই হয়েছে " ​ "হুমা" বলে নিজের মাথা নাড়ল দীপা ​ "তবে যাইহোক, অনেক রাত এখন...এইবার গিয়ে শুয়ে পর তুই, কালকে অনেক তাড়াতাড়ি বেরোতে হবে তোদের" বলে সোফার হাতলের ওপর চাপ দিয়ে আস্তে আস্তে সোফা থেকে উঠে পড়লেন ডাক্তার-কাকু,তারপর দীপার দিকে ঘুরে হাসি মুখে বলে উঠলেন "কালকে নিশ্চয়ই এতক্ষণে ওইখানে পৌঁছে গেছিস তোরা "​ "হমম...সেইটাই আমি আশা করি ডাক্তার-কাকু, আই হোপ সো" বলে নিজেও সোফা থেকে উঠে পড়ল দীপা | ডাক্তার-কাকুকে আস্তে আস্তে নিজের ঘরে ঢুকে যেতে দেখে আর এক মুহূর্তও দেরি না করে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে দুতলায় উঠে নিজের ঘরে ঢুকল দীপা | তবে ঘরে ঢুকতেই দেখল যে তিস্তার পাশে রুদ্রও ঘুমোচ্ছে | ​ ওদের দুজনকে শান্তিতে ঘুমোতে দেখে নিঃশব্দে পা টিপে টিপে খাটের ওপর উঠে পড়ল দীপা | তারপর রুদ্রর গালে একটা আলতো চুমু খেয়ে নিদ্রা মগ্ন হয়ে পড়ল সে |​
Parent