আউট অফ কলকাতা - অধ্যায় ৩৬
পর্ব ৩৬
"সাবধানে, সাবধানে যাবে তোমরা..." পেছন থেকে ডাক্তার-কাকু বলে উঠলেন । তার কণ্ঠস্বর শুনে তিনজনেই পেছনে তাকাল আর তাকাতেই ওনাকে দেখতে পেল ।
"একি ডাক্তার- কাকু আপনি আবার এলেন কেন...?" দীপা বলে উঠল
"আরে কিছু হবেনা, তবে যা বললাম মনে রাখবে তোমরা সবাই..."
"হ্যাঁ ডাক্তার-কাকু...মনে রাখব" গাড়িটার দরজাটা খুলে গাড়িতে উঠে বসল দীপা | ভোরের আকাশে তখন আলো ফুটে গেছে । দূর থেকে পাখির কূজন তাদের কানে ভেসে আসতে লাগল এমন সময় দীপা বলে উঠল
"চল এবার...ইটস টাইম ফর আস...."
ফোনের গ্যালারিতে আগে থেকেই পর পর সব স্ক্রিনশটগুলো সাজিয়ে রেখেছিল রুদ্র আর তাই আর সময় নষ্ট না করে সেটা সে তিস্তার হাতে ধরিয়ে দিল | গাড়ির চালকের আসনে ছিল রুদ্র আর তার পাশেই বসল তিস্তা | পেছনের সিটে ছিল দীপা আর তার পাশে ছিল তাদের সব ব্যাগ পত্রগুলো | জিনিস-পত্র পরিমাণ এর আগের বারের থেকে অনেকটাই বেশি হলেও ওরা চেষ্টা করেছিল যত সম্ভব জিনিসপত্র কম করে নেওয়ার। তার কারণ সেদিনকার পথ ছিল তাদের কাছে পুরোটাই অজানা |
"গাড়িটা ভালোই দেখতে লাগছে..." ডাক্তার-কাকু গাড়ির জানালার পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলে উঠলেন
"হ্যাঁ...থ্যাংকস টু ইউ ডাক্তার-কাকু" দীপা বলে উঠল | ডাক্তার-কাকুর সেটা বলার কারণ ছিল গাড়ির নতুন রঙের জন্য । রুদ্র সেদিন ভোর ভোর উঠেই ডাক্তার-কাকুর কাছ থেকে কিছুটা গারো সবুজ রং নিয়ে গাড়ির চারপাশে রঙ করে দিয়েছিলো আর সেটা করার ফলে গাড়িটার সেই আগের মড়াখেকো রূপ অনেকটাই চলে গেছিলো । তবে সবুজ রং করে গাড়িটায় একটা ক্যামোফ্লাজের ব্যাপারও তৈরি হয়েছিল |
"হমম...যাও এবার তোমরা গুড লাক..." বলে একটা দীর্ঘশ্বাস নিলেন ডাক্তার-কাকু
"আসছি ডাক্তার-কাকু..." বলে চাবিটা ঘোরাতেই গাড়িটা একটা ভীষণ গর্জন করে জেগে উঠল | পুরনো আর জরাজীর্ণ অবস্থাতে হলেও গাড়ির ভেতরের জিনিসপত্র মানে গাড়ির ইঙ্গিনটা তখনও চাবুকের মতন ছিল | ক্লাচ চেপে প্রথম গিয়ার দিয়ে আস্তে আস্তে এক্সিলারেটরে চাপ দিতেই গাড়িটা এগিয়ে যেতে লাগল । দীপা আর তিস্তা জানালা দিয়ে ডাক্তার-কাকুকে শেষ বারের জন্য হাত নাড়িয়ে বিদায় জানাল আর সাথে সাথেই এক্সিলারেটরে চাপ দিলো রুদ্র | শেষমেশ দেখতে দেখতে ওরা বেরিয়ে পড়লো তাদের শেষ গন্তব্যে পৌঁছোবার জন্য |
আগের দিনের চাইতে অনেকটাই আগে বেরবার জন্য জানালা দিয়ে হিম শীতল বাতাস হুহু করে ঢুকতে লাগল, তবে ওদের ঠাণ্ডা লাগল না কারণ নতুন কিছু খুঁজে পাওয়ার উত্তেজনায় তাদের শরীরের প্রতিতা রক্ত কোশ আগুনের ফুল্কির মতন জ্বলে ছিল । অনেক কষ্ট সহ্য করেছে তারা, আজ সেই কষ্টের নাশ হবে...
সেই একই ঝোপঝাড়ের রাস্তা ধরে ওরে আস্তে আস্তে এগোতে আরম্ভ করলো তবে আগের দিনের মতন আর অসুবিধা হল না ওদের | পর পর দুদিন একই রাস্তা দিয়ে যাওয়া আসার কারণে সামনের ঝোপ ঝড় অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে গেছিলো | রুদ্র আস্তে আস্তে গাড়ির গতি বারিয়ে সেই রাস্তা দিয়ে এগিয়ে যেতে লাগল এমন সময় তিস্তা বলে উঠল :
"এখন দিয়ে বেরিয়ে সোজা যে রাস্তা দিয়ে এসেছিলাম, সেই রাস্তাটাই ধরবে...বুঝলে?"
"হমম একদম, তবে বলছি যে তুমি তোমার সব অস্ত্র-শস্ত্র ঠিকঠাক করে নিয়েছ তো ? "
"হ্যাঁ বাবা...সে সব আমায় মনে করানোর কোনও দরকারই নেই, ওগুলো আমার শরীরেরই অঙ্গ " বলে নিজের হট প্যান্টের ওপর দিয়েই নিজের উরুর ওপর সেই বেল্টের ওপর হাত বোলাল তিস্তা |
আস্তে আস্তে সেই কাঁচা রাস্তা থেকে বেরিয়ে হাইওয়েতে উঠল ওরা তবে হাইওয়েতে উঠতেই রাস্তার সেই করুন অবস্থার টের পেলো ওরা তিনজন| আগের দিন তাড়াহুড়ো আর শরীরে এড্রেনালিনে ভোরে থাকার জন্য উত্তেজনায় সেই রাস্তা দিয়ে আসতে জিনিসটা না বুঝলেও আজকে ধীরে সুস্থে সেই একই রাস্তা দিয়ে যেতেই বুঝতে পারলো আসল ঠেলা | কিছুদূর অন্তর অন্তর রাস্তার মাঝখানটা খোবলানো খোবলানো মনে হতে লাগল, দেখে মনে হতে লাগলো যেন কেউ খুবলে দিয়ে কিছু দিয়ে | কোনমতে খুব সাবধানে সেই গচ্চা গর্ত বাঁচিয়ে গাড়িটাকে আস্তে আস্তে এগিয়ে নিয়ে যেতে লাগলো রুদ্র তবে কিছুদূর যেতে না যেতেই গাড়িটাকে স্লো করে পেছন দিকে মানে দীপার দিকে মাথা ঘুরিয়ে রুদ্র বলে উঠল :
"এই দীপা...তেল নিতে হবে, গাড়িতে তেল কম আছে মনে হচ্ছে..."
রুদ্রর মুখে সেই কোথা শুনে নিজের ভুরু দুটো কুঁচকে দীপা বলে উঠলঃ "মানে...? তোকে কাল রাত্রে জিজ্ঞেস করলাম না এই ব্যাপারে? তুই তো বললি যে যা আছে তাতে হয়ে যাবে...আর তা না হলে ডাক্তার-কাকুর কাছ থেকে নিয়ে নিবি...তাহলে এখন...? "
"হ্যাঁ সে তো আমি সকালেই ডাক্তার-কাকুর কাছ থেকে কিছুটা চেয়ে নিয়ে ছিলাম কিন্তু, এখন...এখন তো ফুয়েল গেজে অন্য কিছু দেখাচ্ছে..." বলে ফুয়েল গেজের দিকে ইশারা করল রুদ্র | দীপা সাথে সাথে নিজের সিট থেকে উঠে সেই দিকে তাকাতেই দেখল যে গেজের কাঁটাটা একদম নিচে নেমে এসেছে |
"ওহ! এই ব্যাপার ? ওটা..ওসব কিছু না, তেল আছে । তুই কোনও চিন্তা করিস না নিজের মতন চালা..ব্যাস" বলে আবার নিজের জায়গায় বসে পড়ল দীপা
"শিওর...তো তুমি?" রুদ্র বলে উঠল
"একদম শিওর তবে এবার একটু জোরে চালা...আটটা বেজে গেছে যে...."
"হম" বলে আর কোনও কথা না বারিয়ে আবার এক্সিলারেটরে চাপ দিয়ে গাড়ি ভাগাতে লাগলো রুদ্র | প্রায় চল্লিশ মিনিট সেই একি ভাবে যাওয়ার পর হঠাৎ মেন রাস্তা থেকে নেমে পাশে একটা ঝোপ দেখে গাড়িটা দাঁড় করাল রুদ্র | তাকে সেই রূপ দাঁড়াতে দেখে দীপা বলে উঠল :
"কি রে? কি হল? আবার দাঁড়ালি কেন? গাড়িতে কিছু..."
"না না...এমনি কিছু না জাস্ট একটু খিদে পেয়েছে..." বলে পেছন দিকের সিট থেকে একটা ব্যাগ টেনে নিলো রুদ্র | তারপর সেটা চেন খুলে প্লাস্টিকের মধ্যে থেকে দুটো রুটি বার করে গো গ্রাসে গিলে নিলো রুদ্র | তিস্তাকে ওর দিকে হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখে রুদ্র বলে উঠল ; "খাবে তুমি...?"
তিস্তা নিজের মাথা নাড়িয়ে 'না' জানিয়ে আবার সামনের দিকে তাকাল । রুদ্রকে সেই ভাবে খেতে দেখে দীপা বুঝল যে সেই ভাঙা চোরা পথ দিয়ে গাড়ি চালানোর জন্যই ওর অতটা খিদে পেয়ে গেছে |
পেট শান্ত করে জলের বোতল থেকে এক ঢোঁক জল মুখে নিয়ে গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরের দিকটায় তাকাল রুদ্র, সত্যি সময়ের সাথে সাথে সব কিছুই পাল্টে যায় | এক সময় যে হাইওয়ে ছিল মকমলের মতন মোলায়েম আজ সেটাই পরিণত হয়েছে এই পরিত্যক্ত, ভাঙা আর আগাছা ভর্তি রাস্তায় | সেই কারণেই হয়ত খুব একটা গাড়িও তেমন চোখে পড়লো না ওদের | যাও বা দু তিনটে চোখে পড়ল সে সবই তাদের উল্টোদিকে চলে গেল | অন্যমনস্ক হয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে সেই সব কথা চিন্তা করছিল রুদ্র এমন সময় হঠাৎ তিস্তার কণ্ঠস্বর শুনে তার সম্বিত ফিরল ঃ
"চলো এবার...এখনও অনেকটা রাস্তা বাকি যে..."
তিস্তার কথা শুনে নিজের মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়ে রুদ্র আবার গাড়ি স্টার্ট করে হাইওয়ে ধড়ে এগিয়ে যেতে লাগলো ওরা | আরও প্রায় ঘণ্টা খানেক সেই পথে যাওয়ার পর তিস্তা আবার মোবাইল ফোনটা ওপর তুলে ধরে রাস্তাটা আরেকবার মিলিয়ে নিলো |
"এইবার...এইবার এই এখন দিয়ে ঘুরে সোজা..." তবে তার কথা শেষ হতে না হতেই রুদ্র প্রাণপণে গাড়ির ব্রেকটা চেপে ধরল | অকস্মাৎ অত জোরে ব্রেক লাগানোর ফলে গাড়িটা পিছলে গিয়ে ঘষটাতে ঘষটাতে কিছুদূর গিয়ে থামল | গাড়িতে সিটবেল্ট ছিল না তাই তিস্তা প্রথমেই ড্যাশবার্ডে ধাক্কা খেলো । রুদ্র কোন মতে নিজের হাত দিয়ে নিজেকে বাঁচিয়ে নিলো । দীপা পেছনে থাকার ফলে বেশী জখম হল না । সব কিছু এতটাই তাড়াতাড়ি হয়ে গেল যে গাড়ির বাকি দুজন যাত্রী ভয়ে কাবু হয়ে গেল | টায়ারের রাবার পোড়া গন্ধ ওদের নাকে আসতে লাগল । দীপা আস্তে আস্তে নিজের সিট থেকে উঠে তিস্তাকে সোজা করতেই দেখল যে তিস্তা পুরোপুরি ঠিক আছে ।
"তোর লাগেনি তো তিস্তা...?"
"না না দীপা দি, ঠিক টাইমে হাঁটু দিয়ে সাপোর্ট দেওয়ার জন্য কিছু হয়নি...তবে রুদ্র তুমি ঠিক আছো তো..." রুদ্রর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে উঠল তিস্তা।
তিস্তার কথা শুনে দীপাও সেই দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল "কি...? কি হল রু ?" আর সাথে সাথে ওদের নাকে একটা পচা ভোঁটকা গন্ধ ভেসে এলো | গন্ধটা এতটাই তীব্রতর ছিল যে দীপার গা গুলিয়ে উঠতে লাগল |
দীপার প্রশ্ন শুনে রুদ্র আস্তে আস্তে নিজের তর্জনী তুলে সামনে দিকে ইশারা করল "সাম...সামনের অবস্থাটা দেখো এক...একবার..." বলে গাড়ির দরজাটা খুলে গাড়ি থেকে নিচে নামল রুদ্র | তাকে দেখা দেখি বাকি দুজনও গাড়ি থেকে নেমে সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্যটা দেখল | রুদ্র যদি ঠিক সময় গাড়ির ব্রেকটা না টিপত তাহলে হয়তো তাদেরও স্থান সেইখানেই হত | সে কি ভয়ঙ্কর দৃশ্য....গাড়ি থেকে পাঁচ ফুট পর সামনের রাস্তার কোনও অস্তিত্বই দেখতে পেলো না ওরা | সেই রাস্তার জায়গায় প্রায় পঞ্চাশ ফুট গভীর একটা খাইয়ের মতন দেখতে পেল ওরা আর সেই খাইয়ের মধ্যেই পরে থাকতে দেখল লাশের পর লাশ | সেই সব লাশই পোচে গোলে গিয়ে সেই দুর্গন্ধ বেরোচ্ছে......কিছুটা দূরে আবার কোয়াকটা কুকুরকে একটা মরার হাত নিয়ে ঝগড়া করতে দেখা গেল ।
রুদ্র এইরকম ভয়াবহ দৃশ্য যেন আগে কোনোদিনও দেখেনি | সাক্ষাৎ মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে সেই খাইয়ের দিকে তাকিয়ে ভয়ে আশ্চর্যে প্রশ্ন করল "এ...এটা...কি? এখানে...রাস্তা...রাস্তা কোই? এত লাশ..?"
"বুঝতে পারছনা রুদ্র?" বলে ওর মুখের দিকে তাকাল তিস্তা তারপর আবার বলে উঠল ," এটা...এটা ভাগাড়....' একটা বড়ো দীর্ঘশ্বাস নিয়ে আবার বলে উঠল , "হয়তো...একসময় এখান দিয়ে যাতায়াত করার জন্য একটা রাস্তা ছিল কিন্তু যুদ্ধের পর সেটার আর কোনও অংশই অবশিষ্ট নেই, দ্যাখো এখনও ওই জায়গাগুলোতে শেলিং এর ক্রেটার হয়ে রয়েছে" বলে নিজের আঙ্গুল দিয়ে নিচের দিকে ইশারা করল তিস্তা | তিস্তার কথা শুনে রুদ্র সামনের দিকে একটু এগিয়ে যেতেই দেখল যে সত্যি বিশাল বিশাল গর্তের মতন কেমন সব হয়ে রয়েছে | সেই দিকে মন দিয়ে কিছুক্ষণ তাকাতেই রুদ্রর চোখ পড়ল তারই ঠিক পাশের পরে থাকা একটা লম্বা পাইপের মতন জিনিসের ওপর | দেখে মনে হল যেন মাটি থেকে বেরিয়ে রয়েছে | সেই দিকে ইশারা করে রুদ্র বলল ঃ
"ওটা...ওটা কি? জলের পাইপ নাকি...? কিন্তু ওইরকম তো পাইপ হয়না...তবে..."
"ওটা পাইপ না রুদ্র, ওটা ট্যাঙ্ক....মানে যুদ্ধের ট্যাঙ্কের অবশিষ্ট অংশ..."
"ট্যাঙ্ক?" অবাক হয়ে সেই জিনিসটার দিকে আবার একবার তাকাল রুদ্র,"হমম...তাহলে, তাহলে ঠিকই বুঝেছি আমি...."
"কি?" অবাক হয়ে রুদ্রর মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল তিস্তা
"এই জায়গাটাই মেন্ হাব ছিল, মানে এখন দিয়েই ওই দিকে যাওয়ার রাস্তা ছিল তাই শত্রুরা যাতে এই দিকে না ঢুকতে পারে সেই জন্যই রেসিস্টেন্সরা এখানে নিজেদের ট্যাঙ্ক আর্টিলারি দিয়ে রোডব্লক বানিয়েছিল...তবে সেটা যে কতটা কার্যকরী হয়েছিল সেটা আমি জানি না কিন্তু সেই রোডব্লক সরাবার জন্যই বা আক্রশ দেখাবার জন্যই যে শত্রুরা এখানে শেলিং করেছিল সেটা বুঝতে পারছি..."
"হমম আর এখন এই জায়গাটাই ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে..."
"হ্যাঁ...বা পরিণত করছে সবাইকে মনে করাবার জন্য যে তাদের বিরুদ্ধে গেলে অন্যদেরও এই একি পরিণতি হবে..." রুদ্র বলে উঠল
"তিস্তা...এছাড়া আর কোনও রাস্তার ব্যাপারে জানিস তুই..." হঠাৎ পেছন থেকে দীপা বলে উঠল | রুদ্র আর তিস্তা তার গলার আওয়াজ শুনে পেছনে ঘুরতেই দীপাকে নাকে কাপড় চাপা দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল |
"হ্যাঁ... জানি দীপা দি কিন্তু...সেটা অনেক ঘুরপথ...মানে পুরোই উল্টো দিক আর ওইদিকে কি বিপদ..."
"আর..তাছাড়া কোনও রাস্তা আছে কি...?"
"না..সেটা ছাড়া আমাদের যাওয়ার কোনও রাস্তা নেই, দীপা দি আর যদি থেকেও থাকে তাহলে সেটার ব্যাপারে আমি কিছু জানি না..." তিস্তা বলে উঠল
"তাহলে আর দেরি করা যাবে না একদম...তাড়াতাড়ি চল! এখান থেকে চল অন্তত...গাড়িতে ওঠ...সূর্য থাকতে থাকতে আমাদের সেখানে পৌঁছতেই হবে যে করেই হোক...নাহলে" শক্ত গলায় বলে উঠল দীপা "রু, গাড়িতে ওঠ!"
দীপার কথা শুনে রুদ্র সাথে সাথে গাড়ি স্টার্ট করে সেটাকে আস্তে আস্তে ব্যাক করে তিস্তার দিকে তাকাল ।
"হাইওয়েতে ওঠে আবার...তারপর আবার সোজা যেতে হবে..." তিস্তা বলে উঠল | তিস্তার কথা শুনে রুদ্র আবার হাইওয়েতে উঠে গাড়িটাকে ছোটাতে লাগল | একের-পর এক মাঠঘাট জলা জঙ্গল পেরোতে পেরোতে সেই নতুন রাস্তা ধরে এগিয়ে যেতে লাগল ওরা | তবে যতই না ওরা সেই রাস্তা দিয়ে এগোতে লাগল ততই ওদের মনে নতুন একটা আশংকা দানা বাঁধতে লাগলো | "তারা ঠিক পৌঁছতে পারবো তো সেখানে....?"
রুদ্রকে সেই নতুন রাস্তা বলে দিতে দিতে সেখান দিয়ে নিয়ে যেতে লাগলো তিস্তা | দীপা পেছনের সিটে বসে জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখতে লাগল এমন সময় একটা ঘরের বাইরে লাগান একটা বোর্ড চোখে পড়ল দীপা । অবশেষে প্রায় তিনঘণ্টা পর ওরা রঘুনাথপুর পেরল |
"রঘুনাথপুর..."
"কোথায় দেখলে...?"
"ওই পেছনের বার্ডটায়..." দীপা বলে উঠল
"ওহ! তাহলে এখান থেকে আর বেশি দূর নয় লেকটা" তিস্তা বলে উঠল
"হমম রু, গাড়িটাকে এইবার এখানে কোথাও একটা লুকোতে হবে, মানে এই ঝোপ জঙ্গলের মধ্যে..."
"কেন? এখনতো অনেক দেরি আছে...তাই না তিস্তা? " তিস্তার দিকে ঘুরে প্রশ্ন করল রুদ্র
"হমম তবুও...বলা যায়না, গাড়িটা দূরে রাখা ভালো..." দীপা বলে উঠল
"কিন্তু যদি আমাদের আবার পালাতে হয়...তাহলে?" তিস্তা বলে উঠল
"সেই জন্যই তো একটা মাঝের জায়গা দেখে দাঁড় করাতে বললাম আমি"
"ওহ আচ্ছা ঠিক আছে..." রুদ্র বলে উঠল
রাস্তা দিয়ে আস্তে আস্তে যেতে যেতে হঠাৎ লেকর মুখ থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে একটা পরিত্যক্ত বাড়ি নজরে পড়ল রুদ্রর | ঝোপ জঙ্গলের ভেতরে থাকার কারণে বাড়িটা খুব সহজে বাকিদের চোখে না পড়লেও রুদ্রর চোখে একবারে পড়ল | সে গাড়িটাকে মেন্ রাস্তা থেকে নামিয়ে আস্তে আস্তে সেই বাড়ির পেছনে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করিয়ে প্রশ্ন করল "এখানে..?"
"একদম পারফেক্ট স্পট" দীপা বলে উঠল
গাড়ি থেকে নেমে চারপাশটা একটু ঘুরে দেখতেই দীপা বুঝল যে বাড়িটা পরিত্যক্ত হয়েছে অনেকদিনই আর তার ফলে চারিদিক দিয়ে গজিয়ে উঠেছে একাধিক লতা পাতা | সেই ঘন গাছগাছড়ার একটা ঝোপের পেছনে একটা ভালো স্পট দেখতে পেলো দীপা আর সাথে সাথে রুদ্রর কাছে ফিরে গিয়ে তাকে সেইখানে গাড়িটা নিয়ে যেতে বলল | রুদ্র আস্তে আস্তে সেই ঝোপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে গাড়িটাকে নিয়ে গিয়ে সেখানে দাঁড় করিয়ে তারপর গাড়ি থেকে নেমে আরও কিছু গাছের ডাল পালা এপাশ ওপাশ থেকে এনে গাড়িটার ওপর চাপিয়ে দিলো লুকানোর জন্য | অবশ্য গাড়ির নতুন রঙের ফলে সেটা দেখা যাওয়ার কোনও প্রশ্নই ছিল না | অবশেষে নিজের কাজে সন্তুষ্ট হয়ে দীপার দিকে ঘুরে হাসল রুদ্র |
"নাইস ওয়ার্ক তবে চল, চল এবার" দীপা বলে উঠল | তিস্তা গাড়ি থেকে মালপত্র আগেই বের করে নিয়েছিল তাই এবার দীপার কথা শুনে সবাই নিজেদের ব্যাগ-ট্যাগগুলো নিজেদের পিঠে কাঁধে চাপিয়ে নিলো | সামনের রাস্তাটা দেখে খালি খালি মনে হলেও ওরা রাস্তা এড়িয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো | আগে থাকতেই ম্যাপে দেখেছিলো যে সামনে লেকের দিকটা জঙ্গলটা অনেকটাই কম আছে কিন্তু সেই রাস্তা ধরতে চাইলো না ওরা | জঙ্গলের ভেতর দিয়েই আস্তে আস্তে এগিয়ে যেতে লাগল যেতে লাগলো ওরা | সূর্য দেবর প্রকোপ প্রবল থেকে প্রবলতর হয় গেলেও বড়ো বড়ো গাছ থাকায় ফলে তার থেকে অনেকটাই মুক্তি পেলো ওরা | কিছুদূর যেতে না যেতেই নিজের পকেট থেকে ফোনটা বের করে একবার সময়টা দেখল রুদ্র | তখন প্রায় দুপুর তিনটে |
দলের নেতৃত্ব দিচ্ছিল তিস্তা তার পেছনে ছিল দীপা আর সব শেষে ছিল রুদ্র । সমতল জমি থেকে যে ওরা এইবার আস্তে আস্তে ওপরে উঠছে সেটা খাঁড়াই অনুভব করে বুঝতে পারল ওরা | এমনিই জায়গাটা পাহাড়ি আর তার ফলে যতই না ওরা এগোতে লাগল ততই জঙ্গলটা ঘন আর গুরুতর হয়ে উঠতে আরম্ভ করলো | এভারগ্রিন গাছে ভর্তি থাকার ফলে আস্তে আস্তে জঙ্গলটা দুর্ভেদ্য হয়ে উঠতে আরম্ভ করলো| সেই দেখে তিস্তা নিজের ব্যাগ থেকে ডাক্তার-কাকুর দেওয়া সেই বড়ো ছোঁড়াটা বের করে গাছের ডালগুলো কেটে আগে যাওয়ার রাস্তা বানাতে লাগলো| কিছুদূর সেই ভাবে যাওয়ার পর তিনজনেই ঘেমে চান করে গেলো |
"আর...পারছিনা, দাঁড়া...দাঁড়া একটু জিরিয়ে নিতে দে" বলে হাঁপাতে হাঁপাতে একটা বড়ো পাথর খণ্ডের ওপর গিয়ে বসে পড়ল দীপা | তাকে দেখা দেখি রুদ্রও তার পাশে গিয়ে বসে পড়ল | নিজের কপাল বেয়ে ঘাম পরতে দেখে রুদ্র নিজের হাত দিয়ে মুছতে যেতেই দীপা নিজের জামার কোন দিয়ে সেটা মুছিয়ে দিলো | কিছুক্ষণ সেখানে সেইভাবে বসে থাকার পর রুদ্র নিজের পকেট থেকে ফোনটা বের করে ম্যাপটাকে আবার একবার ভালো করে দেখে নিলো |
"আমরা ঠিক দিকেই এগোচ্ছই..." ম্যাপের ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো রুদ্র |
"আর ইউ শিওর রু, আশপাশের অবস্থা দেখে সেটা তো মনে হচ্ছে না ?" অনিশ্চিত কণ্ঠে প্রশ্ন করে উঠল দীপা
"হ্যাঁ...এই তো এই ম্যাপের স্কেল আর সূর্যের দিক অনুযায়ী আমার মনে হচ্ছে আমরা ঠিক দিকেই যাচ্ছি..."
"কিন্তু আমরা তো অনেকটাই পথ চলে এলাম তাইনা...?"
"হ্যাঁ...আর তাই জন্যই বলছি আমরা ঠিক দিকে এগোচ্ছি..." রুদ্র বলে উঠল
"তারমানে...?" পাস থেকে তিস্তা বলে উঠল
"তারমানে? তারমানে আমার মনে হচ্ছে যে আমরা সেই জায়গার খুব কাছাকাছি চলে এসেছি" আশান্বিত গলায় বলে উঠলো রুদ্র "আর নিয়ার এবাউট ২৪০০ মিটারেই ওই জায়গাটা আমাদের সামনে চলে আসা উচিত"
"২৪০০মিটার! মানে ২.৪ কিমি.???" দীপা চেঁচিয়ে উঠল
"হমম..." রুদ্রর কথা শুনতেই বাকি দুজন আরও উৎসাহিত হয়ে উঠলো | দীপা পাথরের ওপর থেকে উঠে আবার নিজের ব্যাগ পরে নিয়ে এগোতে লাগল তবে এইবার নিজের চলার গতি বাড়িয়ে দিলো | তাহলে অবশেষে তাদের দুঃখের অবসান ঘটবে আজকে...
"তবে রু, এত সহজে জায়গাটা পেয়ে গেলে তাহলে সেটা কি সেফ হাউস হবে..." ঝোপঝাড় ডিঙোতে ডিঙোতে সামনে থেকে বলে উঠল দীপা
"হ্যাঁ আমিও সেটাই ভাবছি জানতো...মানে অনেক সহজেই আমরা এখানে পৌঁছে...." তবে নিজে মুখের কথা শেষ করার আগেই হঠাৎ তিস্তা বলে উঠল ঃ
"ওইটা...ওইটা কি...?" সামনের দিকে আঙ্গুল তুলে তিস্তা প্রশ্ন করে উঠল | রুদ্রর আর দীপা সেই ইশারা অনুসরণ করে সেই দিকে তাকাতেই জিনিসটা দেখল কিন্তু ঠিক করে বুঝতে পারল না জিনিসটা আসলে কি...
"ওটা...ওটা, কি? গাছ? বুঝতে পারছিনা আমি "
"সামনে চল আরেকটু তাহলে বুঝতে পারবি..." বলে উঠে আস্তে আস্তে সেই দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো দীপা |
আর ঠিক দীপার কথা মতোই সামনে এগোতেই হঠাৎ সেই জিনিসটা পরিষ্কার দেখতে পেয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল ওরা তাদের যাওয়ার রাস্তায় সেই বিরাট প্রাচীরটা দেখে, ক্যাকটাসের সেই বিরাট প্রাচীর।
দীপা আস্তে আস্তে আরও কিছুটা এগিয়ে গিয়ে ভালো করে জিনিসটা দেখে বলে উঠল "এটা এখানে...এটা এখানে কি করে..? ওরকম তো..."
সেটাকে দেখে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিলো যে কেউ ইচ্ছা করেই সেই বাধাটা সৃষ্টি করেছিল! ঠিক একটা পাহাড়ের মতন ছোট থেকে আস্তে আস্তে মাঝারি তারপর আস্তে আস্তে বিরাট বড়ো হয়ে গেছে সেই ক্যাকটাসের গাছগুলো আবার তারই মধ্যে মধ্যে আবার গজিয়ে উঠেছে মোটা মোটা অশথ গাছ | মনে হচ্ছিলো যেন ক্যাকটাসকে অশথ গাছে পাহারা দিচ্ছে আবার অশথ গাছকে যেন ক্যাকটাসে পাহারা দিচ্ছে | এমনি কোনও গাছ হলে সেগুলোর ওপরে উঠে না হয় ঐদিকে যাওয়া পরিকল্পনা করা যেত কিন্তু সেই বিরাট বিরাট ক্যাকটাসের ওপর ওঠার কোনও প্রশ্নই আসেনা | ক্যাকটাসের প্রতিটা কাঁটা প্রায় ইঞ্চি দশেক লম্বা | সেই কাঁটা একবার শরীরে বিঁধে গেলে বাঁচার কোনও প্রশ্নই থাকবে না |
"এর মানে বুঝতে পারছিস তো তোরা...." দীপা হঠাৎ বলে উঠল
"হমম..আমরা সেই জায়গা খুব কাঁচা কচি এসে পড়েছি...আর সেই জন্যই এই প্রটেকসান, কিন্তু এখন দিয়ে কি করে যাব আমরা...মানে পেছন দিকটা এরকম হলে সাইডেও একই অবস্থা হবে..." তিস্তা বলে উঠল
তিনজনেই আবার সেই বিরাট প্রাচীরের দিকে তাকাল এমন সময় হঠাৎ পাশ থেকে রুদ্র উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল "এখন দিয়ে ভেতরে ঢোকার নিশ্চয়ই অন্য কোনও রাস্তা আছে...মানে কোনও গুপ্ত পথ বা ওই ট্র্যাপ-ডোর জাতীয়...মনে আছে তোমাদের...? তোমরা ওইদিকটা খোঁজো....আমিও খুঁজছি"
রুদ্রর কথা শুনে বাকি দুজনও উত্তেজিত হয়ে এদিক ঐদিক খুঁজতে লাগলো | পাচিলের সামনের প্রতিটা অংশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খোঁজার পরেও কোনও কিছু না পেয়ে নিরাশ হয়ে আবার ওরা একই জায়গায় ফিরে এলো |
সূর্য তখন প্রায় অস্ত যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে গাছে এমন সময়ে রুদ্র বলল "ওই..ওই পাশটা দিয়ে ঘুরে গেলে হয় না, মানে ওই বাঁদিকটা দিয়ে"
"না...ঐদিকেও এইরকমই একই অবস্থা রু..." দীপা বলে উঠল
"তাহলে? তাহলে এই এত সামনে এসে হার মেনে যাবো আমরা...? সেরকম হলে আজকের রাতটা এখানে..." রুদ্র বলে উঠল
"ক্ষেপেছিস তুই...এই দুর্ভেদ্য জঙ্গলে রাতির কাটানোর কথা বলছিস কি করে তুই? এখানে মানুষ না থাকলেও কি ধরনের জন্তু জানোয়ার আছে সে সব আমরা কিছুই জানি না..." দীপা বলে উঠল
"দেন হোয়াট ডু ইয়উ রেকন...?"
"আমার...আমার সঙ্গে এসো...এইদিকে" হঠাৎ তৃতীয় ব্যক্তির আগমন টের পেয়ে সেই দিয়ে তাকাতেই তিস্তাকে দেখতে পেলো ওরা | তিস্তার অনুপস্থিতি এতক্ষণ না বুঝলেও তার গলার আওয়াজ পেয়ে সেইদিকে তাকাতেই তাকে হাঁপাতে হাঁপাতে তাদের দিকে তাকিয়ে হাঁসতে দেখল ওরা|
"কোথায়? কোথায় যাবো আমরা...? কোন দিক দিয়ে..." তিস্তার মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে উঠল দীপা
"এই পাঁচিলটার প্যারালাল..."
"মানে...?"
"মানে এই প্রাচীরের একদম গা ঘেঁসে যে পথটা চলে গেছে...সেইখান দিয়ে গিয়ে একবার দেখা যাক...কতদূর গেছে সেই পথটা..." তিস্তার কথা শুনে রুদ্র সাথে সাথে নিজের পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে ম্যাপের ছবিটা দেখতেই বলে উঠল "দাঁড়াও দাঁড়াও....এই..এই রাস্তাটা তো জলের দিকে চলে গেছে...মানে ওই লেকের দিকে"
"তাই চল...আমাদের কাছে আর কোনও রাস্তা নেই..." বলে দীপা সেই দিকে এগিয়ে গেল
"এই নাও দীপা-দি টর্চটা..." নিজের বাগ থেকে টর্চটা বার করে দীপার হাতে দিয়ে বলে উঠল তিস্তা । তিনজন সেই কাঁটা প্রাচীরের গা ঘেঁসে আস্তে আস্তে এগিয়ে যেতে লাগল | কেউ যতই সাবধান হোক না কেন একটা না একটা কাঁটা লাগা অবধারনিও । দীপারও সেই রকমই হাতে আর পায়ে কাঁটা লেগে কেটে গেল কিন্তু সে সেই দিকে কোনও ধ্যান না দিয়ে সামনের দিকে দৃঢ়তার সাথে এগিয়ে যেতে লাগল |
আস্তে আস্তে সামনের দিকে এগোতে এগোতে আরও প্রায় আধ ঘণ্টা হাঁটার পর ওরা নিজেরদের সামনে সেই বিশাল হ্রদটাকে দেখতে পেলো | সামনে অনেকদূরে কয়েকটা আলো দুর্বল ভাবে জ্বলে থাকতে দেখল ওরা ।
"দেখছ..দেখছও তো তোমাদের বললাম না যে এটা সোজা জলের সঙ্গে এসে মিশেছে" রুদ্র বলে উঠল
"হমম তারমানে ব্যাপারটা বুঝলি তো...? এই পাঁচিলটা...মানে এই জায়গাটা পুরোপুরি পরিকল্পনা করে বানানো আর আমি ১০০% শিওর যে ওই পাঁচিলের ওইপাশেই আছে আমাদের সেই সেফ হাউস..." তবে দীপার কথা শেষ হতে না যেতেই আকাশে মেঘ ডেকে উঠলো
"ফাক...দিস ইস ব্যাড..." তিস্তা বলে উঠল
"হমম, গোদের উপর বিষফোড়া...." পাশ থেকে দীপা বলে উঠলো
"তাহলে..তাহলে, এবার আমরা কি করব দীপা দি...? " তিস্তা বলে উঠল
"আমাদের কাছে আর কোনও বিকল্প রাস্তা নেই, আর আকাশের অবস্থা দেখে যা মনে হচ্ছে তাতে একটু পরেই হয়তো বৃষ্টিও এসে যাবে। আর এখানে রাত কাটানোর কোন প্রশ্নই নেই তাই, এইখান...এইদিক দিয়ে আস্তে আস্তে জলে নেমে সাঁতার কেটে ওই দিকে গিয়ে একবার দেখা যেতে পারে...আমাদের এই দেওয়াল ধরে জলের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোন রাস্তা নেই..." দীপা বলে উঠল
"মানে? তারপর..'
"তারপর দেখতে হবে এমন একটা জায়গা যেখানে ক্যাকটাস নেই বা কম আছে...আর সেখান গিয়ে দেখতে হবে আমরা ভেতরে পৌঁছতে পারি কিনা" দীপা বলে উঠল
"কিন্তু...কিন্তু..জলে নামলে আমাদের সব কিছুই তো ভিজে যাবে তাহলে, মানে স্টার্টইং ফ্রম জামা কাপড়, ব্যাগ-ট্যাগম কাগজ-পত্র আর তিস্তার বন্দুকে একবার জল ঢুকে গেলে তো হয়েই গেল" অনিশ্চিত কণ্ঠে বলে উঠল রুদ্র
"এখানে বসে থাকলে একটু পরে বৃষ্টিতে এমনিই ভিজে যাবে..." দীপা বলে উঠল
"হ্যাঁ...কিন্তু জলে নামলেও তো ভিজে যাবে..."
"কেন? ভিজবে কেন ? প্লাস্টিকের ব্যাগগুলো কি এমনি এমনি নিতে বলেছিলাম তোদের...?" দীপা বলে উঠল
"মানে....?" রুদ্র বলে উঠল
"মানে আমরা যে প্লাস্টিকের ব্যাগগুল সঙ্গে এনেছি তার মধ্যে সব জিনিস ঢুকিয়ে নেবো আমরা | তোদের নিজেদের নিজেদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুল প্রথমে প্লাস্টিকে ঢোকা তারপর সেগুলো ব্যাগে ঢুকিয়ে দে আর বাকি জিনিসগুলো সাবধানে হাতে ধরে নে "
"সে না হয় হল কিন্তু জামা কাপড়....?" তিস্তা বলে উঠল
"সব কিছু খুলে ভেতরে প্লাস্টিকের ভেতরে ঢুকিয়ে নে...এখানে সবাই সবাইকে ল্যাংটো দেখেছে তাই লজ্জার কিছু নেই..." বলে সাথে সাথে নিজের পরনের কামিজ আর প্যান্ট খুলে দিয়ে পুরো উলঙ্গ হয়ে গেলো দীপা | সেই অন্ধকার অনিশ্চয়তার মদ্ধেও দীপার সেই অপরূপ নগ্ন সৌন্দর্য দেখে রুদ্রর ধমনীর রক্ত গরম হয়ে উঠতে লাগল ।
'হমম..গুড আইডিয়া....দীপা দি" বলে তিস্তাও নিজের পরনের জামা আর হটস খুলে ফেললো আর তার দেখা দেখি রুদ্রও পুরো উলঙ্গ হয়ে গেল | নিজেদের সব দরকারি জিনিসপত্রগুল যথাসম্ভব প্যাক করে প্লাস্টিক করে ব্যাগে ঢুকিয়ে নিয়ে জলের নামার জন্য প্রস্তুত হল ওরা | দীপাকে আগে জলে নামতে দেখে রুদ্র ওর হাত ধরে ওকে বাধা দিয়ে বলে উঠল ঃ
"দীপা আর ইউ শিওর....আমরা অন্য..."
"আমি জানি না রু...অ্যাই রেয়ালি ডোন্ট নো বাট দিস ইস আওয়ার লাস্ট রিসোর্ট...আমাদের এটা করতেই হবে..." দীপার কণ্ঠে একটা শক্ত দৃঢ়তা অনুভব করতেই রুদ্রর মন থেকে সব ভয় কেটে গেল...নিজের মধ্যে আবার সেই সাহসিকতা অনুভব করে দীপাকে অনুসরন করে এগিয়ে গেল রুদ্রও | প্রথমে দীপা তারপর রুদ্র আর একদম শেষে তিস্তা একে একে আস্তে আস্তে সবাই মিলে জলে নেমে পড়ল |
প্রথমে জলটা খুব ঠাণ্ডা লাগলেও একটু পরেই সেটা খুব আরামদায়ক লাগতে লাগলো ওদের | জানুয়ারি মাসের ঠাণ্ডা এখন আর সেইরকম না থাকার জন্যই তাদের তেমন কিছু অসুবিধা হল না| প্রকৃতপক্ষে বছরের এই সময়ে জল আর আবহাওয়া খুব ঠাণ্ডা হওয়া উচিত কিন্তু গ্লোবাল ওয়ার্মিং আর জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সব কিছুই পাল্টে গেছিলো | আবহাওয়াটা ওদের খুবই মনোরম লাগতে আরম্ভ করলো - ঠিক যেমন লাগে বসন্তের শেষের আর গ্রীষ্মের প্রথম দিকে। সৌভাগ্যক্রমেই আকাশে জমে থাকা ঘন কালো মেঘের ঘটা আস্তে আস্তে পরিষ্কার হয়ে যেতে লাগলো আর কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই আকাশে চাঁদ বেরিয়ে পড়ল | ওরা সেই আলোতেই আস্তে আস্তে এগিয়ে যেতে লাগলো এমন সময় রুদ্র বলে উঠল ঃ
"এই তোমরা...পায়ে ফীল করতে পারছ....?"
"হ্যাঁ...পারছি, জল খুব বেশি গভীর নয় এইখানটায়..." তিস্তা বলে উঠলো
"হমম...তবে সাবধানে কিন্তু...ঢেউ রয়েছে কিন্তু অল্প" সামনে থেকে দীপা বলে উঠল
জলের স্তরটা তাদের গলা অবধি হলেও, ভাগ্যক্রমে এপাশে লেকের নীচের অংশটা বেশ শক্তই ছিল তাই সেখান দিয়ে হাটতে তাদের কোনও অসুবিধাই হচ্ছিলো না, তবে মাথার ওপরে নিজেদের ব্যাগ আর জিনিসপত্র থাকার ফলে সেগুলো ধরে রাখতে খুবই অসুবিধা হচ্ছিলো ওদের | জিনিসপত্রগুল প্লাস্টিকে থাকার কারণে মাঝে মধ্যেই সেই ব্যাগগুলো পিছলে যেতে লাগল । সামনের দিকে এগোতে এগোতে ওরা শীঘ্রই বুঝতে পারল যে তাদের পাশের বনটা আস্তে আস্তে হালকা হয়ে যাচ্ছে | আর সেই আশার কিরণ অনুসরণ করতে করতে আরও পনেরো মিনিট ওরকম যেতেই ক্যাকটাসের সেই প্রাচীরটাকেও আস্তে আস্তে কমে যেতে দেখল ওরা | তবে ক্যাকটাস কমে গেলেও এইপাসে আবার অন্য ধরনের লম্বা লম্বা গাছে ভর্তি দেখল ওরা |
"ক্যাকটাসের পাঁচিলটা তো শেষ হয়ে গাছে...এইবারে ওপরে ওঠা যাক নাকি" রুদ্র বলে উঠল ," ওই....ওইখানটা দিয়ে ওঠা যাবে মনে হচ্ছে " একটা ঢালু জায়গার দিকে ইশারা করে বলে উঠল রুদ্র
"না...না...দাড়াও" ফিসফিস করে বলে উঠল তিস্তা "একদম তাড়াহুড়ো কর না..."
"কেন? এখানে তো আর কিছু নেই? তাহলে কেন..." রুদ্র বলে উঠল
"না...তিস্তা ঠিকই বলেছে । এখান দিয়ে সোজাসুজি ওঠা ঠিক হবে না আর সেটা আমার পক্ষেও সম্ভব না" দীপা বলে উঠল
"তাহলে"
"তাহলে...দূরে লেকের পারের কাছটায় দেখ অনেকটা সমতল হয়ে গেছে ল্যান্ডটা...ওইখানে যে গাছগাছালিগুল দেখছিস তার পেছন গিয়েই আপাতত দাঁড়াই চল, মানে বলা যায়না যদি এখানে গার্ড থেকে থাকে তাহলে আমাদের পুরো প্ল্যানটাই শেষ হয়ে যাবে...." দীপা বলে উঠল | দীপার কথা শুনে আরও কিছুটা এগিয়ে গিয়ে একটা মোটা গাছের কাণ্ড ধরে আস্তে আস্তে ওপরে উঠে গেল রুদ্র, তার পেছনে উঠল দীপা আর সব শেষে তিস্তা | তারপর নিজেদের সব জিনিস-পত্রগুলো একটা গাছের পেছনে রেখে আস্তে আস্তে সেই লম্বা গাছগুলোর আড়ালে গিয়ে দাঁড়ালো ওরা | ওপরে আকাশের তারাগুলো মিটি মিটি করে চেয়ে দেখতে লাগলো সেই তিন-মূর্তির কাণ্ড কারখানা |