বজ্রাঘাত - অধ্যায় ১৪
১৪।।
দরজায় বেলের আওয়াজে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় পৃথা। প্রনববাবুর আসার কথা শোনার পরই তাড়াতাড়ি স্নান সেরে ফ্রেশ হয়ে নিয়েছিল সে।
‘ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই হ্যাংওভারটা কাটছিলই না প্রায় বলতে গেলে… অবস্য সেটা আর হবে নাই বা কেন? প্রায় ওয়াইনের পুরো বোতলটাই তো এক রাতের মধ্যে সাবাড় করে দিয়েছিলাম… তার ফল তো একটু হলেও ভুগতে হবে বৈকি…’ মনে মনে ভাবতে থাকে পৃথা, আলমারী খুলে একটা হাল্কা গোলাপী রঙের কুর্তি আর ঢোলা সালোয়ার বের করে পড়ে নিতে নিতে… মনের মধ্যে এক গুচ্ছ প্রশ্ন নিয়ে রেডি হয়ে থাকার জন্য। সদ্য স্নান করা ভিজে ঝাঁকড়া চুলগুলো একটা ক্লিপ দিয়ে মাথার ওপরে আটকে নেয় সে। ইচ্ছা না থাকলেও একটা ওড়না নিয়ে গায়ের ওপরে ফেলে রাখে, ভালো করেই জানে ওড়না ছাড়া কুর্তির ওপর দিয়ে ব্রা পড়া থাকলেও, বুকের বোঁটাগুলো কি রকম ফুটে উঠে থাকতে পারে তার, অপরিচিত আগুন্তুকের সামনে তাই সেই ভাবে থাকাটা যে দৃষ্টিকটু, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। নিজের দৃষ্টিভঙ্গিতেও বাঁধে না কি সেটা? যতই নিজেকে দুঃসাহসিক প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করুক সে, আদতে তো তার ভেতরে সেই চিরন্তন বাঙালী মেয়ের নমনীয় লাজলজ্জা, ভালো, মন্দ, শিক্ষা, আত্মমর্যাদা… সমস্তটাই বিরাজমান।
বেল বাজতেই দ্রুত পায়ে বেডরুমের মধ্যে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ায় সে, একবার ভালো করে নিজেকে দেখে নিয়ে ফিরে আসে ড্রইংরুমে, এগিয়ে যায় দরজার দিকে। আই হোলের মধ্যে চোখ রাখে পৃথা… নজরে আসে দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটিকে। লম্বা, স্বাস্থবান… গোল মুখ, মুখে ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি, চোখে রোদচশমা। পরনে ধোপদূরস্ত সাদা পায়জামা পাঞ্জাবী। হাতের মধ্যে রোল করা একটা কাগজ। ভদ্রলোক বলেই মনে হয় পৃথার… ঠিক তথাকথিত বাড়িওলা মার্কা দেখতে নয়। নব ঘুরিয়ে দরজা খুলে দাঁড়ায় পৃথা।
দরজার খোলার আওয়াজে সচকিত হয়ে চোখ থেকে রোদচশমাটা নামিয়ে সামনের পানেই তাকিয়ে ছিলেন ভদ্রলোক সম্ভবত, তাই দরজা খুলতেই পৃথার সাথে চোখাচুখি হয় তাঁর… মৃদু হেসে দু-হাত তুলে নমস্কার করে বলে ওঠেন, ‘নমস্কার, আমি… আমিই প্রনব কর্মকার… আমার সাথে আপনার…’
ওনার কথা শেষ হবার আগেই পৃথা প্রতিনমস্কার জানিয়ে বলে ওঠে, ‘ও, হ্যা, হ্যা… নমস্কার… বুঝতে পেরেছি… আসুন, আসুন… ভিতরে আসুন…’ বলে সরে দাঁড়ায় দরজার থেকে… ভদ্রলোক পৃথার গা বাঁচিয়ে ঘরের মধ্যে পা রাখেন।
পৃথা দরজা বন্ধ করতে গিয়ে দেখে পাশের ফ্ল্যাটের দরজাটা ততক্ষনে ফাঁক হয়ে গিয়েছে… ওপাশে অলোকবাবুর কৌতুহলী মুখ। পৃথার সাথে চোখচুখি হতে গাল চোঁয়ানো হাসি ঝরে পড়ে আলোকবাবুর, ‘কেউ এলো বুঝি?’
‘হ্যাঅ্যাঅ্যা…’ অলোকবাবুর কথা নকল করে সেই ভাবেই টেনে উত্তর দেয় পৃথা এক গাল হেসে… তারপর বলে, ‘এবার বন্ধ করি দরজাটা? আপনিও আপনার দরজাটা বন্ধ করে দিন, কেমন?’
‘ওহ… হ্যা, হ্যা… নিশ্চয়, নিশ্চয়…’ তাড়াতাড়ি বলে নিজের দরজাটা বন্ধ করে দেন অলোকবাবু, পৃথাও আর দেরি না করে দরজা বন্ধ করে ফিরে দাঁড়ায়। ভদ্রলোককে তখনও দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে শশব্যস্ত হয়ে বলে ওঠে, ‘আরে, আপনি দাঁড়িয়ে আছেন কেন, বসুন বসুন…’ বলে সোফার দিকে হাত তুলে দেখায় সে। ভদ্রলোক দরজার কাছটায় নিজের পায়ের কোলাপুরী চটিটা খুলে রাখেন, দেখেই বোঝা যায় যথেষ্ট দামী চটিটা। ভদ্রলোক ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে গিয়ে বসে সোফায়, ঘাড় তুলে মুখ ফিরিয়ে দেখতে থাকে ঘরটাকে ভালো করে।
‘অনেক দিন পর এলাম, জানেন… কত যে স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে এই ফ্ল্যাটে…’ এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখতে দেখতে বলে ওঠেন ভদ্রলোক।
ফ্রিজ থেকে জলের বোতল বের করে একটা গ্লাসে ঢেলে নিয়ে সেন্টার টেবিলের ওপরে রেখে ভদ্রলোকের উল্টো দিকের সোফায় বসতে বসতে পৃথা বলে, ‘ও, তাই… আগে খুব আসতেন বুঝি?’
হাতে ধরা কাগজের রোলটাকে নিজের পাশে, সোফার ওপরে রেখে টেবিলের ওপর থেকে জলের গ্লাসটা তুলে নিয়ে খানিকটা জল ঢকঢক করে খেয়ে নেন, তারপর গ্লাসটাকে ফিরিয়ে রেখে দিয়ে ভালো করে হেলান দিয়ে বসে পৃথার দিকে সোজাসুজি তাকান ভদ্রলোক, তারপর ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বলেন, ‘বৃষ্টি হলেও গরমটা কমছে না একটুও, থ্যাঙ্কস, জলটার জন্য।’ তারপর যেন পৃথার কথার প্রশঙ্গ টেনে বলে, ‘হ্যা, ঠিক বুঝেছেন, অনেকবার এসেছি এই ফ্ল্যাটে… কতবার তার কোন হিসাব নেই… দিনের পর দিন, একটা সময় তো এইটাই প্রায় বলতে গেলে আমাদের ঘর বাড়ি ছিল… কখন আছি আর কখন নেই তার কোন ঠিক ছিল না… থাকলেই হল… এই রকমই ছিল ব্যাপারটা।’
ভদ্রলোকের কথার ফাঁকে ভালো করে আপদমস্তক দেখে নিচ্ছিল পৃথা। বেশ ফর্সা, আর ভালোই স্বাস্থবান, বরং বলা চলে বেশ হৃষ্টপুষ্ট আরকি, কিন্তু হাইটটা ভালো হবার ফলে খারাপ লাগে না, নয়তো একটু বেঁটে হলেই গোলগাল ফুটবলের মত লাগত। সেটা কেমন লাগতো ভাবতেই নিজের অসাবধানেই একটা হাসির ঝিলিক খেলে যায় পৃথার ঠোঁটের কোন। পরক্ষনেই ত্রস্ত হয়ে ওঠে সে, আশ্বস্ত হয়, ভদ্রলোক নিজের খেয়ালে থাকায় তার ওই মিচকি হাসিটা না দেখাতে পাওয়ায়। উঠে দাঁড়ায় সে।
‘একটু চা খাবেন তো?’ প্রশ্ন করে পৃথা, কিচেনের দিকে এগুতে উদ্যত হয়।
হাত তুলে তাকে থামায় ভদ্রলোক তাড়াতাড়ি, ‘না, না, মিস মুখার্জি, এই অবেলায় আর চা করতে হবে না আপনাকে… শুধু শুধু আমার জন্য আবার কেন চা করতে যাবেন আপনি?’
‘আরে তাতে কি হয়েছে, আপনি এসেছেন কষ্ট করে, আর একটু চা করে দিতে অসুবিধা হবে আমার? আমি এক্ষুনি নিয়ে আসছি। আপনি একটু বসুন…’ বলে দ্রুত পা চালিয়ে কিচেনের দিকে চলে যায় সে। আগেই চায়ের সরঞ্জাম রেডি করে রেখে দিয়েছিল, গ্যাস জ্বালিয়ে চায়ের জলটা চাপিয়ে দেয়। তাক থেকে বিস্কিটের কৌটটা বের করে প্লেটে চার পাঁচটা বিস্কিট সাজায়। একটু অপেক্ষা করে চায়ের জলটা ফোটার। ভদ্রলোকের কথাগুলো ভাবতে থাকে সে ওখানে দাঁড়িয়ে। ‘আগে অনেক এসেছিলেন ভদ্রলোক, সেটাই তো বললেন… অবস্য আসতেই পারেন, সেটাই তো স্বাভাবিক, নয়কি, উনি তো সকালেই বললেন ওই অর্নব না কে… আচ্ছা… তবে কি…’
ভাবানার মধ্যেই চায়ের জল ফুটে ওঠার শোঁ শোঁ শব্দে চটকা ভাঙে… চায়ের পাতা চামচে মেপে দিয়ে নব ঘুরিয়ে বার্নারটা নিভিয়ে দেয়। কাপ, আরো একটা ডিস, আর ছাঁকনিটা জোগাড় করে স্ল্যাবের ওপরে রাখে। ট্রে’টাকে মুছে নেয় কিচেনের কাপড়টা দিয়ে।
‘আপনি শুধু শুধু চা’য়ের জন্য ব্যস্ত হলেন, মিস মুখার্জি… না হলেও চলতো…’ কানে আসে ভদ্রলোকের কথা ড্রইংরুম থেকে বলে উঠতে।
‘না, না, কোন অসুবিধা হচ্ছে না মিঃ কর্মকার, ঠিক আছে, এই তো হয়ে গেছে, এক্ষুনি আসছি…’ উত্তর দেয় পৃথা… দুটো চায়ের কাপে ঢেলে নেয় চা’টাকে, তারপর ট্রে’য়ের ওপরে চায়ের কাপ, প্লেট আর সুগার পট সাজিয়ে ফিরে আসে ড্রইংরুমে সে। সেন্টার টেবিলের ওপরে রাখা ফাঁকা জলের গ্লাসটাকে একটু পাশে সরিয়ে দিয়ে ট্রে’টাকে নামিয়ে বলে, ‘আমি কিন্তু র’টি করলাম, অসুবিধা হবে না তো আপনার?’
সোফার ওপরে সোজা হয়ে উঠে বসে বলে ওঠেন ভদ্রলোক, ‘আরে, না, না, নো প্রবলেম, এই এত বেলায় আপনি চা করেছেন, এটাই তো অনেক।’
‘না, এ আর এমন কি, এই টুকু তো চা’ই করা…’ কাপের মধ্যে পট থেকে এক চামচ চিনি নিয়ে দিয়ে বলে পৃথা, ‘এক চামচই তো?’
‘হ্যা, হ্যা, এক চামচই…’
হাত বাড়িয়ে চায়ের কাপটা এগিয়ে দেয় পৃথা ভদ্রলোকের দিকে, উনিও সামনের দিকে ঝুঁকে প্লেটটা ধরে নেন। পৃথা বিস্কিটটা এগিয়ে দিয়ে নিজের কাপটা ট্রে থেকে তুলে নিয়ে নিজের সোফায় পিছিয়ে এলিয়ে বসে… ও চিনি ছাড়াই পছন্দ করে চা’টা খেতে… ছোট সিপ দেয় গরম চায়ের কাপে।
ভদ্রলোকও আবার নিজে পিছিয়ে বসে চায়ের কাপের দিকে তাকিয়ে চামচটা নেড়ে গুলতে থাকে চিনি… তাঁর মুখ দেখে পৃথার মনে হয় উনি সম্ভবত কিছু ভাবছেন, তাই কিছু না বলে ডান পায়ের ওপরে বাঁ পা’টাকে ক্রস করে রেখে চুপচাপ চা’য়ের কাপে চুমুক দিতে থাকে।
‘বাঃ, চা’টা বেশ ভালো তো?’ একটা সিপ দিয়ে বলে ওঠেন ভদ্রলোক।
পৃথার বুঝতে অসুবিধা হয় না এটা উনি আসলে চা’য়ের প্রশংসা করছেন না, কোন কথার বলার আছে, তাই এই ভাবেই শুরু করতে চাইছেন। কোন উত্তর দেয় না সে, পরের কথার জন্য অপেক্ষা করে চুপ করে।
‘আচ্ছা…’ গলাটাকে একটা খাকারি দিয়ে পরিষ্কার করে নেন ভদ্রলোক, ‘বলছিলাম, ইয়ে… মিস মুখার্জি… আপনি… মানে, আপনার এখানে থাকতে কোন অসুবিধা হচ্ছে না তো?’
‘অসুবিধা? ঠিক কি ধরনের অসুবিধা বলতে চাইছেন বলুন তো?’ পালটা ঘুরিয়ে প্রশ্ন করে পৃথা।
‘না, মানে, এই আর কি… আপনি তো শুনেছি এই শহরে নতুন, তাই ওই আর কি, বলছিলাম যে…’ কুন্ঠিত গলায় বলেন ভদ্রলোক।
‘এ বাবা, অসুবিধা কি বলছেন… সত্যি বলতে কি আমি তো ভাবতেই পারিনি যে কোলকাতায় এসে এত সুন্দর একটা ফ্ল্যাট পেয়ে যাবো, আর সেটাও এত সহজে… বরং সে দিক দিয়ে বলতে গেলে আমি যথেষ্ট লাকি… এই রকম একটা সাজানো গোছানো ফ্ল্যাট, তাও আবার এত কম রেন্টএ, এ তো যে কোন কারুর কাছেই ভিষন লোভনীয়, তাই না?’ বলতে বলতে সোজা হয়ে উঠে বসে পৃথা।
‘হ্যা, সেটা সত্যি… কোলকাতায় এত কম রেন্টএ এমন একটা ফার্নিসড ফ্ল্যাট সচরাচর পাওয়া একটু দুষ্করই বটে… আসলে…’ বলতে বলতে থেমে যায় ভদ্রলোক।
‘আসলে?’ কথাটায় টান দেয় পৃথা।
‘না, মানে ওই আর কি… আসলে এই ফ্ল্যাটটা তো সহজে কেউ ভাড়া নিতে চাইছিল না, তাই কম রেন্টএই দিতে হল।’ কথাটা শেষ করেন ভদ্রলোক।
‘আচ্ছা, একটা কথা জিজ্ঞাসা করব?’ এবার প্রশ্ন করে পৃথা।
‘হ্যা, হ্যা, বলুন না…’ ভদ্রলোক সশব্যস্ত হয়ে বলে ওঠেন।
‘না, মানে, আমি আগেও শুনেছি, এখন আপনিও বলছেন যে, এই ফ্ল্যাটটা নাকি সহজে কেউ ভাড়া নিতে চাইছিল না, কিন্তু এত সুন্দর একটা ফ্ল্যাট, আমি ঠিক মেলাতে পারছি না ব্যাপারটা…’ জিজ্ঞাসা করে পৃথা।
‘হ্যা, কিছুটা আপনি ঠিকই শুনেছেন… তবে আপনাকে আমি বলতেই পারি যে, যেটা শুনেছেন সেটা নেহাৎই একটা বাজে রটনা, আসলে সেই রকম কিছু কোন ব্যাপারই নেই… লোকে শুধু শুধুই বিনা কারণে উল্টোপাল্টা কথা শুনে ভয়ে ফ্ল্যাটটা ভাড়া নিতে চাইতো না… নয়তো বলুন না, আপনার কি কোন অসুবিধা হচ্ছে এখানে… প্রায় এতো দিন তো থাকলেন… বলুন?’
‘না, তা হচ্ছে না ঠিকই… বরং আমি তো ভিষন ভাবে আপ্লুত, এই রকম একটা ফ্ল্যাট পেয়ে… কিন্তু তবুও… লোকে কি শুধু শুধুই ভয় পেতো?’ ফের জিজ্ঞাসা করে পৃথা। ‘আর তাছাড়া আমি শুনেছি আগেও বেশ কয়একটি ফ্যামিলি এসেছিল এই ফ্ল্যাটে, তারা নাকি দিন দুয়েকের বেশি থাকতেই পারেনি? সেটাই বা কেন?’
‘আসলে, তারা ঠিক আপনার মত এত ভালো ছিল না…’ কাঁচুমাচু মুখে উত্তর দেবার চেষ্টা করেন ভদ্রলোক।
‘আমার মত ভালো ছিল না? সেটা আবার কেমন কথা?’ অদ্ভুত লাগে প্রনববাবুর উত্তরে পৃথার।
‘ওহ… না, না, আমি ঠিক সেই ভাবে কথাটা বলতে চাই নি… প্লিজ ডোন্ট টেক ইট আদার ওয়াইজ… আসলে আমি বলতে চেয়েছি যে আপনি একেবারে নির্ঝঞ্ঝাট মানুষ… একা থাকেন… তাই আর কি…’ কি বলবেন ঠিক বোধহয় বুঝে উঠতে পারেন না ভদ্রলোক।
‘আচ্ছা, সে না হয় বুঝলাম, কিন্তু আমাকে একটা কথা বলুন তো, আপনি তখন ফোনে বললেন যে আপনি ওই কি যেন নাম… অর্নব না কি… তার প্রপার্টিটা দেখাশোনা করেন… তাহলে কি এই ফ্ল্যাটটাও ওনারই?’ প্রশ্ন করে পৃথা।
কথার প্রসঙ্গান্তর ঘটতে বোধহয় একটু আশ্বস্ত হন প্রণববাবু, তাড়াতাড়ি করে বলে ওঠে, ‘হ্যা, ঠিকই তো… এ সব কিছুই অর্নবের, আমার কিছুই নয়, আমি শুধু অর্নবের হয়ে দেখাশোনা করি মাত্র…।’
‘ও, তা আপনার এই মিঃ অর্নব না কে, তিনি কি করেন, তিনি কি এই শহরেই থাকেন নাকি অন্য কোন শহরে অথবা বিদেশে থাকেন?’ হাত থেকে খালি চায়ের কাপটা ট্রেতে রাখতে রাখতে প্রশ্ন রাখে পৃথা।
নিজের খালি কাপটাও এগিয়ে রেখে দেন ট্রে’র ওপরে, তারপর সোফায় হেলে বসে পকেটে হাত ঢোকান প্রণববাবু, পরক্ষনেই কি মনে করে পৃথার দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘সরি, আমি একটা সিগারেট ধরাতে পারি… ইফ ইয়ু ডোন্ট মাইন্ড…’
‘হ্যা, হ্যা… নো প্রবলেম… প্লিজ… ক্যারি অন…’ বলে উঠে দাঁড়িয়ে সেন্টার টেবিলের ওপর থেকে সব কাপগুলো আর আগের জলের গ্লাসটাকে ট্রে’টার মধ্যে রেখে নিয়ে এগিয়ে যায় কিচেনের দিকে। সিঙ্কের মধ্যে এঁটো কাপ গুলো রেখে দিয়ে ফিরে আসে সে। আসার পথে বেডরুমে ঢুকে নিজের সিগারেটএর প্যাকেটটা আর লাইটারটা তুলে নেয়… প্রণববাবু সিগারেট ধরাচ্ছে দেখে তার নিজেরও সুবিধা হয়। সোফায় বসে প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ঠোঁটের কোনে ঝুলিয়ে লাইটার জ্বালায়… লাইটারটাকে সেন্টার টেবিলের ওপরে ফিরিয়ে রেখে দিয়ে হেলান দেয় সোফায়… এক রাশ ধোয়া ছাড়ে নাক মুখ দিয়ে। প্রণববাবুও সিগারেটএর ধোয়া ছাড়তে ছাড়তে লক্ষ্য করতে থাকেন পৃথাকে। চোখা চুখি হয়ে গেলে তাড়াতাড়ি চোখ নামিয়ে নেন। মিচকি হাসি খেলে যায় পৃথার ঠোঁটে… বুঝতে অসুবিধা হয় না তাকে এই ভাবে ওনার সামনে এত সহজ ভাবে সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে দেখে একটু অপ্রস্তুতই হয়েছেন ভদ্রলোক… এখনও পুরুষেরা মেয়েদের সিগারেট ধরাতে দেখলে প্রথমে একটা ঝটকা খায়… তাই বুঝেও কিছু বলে না সে, সিগারেটএ আর একটা লম্বা টান মেরে বলে ওঠে, ‘কই, বললেন না তো… আপনার এই অর্নব না কে, সে কোথায় থাকেন? এখানেই বা থাকেন না কেন?’
‘বলছি… তবে আমার মনে হয় তার আগে আমাদের আগে কাজটা সেরে নেওয়া উচিত, আসলে যে জন্য আসা আমার, সেটা ফেলে রেখে কি লাভ, তাই না…’ বলে পাশ থেকে রোল করা কাগজটা হাতে তুলে নিয়ে এগিয়ে দেন পৃথার দিকে।
পৃথা ওনার হাত থেকে কাগজের রোলটা নিয়ে খুলে ধরে চোখের সামনে…
‘ওই যে, দেখুন, তৃতীয় পাতার নীচে আপনার সইটা বাদ পড়ে গেছে, ওটা একটু করে দেবেন কাইন্ডলি…’ পৃথাকে কাগজটা মনোযোগ দিয়ে পড়তে দেখে বলে ওঠেন ভদ্রলোক।
‘আমি একবার চোখ বুলিয়ে নিতে পারি এটাতে?’ প্রশ্ন করে পৃথা।
‘হ্যা, হ্যা, নিশ্চয়ই… দেখে নিন না ভালো করে…’ তাড়াতাড়ি বলে ওঠেন প্রণববাবু।
রেন্ট এগ্রিমেন্টই বটে… পৃথা মুখার্জি আর অর্নব বাসুর মধ্যে… সাধারণতঃ আগডুম বাগডুম যা যা এই ধরনের এগ্রিমেন্টএ থাকে, তাই রয়েছে… তবে একটা জায়গায় গিয়ে সে থমকায়… ভালো করে পড়ে মুখ তোলে ভুরু কুঁচকে… ‘আচ্ছা… এখানে তো কোন রেন্ট ডিউরেশন মেনশন করেন নি… মানে বলতে চাইছি সাধারণত আমি যা শুনেছি, এই ধরনের এগ্রিমেন্ট সামথিং এগারো মাস বা ওই ধরনের একটা টাইম পিরিয়েডের মধ্যে হয়… কিন্তু সেটা তো এখানে নেই… ব্যাপারটা কি? আমার তো মনে হচ্ছে আগে যে এগ্রিমেন্টটায় আমি সই করেছিলাম সেটাতে একটা ওই ধরনেরই টাইম পিরিয়েড মেনশেন্ড ছিল… কিন্তু এটাতে তো দেখছি সেই ক্লজটা সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, কেন?’
‘হ্যা… মানে… না… মানে… হ্যা, ওই আরকি… আপনি ঠিকই ধরেছেন… আগে যখন এগ্রিমেন্ট করার কথা হয়েছিল তখন ওই টাইম পিরিয়ডটা মেনশন্ড করা হয়েছিল, কিন্তু পরে আর কি ওটা আর রাখি নি…’ আমতা আমতা করে উত্তর দেন ভদ্রলোক।
‘রাখেন নি, সেতো দেখতেই পাচ্ছি… কিন্তু হোয়াই? কেন?’ কাগজের ওপরে চোখ বোলাতে বোলাতে ফের প্রশ্ন করে পৃথা।
‘না, ভাবলাম, আপনি বাইরের থেকে এসেছেন, আর তাছাড়া আপনার যখন এই ফ্ল্যাটটা এত ভালো লেগে গিয়েছে, তখন থাক না ওই সব… আপনার যত দিন খুশি… যত মাস… যত বছর খুশি আপনি থাকুন না এখানে… যেদিন ভালো লাগবে না… সেদিন না হয় ছেড়ে চলে যাবেন… আমাদের কোন আপত্তি নেই তাতে…’ অ্যাস্ট্রের মধ্যে সিগারেটএর বাড্সটা চেপে গুঁজে দিতে দিতে কোন রকমে উত্তর দেন প্রণববাবু, পৃথার চোখের দিকে না তাকিয়ে।
‘আমাদের?’ ভুরু কুঁচকে মুখ তোলে পৃথা।
‘না, মানে, সরি, আমার… ওই আর কি…’ তাড়াতাড়ি নিজের ভুলটা সংশোধন করে ওঠেন ভদ্রলোক।
‘ভাড়া অ্যাপ্রিশিয়েষনএর ক্লজটাও তো দেখছি বাদ দিয়েছেন… কি মশাই… এই একই ভাড়ায় সারা জীবন থাকব নাকি আমি?’ এবার একটু হেসেই ফেলে পৃথা।
পৃথাকে হাসতে দেখে বোধহয় একটু মনে বল পান প্রণববাবু, তিনিও হেসে বলেন, ‘থাকুন না… আপনার তাতে কি… যদি মনে হয় বাড়াবেন, দেবেন’খন বাড়িয়ে… আপনার সুবিধা মত… আমি বলার কে?’ বলতে বলতে বুক পকেট থেকে একটা পেন বের করে খাপ খুলে, পেনটা বাড়িয়ে দেন পৃথার দিকে।
পৃথা হাতে ধরা সিগারেটএ একটা টান দিয়ে, সেটাকে অ্যাস্ট্রের ধারে রেখে হাত বাড়িয়ে প্রণববাবুর পেনটা নিয়ে নেয়… তারপর পাতা উল্টে তৃতীয় পাতায় গিয়ে সই করে, পৃথা মুখার্জি, সই এর নিচে তারিখে সেই দিনের উল্লেখ করতে ভোলে না… তারপর পেন আর কাগজের রোলটা ফিরিয়ে দেয় প্রণববাবুর হাতে, নিজে সোফায় আবার হেলান দিয়ে বসে আরাম করে, অ্যাস্ট্রের সাইড থেকে সিগারেটটা তুলে নিয়ে।
প্রণববাবু পৃথার হাত থেকে এগ্রিমেন্টটা নিয়ে ভালো করে রোল করতে থাকেন আবার, আর পৃথা উল্টো দিকের সোফায় হাতের আঙুলের ফাঁকে সিগারেটটা ধরে ওনাকে দেখতে থাকে চুপচাপ।
হটাৎ কেন জানা নেই, পৃথার গায়ে কেমন কাঁটা দিয়ে ওঠে… ঝট করে সে মাথা ঘোরায় ডাইনে, তারপর বাঁয়ে… তার মন যেন বলে ওঠে এই মুহুর্তে ঘরের মধ্যে শুধু সে আর প্রণববাবু নন, আরো একজন কোন তৃতীয় ব্যক্তি উপস্থিত রয়েছে… কিন্তু সেটা শুধু সে অনুভব করতে পারছে মাত্র, দেখতে পাচ্ছে না। ভুরু কুঁচকে যায় তার। তবে কি…
১৫।।
হটাৎ করেই উঠে দাঁড়ায় পৃথা, দ্রুত পায়ে গিয়ে ঢোকে বেডরুমে, বেডসাইড টেবিলের ওপরে রাখা ছবিটাকে হাতে তুলে নিয়ে একবার দেখে, তারপর সেটা হাতে নিয়ে ফিরে আসে ড্রইংরুমে, সোফার ওপরে বসে ছবিটাকে সেন্টার টেবিলের ওপরে রেখে এগিয়ে দেয় প্রণববাবুর দিকে, বলে, ‘আচ্ছা, এই ছবিটা কাদের? এরা কারা? আমি এখানে আসার পর ছবিটাকে বেডরুমে দেখতে পাই, কিন্তু আর কোথাও এদের ছবি পাইনি… ইনিই কি…?’
পৃথার প্রশ্নের ফাঁকেই ছবিটাকে হাতে তুলে নিয়ে দেখতে শুরু করেছিলেন প্রণববাবু, তাই পৃথার কথা শেষ হবার আগেই বলে ওঠেন, ‘হু… এটাই অর্নব, আর ওর পাশে ওর স্ত্রী, লিন্ডা… এটা ওদের হানিমুনে গিয়ে তোলা ছবি… সম্ভবত অন্য কাউকে দিয়ে তুলিয়েছিল।’
কেন জানে না পৃথা, ওর বুকের মধ্যেটায় কেমন একটা ঝড় ওঠে… বুকের মধ্যে যেন হৃদপিন্ডটা অকারণেই কেমন ধক ধক করে বাজতে থাকে… গলার মধ্যেটায় কি কারনে যে শুকিয়ে ওঠে, বোঝে না সে… গলাটা একবার খেকারি দিয়ে ঝেড়ে নিয়ে বলে, ‘ও’… তারপর একটু চুপ থেকে ফের বলে ওঠে, ‘তা, এখন এনারা কোথায়?’
খানিক স্থির দৃষ্টিতে পৃথার পানে তাকিয়ে থাকেন প্রণববাবু, তারপর মাথা নেড়ে ধীর কন্ঠে বলেন, ‘সেটা এই ভাবে বলা সম্ভব নয়… সেটা বলার জন্য সময়ের প্রয়োজন… অনেকটা পিছিয়ে যেতে হবে আপনার এই উত্তরটা দেবার জন্য।’
প্রণববাবুর কথায় একটু বিস্মিত হয় পৃথা, ‘ঠিক বুঝলাম না… এনারা কোথায়, সেটা বলতে এতটা অসুবিধার কি রয়েছে এর মধ্যে?’
‘না, ঠিক অসুবিধা নয়, কিন্তু সেটা এক কথায় উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়… এই আর কি।’
‘আপনার যদি বলতে কোন দ্বিধা থাকে, তাহলে আপনাকে জোর করবো না, থাক তবে… আমারও যে খুব জানার প্রয়োজন তা নয়, জাস্ট কিউরিওসিটি বলতে পারেন… ঠিক আছে, অসুবিধা থাকলে বলতে হবে না… অবস্য আমার জিজ্ঞাসা করাটাই সম্ভবত একটু বাড়াবাড়িই হয়ে গেছে… আসলে অনেক দিন ধরেই আপনার এই অর্নববাবুর ছবিটা আমার বেডরুমে রয়েছে তো, প্রায় সবসময়ই চোখে পড়ে, তাই আর কি জিজ্ঞাসা করছিলাম, ঠিক আছে, নো প্রবলেম, আপনাকে কোন অসুবিধায় ফেলতে চাইনা আমি…’ বলে সোফায় হেলান দিয়ে ফিরে বসে পৃথা। মনে মনে বেশ নিরাশই হয়, কিন্তু মুখে সেই ভাবের প্রকাশ করে না।
আরো কিছুক্ষন চুপ করে ছবিটার দিকে তাকিয়ে থেকে তারপর আসতে আসতে সেটা নামিয়ে রাখে সেন্টার টেবিলটার ওপরে প্রণববাবু, ছবিটার সামনেটা ঘুরিয়ে দেয় পৃথার দিকে… পৃথারও চোখ গিয়ে পড়ে ছবির মধ্যের ছেলেটি, মানে অর্নবের ওপরে। তার মনে হয় যেন ছবির মধ্যে থেকেই তার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে অর্নব, তাকেই যেন দেখছে… ঠোঁটের কোনে কি স্মিত একটা হাসি? না, না, ওটা নিশ্চয়ই ওরই মনের ভুল। ছবির দুজনকেই আরো ভালো করে একবার দেখে নেয় পৃথা, তারপর চোখ তুলে তাকায় প্রণববাবুর দিকে।
ততক্ষনে প্রণববাবু পকেট থেকে সিগারেটএর প্যাকেটটা বার করে নিয়েছেন হাতে, পৃথার সাথে চোখাচুখি হতে প্যাকেটটা খুলে এগিয়ে দিয়ে বলেন, ‘আমি দেখলাম আপনিও গোল্ড ফ্লেকই খান, তবে আপনারটা লাইট আর এটা রেগুলার কিংস, নেবেন নাকি?’
না বলে না পৃথা, সামনে ঝুঁকে এসে হাত বাড়িয়ে প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট টেনে বের করে নেয়… তারপর ঠোঁটের কোনে ঝুলিয়ে লাইটার জ্বালায়… তারপর ফের পিছিয়ে হেলান দিয়ে বসে সোফায়, পায়ের ওপরে পা’টাকে ক্রস করে তুলে রেখে… হাল্কা ধোঁয়া ছাড়ে মুখ থেকে।
প্রণববাবুও নিজের ধরানো সিগারেটএ একটা টান দিয়ে ভালো করে বসেন সোফাতে, তারপর বলতে শুরু করেন, ‘অর্নবের কথা বলতে গেলে আমাকে একটু পিছিয়ে যেতে হবে বেশ কিছু বছর। অর্নবের সাথে আমার বন্ধুত্ব এক বা দুই দিনের নয়, সেই ছোট বেলা থেকে। আমরা একই সাথে বড় হয়েছি। আমরা দুজনেই কিন্তু কেউই কোলকাতার ছেলে নই, আমাদের বাড়ি রায়পুর, ছত্তিসগড়ে, অবস্য এখন সেটা ছত্তিসগড়, আগে ছিল না। আমি সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে হলেও, অর্নবের বাবা কিন্তু যথেষ্ট বিত্তবান। রায়পুরে ওদের বিশাল বাড়ি রয়েছে। ওর বাবা একটা বিরাট ইস্পাত কারখানার মালিক, তাই ও কোনদিনই অভাব কি জিনিস, জানতো না। কিন্তু বড় লোকের ছেলে বলে যে বখে যাওয়া, তা কিন্তু নয়। বরং বলবো ও একেবারেই ওর বাবার স্বভাবের বিপরীত। হয়তো মায়ের মতই হয়ে থাকবে। খুব ছোটবেলায় মাকে হারায়। বাবা বিয়ে করেন আবার। অর্নবের সৎমা কিন্তু ওকে নিজের করেই টেনে নিয়েছিলেন, মায়ের অভাব কোনদিন বুঝতে দেন নি। অথচ বাবার কাছ থেকে ও সেই অর্থে ভালোবাসা বা স্নেহ পায় নি বললেই হবে। অর্নবের বাবা ছিলেন বরাবরই একটু অন্য স্বভাবের, ব্যবসা, অর্থ, প্রতিপত্তি… এই সবই বেশি ভালোবাসতেন কাকাবাবু, মানে অর্নবের বাবা। আমরা ওনাকে কাকাবাবুই বলতাম। ভিষন রাশভারী ছিলেন ভদ্রলোক। তাঁর কথাই শেষ কথা ছিল সর্বদাই। নিজের ব্যবসা নিয়েই থাকতেন সবসময়, সংসারের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা ওই টাকা দিয়েই খালাস হয়ে যেত।
আমরা বড়লোক না হলেও আমার বাবা অনেক কষ্ট করে আমাকে সেই সময়ের শহরের সবচেয়ে ভালো ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। অর্নবের সাথে আমার আলাপ স্কুলে, একই ক্লাসে পড়তাম আমরা। খুব চৌখস ছেলে ছিল অর্নব… কি লেখাপড়ায়, আর কি খেলাধুলায়। কোনদিন সেকেন্ড হয় নি কোন পরীক্ষাতেই। মনে আছে, বোর্ড এক্স্যামেও ফার্স্ট হয়েছিল ও, ছবি বেরিয়েছিল কাগজে। কিন্তু তাতে ওর থেকে যেন আমরা মানে ওর বন্ধবন্ধবেরা বেশি গর্ব অনুভব করেছিলাম সেই ঘটনায়। ওকে নিয়ে অনেকদিন ধরে আমরা সবাই মিলে প্রায় উৎসবে মেতে উঠেছিলাম। খেলাধূলাতেও ও ছিল আমাদের ক্যাপ্টেন। কত ইন্টারস্কুল চ্যাম্পিয়নশিপে যে জিতিয়েছে আমাদের স্কুলকে তার ইয়ত্তা নেই। তাই ও শুধু মাত্র আমাদের বন্ধুদের মধ্যেই নয়, ও ছিল আমাদের স্কুলের শিক্ষকদের কাছেও অতি প্রিয়।
ধীরে ধীরে ক্লাস টুলেভ পাশ রলাম। যথারীতি খুব ভালো রেসাল্ট করল এবারের পরীক্ষাতেও। মনে আছে, স্কুলে থাকতে মেয়েদের মধ্যেও ও ছিল হিরো। ওর কাছাকাছি আসার জন্য মেয়েদের মধ্যে রীতিমত প্রতিযোগীতা চলতো। আমরা দেখতাম আর মজা করতাম এই সব নিয়ে খুব। আসলে ওর চেহারাটা ভিষন সুন্দর ছিল, যত বয়স বেড়েছে, ততই যেন রাজপুত্রের মত দেখতে হয়ে উঠেছিল। যেমন লম্বা, তেমনি গায়েগতরে। ওই বয়সেই হাইট ছিল প্রায় ছয়ের ওপরে, সেই সাথে একেবারে পেটানো বেয়াম করা চেহারা। টকটক করছে গায়ের রং, তেমনি সুন্দর দেখতে, চোখ নাক মুখ কাটা কাটা… সত্যিই যেন রাজপুত্র। ওকে দেখলে মনে হত যেন পূর্ন যুবক। অথচ মনের মধ্যে কোন অহঙ্কার ছিল না কোন কিছু নিয়েই… এত যে বড়লোকের ঘরের ছেলে, কে বলবে দেখলে, আমাদের বাড়িই পড়ে থাকত নির্দিধায়… কতদিন হয়েছে দুপুরে স্কুল থেকে ফেরার পথে, চলে এসেছে আমাদের বাড়ি, মায়ের কাছ থেকে অক্লেশে ভাত চেয়ে খেয়ে গিয়েছে। আমারই এক এক সময় খারাপ লাগতো আমাদের বাড়ির সাধারণ খাবার ওকে খেতে দিচ্ছি ভেবে, কিন্তু ওর মধ্যে তা নিয়ে কোন হোলদোল ছিল না। ওই রকম সাধারণ খাবার, তাই একেবারে চেটেপুটে খেয়ে উঠে যেত। উল্টে মায়ের কাছে আমাকেই বরং মাঝে মধ্যে কথা শুনতে হতো যদি কোনদিন খাবার নিয়ে অশান্তি করেছি তো, অর্নবের দৃষ্টান্ত টেনে মা বলতো, ‘ওকে দেখে কিছু তো শিখতে পারিস…’। সত্যিই, ওকে দেখে অনেক কিছুই শেখার ছিল আমাদের। সেই সাথে ওর নির্ভিক মানসিকতা। ভাবতে পারবেন না, কি অক্লেশে ঝাপিয়ে পড়তে পারতো যদি কেউ কখনও কোন বিপদে পড়েছে শুনেছে। একবার আমাদের এক বন্ধু ফিরছিল কোচিং করে। বেশ রাত হয়ে গিয়েছিল। তখন বোধহয় ক্লাস টুয়েল্ভে উঠেছি… হ্যা, তাই হবে। তা, সেই বন্ধুটি তখন সদ্য প্রেমে পড়েছে, বেশ কিছুদিন ধরেই চলছে ওদের সেই প্রেম পর্ব। আমরা, মানে বন্ধুরা ওদের এই ব্যাপারটা সবাই প্রায় জানতাম। বেশ উৎসাহও দিতাম ওকে এই নিয়ে। বুঝতেই পারছেন, তখন সদ্য কৈশোরে পা রেখেছি, তাই কাছের কেউ প্রেম করছে, সেটা জানার পর আমাদের অ্যাড্রেনিলের পরিমানও যেন বেড়ে থাকতো। ও মেয়েটির সাথে দেখা করে ফিরলেই আমারা প্রশ্নবানে জর্জরিত করে তুলতাম, জানার জন্য, কি বলল, কি করল, এই সব আর কি।’
বলতে বলতে প্রণববাবু থামেন একটু। পৃথার দিকে তাকিয়ে স্মিত হেসে বলেন, ‘বোর করছি না তো? আসলে কি বলুন তো, এই সব কথাগুলো জমে ছিল বুকের মধ্যে। হটাৎ করে আপনার প্রশ্নে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে।’
পৃথাও প্রত্যুত্তরে হাসে। ‘না, না… বোর হবো কেন, শুনতে ভালোই লাগছে। আমিই তো জিজ্ঞাসাটা করেছিলাম। বলুন আপনি…’
‘একটু জল হবে?’ পৃথাকে অনুরোধ করেন ভদ্রলোক।
‘হ্যা, হ্যা, নিশ্চয়… দাড়ান, আনছি এক্ষুনি…’ বলে উঠে দাড়ায় পৃথা। ‘ঠান্ডা দিই?’
কিচেন থেকে একটা গ্লাস এনে ফ্রিজ খুলে জল বের করে ঢেলে বোতলটাকে ফিরিয়ে ঢুকিয়ে রাখে আবার। ফিরে এসে প্রণববাবুর হাতে গ্লাসটা এগিয়ে দেয় পৃথা।
‘থ্যাঙ্কস্, আসলে কথায় কথায় তেষ্টা পেয়ে গিয়েছিল…’ হাসি মুখে বলে ওঠেন ভদ্রলোক।
উত্তরে শুধু স্মিত হাসে পৃথা, মুখ তুলে তাকায় দেওয়াল ঘড়িটার পানে, প্রায় দেড়’টা বাজে, বেশ বেলা হয়ে গিয়েছে। দুপুর বেলায় তার বাড়িতে অতিথি এসেছে, সেখানে না খাইয়ে ছাড়ে কি করে সে? মনে মনে ভাবে পৃথা। কিন্তু এখন রান্না করা সম্ভব নয়, ভদ্রলোককে এই ভাবে বসিয়ে রেখে, তার চেয়ে বরং কিছু অর্ডার করে দিলেই হয়। নিজের সিদ্ধান্তে নিজেই খুশি হয় পৃথা। প্রণববাবুর দিকে ফিরে বলে সে, ‘মিঃ কর্মকার, বেলা তো অনেক হলো, তাই বলছিলাম যে আজকে কিন্তু আপনি আমার এখানেই লাঞ্চ করে যাবেন।’
শুনে শশব্যস্ত হয়ে ওঠেন ভদ্রলোক, ‘এ বাবা, না, না, তা কি করে হয়? আমি তো শুধু মাত্র এগ্রিমেন্টাতে সই করাতেই এসেছিলাম। ছি ছি, দেখুন তো, কি অন্যায়, আমার জন্য আপনার বোধহয় অসুবিধা হয়ে গেল। সত্যিই তো, অনেক বেলা হয়ে গেছে। না, না। আজ বরং আমি উঠি। সই তো হয়েই গিয়েছে। আর একদিন না হয় আমি আসব’খন। তখন না হয় বাকি কথা হবে, কেমন?’ বলে উঠে দাঁড়াতে উদ্যত হন প্রণববাবু।
ওনাকে উঠতে দেখে হাঁ হাঁ করে ওঠে পৃথা, ‘না, না… উঠছেন কেন? আমি আমার জন্য বলিনি এ ভাবে। আর তাছাড়া এই দুপুর বেলায় আপনাকে না খাইয়ে ছাড়িই বা কি করে বলুন, যতই হোক, বাঙালী তো আমরা, নাকি? আমার মা শুনলে তো আমাকে এক হাত নিয়ে নেবে যদি আপনি এই ভাবে দুপুর বেলায় না খেয়ে চলে যান।’
ততক্ষনে উঠে দাঁড়িয়ে পড়েছেন ভদ্রলোক, ‘আপনি শুধু শুধু কুন্ঠিত হচ্ছেন মিস মুখার্জি, কোন অসুবিধা নেই এতে। আর তাছাড়া আজ দেখুন রবিবার, বাড়িতেও আমার ফ্যামিলি অপেক্ষা করছে আমার জন্য, সেখানে আমিই বা কি করে এখানে লাঞ্চ করে ফিরি বলুন। প্লিজ মিস মুখার্জি, অন্য আর একদিন না হয় খাওয়া যাবে’খন। আজকে বরং থাক।’
‘আমি বুঝতে পারছি যে আপনার ফ্যামিলি আপনার জন্য অপেক্ষা করছে, হয়তো ফিরে গিয়েই ওনাদের সাথে আপনি লাঞ্চ করবেন বলেই ঠিক করেছিলেন, কিন্তু এ ভাবে আপনি যদি না খেয়ে আমার বাড়ি থেকে চলে যান, তাহলে আমারও তো ভালো লাগবে না, বলুন। প্লিজ, একটু আমাকে টাইম দিন, আমি এক্ষুনি কিছু অর্ডার করে দিচ্ছি। বেশি সময় লাগবে না, বিশ্বাস করুন।’ বলে ওঠে পৃথা।
‘না, না, আপনি ভুল বুঝছেন আমায়। আসলে সত্যিই আমার এখন যাবার দরকার। আমি বললাম তো, আমি আর একদিন না হয় আসব’খন। আগে থাকেতেই না হয় সেদিন ঠিক করে আসবো। প্লিজ, আজকে আর এটা নিয়ে জোরাজুরি করবেন না। সত্যিই, অনেকটাই বেলা হয়ে গিয়েছে কথায় কথায়।’
পৃথা বুঝতে পারে, আজ যদি প্রণববাবু ফিরে যান, তার অনেক কথাই না জানা থেকে যাবে, যেটা সে কিছুতেই হতে দিতে পারে না। তাকে জানতেই হবে এই অর্নব সম্বন্ধে সমস্ত না জানা কথা। জানতেই হবে। এবারে প্রায় হাত জোড় করেই দাড়িয়ে পড়ে সে প্রণববাবুর সামনে, ‘প্লিজ মিঃ কর্মকার, প্লিজ, ট্রাই টু আন্ডার্স্ট্যান্ড… আজ আমার জানার খুব প্রয়োজন এই অর্নববাবুর সম্বন্ধে… আই ওয়ান্ট টু নো এভরি ডিটেলস অ্যাবাউট হিম… তাই আপনার কাছে আমার একান্ত অনুরোধ, এক্ষুনি যাবেন না আপনি, প্লিজ ফিনিশ ইয়োর স্টোরি… প্লিজ…’
এবার যেন একটু চুপ করে যান ভদ্রলোক। এক দৃষ্টিতে খানিক তাকিয়ে থাকেন পৃথার পানে, তারপর ধীর কন্ঠে প্রশ্ন করেন, ‘কিন্তু কেন মিস মুখার্জি, হোয়াই ডু ইয়ু ওয়ান্ট টু নো অ্যাবাউট অর্নব? এই যে একটু আগেই বলছিলেন যে ইয়ু আর নট ইন্টারেস্টেড টু নো এনিথিং… দেন?’
প্রণববাবুর প্রশ্নে একটু অপ্রস্তুত হয় পৃথা, মাথা নিচু করে বলে, ‘সেটা আপনাকে আমি ঠিক বোঝাতে পারবো না, বাট ইটস ট্রু, দ্যাট আই ওয়ান্ট টু নো হিম, প্লিজ মিঃ কর্মকার, আপনি বসুন, টেল মি অ্যাাবাউট অর্নব।’
খানিক চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন প্রণববাবু, তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে উঠলেন, ‘বেশ, আপনি যখন অর্নবের ব্যাপারে এতটাই ইন্টারেস্টেড, দেন… ওকে… আমি বরং একটা আমার বাড়িতে ফোন করে জানিয়ে দিই… কি বলেন।’
ভদ্রলোকের কথায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে পৃথার মুখটা… তাড়াতাড়ি ঘাড় হেলিয়ে বলে ওঠে, ‘হ্যা, হ্যা মিঃ কর্মকার, সেই ভালো… আপনি বরং জানিয়ে দিন, আমিও দেখি কিছু অর্ডার করে দিই… আপনি চাইনিজ খান তো?’
হেসে ফেলেন ভদ্রলোক, ‘রবিবারের দুপুরের মাংস ভাত ছেড়ে চাইনিজ… বেশ… তাই হোক… হয়তো এটাই ছিল আজকে আমার কপালে…’ বলে হা হা করে হেসে ওঠেন।
পৃথাও প্রণববাবুর হাসিতে হেসে ফেলে।
4
১৬।।
ড্রইংরুমে ছবিটা হাতে নিয়ে চুপ করে সেটার দিকে তাকিয়ে বসেছিল পৃথা। প্রণববাবু বাথরুমে গিয়েছেন কিছুক্ষন আগে, তাই ওই সময়টায় ছবিটাকে হাতে তুলে নিয়েছিল সে। ‘অর্নব, যাক, তোমার নামটা তাহলে এতদিনে জানতে পারলাম’ মনে মনে বলে পৃথা, ‘তুমি যে বিবাহিত, সেটা তো বুঝেইছি, ওটা নিয়ে আমার কোন সন্দেহ ছিল না আগেও… কিন্তু নামটা জানার খুব ইচ্ছা ছিল… শুধু নাম নয়… আমি আরো জানতে চাই তোমার সম্বন্ধে… আরো… সব কিছু… জানি এটা একেবারেই আমার ছেলেমানুষি… আমার এই কৌতুহল তুমি জানতে পারলে নিশ্চয়ই হাসবে… রাগ করবে কি? কেন? রাগ করার কি আছে? আমার তোমার ব্যাপারে জানার ইচ্ছা হতেই পারে… কি? পারে না?… লিন্ডা… মানে তোমার বউ রাগ করবে তাতে? দূর… সেই বা জানছে কি করে? তাই না?… সত্যিই অর্নব… কি অদ্ভুত না? হয়তো তুমি কতওও দূরে কোথায় নিজের বউয়ের কাছে বসে রয়েছে… শুধু বসেই বা রয়েছ বলি কি করে? হয়তো এই মুহুর্তে আদর খাচ্ছ বউয়ের কোলে মাথা রেখে… আর তোমারই ফ্ল্যাটে বসে তোমার কথা চিন্তা করছে একেবারে অপরিচিত একটা মেয়ে… তুমি জানতেও পারছ না… থাকনা… নাই বা জানলে আমার কথা… আমিই শুধু না হয় জেনে রাখি তোমায়… কি মনে হচ্ছে তোমার? ভালোবেসে ফেলেছি তোমায়? সে তো আগেই স্বীকার করে নিয়েছি… যেদিন প্রথম এই ফ্ল্যাটে ঢুকে দেখি তোমাকে, ছবিতে… সেদিনই যে প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম… সেটা তুমি পাগলামী বলো আর যাই বলো… এটা শুধুই আমার… শুধু আমার অনুভূতি… তুমি জানতেও পারবে না… অস্বীকার করবো না… একটু যে লিন্ডাকে হিংসা হয় না তা নয়… একটু কেন… বেশ হিংসা হচ্ছে… ইশ… ও কি লাকি বলো তো… তোমাকে সব সময় কাছে পায়… আর আমি শুধু তোমায় ছবিটাতেই দেখি… কোন দিনও পাব না তোমায়… না?’ ভাবতে ভাবতে কেমন যেন সিরসির করে শরীরটা… আবার সেই অদ্ভুত অনুভূতি… তার মনে হয়, কেউ যেন তার পেছনেই দাঁড়িয়ে রয়েছে… তাকেই দেখে যাচ্ছে এক মনে… বারে বারে কেন যে এই ধরণের অনুভূতিটা তার হয় কে জানে… নিশ্চয়ই মনেরই ভূল।
গলার খ্যাকারিতে চটকা ভাঙে পৃথার… কখন প্রণববাবু বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে দাঁড়িয়েছেন কে জানে… লজ্জা পেয়ে যায় ও… গালের ওপরে লালিমার রেশ লাগে… হাতের ছবিটাকে তাড়াতাড়ি করে সেন্টার টেবিলের ওপরে রেখে দিয়ে প্রণববাবুর দিকে মুখ তুলে হাসে… সে হাসিতে যেন কোন বাচ্ছা মেয়ে লুকিয়ে কিছু করতে গিয়ে ধরা পড়ে যাওয়ার হাসি।
প্রত্যুত্তরে ভদ্রলোক মুচকি হেসে নিজের বসার জায়গায় ফিরে গিয়ে বসে পড়েন… ‘দেখছিলেন ছবিটা?’ প্রশ্ন করেন পৃথাকে।
‘হ্যা, মানে ওই আর কি…’ বলতে বলতে চোখ নামিয়ে নেয় পৃথা… লজ্জা করে এ ভাবে ধরা পড়ে যাওয়াতে।
হাতে লেগে থাকা জলটা রুমাল দিয়ে মুছতে মুছতে বলেন প্রণববাবু, ‘যেটা বলছিলাম তখন… তা সেই বন্ধুটি চুটিয়ে প্রেম করছে… আর আমরা মানে ওর সমস্ত বন্ধুরা ওকে উৎসাহ দিয়ে চলেছি… যত রকম ভাবে তাকে সাহায্য করা যায় সেটা করতে কারুর কোন বিরাম ছিল না… বেশ কাটছিল আমাদের… বাধ সাধল মেয়েটির দাদা… একদিন এসে বেধড়ক মেরে গেল ছেলেটিকে… সে বেচারা আমাদের কাছে এসে কাঁদো কাঁদো মুখে হাজির… প্রেমিকার দাদার হাতে মার খেয়ে ফিরেছে… আমরা তো শুনে খেঁপে উঠলাম… যতই হোক, এ যেন আমাদের সকলের একটা প্রেস্টিজ ফাইট… দল বেঁধে চললাম মেয়েটির দাদাকে শাসাতে… টগবগ করে ফুটছে তখন আমাদের রক্ত… কি সাহস… আমরা থাকতে কি না আমাদের বন্ধুর গায়ে হাত?’
‘খুব বন্ধু বৎসল ছিলেন আপনারা… না?’ হেসে প্রশ্ন করে পৃথা।
‘হ্যা, তা বলতে পারেন… তখন বন্ধুই ধ্যান জ্ঞান… সব কিছু… বোঝেনই তো… কিই বা বয়স তখন…’ হাসতে হাসতে উত্তর দেন ভদ্রলোক।
‘তারপর?’ তাড়া দেয় পৃথা।
‘তারপর আমরা সবাই মিলে গিয়ে দেখা করলাম মেয়েটির দাদার সাথে… কিন্তু সামনে দেখে তো আমাদের সবার অবস্থা খারাপ… এ যে দেখি একেবারে বেয়ামবীর… এই চেহারা… যেমনি বুকের ছাতি… তেমনি হাতের গুলি… তখন কে গিয়ে কথা বলবে সেটাই ঠিক করে উঠতে পারছিলাম না আমরা… প্রত্যেকেরই তখন উৎসাহে ভাঁটা পড়ে গিয়েছে… কেন এলাম সেটাই ভাবছি তখন… ঠিক সেই সময় অর্নব এগিয়ে গেলো লোকটির দিকে… কোমরে হাত রেখে লোকটির চোখে চোখ রেখে তর্ক করতে লাগল বন্ধুর হয়ে… এক কথা দু কথা বলতে বলতে শুরু হয়ে গেলো হাতাহাতি… অর্নবও কম যায় না… দুম করে দিল এক ঘুঁসি লোকটার নাকের ওপরে… গলগল করে রক্ত বেরুতে শুরু করে দিল… হটাৎ করে লোকটা একটা লাঠি নিয়ে চালিয়ে দিল… সেটা গিয়ে সোজা লাগল অর্নবের কপালে… আর একটু হলেই হয়তো ওর চোখটাতেই আঘাতটা লাগতো, কপাল গুনে সেটা হয় নি… কিন্তু বেশ ভালো মত কেটে গিয়েছিল… কিন্তু অর্নবকে কে থামায় তখন… সেই লাঠি নিয়েই বেধড়ক পেটাতে লাগল ওই রকম একটা বেয়াম করা লোককে… শেষে হার স্বীকার করতে বাধ্য করল… দুজনেরই তখন রক্তাক্ত অবস্থা… জামা কাপড় ছিড়ে রক্তারক্তি…’
‘সেই কাটা দাগটা বোধহয় এখনও রয়েছে কপালে…?’ খাটো গলায় প্রশ্ন করে পৃথা, ছবিটার দিকে তাকিয়ে।
‘হ্যা, ঠিক ধরেছেন… ভুরুর ওপরে ওই দাগটা থেকেই গেলো ওর…’ উত্তর দেন ভদ্রলোক।
‘খুব সেক্সি… দাগটা…’ গলাটাকে আরো খাদে নামিয়ে বলে ওঠে পৃথা।
‘অ্যা? কিছু বললেন?’ প্রশ্ন করে প্রণববাবু।
‘নাঃ… কিছু না… তারপর বলুন…’ মাথা নেড়ে বলে পৃথা।
‘পড়াশোনায় খুব ব্রিলিয়েন্ট ছাত্র ছিল অর্নব, জানেন… জয়েন্টএ ভালো র্যাঙ্ক করে আই আই টি কানপূরে কেমিকাল ইঞ্জিনিয়ারিংএ চান্স পেয়ে গিয়েছিল। ওখানেও খুব ভালো রেসাল্ট করেছিল… প্লেসমেন্ট পেলো ডাও’তে… কানাডায়।’ বলতে থাকেন প্রণববাবু। ‘কানাডায় চাকরিতেও খুব তাড়াতাড়ি উন্নতি করে ফেলেছিল… প্রায় বছর পাঁচেকের মধ্যেই চলে গেল সানফ্রান্সিস্কোতে… একেবারে কম্পানির ভাইস প্রেসিডেন্ট কাম চিফ্ ইন্টিগ্রেটিং অফিসার হয়ে… দু হাতে কামাতে থাকলো… সেই সাথে বিশাল সন্মান।’ বলে একটু থামলেন ভদ্রলোক। পৃথাও কিছু না বলে চুপ করে রইলো।
‘এত পয়সা, এত সন্মান… কিন্তু বদলালো না অর্নব একটুও… নিয়ম করে আমাদের সবার সাথে যোগাযোগ রেখে যেত ওখান থেকে… প্রত্যেকের সাথে। এর মধ্যে বাবা মারা গেলেন ওর… আর তার কিছু দিন পর মা’ও। ইন্ডিয়াতে ফিরে সমস্ত সম্পত্তি বেচে দেবে ঠিক করল। অনেক করে বোঝালাম ওকে… ও’র বক্তব্য, কি হবে এখানে এত কিছু রেখে? ফিরবে তো না আর এখানে… ওর ইচ্ছা ছিল বিদেশেই সেটেল্ড করে যাবার… কিন্তু তবুও শেষে দুম করে আমাকে ধরে বসল… বলল, প্রণব, তোকেই দেখতে হবে আমার সব কিছু। আমার তো ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা… আরে… আমি বোঝাতে গেলাম যাতে ও না বিক্রি করে, কিন্তু তাই বলে আমাকে ফাঁসাবে, সেটা তো ভাবি নি… কিন্তু ও বললো, দেখ, তুই যদি না আমার এই প্রপার্টি দেখভাল করিস, তাহলে আমি বেচে দিয়ে চলে যাবো… এবার তোর সিদ্ধান্ত… আমি তা’ও অনেকবার বোঝাবার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু ভবি ভোলার নয়… শেষে আমাকে ওর সমস্ত প্রপার্টির এক্সিকিউটর করে পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি বানিয়ে দিয়ে ফিরে গেল বিদেশে।’
‘সেই থেকেই সামলাচ্ছেন আপনি?’ মৃদু কন্ঠে বলে পৃথা।
‘সেই রকমই বলতে পারেন।’ বলে ভদ্রলোক।
‘ওহ্, এই তাহলে আপনার বন্ধুর গল্প…’ বলে পৃথা… মনে মনে যেন একটু হতাশই হয় সে… হয়তো আরো কিছু আশা করেছিল সে।
টেবিলের ওপরে থাকা ছবিটার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন প্রণববাবু, ‘সেটা হলে তো ভালোই হত মিস মুখার্জি…’
‘মানে? সেটা নয়? আরো…’ বলতে যায় পৃথা।
পৃথার প্রায় মুখের কথা থেকেই বলে ওঠেন প্রণববাবু, ‘হ্যা, আরো… এবারে ফিরে গিয়ে আরো বেশি করে কাজে ডুবে গেল অর্নব। শুধু কাজ, কাজ আর কাজ। ওকে দেখার মত কেউ নেই। এমনিতেই দেখতে রাজপুত্রের মত ছিল, এই কদিন ওখানকার জল হাওয়ায় যেন আরো রূপবান হয়ে উঠল… কোন এক পার্টিতে আলাপ হল ওর সাথে লিন্ডার, লিন্ডা হেল্মস্ট্যাগ, সুইডেনএর মেয়ে…’
লিন্ডার নামটা শুনে একটু নড়ে চড়ে বসে পৃথা… চোখটা তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে তার।
‘অপরূপ সুন্দরী…’ ফের বলতে থাকেন প্রণববাবু, ‘সেটা হয়তো কিছুটা বুঝতে পেরেছেন ছবিতে দেখে… সামনে দেখলে সত্যিই চোখ ফেরানো মুস্কিল… ভগবান সম্ভবত অনেক সময় নিয়ে মেয়েটিকে গড়েছিলেন…’
একটু নড়ে বসে পৃথা… চোখ চলে যায় ছবির পানে… আড় চোখে একবার দেখে নেয় ছবির লিন্ডাকে… সত্যি… কথাটা অস্বীকার করা যায় না… কিন্তু… কিন্তু সেই বা কম কিসে? সেও তো সুন্দরী… সবাই তো তাই বলে? প্রণববাবুর কি তাই মনে হয় না? তার সামনে এই ভাবে অন্য একটা মেয়েকে সুন্দরী বলাটা ঠিক হজম করতে পারে না পৃথা… কিন্তু মুখটাকে যথা সম্ভব অভিব্যক্তিহীন করে রাখার চেষ্টা করে… বুঝতে দেয়না তার মনের মধ্যে গড়ে উঠতে থাকা মেয়েলী হিংসার রেশটুকু… আনমনে কপাল থেকে ঝুলে আসা চুলের গোছা নিয়ে পাকায় আঙুলের ফাঁকে…
‘অর্নবও তাই হয়তো প্রথম দেখাতেই চোখ ফেরাতে পারেনি… আর তাছাড়া সেও তো রূপবান… ওদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে উঠতে বেশি সময় লাগেনি… সময় লাগে নি একে অপরের প্রতি আকৃষ্ট হতে… তারপর থেকে প্রায় ওদের দেখা গিয়েছে সমস্ত জায়গায়… একে অপরের সাথে ঘুরে বেড়াতে… বেশ চলছিল ওদের প্রেমপর্ব… আমাকে অর্নব মাঝে মধ্যেই জানাতো ওদের কথা… ভালো লাগতো শুনে… ভাবতাম যাক, অর্নবটার একটা হিল্লে তো হলো। এরমধ্যে আমিও বিয়ে করলাম… ওকে খবর পাঠালাম আসার জন্য… কিন্তু ও আসতে পারলো না… অবস্য আসা যে ওর পক্ষে সম্ভব হবে না সেটা আমিও জানতাম… কারণ ও যা ব্যস্ত মানুষ, আর যা গুরু দ্বায়ীত্ব ওর ওপরে, সেখানে হটাৎ করে ইন্ডিয়ায় আসা ওর পক্ষে সম্ভব নয়। তাই কিছু মনেও করিনি। আমার বিয়ের পরে পরেই ও জানালো যে ও’ও লিন্ডাকে বিয়ে করতে চলেছে… করেও ফেলল তার পরই… ওই যে ছবিটা… ওটা ও আমাকেই পাঠিয়েছিল অ্যারাকানসাস থেকে… ওদের হানিমুনে গিয়ে…’
সিগারেটএর প্যাকেটটা হাতে তুলে এগিয়ে ধরে প্রণববাবুর দিকে… ভদ্রলোক প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট টেনে নিয়ে বলেন, ‘থ্যাঙ্কস্’, বলে ধরিয়ে টান দেন সিগারেটএ। পৃথাও একটা সিগারেট বের করে জ্বালায় ঠোটের ফাঁকে রেখে… ধোঁয়া ছেড়ে বলে, ‘তারপর…’
‘বছর গড়িয়ে যায়… ভিষন সুখি দুটো মানুষ… একে অপরকে ছেড়ে থাকার কথা চিন্তাও করতে পারে না… যেন মেড ফর ইচ আদার… সব চলছিল ঠিকঠাক… কিন্তু ভগবানের বোধহয় অন্য কিছু ভাবা ছিল… সহ্য হলো না ওদের এত প্রেম… হটাৎ করে ধরা পড়লো লিন্ডার শরীরের মধ্যে বাসা বেঁধেছে মারণ রোগ… হেপাটোসেলুলার কার্সিনোমা… সাধারণ ভাষায় যাকে বলে লিভার ক্যান্সার… যখন ধরা পড়লো… আর কিছু করার নেই… একেবারে লাস্ট স্টেজ… ধরা পড়ার পর আর মাস দুয়েক বেঁচে ছিল বোধহয় লিন্ডা… পাগলের মত চেষ্টা করেছিল অর্নব ওকে বাঁচাতে… কিন্তু পারলো না।’
শুনে স্তব্দ হয়ে যায় পৃথা… এটা সে কোন মতেই আশা করেনি… এই কিছুক্ষন আগেই মেয়েটিকে হিংসার চোখে দেখছিল ও… কিন্তু এটা শোনার জন্য কোন ভাবেই প্রস্তুত ছিল না… জলে ভরে আসে তার চোখদুটি… ধরা গলায় বলে, ‘কি বলছেন মিঃ কর্মকার? লিন্ডা মারা গিয়েছে?’
‘হ্যা মিস মুখার্জি… অর্নবদের দাম্পত্য জীবনের মেয়াদ ঠিক এক বছরের ছিল…’ মৃধু কন্ঠে বলেন প্রণববাবু।
ছি ছি… কত কিই না ভাবছিল সে… মনে মনে নিজের প্রতিই বিরক্ত হয় এই ভাবে না জেনে অন্য কারুর সম্বন্ধে কিছু ভেবে নেওয়ার জন্য… লজ্জিত হয় নিজের এই অভব্যতায়… মাথা নিচু করে চুপ করে বসে থাকে।
‘দুম করে চাকরীটা ছেড়ে দিল অর্নব তারপরই, জানেন… ছেড়ে দিয়ে সোজা চলে এলো ইন্ডিয়ায়… আমার সাথে যোগাযোগ করল… কি সান্তনা দেবো বলুন তো এই রকম একটা ঘটনার পর? অর্নব যেন একেবারে বদলে গেল… আগের সেই সদা চঞ্চল ছেলেটা কেমন চুপচাপ হয়ে গেল… বেশ কিছুদিন বসে রইল নিজের বাড়িতে, নিজেকেই বন্দি করে… অনেক বোঝাবার চেষ্টা করলাম, কিন্তু কিছুতেই স্বাভাবিক হতে পারছিল না… বুঝতে পারছিলাম, ও কিছুতেই মন থেকে এই ভাবে লিন্ডার মৃত্যুটা মেনে নিয়ে পারছে না… আর সেটাই তো স্বাভাবিক। প্রায় বছর খানেক চুপচাপ বসে রইল বাড়িতে… আমি কত করে বললাম, ফিরে যখন এসেছিস, তখন না হয় তুইই তোর ব্যবসা পত্তর দেখাশুনা কর… তাতে ব্যবসারও ভালো হবে, আর মনটাও একটু ব্যস্ত থাকাতে ভালো থাকবে… কিন্তু রাজি করাতে পারিনি কিছুতেই।
সময়… সময় মানুষকে অনেক সাহায্য করে, জানেন মিস মুখার্জি… ধীরে ধীরে একটু একটু করে স্বাভাবিক হতে লাগল অর্নব… প্রথম দিকের সেই পাগল পাগল মনোভাবটাও একটু একটু করে কেটে যেতে লাগলো… আমিও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম… নিজের পৈত্রিক ব্যবসাটা তখনও না দেখা শোনা করা শুরু করলেও, নিজেকে আর অতটা বন্দি করে রাখতো না… তবে মাঝে মধ্যেই নিরুদ্দেশ হয়ে যেত… বেরিয়ে পড়তো ব্যাগ গুছিয়ে… ঘুরে বেড়াতো নানা জায়গায়… হটাৎ হটাৎ করে চলে যেত যেদিকে মন যায় সেদিকে মাস দু-মাসের জন্য… আসলে সত্যি বলতে কি, টাকার তো কোনদিনও অভাব ছিল না, তাই সেদিকটায় ভাবতে হয়নি ওকে কখনও। ইচ্ছা হলেই বেড়িয়ে পড়তো… আবার বেশ কিছুদিন পর ফিরে আসতো। প্রথম প্রথম চিন্তা করলেও, পরে আর ওর এই নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া নিয়ে চিন্তা করতাম না… ওকে ওর মতই থাকতে দিতাম… আমিই তখনও দেখাশোনা করে যেতাম ওর সমস্ত কিছু।’
কেন জানে না পৃথা, ওর ও অর্নবের এই পরিবর্তন শুনে ভালো লাগে… যেন একটু নিশ্চিন্ত হয় সে মনে মনে… ম্লান হেসে বলে, ‘যাক, তাহলে অর্নববাবু নিজেকে শেষের দিকে সামলে নিতে পেরেছিল যা’হোক…’ নিজের মনের মধ্যে তৈরী হওয়া খানিক আগের গ্লানিটার কিছুটা যেন প্রশমিত হয় প্রণববাবুর এই তথ্যে।
‘হ্যা, মোটামুটি সামলে নিতে পেরেছিল বলা যেতে পারে… আগের মত সবসময় হাসি ঠাট্টার মধ্যে না থাকলেও, প্রথম দিকে ফিরে একেবারে যে রকম ভেঙে পড়েছিল, সেটার থেকে নিজেকে বের করে নিয়ে এসেছিল অনেকটাই।’ বলে থামলেন ভদ্রলোক। তারপর একটু নিজেকে যেন গুছিয়ে নিয়ে আবার বলতে শুরু করেন, ‘হটাৎ একদিন দুম করে আমাকে বলল, প্রণব, চল, কোলকাতা যাবো… আমি তো শুনে আকাশ থেকে পড়লাম… বললাম, কোলকাতা? কেন? শুনে বলল, এ ভাবে চুপ করে বসে থাকতে ভালো লাগছে না রে, ওখানে গিয়ে একটা কিছু করবো… তুইও বৌদিদের নিয়ে চল আমার সাথে। ততদিনে আমারও বাবা মা গত হয়েছেন ঠিকই, কিন্তু বৌ, বাচ্ছা, তাদের স্কুল, এ ভাবে হটাৎ বললে হয় নাকি? অনেক করে বোঝালাম, কিন্তু কে শোনে কার কথা… বরাবরই ও ওই রকম, একবার যখন মাথায় ঢুকেছে, তখন সেখান থেকে ওকে সরানো কার সাধ্য… শেষে সত্যিই একদিন আমরা সবাই মিলে চলে এলাম কোলকাতায়… ওখানকার ব্যবসা সব কিছু বিক্রি করে দিয়ে… হাতে বেশ ভালো কিছু টাকা পেয়েছিল… তাই দিয়ে ও এখানে একটা বড় কেমিক্যাল ফ্যাক্টারি শুরু করল… নিজে থাকার জন্য এই ফ্ল্যাটটা কিনেছিল আর আমাদের জন্য আর একটা ফ্ল্যাট কিনে দিল। চাইলে ও একটা বাড়িই কিনে নিতে পারতো, কিন্তু সে দিকে গেলো না, বলল, না রে প্রণব, আমার মত একার লোকের জন্য এই রকম ছোট ফ্ল্যাটই ভালো। নতুন ব্যবসায় আমাকে ওর পার্টনার করে নিল… ইনভেস্টমেন্ট ওর… আমাকে শুধু সাথে থাকতে হবে। অর্নবের দূরদর্শিতায় আর অধ্যবশায় ব্যবসা দেখতে দেখতে ফুলে ফেঁপে উঠল… দেখতে দেখতে বছর তিনেক গড়িয়ে গেল… আমাদের প্রডাক্ট প্রচুর বিদেশে যেতে লাগল…’
‘তাহলে এখন উনি কোথায়?’ চিন্তিত গলায় প্রশ্ন করে পৃথা।
‘সেই কথাতেই আসছি এবার… ঘটনাটা খবরের কাগজেও বেরিয়েছিল তখন… হয়তো দেখেও থাকবেন… সব কিছুই ঠিকঠাক চলছিল, একদিন এক ক্লায়েন্ট মিট করতে গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছিল অর্নব… যাচ্ছিল বর্ধমানের দিকে… সেদিন আমারও সাথে যাবার কথা ছিল, কিন্তু সকাল থেকে আমার ছেলেটার ধূম জ্বর হওয়াতে আমি আর ওর সাথে যেতে পারিনি…’ বলে থামলেন প্রণববাবু।
উৎকন্ঠিত গলায় প্রশ্ন করে পৃথা… ‘তারপর? তারপর কি হলো প্রণববাবু?’
‘খুব বৃষ্টি পড়ছিল সেদিন… আমিও ওকে যেতে বারণ করেছিলাম, কিন্তু কথা শুনলে তো… হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল… আমার সামনে দিয়েই গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেল… আর তারপর…’
‘তারপর…’ গলা শুকিয়ে আসে পৃথার…
‘আর তারপর আর কোন খবর নেই…’ বলে চুপ করেন ভদ্রলোক।
‘মানে? খবর নেই মানে?’ একটু যেন গলার স্বরটা জোরে শোনায় পৃথার… ‘আবার কি উনি বেড়াতে চলে গিয়েছিলেন?’
‘নাঃ… এবারে আর বেড়াতে যাবার জন্য নিরুদ্দেশ নয়… রাস্তার ধারে ওর গাড়িটা পাওয়া যায়… জ্বলে কালো হয়ে গিয়েছিল… পরে পুলিশ তদন্ত করে জেনেছিল যে আশপাশের লোক দেখেছিল যে বৃষ্টির মধ্যে হটাৎ একটা বাজ পড়ে ওই গাড়িটার ওপরে… গাড়িটা তখন ওই রাস্তার ধারেই দাঁড়িয়ে ছিল সম্ভবত… কেন, তার উত্তর দেবার আর কেউ নেই… লোকজন দৌড়ে গিয়েছিল সাহায্য করার জন্য… কিন্তু ততক্ষনে সব শেষ… জ্বলেপুড়ে খাঁক হয়ে গিয়েছিল গাড়িটা…’ বলে চুপ করেন ভদ্রলোক।
গলার মধ্যেটায় কি একটা দলা পাকায় পৃথার… ঘরের মধ্যের সমস্ত কিছু যেন ঘুরছে চোখের সামনে… খুব কষ্ট করে বলে ওঠে সে, ‘আর… আর অর্নববাবু?’ কেমন যেন কান্নাটা ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে বুকের ভেতর থেকে তার, অনেক কষ্টে চেপে রাখে সে ভদ্রলোকের সামনে।
‘জানি না… গাড়িটা এতটাই জ্বলে গিয়েছিল যে অর্নবের বডিটাও আর পাওয়া যায় নি… একেবারে মুছে গেল বরাবরের জন্য… হারিয়ে গেল সে…’ বলে চুপ করেন প্রণববাবু।
পৃথাও থম মেরে চুপ করে বসে থাকে সোফায়… কথা সরে না তার মুখ থেকেও… এ কি করে সম্ভব… একটা গোটা জলজ্যান্ত মানুষের এই পরিণতি হতে পারে নাকি? কিছুতেই যেন মেলাতে পারে না সে… অর্নবকে নিয়ে সে কল্পনার জাল বুনেছিল ঠিকই, কিন্তু সেও জানতো যে সেটা অবাস্তব… সেটা ছিল নিছকই নিজের মত করে নিজেকে আনন্দ দেওয়ার… হয়তো সেটা ভালোবাসা নয়, সামান্য মোহো… হিংসা হয়েছিল লিন্ডার ভাগ্য দেখে এই রকম একটা মানুষকে নিজের করে পেয়েছে বলে ঠিকই… কিন্তু তাদের যে শেষে এই পরিণতি হয়েছিল সেটা সে কিছুতেই মানতে পারে না… না, না, একি করে হয়… একটা মানুষ এই ভাবে…
দরজায় বেল বাজার আওয়াজ হয়… কিন্তু কানে যায় না পৃথার… ডুবে থাকে সে আপন চিন্তায়… আবার বেল বাজতে প্রণববাবু মৃদু গলায় বলেন, ‘মিস মুখার্জি… বেল বাজছে… সম্ভবত কেউ এসেছে…’
‘এ্যা? হ্যা…’ সম্বিত ফেরে পৃথার… ধীর পায়ে উঠে যায় দরজার দিকে… তখনও যেন ঘোরের মধ্যে রয়েছে সে… দরজা খুলে দেখে ওর অর্ডার দেওয়া খাবার নিয়ে একটি ছেলে দাঁড়িয়ে রয়েছে দরজার ওপারে।
১৭।।
প্রণববাবু ঘুরে যাবার পর বেশ কিছুদিন কেটে গিয়েছে, এক সন্ধ্যায়, ফ্ল্যাটের দরজা খুলে ঘরে ঢোকে পৃথা তড়িঘড়ি… ‘ইশ… খুব ভুল হয়ে গেছে আজকে…’ মনে মনে ভাবে… সকালবেলায় বেরুবার সময় সাধারণত যে ব্যাগটা নিয়ে অফিসে যায়, সেটা আজকে নেয় নি, আর তার ফলে ছাতাটাও বের করতে ভুলে গিয়েছিল ওই ব্যাগটা থেকে। ফেরার পথে এই রকম ঝেঁপে বৃষ্টি নামবে কে জানতো… একেবারে চুপচুপে ভিজে গিয়েছে… কতক্ষন অটোর জন্য দাঁড়িয়েছিল… এমন জায়গায় অটো স্ট্যান্ডটা যে একটু যে শেডের তলায় দাঁড়াবে, তারও যো নেই… দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিজতে হয়েছে ওকে…
পায়ের জুতোটাকে কোনরকমে খুলে হাতের ব্যাগটাকে সোফার ওপরে ছুড়ে দিয়ে বাথরুমের দিকে দৌড়ায়… এ ভাবে এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে ড্রইংরুমের মেঝেটা ভিজে নোংরা হয়ে যাবে শুধু শুধু… পরে তো তাকেই সেই কাদা পরিষ্কার করতে হবে। বাথরুমে যাবার পথেই জামার বোতামগুলো খুলতে থাকে দ্রুত হাতে, ঢুকেই বাথরুমের দরজাটাকে আলগোছে টেনে ভিজিয়ে রেখে গা’য়ের থেকে টেনে জামাটা খুলে ফেলে দেয় বালতিটার মধ্যে… হাত দেয় জিন্সের বোতামে… ভিজে গিয়ে একেবারে সেঁটে গিয়েছে পায়ের সাথে জিন্সটা… বোতাম আর চেন খুলে কোমর থেকে দেহটাকে বেঁকিয়ে চুরিয়ে নেড়ে নেড়ে টেনে নামায় শরীর থেকে প্যান্টটাকে… ‘ইশ… কি কুক্ষনেই না আজকেই জিন্স শার্ট পরে অফিসে গিয়েছিলাম… কুর্তি হলে তাও একটু হালকা হত… এতো একেবারে ভিজে ভারী হয়ে উঠেছে…’ জিন্সটারও জায়গা হয় বালতির মধ্যে… নজর পড়ে নিজের শরীরে পরে থাকে ব্রা প্যান্টির দিকে… ‘দেখ কি অবস্থা… ও গুলোও তো দেখছি ভিজে গিয়েছে… মরণ আর কি… বৃষ্টি হবার আর সময় হলো না… আর একটু পরে নামতে পারতো… ততক্ষনে বাড়ি পৌছে যেতাম… ক’দিন ধরেই গা’টা ম্যাজম্যাজ করছে, তার ওপর এই ভাবে ভিজলাম, জ্বর না আবার এসে যায়…’ হাত ঘুরিয়ে অভ্যস্থ হাতে ব্রায়ের হুকটা আলগা করতে করতে ভাবে পৃথা।
প্যান্টিটা খুলে দাঁড়ায় শাওয়ারের নিচে… কলটা খুলতেই ছাদের রিজার্ভারের জমা ঠান্ডা জল ছিটিয়ে পড়ে নগ্ন দেহের ওপরে… হটাৎ করে গায়ের ওপরে এসে পড়া ঠান্ডা জলে কাঁপুনি ধরে যায় তার… ‘উউউহুহুহুহু…’ করে চিৎকার করে ওঠে… ভিষন শীত করতে থাকে তার… হাত দুটোকে জড়ো করে ধরে বুকের ওপরে… একটু একটু করে জলের ঠান্ডা ভাবটা সয়ে যেতে থাকে শরীরের তাপমাত্রার সাথে… সেও স্বাভাবিক হয় যেন একটু… এবার ভালো করে জলের ধারার নীচে দাঁড়িয়ে শরীরের ওপরে জলটা নিতে থাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে… চোখদুটো বন্ধ করে রাখে আরামে… নিরাবরণ নিটোল তম্বী শরীরটা বেয়ে জলের ধারা মাথার থেকে নেমে ধেয়ে যায় মাটির দিকে।
বাথরুম থেকে বড় তোয়ালেটা সারা শরীরে জড়িয়ে বেরিয়ে এসে দাঁড়ায় ড্রইংরুমের মধ্যে… তোয়ালের খুঁটটা গুঁজে রাখে পায়রার মত দুটো নরম বুকদুটোকে ঢেকে রেখে… শেষ প্রান্তটা গিয়ে হাঁটুর অনেক ওপরেই শেষ হয়ে যায়… নিটোল কাঁধদুটো থাকে সম্পূর্ণ নিরাবরণ… ‘সর্বনাশ… বাইরের দরজাটাই বন্ধ করি নি? দেখেছ অবস্থা!’ বাইরের দরজাটার দিকে তাকিয়ে নিজের ভুলে আঁতকে ওঠে পৃথা… দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে ফাঁক হয়ে থাকা দরজাটার দিকে… হাতের চাপে ঢেলে দেয় দরজাটাকে… ইয়েল লকের খট করে আওয়াজ তুলে বন্ধ হয়ে যায় দরজাটা… ‘ইশ… দেখেছ কান্ড আমার… যদি কেউ ঢুকে পড়তো এখন? এ বাবা… আমিও তো একেবারে ন্যাংটো হয়ে চান করছিলাম…’ যেন নিশ্চিন্ত হতেই একবার উঁকি মারে আধো অন্ধকার কিচেনের মধ্যে… তারপর গিয়ে আলো জ্বালে বেডরুমে… ভালো করে চারপাশটায় চোখ বুলিয়ে নেয় একবার… খেয়াল করে ঘরের লাগোয়া বারান্দার দরজার ছিটকিনিটার দিকে… ‘নাঃ… বাবাহঃ… কেউ ঢোকে নি… ইশ… কি ভুলটাই না করে বসেছিলাম…’ ঘুরে দাঁড়ায় আয়নার সামনে… নিজেই নিজেকে ভেঙচি কাটে আয়নার প্রতিফলনের মধ্যে দিয়ে… জানলার ওপারে তখন অঝরে ঝরে চলেছে বৃষ্টি।
কড়্… কড়্… কড়াৎ… মেঘে ঢাকা সন্ধ্যের কালো আকাশটাকে চিরে বিকট শব্দে বাজটা পড়ল… আকস্মিক বাজের শব্দে চমকে উঠলো পৃথা… তারপরই ঝুপ করে অন্ধকার হয়ে গেল… একটা নিশ্ছিদ্র কালো অন্ধকার ওকে যেন জড়িয়ে ধরল চতুর্দিক থেকে…
চুপ করে খানিক এক ভাবে দাঁড়িয়ে রইল ওখানটাতেই… একটু একটু করে অন্ধকারটা চোখের মধ্যে সয়ে আসতে লাগলো… জানলা দিয়ে আসা বাইরের সন্ধ্যের আলোয় অস্পষ্ট ভাবে চোখে পড়তে লাগলো ঘরের মধ্যেটা… ধীর পদক্ষেপে খুব সাবধানে বেডরুম থেকে বেরিয়ে এসে দাঁড়ালো ড্রইংরুমের মধ্যে… ‘ইশ… এখানেটা তো আরো বেশি অন্ধকার… নিশ্চয় বাজ পড়ে কোথাও কোন ট্রান্সফর্মার উড়েছে… নয়তো এই ভাবে কারেন্ট যেতো না…’ একা একা কথা বলে… হাতড়ে হাতড়ে এগিয়ে যায় কিচেনের দিকে… তাকের ওপর থেকে মোমবাতি আর দেশলাইটা পেড়ে জ্বালায় সেটি… মোমের নরম আলোয় ভরে যায় কিচেনটা… সাবধানে হাতে জ্বলন্ত মোমবাতিটা ধরে ফিরে আসে ড্রইংরুমে… এগিয়ে গিয়ে বাইরের দরজার লকটাকে তুলে দেয় ভালো করে… তারপর গুটিগুটি পায়ে মোমবাতির শিখাটাকে হাতের তেলোর আড়াল করে এগিয়ে চলে বেডরুমের দিকে। বেডরুমের সামনে এসে দাঁড়াতেই জানলা থেকে ঠান্ডা এক ঝলক বাতাস হৈ হৈ করে ঢুকে দুম করে নিভিয়ে দেয় মোমবাতিটাকে… ‘যাহঃ… দূর… ভাল্লাগে না…’ নিভে যাওয়া মোমবাতিটাকে হাতের মধ্যে ধরে স্বগক্তি করে পৃথা… সেটাকে বেডসাইড টেবিলের ওপরেই রেখে দিয়ে সুইচ বোর্ডের কাছে গিয়ে অফ্ করে দেয় ঘরের আলোটাকে তারপর এগিয়ে যায় ঘরের জানলাটার কাছে… জানলার পাল্লাদুটো খুলে দেয়… বাইরের থেকে ঠান্ডা বাতাসের সাথে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির ছাট এসে লাগে ওর চোখে মুখে… ভালো লাগায় মনটা ভরে যায়… জানলার ফ্রেমটায় হাত রেখে মুখটাকে যথাসম্ভব বাড়িয়ে দেয় সামনের দিকে… মুখের ওপরে জলের ঝাপটা নিতে থাকে মনের আনন্দে।
ওই ভাবে থাকতে থাকতে আস্তে আস্তে মাথাটাকে হেলিয়ে জানলার ফ্রেমে ঠেস দিয়ে… অন্ধকার ঘরের মধ্যে একলা সে… কেমন যেন আস্তে আস্তে মনটা ভারী হয়ে ওঠে… প্রণববাবু ফিরে যাবার পর থেকেই মাঝে মধ্যেই আজকাল কিছু ভালো লাগে না তার… থেকে থেকে বুকের মধ্যেটায় একটা না চেনা বোঝা চেপে বসে যেন… হারিয়ে ফেলে নিজেকে এক দুঃসহ চাপা কষ্টের আবর্তে…
জানলার ফ্রেমে মাথা রেখেই মৃধু স্বরে গুনগুন করে গান ধরে আপন মনে…
শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে, পড়ুক ঝরে
তোমারি সুরটি আমার মুখের ‘পরে, বুকের ‘পরে।।
পুরবের আলোর সাথে পড়ুক প্রাতে দুই নয়ানে-
নিশীথের অন্ধকারে গভীর ধারে পড়ুক প্রানে।
নিশিদিন এই জীবনের সুখের ‘পরে দুখের ‘পরে
শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে, পড়ুক ঝরে।
যে শাখায় ফুল ফোটে না, ফল ধরে না একেবারে,
তোমার ওই বাদল-বায়ে দিক জাগায়ে সেই শাখারে।
যা-কিছু জীর্ণ আমার, দীর্ণ আমার, জীবনহারা,
তাহারি স্তরে স্তরে পড়ুক ঝরে সুরের ধারা।
নিশিদিন এই জীবনের তৃষার ‘পরে, ভুখের ‘পরে
শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে, পড়ুক ঝরে।।
কেন জানা নেই, পৃথার চোখের কোল দিয়ে আনমনে গড়িয়ে পড়তে থাকে নোনা জলের ধারা। গানটা শেষ করে চুপ করে আরো খানিকক্ষন ওই ভাবেই দাঁড়িয়ে থাকে বৃষ্টির ছাঁটের মুখে… চোখের উষ্ণ জলের সাথে মিশে যায় বৃষ্টির ঠান্ডা জল। ওখানে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে কখন গায়ের থেকে তোয়ালেটা মাটিতে খসে পড়ে গিয়েছে, খেয়ালও নেই তার… ওই ভাবেই নগ্ন দেহে দাঁড়িয়ে থাকে সে বাইরের পানে তাকিয়ে। সেদিনের পর থেকে কিছুতেই সরিয়ে রাখতে পারছে না অর্নবকে মনের মধ্যে থেকে… একি হয়ে গেলো… একটা কল্পসুখের মধ্যে সে ভেসে ছিল, কিন্তু হটাৎ করে যেন তাকে টেনে হিঁচড়ে বাস্তবের কঠিন মাটির ওপরে আছড়ে ফেলে দিয়ে গেলেন ওই ভদ্রলোক… প্রণববাবু… তার জীবনের সব প্রাণচ্ছলতা যেন কি করে নিমেশে উবে গেল এক ফুৎকারে… তার মনে হচ্ছিল যেন জীবনের সমস্ত রঙ গন্ধ কেউ এক লহমায় মুছে দিয়ে গিয়েছে… একটা বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে তার।
হটাৎ করে ওর সেই অস্বস্থিটা যেন ফিরে আসে… সিরসির করে ওঠে নগ্ন শরীরটা… মনে হয় অন্ধকার ঘরের মধ্যে কারুর উপস্থিতি… অনুভব করার চেষ্টা করে নিঃশ্বাসের মৃদু শব্দ… বিগত বেশ কিছুদিন ধরেই পৃথার মধ্যে এই অনুভূতিটা আরো বেশি করে চেপে বসেছে… শুধু অনুভূতিই বা এখন আর বলে কি করে সে? হাতে গরম বেশ কিছু প্রমাণও তো পেয়েছে ইতিমধ্যেই। ওর জায়গায় যদি অন্য কোন মেয়ে থাকতো, ও নিশ্চিত, এতদিনে পাততাড়ি গুটিয়ে পালাতো ফ্ল্যাট থেকে সে। কিন্তু ও সেটা হতে দিতে পারে না। এত সহজে পিছিয়ে যাবার মেয়ে, পৃথা নয়। প্রথম প্রথম খেয়াল করতো ওর অনুপস্থিতিতে কিচেনে রাখা বিস্কিটের কৌটোটা হয়তো ঠিক জায়গায় নেই, বা ফ্রীজে রাখা রান্না করে রেখে দেওয়া খাবারের ঢাকাটা খোলা… গায়ে মাখেনি সেটা নিয়ে আগে, ভেবেছে হয়তো তারই ভুল, কিন্তু যত দিন গিয়েছে, ততই ব্যাপারটা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ কমে এসেছে। শেষে ইচ্ছা করেই দেখে রাখতো ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে কোনটা কি ভাবে রয়েছে, ফিরে দেখেছে যে, হ্যা, ঠিক যা ভেবেছে তাই, সরে গিয়েছে আগের অবস্থান থেকে খাবারের জিনিসগুলো। শুধু এটাই নয়, বাইরের থেকে ঘরে ঢুকলেই ওর মনে হতো যেন ওর অনুপস্থিতিতে ঘরের মধ্যে কেউ ছিল, দরজার চাবী ঘোরাবার আওয়াজে সরে গিয়েছে। প্রমাণস্বরূপ কতদিন হয়েছে ঘরে ঢুকে দেখেছে যে ফ্যানটাকে ঘুরতে, কিন্তু ও একেবারেই সুনিশ্চিত যে বেরুবার সময় ও সমস্ত সুইচ অফ করে দিয়েই বেরিয়েছিল। অস্বীকার করবে না পৃথা, প্রথম দিকে বেশ ভয় ভয়ই করতো তার, কিন্তু যত দিন গেছে, তত বুঝেছে, যেই থাকুক না কেন তার এই ফ্ল্যাটে, আর যাই করুক সে, কিন্তু তার ক্ষতি কক্ষনো করবে না… কেন জানে না পৃথা, একটা বিশ্বাস বুকের মধ্যে বাসা বেঁধে ছিল… তাই এটা নিয়ে কোন শোরগোলও আর করে নি, কতকটা ইচ্ছা করেই। বিশেষ করে সুশান্তকে তো এই ব্যাপারে কোন কথাই বলে নি ও। কারণ পৃথা জানতো যে সুশান্ত যদি এই সব ঘটনা জানতে পারে, আগে ওকে এই ফ্ল্যাটটার থেকে সরাবে, আর সেটা ও কোন মতেই চায় না… কেন চায় না, সেটা তো ওর থেকে আর ভালো কেউ জানে না। শুধু আগের মত বেখায়াল থাকে না। আজকাল চান করার সময় বাথরুমের দরজাটা বন্ধ করতে ভোলে না, বা রাত্রেও আগের মত একেবারে নগ্ন দেহে ঘুমায় না। শোবার সময় ব্রা প্যান্টি না পড়লেও, একটা পাতলা স্লিপ গায়ে তুলে নেয়। ব্যাপারটা ভৌতিক না কি অন্য কিছু, তার উত্তরও সঠিক ভাবে নেই ওর কাছে… প্রণববাবুর কাছ থেকে অর্নবের শেষ পরিসমাপ্তির কথা শোনার পরও যেন এখন একটা কোথাও ক্ষীণ আশা বুকের মধ্যে বাসা বেঁধে রয়েছে তার…
তাই, এখনো ওই অনুভুতিটা হতেই শিরদাঁড়া দিয়ে কেমন একটা সিরসিরানি বয়ে যায় তার… মেয়েলি স্বজ্ঞায় হাতটা চলে যায় নিজের বুকের ওপরে… হাত পড়তেই খেয়াল হয় নিজের শরীরটা নিরাবরণ… তার অজান্তে কখন তোয়ালেটা শরীর থেকে খসে পড়ে গিয়েছে… একবার ভাবে তোয়ালেটা তুলে জড়িয়ে নেয় শরীরে… কিন্তু পরক্ষনেই সে ইচ্ছা ঝেড়ে ফেলে দেয় মনের থেকে… ওই রকম নগ্ন ভাবেই দাঁড়িয়ে থাকে… ইচ্ছা করে নিজের এই নিটোল নগ্ন শরীরটাকে ঘরের মধ্যে উপস্থিত কায়াহীনের সামনে মেলে ধরে রাখতে… ইন্দ্রীয়টা সজাগ হয়ে ওঠে আরো… বোঝার চেষ্টা করে ঘরের মধ্যে থাকা দ্বিতীয় ব্যক্তির উপস্থিতিটাকে।
হটাৎ কানে আসে ড্রইংরুম থেকে বেজে ওঠা মোবাইলের আওয়াজ… প্রায় চমকে ওঠে সে এই ভাবে হটাৎ করে আওয়াজ পেয়ে… ধড়াস করে ওঠে বুকের মধ্যেটায়… কিন্তু তারপরই হেসে ফেলে নিজের বোকামী দেখে… মাটির থেকে তোয়ালেটা হাতে তুলে নিয়ে ওই অবস্থাতেই দ্রুত এগিয়ে যায় মোবাইলের রিংটোনের আওয়াজ লক্ষ্য করে। অন্ধকারের মধ্যেই সোফাটার অবস্থান আন্দাজ করে হাতের মধ্যে ধরা তোয়ালেটাকে ছুড়ে দেয়… তারপর হাতড়ায় সেন্টার টেবিলের ওপরে মোবাইলটার জন্য… বেজেই চলেছে, কিন্তু কোথায় সেটা? বিরক্ত হয়ে ওঠে মনটা… পরক্ষনেই মনে হয় যে মোবাইলটা ব্যাগ থেকে বেরই করা হয় নি ঘরে ঢোকার পর… সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে এগোতে যায় সোফার দিকে… মনে পড়ে ঘরে ঢুকে সোফার ওপরেই ছুড়ে রেখে দিয়েছিল কাঁধের থেকে ব্যাগটা, গা’য়ের থেকে ভিজে জামা খোলার তাগিদে। ‘উফফফ্…’ যেতে গিয়ে পায়ে ধাক্কা লাগে সেন্টার টেবিলের কোনাটায়… আরো যেন বিরক্তি ছেয়ে ধরে মনের মধ্যে… ব্যথা পাওয়া জায়গায় হাত বোলাতে বোলাতেই এগিয়ে যায় সোফার দিকে… হাতের আন্দাজে কিছুক্ষন আগে ছুড়ে রাখা তোয়ালের নিচ থেকে টেনে বের করে ব্যাগটা… চেন খুলে তাড়াতাড়ি মোবাইলটা বের করে কলার নামের ওপরে চোখ রাখে পৃথা… ‘বাপী?…’ নিমেশে যেন মনের মধ্যে জমে থাকার শত বিরক্তি গুলো কোন এক জাদুর স্পর্শে উবে যায় সাথে সাথে… মুখটা চকচক করে ওঠে এক অপার্থিব ভালো লাগায়… কল রিসিভ করে কানে তোলে ফোনটাকে… ‘হ্যা বাপী… বলো…’ গলার স্বরে আদুরে আভাস মিশে যায়।
‘এতক্ষন কোথায় ছিলিস রে মা? সেই তখন থেকে ফোন বাজছে?’ ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে আসে পৃথার বাবার উদবিগ্ন স্বর।
‘আর বোলো না বাপী, এখানে এই কিছুক্ষন আগে ঝুপ করে লোডশেডিং হয়ে গেলো, তাই খুঁজে পাচ্ছিলাম না ফোনটা… সেই জন্যেই তো ফোনটা তুলতে দেরী হলো…’ বলে পৃথা। ফোনটা কানে নিয়ে ফিরে আসে বেডরুমে… খাটের ওপরে বালিসটাকে টেনে বেডরেস্টে রেখে ভালো করে হেলান দিয়ে বসে বলে ‘হটাৎ তুমি ফোন করলে? তোমরা ঠিক আছো তো?’ এবার পৃথার উদবিগ্ন হবার পালা।
‘হ্যা রে মা, আমরা ঠিক আছি… আসলে তুই ফোন করিস নি আজকে সন্ধ্যেবেলায়, তাই তোর মা একটু অস্থির হয়ে উঠছিল, সেই জন্য ভাবলাম একবার ফোন করে দেখি… এই নে, মায়ের সাথে কথা বল…’ বোঝা গেল কথাগুলো বলে ফোনটা এগিয়ে দিলেন নিজের স্ত্রী’য়ের দিকে।
‘ইশ… সত্যিই তো… মাকে ফোন করতে একদম ভুলে গিয়েছি…’ মনে মনে ভাবে পৃথা। আসলে প্রতিদিনই নিয়ম করে অফিস থেকে ফিরে একবার মায়ের সাথে ফোনে কথা বলে পৃথা, এটা অবস্য ওর মায়েরই কড়া নির্দেশ… মেয়ে যতক্ষন না বাড়ি ফিরে ফোন করে, ততক্ষন যে ওনারা দুশ্চিন্তায় থাকে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। পৃথা এই নিয়ে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছে, ও বড় হয়েছে, এখন এই রকম দুশ্চিন্তা করার কোন মানেই হয় না, কিন্তু তবুও, শোনেন নি ওর মা, মেয়ে যতই বড় হোক না কেন, তবুও, সে এত দূরে থাকে, সেখানে একবার ফিরে ফোন করলে যে কোন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না সেটা ভালো করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন মেয়েকে। অগত্যা, সেটাই দস্তুর হয়ে গিয়েছে কোলকাতায় আসা ইস্তক… প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরে মাকে একবার ফোন করে কথা বলতেই হয় তাকে। কিন্তু আজকে বৃষ্টিতে ভিজে গিয়েই সব কিছু গন্ডগোল হয়ে গিয়েছে… ভিজে জামা ছেড়ে চান করে হয়তো ফোন করতো, কিন্তু তার মধ্যে লাইটটাও গেছে নিভে… তাই মাথা থেকেই বেরিয়ে গিয়েছে ফোন করার ব্যাপারটা।
‘তুই কি রে তিতির? একটা ফোন করতে এত অনিহা… জানিস আমরা কত টেনশন নিয়ে বসে থাকি তোর ফোনের অপেক্ষায়… এটা আর কবে বুঝবি বলতো… একটা ফোন করতে পারিস না? বুঝবি বুঝবি… যখন মা হবি তখন বুঝবি যে বাবা মা কি রকম টেনশন করে সন্তানদের জন্য… আর কি ভাবে বোঝাবো তোকে…’ একের পর এক সুনামীর মত মায়ের অভিমান ভেসে এসে আছড়ে পড়তে থাকে পৃথার কানের মধ্যে… তাকে কিছু বলার সুযোগই দেন না…
শেষে একটু গলাটা তুলেই বলে ওঠে পৃথা, ‘আরে বাবা, তুমি থামবে? আগে শুনবে তো কেন ফোন করি নি…’
‘হ্যা, আর কি শোনাবি… ওই তো বলবি অফিসের এত কাজের চাপ যে ফোন করতেই ভুলে গিয়েছি… সেটাই তো হয় রে… সন্তান যখব বড় হয় তখন এই ভাবেই বাবা মায়েদের ভুলে যায় তারা…’ শেষে দিকে সম্ভবতঃ গলাটাই ধরে আসে পৃথার মায়ের…
‘আরে বাবা, না না, সে সব কিচ্ছু নয়… আজকে অফিস থেকে ফেরার পথে একেবারে ভিজে গিয়েছিলাম… তাই…’ আর কথা শেষ করতে পারে না পৃথা… তার আগেই প্রায় ঝাপিয়ে পড়েন তার মা, ফোনের মধ্যেই…
‘সে কি রে তিতির… তুই বৃষ্টিতে ভিজেছিস… কি করে?… কেন ছাতা ছিল না… তাও ভিজলি কি করে? এখনও ভিজে কাপড়েই রয়েছিস না কি রে? এ বাবা, সেটা আগে বলবি তো… ঠান্ডা লাগে নি তো? টেম্পারেচার নিয়েছিস… জ্বর এসে যায় নি তো?…’ এবার শুরু হয় উদবিগ্ন প্রশ্নের ধারা।
‘আরে না, সেই রকম কিছ নয়… আজকে ছাতাটা নিয়ে যেতে ভুলে গিয়েছিলাম… তাই আসার সময় একটু ভিজে গিয়েছি… তাও অনেক আগে…’ বলে বোঝাতে যায় মাকে…
‘অনেক আগে ভিজেছিস… এখনও সেই ভিজে জামা কাপড়েই রয়েছিস নাকি? শিগগির ছেড়ে ফেল ভিজে কাপড় জামা… এই জন্যই চিন্তা হয় তোকে নিয়ে… তোকে বরাবর বলেছি ভিজে জামা কাপড়ে থাকবি না… এই জন্যই চাইনি দূরে গিয়ে একা থাকিস… কিন্তু শুনলে তো মেয়ে মায়ের কথা… আর শুনবেই বা কেন? মায়ের কথা তো… তার মূল্যই বা কতটুকু…’
‘তুমি এবার থামবে? নাকি ফোনটা রাখবো?’ এবার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙতে শুরু করে পৃথার… একে মনটা ভালো নেই, তার ওপরে মায়ের এই অনর্থক বকবকানি… ভালো লাগে?
এবার আর কোন কথা আসে না ফোনের ওপার থেকে… পৃথাও বোঝে ঝাঁঝিয়ে ওঠাটা একটু কাজ দিয়েছে হয়তো, আর তা না হলে অভিমানে মুখ ভার হয়েছে মায়ের… গলার স্বরটাকে স্বাভাবিক করে বলে সে, ‘না, মা, রাগ করছ কেন? আমি তো ভিজে জামা কাপড় সব ছেড়েই ফেলেছি… আর দেখ, চানও করে নিয়েছি সঙ্গে সঙ্গে… সত্যিই… বিশ্বাস করো…’
মেয়ের কথায় একটু আস্বস্থ হন ভদ্রমহিলা, গলাটা নামিয়ে বলেন, ‘ঠিক তো মা, চান করে নিয়েছিস তো… আজকে আর রাতে আর ফ্যান চালিয়ে শুস না… লক্ষ্মী মা আমার… দেখ… তুই ওখানে একা আছিস, খুব চিন্তায় থাকি রে মা…’
হেসে ফেলে পৃথা… ‘উফ্ এত চিন্তা করো না মাদার ইন্ডিয়া… তোমার তিতির এখন বড় হয়ে গেছে… সেই ছোট্টটি আর নেই… এখন নিজেই সব কিছু একা সমলাতে পারে… বুঝলে?’
‘ছাই বড় হয়েছিস… এখনও তো খাইয়ে না দিলে খাস না… সেখানে কত যে বড় হয়েছিস তা আমার জানা আছে…’ বলে ওঠেন পৃথার মা।
‘তুমি এখনও ঝগড়া করবে আমার সাথে?’ আদুরে গলায় বলে ওঠে পৃথা।
মেয়েকে এই ভাবে বলতে শুনে আর রাগ করে থাকতে পারেন না ওর মা, ‘না রে মা, রাগ নয়, চিন্তা হয়… একা একা থাকিস তো… তাই… একটু সাবধানে থাকিস, কেমন… আর যদি শরীর খারাপ লাগে ডাক্তার দেখিয়ে নিতে ভুলিস না… আমাদেরও সাথে সাথে ফোন করিস… এই নে… বাবা আবার ব্যস্ত হচ্ছে, কথা বল বাবার সাথে…’
হটাৎ ড্রইংরুমের আলোটা জ্বলে ওঠে… কারেন্ট চলে আসে… আগেই বেডরুমের আলোর সুইচটা নিভিয়ে রাখাতে ঘরের আলোটা আর জ্বলেনি তাই… তবুও ড্রইংরুমের থেকেই বেশ খানিকটা আলো এসে ঘরটাকে আলোকিত করে তোলে… ঘরের আলো জ্বালাবার আর খুব প্রয়োজন হয় না।
বাইরে তখনও নাগাড়ে বৃষ্টি হয়েই চলেছে… ঝিরঝিরে বৃষ্টির জলের ছাট এসে ঢুকছে ঘরের মধ্যে… পৃথা বিছানা ছেড়ে উঠে এগিয়ে যায় জানলার কাছে, শার্সিগুলো বন্ধ করে দেয় টেনে… দিয়ে ফিরে আসে বিছানায় আবার।
‘ভিজে গেছিস শুনলাম তোর মায়ের কাছে… এখন ঠিক আছিস তো?’ বাবার গলা পায় ফোনের মধ্যে।
‘হ্যা বাপী, আমি ঠিক আছি… তোমরা চিন্তা করো না…’ বলে থামে একটু, তারপর হটাৎ করে মনে পড়ে যেতে বলে ওঠে, ‘বাপী, তোমার প্রেশারের অসুধটা আনিয়েছিলে? ওটা তো শেষ হয়ে যাবার কথা এত দিনে।’
‘হ্যা, হ্যা, আনিয়ে নিয়েছি, তোকে আর ওখানে বসে আমার অসুধের কথা চিন্তা করতে হবে না রে মা… তুই একটু সাবধানে থাকিস, তোর মা বড্ড চিন্তা করে তোকে নিয়ে।’
‘হুম… আমার মা শুধু চিন্তা করে, আর আমার মিষ্টি বাপী এক্কেবারেই ভাবে না তার প্রিন্সেসকে নিয়ে, তাই তো?’ হাসতে হাসতে বলে বাবার কথার জবাবে।
‘না, মানে, আমারও চিন্তা হয় না যে তা নয়, তাও…’ আমতা আমতা করেন ভদ্রলোক।
‘থাক, জানা আছে আমার, আমার বাপীর কাছে আমি কি… আচ্ছা, এবার রাখো… কারেন্ট এসে গেছে…’ হাসতে হাসতে বলে পৃথা।
‘সেকি রে, এতক্ষন কারেন্ট ছিল না?’ প্রশ্ন করেন পৃথার বাবা।
‘না তো… আর সেই সাথে কি বৃষ্টি হচ্ছে বাপী কি বলবো… সেই সন্ধ্যে থেকে নেমেছে, সমানে চলছে… এই এত্তো বড় বড় ফোঁটা… জানলা বন্ধ করে দিতে হয়েছে, এত ছাঁট আসছে…’ হাত নেড়ে বলতে থাকে নিজের বাবাকে।