বজ্রাঘাত - অধ্যায় ১৫
‘দেখিস মা, সাবধানে থাকিস… কেমন… এবার রাখি?’ বলেন ভদ্রলোক।
‘হ্যা, হ্যা, রাখো… তোমরাও সাবধানে থেকো… কেমন… লাভ ইয়ু বাপী… মাকেও চিন্তা করতে বারণ কোরো…’ বলে ফোনটা কেটে দেয় পৃথা।
‘নাঃ, আজ আর রাত্রে কিছু খাবো না… ভাল্লাগছে না… চোখগুলোও কেমন জ্বালা জ্বালা করছে, কে জানে, জ্বর আসবে কি না? মা শুনলে তো লাফাতো… ভাজ্ঞিস কিছু বলি নি… দেখি, শুধু একটু হরলিক্স গুলে খেয়ে শুয়ে পড়বো… কাল সকালে যা হোক দেখা যাবে’খন…’ ভাবতে ভাবতে উঠে দাঁড়ায় বিছানা ছেড়ে… মাথাটা কেমন ভার লাগে… হাতের তেলোটা উলটে ছোয়ায় কপালে, একটু যেন গরম মনে হয়। কিচেনে যাবে মনে করেও আর যায় না, বাথরুমের দিকে এগোয়। কোমডের ওপরে বসে হিসি করে হাল্কা হয় খানিকটা, তারপর উঠে হাতে জল নিয়ে পরিষ্কার হয়ে ফিরে আসে আবার বেডরুমেই। আসার পথে ড্রইংরুমের আলোটাও নিভিয়ে দেয়। মনে হয় কেমন যেন শীত শীত করছে… ঘরের ফ্যানটার রেগুলেটর ঘুরিয়ে একটু কমিয়ে দিয়ে কাবার্ড থেকে একটা গোল গলার টি-শার্ট বের করে পড়ে নেয় গায়ে… তারপর বালিশটা টেনে শুয়ে পড়ে বিছানায়… হাত বাড়িয়ে বেডসাইড টেবিলের ওপরে রাখা অর্নবের ছবিটায় একবার আলতো করে হাত বোলায়… ‘একটু পরে না হয় উঠে হরলিক্সটা করে নেবো’খন’ ভাবতে ভাবতে চোখ বন্ধ করে পৃথা।
১৮।।
‘ওহ্ মা…’ চোখ বন্ধ অবস্থাতেই গুঙিয়ে ওঠে পৃথা… মাথার ওপরে ঠান্ডা জলের ধারা খারাপ লাগে না… কানে আসে চুল থেকে বালতির মধ্যে ঝরে পড়া জলের শব্দ… চোখটা খুলে দেখার চেষ্টা করে… কিন্তু পারে না… অসম্ভব ভারী হয়ে রয়েছে চোখের পাতাদুটো… ইচ্ছা করলেও খুলতে পারে না সে দুটোকে… আর সেই সাথে ঘরের মধ্যে জ্বলতে থাকা আলোটাও বড্ড চোখে লাগে তার… চোখ বন্ধ করে থাকাটাই বেশি ভালো লাগে… ঠোটদুটোও শুকিয়ে উঠেছে… জিভটা বের করে চেটে ঠোটটাকে ভিজিয়ে নেবার চেষ্টা করে সে… ‘আহ্… উম্…’ ফের গোঙায় পৃথা… মাথাটা মনে হচ্ছে যেন যন্ত্রনায় ছিঁড়ে যাচ্ছে একেবারে…
চোখ বন্ধ থাকলেও বুঝতে অসুবিধা হয় না সেই এই মুহুর্তে বিছানায় আড়াআড়ি ভাবে শুয়ে রয়েছে… পা থেকে গলা অবধি একটা চাঁদর টানা… মাথাটা ঝুলছে বিছানা থেকে বাইরের দিকে… আর কেউ একজন তার মাথাটাকে নিজের হাতের তেলোর মধ্যে পরম মমতায় ধরে রেখে তপ্ত কপালের ওপর দিয়ে ঠান্ডা জল ঢেলে চলেছে এক ভাবে… ঘাড়ের নীচে একটা তোয়ালে গোঁজা… হয়তো বিছানাটা যাতে না ভিজে যায়, সেই প্রয়াশে…
জলের ধারা বন্ধ হয় একটু পরে… যেই তার মাথাটা ধরে থাকুক, খুব সাবধানে নিজের কোলের ওপরে তুলে নিয়ে ঘাড়ের নিচ থেকে তোয়ালেটা টেনে বের করে মাথার জল মুছিয়ে দিতে থাকে পরম মমতায়… পৃথা মুখে কিছু না বলে চুপ করে চোখ বন্ধ করেই শুয়ে থাকে ওই ভাবে। মাথা মোছানো শেষ হলে সাবধানে আবার বিছানায় সোজা করে বালিশের ওপরে মাথাটা ফিরিয়ে শুইয়ে দেওয়া হয় তাকে… ভিজে তোয়ালে দিয়ে তার ঘাড়, মুখ আলতো হাতে মুছিয়ে দিতে থাকে আগুন্তুক… কে… কে সেবা করছে তার? মনে মনে ভাবার চেষ্টা করে পৃথা… কিন্তু মাথার মধ্যে এতই যন্ত্রনা হচ্ছে যে ইচ্ছা করে না সেটা নিয়ে বেশি চিন্তা করতে… চুপচাপ নিজের তপ্ত অসুস্থ শরীরটাকে সমর্পন করে দেয় আগুন্তুকের হাতে। ফ্যানের হাওয়াটা ভেজা চুলের ওপরে লেগে বেশ ভালো লাগে। চোখ বন্ধ করেই খেয়াল করে ধীরে ধীরে তার গায়ের থেকে চাঁদরটা কেউ সরিয়ে কোমর থেকে গায়ের টি-শার্টটা গুটিয়ে খানিকটা ওপর দিকে গুটিয়ে তুলে দিলো… মানে এখন তার উর্ধঙ্গ সম্পূর্ন উন্মুক্ত আগুন্তুকের সামনে… চুপচাপ অপেক্ষা করে সে পরবর্তি কি পদক্ষেপ নেয় সেটা দেখার… আদুল গায়ের ওপরে ভেজা তোয়ালের ছোঁয়া পায়… খুব আলতো হাতে তার সারা গা মুছিয়ে দিতে থাকে আগুন্তুক… নগ্ন নরম অথচ সুগঠিত বুকের ওপর দিয়ে তোয়ালের পরশটা বয়ে যায়… আনমনেই বোঁটাদুটো কেমন অসভ্যের মত শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে যায় বুকের ওপরে, আগুন্তুকের চোখের সামনে… কেমন যেন লজ্জা লাগে তার হটাৎ… লজ্জা লাগে কিন্তু তার সাথে অদ্ভুত একটা ভালো লাগাও মিশে থাকে… বাধা দেয় না… চুপ করে শুয়ে উপভোগ করে আরামের রেশটুকু… ‘উম্… আহ্’ ফের গুঙিয়ে ওঠে সে… মাথার মধ্যেটায় এখনও যেন যন্ত্রনায় ছিঁড়ে যাচ্ছে…
তোয়ালের ছোঁয়া সরে যায় শরীর থেকে… গায়ের টি-শার্টটা ফের নেমে দেহটাকে ঢেকে দেয় কোমর অবধি… চাদর ফিরে আসে গায়ের ওপরে গলা কাছটায়… এবার কপালের ওপরে এক টুকরো ভেজা কাপড়ের উপস্থিতি অনুভব করে পৃথা… একটা হাত… এলোমেলো হয়ে থাকা চুলের মধ্যে দিয়ে ঘুরে বেড়াতে লাগে… বিলি কেটে দিতে থাকে খুব ধীরে, আলতো হাতের ছোয়ায়… দূর থেকে যেন ভেসে আসে একটা স্বর… ‘তিতির… তিতির?’
‘উম্?’ চোখ বন্ধ করেই সাড়া দেয় পৃথা।
‘কষ্ট হচ্ছে, খুব?’ কানে আসে গাঢ় স্বরে করা প্রশ্ন।
‘মাথাটা… মাথাটায় ভিষন যন্ত্রনা করছে… আহ্…’ থেমে থেমে উত্তর দেয় পৃথা।
কপালের ওপরে কাপড়ের টুকরো পালটায়… ফের আর একটা নতুন জলে ভেজা টুকরো এসে লেপটে যায় তপ্ত কপালের ওপরে…
‘এই তো… আর একটু পরেই সকাল হয়ে যাবে… তখন সব ঠিক হয়ে যাবে…’ আশ্বাস দেয় অচেনা গলার স্বর… শুনে আর কিছু বলে না পৃথা… চুপ করে চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকে… কপালের পাশের রগের ওপরে চাপ পড়ে শক্ত আঙুলের… ‘আহ্… হুম্…’ ভালো লাগে এই ভাবে কপালের রগে টিপ দেওয়াতে…
একটু চুপ থেকে বলে ওঠে পৃথা… ‘খুব জ্বালাচ্ছি… না?’
এবারে কিন্তু আর কোন উত্তর আসে না… যদিও তখনও পৃথার কপালের ওপরে আগুন্তুকের হাতের ছোয়া লেগে রয়েছে… তাই জ্বরের মধ্যেও স্মিত হাসি খেলে যায় পৃথার ঠোঁটের ওপরে… ‘কি? উত্তর দেবে না?’ অত কষ্টের মধ্যেও শান্ত গলায় ফের প্রশ্ন করে সে।
কোন উত্তর আসে না… কিন্তু কপালের ওপর থেকে ভেজা কাপড়ের টুকরো বদলায়… মাথার চুলে অচেনা আঙুল বিলি কাটে… হাল্কা হাতের মুঠোয় চেপে চেপে ধরে চুলগুলো… টান দেয় অল্প অল্প… পৃথার আরাম হয় খুব এতে… চোখ বন্ধ করেই হাসি মুখে সেই আরাম উপভোগ করতে থাকে চুপটি করে শুয়ে… বোঝে, এখন আর কোন উত্তর সে পাবে না… কিন্তু তার যা বোঝার আজ সব বোঝা হয়ে গিয়েছে… পরম নিশ্চিন্তে আবার ঢলে পড়ে ঘুমের কোলে।
১৯।।
‘ঠিক আছে, আমি তো এই অসুধটা লিখে দিলাম, এটা আনাবার ব্যবস্থা করুন…’
‘এটা এক্ষুনি আনিয়ে নিচ্ছি… কি মনে হচ্ছে আপনার?’
বেশ কয়একটা অপরিচিত গলার স্বরে চোখ মেলে পৃথা… চোখ খুলেই ফের বন্ধ করে নেয় সাথে সাথে, কাঁচের জানলার শার্শির ভিতর দিয়ে ঘরের মধ্যে এসে পড়া দিনের উজ্জল আলো চোখের ওপরে পড়ার ফলে… তারপর আবার ধীরে ধীরে চোখ খোলে সে… বিছানার পাশে প্রণববাবুকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে, আর তাঁর সাথে আরো একজন অপরিচিত বেশ বয়ষ্ক ভদ্রলোক… ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় প্রণববাবুর পানে…
‘এই তো উনি উঠে পড়েছেন…’ পৃথাকে চোখ খুলতে দেখে বলে ওঠেন প্রণববাবু, তারপর তাকে উদ্দেশ্যে করেই বলেন, ‘আর চিন্তা করার কিছু নেই মিস মুখার্জি… ডাক্তারবাবু আপনাকে দেখে নিয়েছেন, অসুধ পড়লেই ঠিক হয়ে যাবে…’
‘ডাক্তার?’ প্রশ্ন ভরা চোখে তাকায় অপরিচিত ভদ্রলোকের দিকে।
‘হ্যা মা… আমি ডাঃ বসাক… তুমি একটু হাতটা বের করো তো… একটা ইঞ্জেকশন দেবো… ইঞ্জেকশনে আশা করি তোমার কোন ভয় নেই…’
ডাক্তারের কথার কোন উত্তর না দিয়ে চুপচাপ বাঁ হাতটাকে চাঁদরের নিচ থেকে বের করে এগিয়ে দেয় পৃথা… ফের তাকায় প্রণববাবুর পানে… প্রণববাবু হাত তুলে ওকে আস্বস্থ করে ইশারায়… ততক্ষনে টি-শার্টের হাতাটাকে বাহুর ওপরে খানিকটা তুলে স্পিরিটে ভেজা তুলো ঘসতে শুরু করে দিয়েছেন ওই ডাক্তার।
ইঞ্জেকশন দেওয়া হলে, সোজা হয়ে দাঁড়ান ডাক্তারবাবু, প্রণববাবুর দিকে ফিরে বলেন, ‘আর কোন ভয় নেই, সামান্যই জ্বর… আমিও একটা প্যারাসিটামল ইঞ্জেক্ট করে দিলাম, তাতে একটু তাড়াতাড়ি কাজ হবে, আশা করছি দুই একদিনের মধ্যেই একেবারে ঠিক হয়ে যাবে… সামান্যই ঠান্ডা লেগে জ্বর… তবে এই অসুধগুলো আনিয়ে নিন…’ তারপর পৃথার দিকে ফিরে বলে, ‘কোন চিন্তা নেই মা, সব ঠিক হয়ে যাবে, কেমন? নরমাল থাকবে… কোন অসুবিধা হলে আমাকে ফোন করবে…’ বলে নিজের ব্যাগ গোছাতে থাকেন।
‘উনি আজকে কি স্নান করবেন?’ ফের প্রশ্ন করেন প্রণববাবু।
‘হ্যা, হ্যা… করবে না কেন? তবে আজকের দিনটায় একেবারে ঠান্ডা জলে না করে একটু ইষদ্উষ্ণ জল করে নেবেন’খন…’ বলে ব্যাগ গুছিয়ে দরজার দিকে এগোতে থাকেন… ওনার সাথে প্রণববাবুও এগিয়ে যান… পৃথা বিছানায় শুয়ে চুপচাপ দেখতে থাকে ওদেরকে।
ডাক্তারকে দরজা অবদি এগিয়ে দিয়ে ফিরে আসে প্রণববাবু পৃথার কাছে, ‘আমি তাহলে অসুধগুলো আনাবার ব্যবস্থা করি গিয়ে… আপনি একটু শুয়ে রেস্ট নিন…’ বলে ফিরে যেতে উদ্যত হন।
‘এক মিনিট মিঃ কর্মকার… আচ্ছা, একটা কথা বলুন তো আমাকে, আমার জ্বর, সেটা আপনি জানলেন কি করে?’ প্রশ্ন করে পৃথা।
পৃথার প্রশ্ন একটু থমকান ভদ্রলোক, আমতা আমতা করে বলেন, ‘না, মানে, ওই তো… সকাল বেলায় আপনার মেসেজ পেয়েই তো জানতে পারলাম…’
‘আমার মেসেজ পেয়ে?’ অবাক হয়ে তাকায় পৃথা। উঠে বসার চেষ্টা করে সে। এখন অনেকটাই আগের থেকে ভালো লাগছে তার।
তাড়াতাড়ি করে এগিয়ে এসে পৃথার পেছন থেকে বালিশটাকে টেনে খাটের রেস্টবোর্ডের ওপরে কাত করে রাখেন প্রণববাবু, পৃথা পিছিয়ে গিয়ে বালিশে হেলান দিয়ে বসে ফের জিজ্ঞাসা করে, ‘আমার মেসেজ পেয়েছিলেন? সেটা কি করে সম্ভব? আমি কখন আপনাকে মেসেজ করলাম, আর আপনাকেই বা করব কেন?’
কাঁধ শ্রাগ করে ভদ্রলোক বলেন, ‘সে আমি কি করে জানবো বলুন, তবে এই তো দেখুন না…’ বলতে বলতে নিজের পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বের করে মেসেজ লিস্ট খুলে পৃথার সামনে তুলে ধরেন উনি।
পৃথা চোখ সরু করে দেখে সত্যিই তার নাম্বার থেকেই মেসেজটা গিয়েছে — ফিলিং ফিবারিশ… প্লিজ কাম শার্প… — অবিশ্বাসী চোখে ফের তাকায় প্রণববাবুর দিকে… নিজেই বিড়বিড় করে বলে ওঠে, ‘আমি করলাম মেসেজ? কিন্তু… কখন?’ ফের তাকায় সামনে মেলে রাখা মেসেজটার দিকে… তারপরই যেন হটাৎ করে ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যায়… মুখটা সহসা উজ্জল হয়ে ওঠে… স্মিত হেসে ঘাড় নেড়ে বলে, ‘হুম… বুঝেছি… আর কিছু বলতে হবে না…’।
প্রণববাবুও ফের যাবার জন্য ঘোরেন… কিন্তু পেছন থেকে পৃথার আবার প্রশ্ন ভেসে আসে, যেন নিজে কিছু ব্যাপারে সঠিক হবার জন্যই প্রশ্নটা তাঁকে করা, ‘আচ্ছা মিঃ কর্মকার, আর একটা কথা জিজ্ঞাসা করার ছিল…’
‘হ্যা, বলুন…’ আর একটা কোন অস্বস্থিকর প্রশ্ন আসছে বুঝে গোবেচারার মত মুখ করে ঘুরে দাঁড়ান ভদ্রলোক…
‘আপনাকে দরজা কে খুলে দিল মিঃ কর্মকার?’ চোখটাকে তীক্ষ্ণ করে তাকিয়ে থাকে প্রণববাবুর মুখের পানে পৃথা।
‘দরজা…’ ঢোক গেলেন ভদ্রলোক… ‘না… মানে… বোধহয় খোলাই ছিল… মনে হয়…’ কোন রকমে আমতা আমতা করে জবাব খোঁজার চেষ্টা করেন।
আর কিছু বলে না পৃথা… ঠোঁটের হাসিটা আরো খানিকটা শুধু চওড়া হয় তার মুখের… সারা শরীরটা একটা ভিষন ভালো লাগায় ভরে ওঠে… অসম্ভব হাল্কা লাগে নিজেকে… শরীরের সমস্ত কষ্ট যেন নিমেশে উধাও হয়ে গিয়েছে… বেডরুম থেকে দ্রুত পায়ে প্রণববাবুকে বেরিয়ে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে, চোখের দৃষ্টিতে মিশে থাকে কৌতুক।
ভদ্রলোক বেডরুম থেকে বেরিয়েই ফের ফিরে আসেন, সাথে একটি মেয়ে… ‘ওহ! মিস মুখার্জি… এ হচ্ছে কাজল…’
পৃথা জিজ্ঞাসু চোখে তাকায় মেয়েটির দিকে… ছোট্ট খাট্টো চেহারার গোটা কুড়ি বছরের মেয়েটি… গায়ে একটি কম দামী হলেও বেশ পরিষ্কার চুড়িদার পরে রয়েছে… মুখটা বেশ মিষ্টি… মাথায় সিদুরের হাল্কা চিহ্ন প্রমাণ দেয় যে মেয়েটি বিবাহিত… এত অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে গিয়েছে?… অবস্য এদের আর্থসামাজিক অবস্থানে সেটাই স্বাভাবিক… পৃথা নজর করে মেয়েটিও এক নজরে তাকিয়ে রয়েছে তারই দিকে…
‘এ… কে? মিঃ কর্মকার?’ প্রশ্ন করে পৃথা।
‘মানে, ও আগে এই ফ্ল্যাটেই অর্নবের কাছে কাজ করতো… খুব বিশ্বাসী… এই কাছেই থাকে… অনেক ছোট বেলায় এসেছিল… এখন তো অনেক বড় হয়ে গেছে, বিয়েও হয়ে গিয়েছে… খুব ভালো মেয়ে… মাঝের কিছুদিন ওই ইন্সিডেন্টটা ঘটার পর আমরা আসতে বারণ করে দিয়েছিলাম, কিন্তু আজ তাই ওকে আবার সাথেই নিয়ে এসেছি… আজ থেকে ও আপনার কাছেই কাজ করবে… আপনার কোন অসুবিধা হবে না… খুব কাজের মেয়ে… সব কিছু সামলে নেবে…’ এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলেন ভদ্রলোক।
‘কিন্তু আমি একা থাকি… সেখানে ও…’ কথা শেষ হয় না পৃথার, তার আগেই প্রণববাবু বলে ওঠেন, ‘আপনি একা থাকেন বলেই তো ওকে আনা… আপনার হাতে হাতে থাকবে… দেখবেন আপনার খুব উপকারে লাগবে… এমনিতেই বুঝতে পারি যে এই ভাবে সংসারের কাজ করার অভ্যাস নেই আপনার, আর তাছাড়া আপনি অফিস করেন, সেখানে এই ধরনের একটা হেল্পিং হ্যান্ড আপনার খুব উপকারে লাগবে…’ বলেই কাজলের দিকে ফিরে বলেন, ‘দিদিমনিকে সব সময় দেখাশুনা করবি, বুঝেছিস… ওনার যেন কোন অসুবিধা না হয়… যা বলবেন, মন দিয়ে শুনবি… কেমন?’
ঘাড় হেলায় কাজল, প্রণববাবুর কথায়।
‘না, সে তো না হয় বুঝলাম, কিন্তু আমি তো অফিস বেরিয়ে যাবো… ও কি সারাদিন থাকবে?’ জিজ্ঞাসা করে পৃথা।
‘না, না, ও সকালে আসবে, আপনি বলে দেবেন কখন আসলে সুবিধা হবে আপনার… সেই মতই সময় করে এসে কাজ করে দিয়ে যাবে… রান্নাটাও খুব ভালো করে ও… সেটাও সামলে নেবে… আর সন্ধ্যেবেলাতে আপনি অফিস থেকে ফিরলে না হয় ও আরো একবার আসবে’খন…’ বলেন প্রণববাবু।
‘আমার দরকার খুব একটা যে ছিল তা নয়… একাই তো বেশ চালিয়ে নিচ্ছিলাম… হ্যা, মাঝে অবস্য ভাবছিলাম যে একটা লোক পেলে ভালো হয়, কিন্তু… আচ্ছা, ঠিক আছে… তবে সকালে আসলেই হবে, সন্ধ্যেবেলায় আর আসার প্রয়োজন নেই… আমি একা মানুষ… এক বেলা একটু হাতে হাতে কাজ করে দিলেই হবে…’ বলে কাজলের দিকে ফিরে বলে, ‘কি পারবে তো?’
ঘাড় হেলিয়ে বলে ওঠে মেয়েটি, ‘হ্যা, হ্যা, দিদিমনি, দেকবেন আপনার কোন অসুবিদা হবে না… আপনি যেমনটি বলবেন, আমি ঠিক তেমনটি করে দেব…’
‘হু… বুঝলাম… তা মাইনে কত নেবে?’ মনে মনে ভাবে পৃথা, এটাই আসল প্রশ্ন।
‘ও নিয়ে আপনি চিন্তা করবেন না… ওটা ওর সাথে আমার কথা হয়ে গিয়েছে…’ তাড়াতাড়ি করে উত্তরটা দেয় প্রণববাবু।
ভুরু কোঁচকায় পৃথা, ‘আমার কাজ করবে আর ওর মাইনে নিয়ে আমি চিন্তা করবো না, মানে? সেটা আবার হয় নাকি?’
‘না, মানে… সেটা বলতে চাইনি ঠিক… আসলে ও আগে যা মাইনে তে কাজ করতো, সেটাই ও পাবে… তাতেই ও রাজি…’ কাঁচুমাচু মুখে উত্তর দেয় ভদ্রলোক।
‘না, সেটা কত, সেটা তো আমাকে জানতে হবে… মাইনেটা তো আমি দেব… আপনি তো আর নয়…’ বলে পৃথা।
‘হ্যা, সেটা তো বটেই… ওই দেড় হাজার টাকা ও পেতো আগে…’
‘দেড় হা-জা-র? এটা একটু বেশিই নয় কি প্রণববাবু?’ টাকার অ্যামাউন্টটা শুনে একটু যেন অসন্তুষ্ট হয় পৃথা।
‘না মানে, ও আগে এটাই তো পেতো, তাই… তবে সব কাজই ও করবে… সব… রান্নাটাও করে দেবে আপনাকে…’ কাজলের হয়ে সাফাই গায় প্রণববাবু। ওনার কথার ধরন দেখে পৃথার যেন মনে হয় কাজলকে কাজে রাখার ব্যাপারটায় ওনার ওপরে আর কারুর কড়া নির্দেশ রয়েছে, তাই যে করেই হোক কাজলকে কাজে বহাল করতেই হবে। তারপরই দুম করে বলে বসেন, ‘আচ্ছা, আপনি ওকে পাঁচশ টাকাই দেবেন’খন…’
অবাক হয় পৃথা, ‘একেবারে দেড় হাজার থেকে পাঁচশতে নেবে গেলেন… ব্যাপারটা কি হলো? বাকি টাকাটা কে দেবে? আপনি?’
‘সে আপনাকে ভাবতে হবে না… ওটা ঠিক হয়ে যাবে…’
‘না, না, মিঃ কর্মকার, ঠিক হয়ে যাবে মানে? ও আমার কাজ করবে আর মাইনের বাকি টাকা অন্য কেউ দেবে… এটা আবার কেমন কথা?’ চোখ ঘুরিয়ে প্রশ্ন করে পৃথা।
পৃথার মনে হল যেন ভদ্রলোককে কেউ ফাটা বাঁশের মধ্যে আটকে দিয়েছে… ব্যাপারটা নিয়ে এতটা জল ঘোলা হবে, সেটা বোধহয় উনি ঠিক আশা করেন নি… তাই কি বলবেন ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না… ওনার অবস্থা দেখে মনে মনে হাসে পৃথা, কিন্তু মুখের সিরিয়াস ভাবটা সরায় না… এবার কাজলের দিকে ফিরে বলে, ‘ঠিক আছে… বুঝেছি… তুমি ওই দেড় হাজারই পাবে… ওটাই আমি দেব… তবে ঠিক মত কাজ করবে তো? আর হ্যা, রান্না সবসময় করার দরকার নেই, ওটা আমিই করে নেবো’খন… আমার রান্না করতে ভালোই লাগে, শুধু একটু হাতে হাতে এগিয়ে দিলেই হবে, বাকিটা আমিই সামলে নেব।’
এত্তো বড় একটা ঘাড় নেড়ে বলে ওঠে কাজল, ‘এক্কেবারে দিদিমনি… কোন এদিক সেদিক হবে না… এক্কেবারে ফাস্ট কেলাস কাজ পাবেন…’
ওর ফাস্ট কেলাস বলার ধরনে আর হাসি চেপে রাখতে পারে না পৃথা, ফিক করে হেসে ফেলে। ওকে হাসতে দেখে প্রণববাবুও হাসেন।
‘একটা কথা ভাবছিলাম মিঃ কর্মকার, কাজল যে আমার কাছে কাজ করবে, তাহলে ও অন্য বাড়ির কাছ কি হবে? প্রশ্ন করে পৃথা।
প্রণববাবু কিছু বলার আগেই উত্তরটা দেয় কাজলই, ‘ও সব তুমি চিন্তা কোরো না দিদিমনি, আমি সব সামলে নেব… আজকে তো ফোন করে বলেই দিয়েচি যে আমি আজ যাবো না… আমার পেট খারাপ হয়েচে… আর কাল থেকে আমি সব ঠিক করে নেব… আগে সকালে এসে তোমার কাজ সারবো, তারপর অন্য বাড়ি যাবো…’
‘কিন্তু আমার তো ব্যাপারটা খারাপ লাগছে না… অন্য বাড়ির লোকেরাও অপেক্ষা করবে তোমার জন্য… আর এই ভাবে হুট করে যদি…’ বলার চেষ্টা করে পৃথা।
‘বলচি তো দিদিমনি… সব আমার ওপরে ছেড়ে দাও… দাদাবাবুর বাড়ি আগে আসবো… তারপর সব…’ হাত তুলে মাথা নেড়ে আশ্বস্ত করে কাজল। পৃথাও আর কথা বাড়ায় না।
‘আমি তাহলে আসি মিস মুখার্জি… কাজল রইলো তাহলে, কেমন…’ বলে প্রণববাবু দ্রুত বেরিয়ে যান বেডরুম থেকে… পৃথার কানে আসে বাইরের দরজাটার বন্ধ হয়ে যাবার আওয়াজ।
গায়ের চাদরটাকে সরিয়ে বিছানার থেকে নামতে উদ্যত হয়… ঘুম ভাঙার পর থেকে ঘরের মধ্যে এত লোক থাকার ফলে সকালের বাথরুমটা আর তার সারা হয়ে ওঠে নি এখনও, তলপেটটা ভারী হয়ে রয়েছে… একবার না গেলেই নয়… কিন্তু চাঁদর সরাতে গিয়েই থমকায়… ঘরের মধ্যে কাজল এখনও দাঁড়িয়ে রয়েছে, আর সে কাল যখন শুয়েছিল, তখন শুধু মাত্র টি-শার্টটাই গায়ে চাপিয়েছিল, তার মানে… ভাবতে ভাবতে চাঁদরের খুটটা ধরে তুলে ভেতর দিকে নজর ফেলে… কিন্তু যা দেখে তাতে আর তাকে কাজলে সামনে অস্বস্তিতে পড়তে হবার কোন কারণ পায় না… পায়ে ওর একটা প্রিন্টেড পাতলা কটন পায়জামা পরা… তারমানে পরে কেউ… আবার একটা হাসি খেলে যায় ঠোঁটে… আর কিছু না ভেবে এবার নিশ্চিন্দে শরীরের ওপর থেকে চাঁদরটা সরিয়ে দিয়ে পা নামায় বিছানার থেকে… তারপর মেঝের দিকে তাকিয়ে খোঁজে কিছু…
‘কিচু খুঁজচো দিদিমনি?’ প্রশ্ন করে কাজল।
‘উ… না…’ আনমনে উত্তর দেয় পৃথা… আসলে ও খোঁজার চেষ্টা করছিল কালকের রাতে এনে রাখা বালতিটা… যেটাতে ওর মাথা ধুইয়ে দেওয়া হয়েছিল জ্বরের সময়… কিন্তু সেটার দেখা পায় না, শুধু শুকিয়ে যাওয়া কিছু জলের রেশ পড়ে থাকতে খেয়াল করে মেঝেতে। সন্তর্পনে উঠে দাঁড়ায় বিছানার থেকে… কিন্তু উঠে দাঁড়াতেই টলে যায় মাথাটা… বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছে এই একটা রাতের মধ্যেই।
দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে ধরে নেয় কাজল পৃথাকে… ‘সাবধান দিদিমনি… তোমার সলিলটা একোনো খুব দুব্বল…’
কাজলের তৎপরতা দেখে ভালো লাগে পৃথার… হেসে বলে, ‘হু, ঠিক বলেছ… বুঝতে পারিনি এতটা দুর্বল হয়ে গেছি… থ্যাঙ্কস্…’
‘বাব্বা… থ্যাঙ্কুয়ের কি আচে গো? তুমি টলে গেলে, আর আমি ধরবো না? কলঘরে যাবে তো? চলো, আমি তোমায় নিয়ে যাই…’
‘না না, তোমাকে আবার যেতে হবে না… আমি নিজেই যেতে পারবো ঠিক…’ বলে ফের চেষ্টা করে এগোবার… কিন্তু কাজল পৃথার হাত ছাড়ে না… ‘না না দিদিমনি… একোন পারবে না… তুমি আমাকে এত পর পর ভাবচো কেন? দেকো, আমি কিন্তু এ বাড়িতে নতুন না… একানের সব কিচু আমার চেনা… তুমি কোনো চিন্তা কোরো না… আমি একা হাতে তোমার সংসারটা কেমন গুচিয়ে দিই দেকবে… কোন বোলতি থাকবে না…’
‘আমার সংসার গুছিয়ে দেবে…?’ কাজলের কথায় হেসে ফেলে পৃথা… আর কথা বাড়ায় না… ধীর পায়ে বাথরুমের দিকে অগ্রসর হয় কাজলের হাত ধরে। ওকে একেবারে বাথরুমের মধ্যে নিয়ে যায় কাজল, হাত বাড়িয়ে দেওয়ালটাকে ধরে পৃথা বলে, ‘এবার তুমি বাইরে গিয়ে দাঁড়াও কাজল, আমি ঠিক আছি…’
‘ঠিক বলচো তো দিদিমনি… পারবে তো?’ তবুও নিসন্দেহ হতে চায় কাজল।
‘হ্যা রে বাবা হ্যা… তুমি যাও দিকি…’ হাসি মুখেই ধমকায় কাজলকে। কাজল ওকে ছেড়ে বাথরুমের বাইরে এসে দাঁড়ায়, ‘আমি একানেই দাঁড়িয়ে রইলুম… তোমার হলে বলো, আবার নিয়ে যাবো…’
কোমর থেকে পায়জামাটা নামিয়ে কোমডে বসে পৃথা… বসার সাথে সাথেই ছরছর শব্দে জমে থাকা শরীরের জল বেরিয়ে আসে… এই রকম শব্দ হওয়াতে কেমন লজ্জা লাগে ওর… আগে একা থাকতো, তাই যেমন খুশি তেমনি ভাবেই চলতো… কিন্তু এখন বাথরুমের বাইরেই কাজল দাঁড়িয়ে… যদি হিসি করার আওয়াজ শোনে? অস্বস্তি হয় তার, কিন্তু কি আর উপায়!
ফ্ল্যাশের আওয়াজ পেতেই কাজল দরজা ঠেলে বাথরুমে ঢোকে… তখনও ও নিজের পায়জামাটা তোলার সুযোগ পায় নি… দুম করে কাজল ঢুকে পড়াতে থতমত খেয়ে যায়… ওকে এই রকম অপ্রস্তুত হতে দেখে কাজলের কিন্তু কোন হোলদোল দেখা যায় না… এগিয়ে এসে ঝুঁকে পায়জামাটাকে ধরে পৃথাকে পড়তে সাহায্য করে… মনে মনে খুশিই হয় পৃথা। কাজল ওকে ধরে থাকে, আর পৃথা বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁতটা মেজে মুখ ধুয়ে নেয়। তারপর মুখ ধোয়া হলে কাজলকে ধরে ধীর পায়ে ফিরে যায় বেডরুমে।
পৃথাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে গায়ের চাঁদরটাকে টেনে দেয় কাজল। তারপর বন্ধ জানলার দিকে এগিয়ে গিয়ে খুলে দেয় শার্শিগুলো… বাইরে তখন আর বৃষ্টি নেই… ঝলমলে রোদ উঠেছে… জানলাটা খুলে দিতেই সকালের মিঠে বাতাসে ঘরটা ভরে যায়। জানলার কাছ থেকে সরে এসে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় কাজল… পৃথা চুপ করে শুয়ে ভাবতে থাকে কাল রাত থেকে এখন অবধি ঘটনার প্রবাহটাকে।
কিছুক্ষনের মধ্যেই ফের ফিরে আসে কাজল ঘরের মধ্যে, ‘ঘরে তো সে রকম কিছুই নেই দেকলাম, ফ্রীজও ফাঁকা…আমাকে পঞ্চাশটা টাকা দাও তো…’ বলতে বলতে বিছানার পাশে, পৃথার সামনে এসে দাঁড়ায় সে।
‘টাকা নিয়ে কি করবে?’ অবাক হয়ে প্রশ্ন করে পৃথা।
‘চিকেন আনতে হবে না? আর পাঁউরুটিও আনবো… তোমাকে উনি একোন জ্বরের মুখে ভালো মন্দ খাওয়াতে বলে গেচেন… তাই একোন সকালে তোমাকে চিকেন সুপ বানিয়ে দেব… আর সেই সাথে টোস্ট… তাই একটু বাইরে যেতে হবে ও গুলো আনতে… দাও… টাকা দাও…’ বলে ওঠে কাজল।
পৃথার বুঝতে অসুবিধা হয় না ইতিমধ্যেই কাজল ওর কথামতো সংসারের দ্বায়িত্ব তুলে নিয়েছে… এখন থেকে ওর কথা মতই চলতে হবে তাকে নাকি? কিন্তু কোন বিরক্ত আসে না মনের মধ্যে তার কাজলের এই স্বতস্ফুর্ততায়, সে বলে, ‘বাইরের ঘরে দেখ আমার ব্যাগটা আছে, নিয়ে এসো…’
ঘর থেকে বেরিয়ে হাতে ব্যাগ নিয়ে ফিরে আসে… ‘আচ্চা দিদিমনি, তুমি আমাকে সেই ফাস্ট থেকে তুমি তুমি করচো কেন বলতো? তুই করে বলতে পারো না? আমাকে তো দাদাবাবু তুই করেই বলতো…’
‘তোমার দাদাবাবু বলতো বলেই আমাকে বলতে হবে?’ হেসে বলে ওঠে পৃথা।
‘হ্যা, বলবে, আর তাচাড়া তুই বলে বললে না বেশ আপন আপন সোনায়… ওই তুমির মধ্যে সেটা থাকে না…’ মাথা নেড়ে নেড়ে বলে কাজল।
‘তাই? তুই বললে আপন শোনায়?’ প্রশ্ন করে পৃথা।
‘সোনাই তো… আমার তুই করে বললেই বেসি ভালো লাগে…’
‘বেশ.. তাই না হয় বলবো… আবার যখন তোমার দাদাবাবু বলতো… তখন আমাকে তো বলতেই হবে, তাই তো?’ বলে পৃথা।
‘ডাকতোই তো দাদাবাবু তুই করে… হেব্বি ভালো লোক ছিল, জানো…’ মাথা নেড়ে বলে কাজল।
‘তাই? খুব ভালো লোক ছিল?’ একটু কৌতুহলী হয়ে ওঠে পৃথা।
‘ছিলই তো… কোনদিন কক্কোনো আমাকে বোকতো না… আমিই তো বলতে গেলে সামলাতাম সব কিচু… দাদাবাবু সংসারের কিচ্চুটি দেকতো না…’
‘মানে তুই গিন্নি ছিলিস, বল্…’
‘এ মা, না, না, সেই রকম নয় গো…’ তাড়াতাড়ি হাত নেড়ে প্রতিবাদ করে ওঠে কাজল।
হাসে পৃথা… ‘বুঝেছি… আমাকে আর বোঝাতে হবে না তোকে, তুই বরং টাকাটা নে… আর পালা…’
পৃথার হাত থেকে টাকাটা নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় কাজল। হটাৎ মনে হতে পৃথা হাঁক পাড়ে, ‘বেরিয়ে গেছিস নাকি?’
ও ঘর থেকে কাজলের গলা আসে, ‘না দিদিমনি, এই বেরুচ্চি, কিচু লাগবে?’
‘দেখ টেবিলের ওপরে বোধহয় আমার মোবাইলটা আছে, একটু দিয়ে যা না…’
মোবাইল নিয়ে ঘরে ঢুকে পৃথার দিকে বাড়িয়ে দেয় কাজল। ওর হাত থেকে মোবাইলটা নিয়ে হেসে বলে ‘থ্যাঙ্কস্’।
‘আবার ওই সব… বলেচি না ও সব থ্যাঙ্কু ট্যাঙ্কু আমায় বলবে না…’ বলতে বলতে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে…
‘ফ্ল্যাটের চাবিটা যাবার সময় নিয়ে যেতে ভুলিস না…’ গলা তুলে বলে ওঠে পৃথা
‘আচ্চা…’ কাজলের উত্তর আসে ড্রইংরুম থেকে, দরজা বন্ধ হয়ে যাবার শব্দ হয়।
মোবাইলটাকে পাশে রেখে একটু অপেক্ষা করে বিছানায় শুয়ে চুপ করে… তারপর মৃদু গলায় ডাক দেয়, ‘অর্নব… আছো?’
কোন উত্তর আসে না।
খানিক চুপ করে থাকে আরো পৃথা, তারপর ফের ডাকে, ‘অর্নব… আমি জানি তুমি আছো এই ঘরেই… একটু এসো না… ডাকছি তো…’
কোন উত্তর নেই।
আরো কয়’এক মুহুর্ত কেটে যায়… আর ডাকে না পৃথা, বিছানায় শুয়ে শুধু চুপ করে অপেক্ষা করে… তাকিয়ে থাকে বেডরুমের দরজার পানে। নিশব্দ ফ্ল্যাটের মধ্যে শুধু মাত্র ড্রইংরুমের বড় দেওয়াল ঘড়িটার টিকটিক আওয়াজটা ভেসে বেড়ায়।
হটাৎ বিছানার পায়ের কাছটার ফাঁকা জায়গাটা ভারী কিছুর চাপে দেবে, নেমে যায় খানিক… যেমন কারুর দেহের ভারে হয়ে থাকে। পৃথার মুখটা উজ্জল হয়ে ওঠে।
২০।।
বিছানার একটু ভেতর দিক করে সরে শোয় পৃথা… ‘আমি জানতাম তুমি আসবে… তুমি অশরিরী কি অশরিরী নও… সে কন্ট্রোভারসারির মধ্যে আমি যেতে চাই না… শুধু জানি তুমি আছো… এবং ভিষন ভাবেই আছো… আমি প্রতিটা মুহুর্তে তোমায় অনুভব করতে পারি… তাই তুমি আমার ডাক অস্বীকার করতেই পারো না… সে ব্যাপারে আমি একশ শতাংশ সুনিশ্চিত…’ পাশের খালি জায়গাটায় হাত বুলিয়ে বলে, ‘অত দূরে বসেছ কেন… এখানটায় এসে বসো…’
বিছানার চাঁদরে কোন ভাঁজ পড়ে না সে বলার পরও, ‘কই, এখানটায় এসো…’ বালিশ থেকে মাথাটা একটু তুলে আবার ডাক দেয় পৃথা।
এবার বিছানার পায়ের কাছের জায়গাটা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে… দেবে যায় তার পাশের জায়গাটা। হাসি ছড়িয়ে পড়ে পৃথার মুখে… বালিশে মাথাটা ফের রেখে দিয়ে ডান হাতটাকে শূন্যে তুলে ধরে বলে, ‘আমার হাতটাকে ধর…’
ওই ভাবে শূণ্যেই থাকে পৃথার হাত, কেউ ধরে না এগিয়ে এসে। ‘কই… ধরবে না? আমি কিন্তু এতক্ষন হাতটা তুলে ধরে রাখতে পারছি না… এখনও দূর্বল আমি…’ গলার স্বরে আদর মিশে থাকে তার।
এবার পৃথার হাতের তালুটা একটা নিরাকার সবল পুরুষালী হাতের মুঠোয় ধরা পড়ে… পৃথার সারা শরীরে একটা শিহরণ খেলে যায় যেন… মনে হয় হাত নয়, সে ভুল করে খোলা কোন বিদ্যুতের তারে হাত ছুঁইয়ে কারেন্ট খেল… মাথার মধ্যেটায় কেমন বোঁ বোঁ করতে শুরু করে দেয়… পেটের মধ্যে মনে হয় হাজারটা প্রজাপতি ছটফট করছে… বুকের মধ্যে হৃদপিন্ডটার গতি নিশ্চয় চার কি পাঁচ গুন বেড়ে গিয়েছে… গলার মধ্যেটা কেমন শুকিয়ে আসে… নাকের পাটা ফুলে বড় বড় নিঃশ্বাস পড়তে শুরু করে… বুকটা হাপড়ের মত ওঠে, নামে… কপালের ওপরে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে ওঠে… একি হচ্ছে ওর মধ্যে? এরকম কেন হচ্ছে তার? নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে মনে মনে… নাকি সেটা করতেও ভুলে গিয়েছে ওই পরশের আবেশে? সাধারনতঃ মেয়েদের যে লজ্জা শরম এসে এই সময় ভীড় করা উচিত, কই, সেই রকম কোন অনুভূতি তো তার মধ্যে আসছে না, আসার কথাও নয়, কারণ ওই ধরণের মেয়েলী আচার আচরণ সে কোনদিনই করে উঠতে পারে নি, কিন্তু তাই বলে এখন কি হলো তার? কেমন যেন ওর সারা শরীরটায় থরথর করে কাঁপন ধরে। খানিক আগের ঠোঁটের কোনে লেগে থাকা হাসিটাও কোথায় উধাও হয়ে যায়… একি স্বপ্ন? নাকি বাস্তব? এত দিন… এত দিন ধরে যেটা ও মনের গভীরে নিয়ে নাড়াচাড়া করে এসেছে প্রতি নিয়ত… সেটা সত্যিই… সত্যিই আজ তার হাতটা অর্নবের হাতের মুঠোয়… উফ্… এবার নিশ্চয় ও পাগল হয়ে যাবে আনন্দে… বাঁ হাতটা তুলে রাখে তার ডান হাতটাকে মুঠো করে ধরে রাখা নিরাকার হাতটার ওপরে… আহঃ… এই তো… কর্কশ একটা পুরুষালী হাত… এটা আঙুলগুলো… এটা হাতের পীঠ… কবজি… বুড়ো আঙুল… বাঁ হাতটাকে ওই না দেখতে পাওয়া অদৃশ্য হাতটার ওপরে বুলিয়ে বুলিয়ে অনুভব করতে থাকে পৃথা। হাতটাকে ছুয়ে দেখার সময় কিছুতেই নিজের হাতদুটোকে স্থির রাখতে পারে না সে… থরথর করে কেঁপেই চলেছে তার হাতদুটো… এটা কি জ্বরের দুর্বলতায়? নাকি মানসিক অস্থিরতায়? কেমন সমস্ত কিছু গোলমাল হয়ে যাচ্ছে আজ পৃথার… কাঁপা হাতেই অদৃশ্য হাতটাকে ধরে টেনে রাখে নিজের গালের ওপরে… চোখ বন্ধ হয়ে আসে আপনা থেকেই… গালের ওপরে হাতটাকে নিয়ে বুলিয়ে অনুভব করতে থাকে সেটার স্পর্শ নিজের ত্বকের ওপরে… আহ্… একি অপার্থিব অনুভুতি… আগে তো কতজনের ছোয়াই না সে পেয়েছে নিজের মুখের ওপরে… বাবা, মা, বন্ধু, বান্ধব… কিন্তু কই… এই রকম তো অনুভূতি কখনও হয়নি তার… এই রকম কাঁপুনি তো কেউ ধরাতে পারে নি তার শরীরে… তবে আজ কেন এমন হচ্ছে? কেন কিছুতেই নিজেকে নিজের বশে ধরে রাখতে পারছে না সে? তবে কি… তবে কি… আর ভাবতে পারে না… তার সমস্ত বোধ বুদ্ধি কেমন হারিয়ে যাচ্ছে… গালের ওপর থেকে হাতটাকে তুলে খুলে, মেলে ধরে আন্দাজ করে, তারপর সেই খোলা হাতের তালুটার মধ্যে নিজের মুখটাকে গুঁজে দেয়… আহঃ… কি প্রশান্তি… জোরে শ্বাস টেনে গন্ধ নেয় সেই না দেখা হাতের… হাতের তালুটাকে চেপে ধরে নিজের তপ্ত ঠোঁট দিয়ে… পাগলের মত চুমু খেতে থাকে একের পর এক… খেয়েই চলে… প্রান ভরে… নিজের মুখেরই লালা লেগে, মেখে যায় হাতের তালুর মধ্যে… লাগুক… ভিজে যাক তার লালায় হাতটা… যা খুশি সে করতে পারে… সম্পূর্ণ অধিকার আছে তার যা খুশি করার… এ শুধু তার… শুধু তার… মনে মনে ভাবে পৃথা… লালায় ভিজে ওঠা হাতটাকে নিয়ে নিজের সারা মুখে মাখিয়ে দিতে থাকে বুলিয়ে বুলিয়ে… আজ বোধহয় পাগলই হয়ে যাবে সে।
ধীরে ধীরে ওই ভাবেই হাতটাকে নিজের দুই হাতের মুঠোয় ধরে রেখে আস্তে আস্তে নামায় নীচের পানে… নাক, ঠোঁট, চিবুক, গলা হয়ে হাতটাকে নামিয়ে নিয়ে আসে নরম বুকের ওপরে… চেপে ধরে দুটো কোমল গোল মাংসপিন্ডের মাঝে। এবার কেঁপে ওঠার পালা বোধহয় অদৃশ্য হাতের… নরম স্তনের স্পর্শ পেতেই গুটিয়ে, সরে যাবার চেষ্টা করে নিরাকার হাতটা… সরে যাবার চেষ্টা করে পৃথার মুঠো ছাড়িয়ে নিয়ে সসংকোচে… কিন্তু পৃথা মুঠো আলগা করে না… সরাতেও দেয়না হাতটাকে নিজের বুকের ওপর থেকে… জোর করে চেপে রাখে… টি_শার্টের ওপর দিয়েই ছুইয়ে রাখে নিজের নরম স্তনদুটোতে… পৃথার অস্বাভাবিক হৃদস্পন্দন অনুভূত হয় হাতের ওপরে… হাতটাকে বুকের মধ্যে চেপে ধরে চোখ খুলে তাকায় পৃথা… শূন্যের পানে… চোখের মধ্যে তখন একরাশ ভালোবাসা উপচে পড়ছে… আর চোখ থেকে চুইয়ে বেরিয়ে এসে সেই সৃষ্টিছাড়া ভালোবাসাটা মাখামাখি হয়ে যাচ্ছে সারা মুখমন্ডলে।
একটা ভরাট গলার স্বর ফিসফিসিয়ে বলে পৃথার খুব কাছ থেকে… ‘হাতটা ছাড়ো তিতির…’
‘না… ছাড়বো না…’ জেদি গলায় উত্তর দেয় পৃথা… মুঠোয় ধরে থাকা অদৃশ্য হাতটাকে আরো বেশি করে চেপে ধরে নিজের বুকের ওপরে… একটা স্তন দেবে যায় হাতের চাপে।
‘এ রকম পাগলামী করতে নেই… ছাড়ো এবার…’ আবার অনুরোধ করে অশরীরি।
‘না বললাম তো…’ হাতটাকে ধরে রগড়ায় নিজের নরম বুকের ওপরে… উত্তেজনায় শক্ত নুড়ি পাথরের মত হয়ে ওঠা বোঁটাটা যেন বিঁধে যেতে থাকে সেই অদৃশ্য হাতের তালুতে।
‘কি চাও?’ প্রশ্ন করে নিরাকার গলার স্বর।
‘তোমায়…’ ছোট্ট উত্তর দেয় পৃথা।
‘কিন্তু এ যে হয় না… এ হতে পারে না… সেটা বোঝার চেষ্টা করো… তুমি যা চাইছো… সেটা কোনদিনই সম্ভব হবে না…’ বোঝাবার ভঙ্গিতে ফের বলে ওঠে স্বরধ্বনি।
‘কেন হবে না? কিসের অসুবিধা? তুমি তো এখন বিবাহিতও আর নও… তাহলে কেন তুমি আমার হবে না?’ চোখ সরু করে প্রশ্ন করে পৃথা।
‘সেটা কথা নয় তিতির… বিবাহিত হওয়া না হওয়াটাই শেষ কথা নয়…’ উত্তর দেয় না দেখা অর্নব।
‘তবে? আমি কি দেখতে কুৎসিত?’ অভিমান ভীড় করে আসে পৃথার গলায়।
‘তুমি আমার দেখা সব থেকে মিষ্টি একটা মেয়ে… কে বলে তুমি কুৎসিত? তোমার থেকে এত সুন্দর দেখতে মেয়ে হয়?’ শান্ত গলায় বলে অর্নব।
‘লিন্ডার থেকেও সুন্দর?’ প্রশ্নটা বেরিয়ে আসে পৃথার মুখ থেকে।
একটু চুপ করে থাকে সেই অশরীরি খানিক, তারপর গাঢ় স্বরে বলে, ‘লিন্ডা বিদেশী ছিল… ও এখন আর বেঁচেও নেই, তাই ওর ব্যাপারে কোন কথা বলতে চাই না… আর তা ছাড়া ওর সৌন্দর্য আর তোমার সৌন্দর্যের মধ্যে অনেক ফারাক… বলতে আমার দ্বিধা নেই, ও ছিল সত্যিই প্রকৃত সুন্দরী… কিন্তু সৌন্দর্যের সাথে যখন অসম্ভব মিষ্টতা আর নিষ্পাপতার মিশেল ঘটে, তখন আর সেটা শুধু সুন্দরের সঙ্গায় পড়ে থাকে না… তুমি তাই…’
‘তাহলে হাতটা টেনে নিতে চাইছ কেন?’ গলা নামিয়ে প্রশ্ন করে পৃথা, গালের ওপরে লালীমার আভা খেলা করে।
‘তুমি যা চাইছ, সেটা হবার নয় বলেই হাতটা টেনে নিতে চাইছি… এটা তোমাকেও বুঝতে হবে…’ ফের বোঝাবার চেষ্টা করে অশরীরি।
‘আমি কিচ্ছু বুঝতে চাই না… আমি যা চাই, তুমি সেটা কি বুঝেছ?’ একটু গলার স্বর তোলে পৃথা।
কোন উত্তর দেয় না অশরীরি… চুপ করে থাকাই বোধহয় শ্রেয় বিবেচনা করে।
‘কি হলো? কিছু বলছো না যে? শোনো… আমি শুধু তোমাকে চাই… শুধু তোমায়… আমি চাই শুধু তোমার হতে… একেবারে… সারা জীবনের জন্য… শুধু তো-মা-র…’ শেষের কথাটা বেশ জোরের সাথে টেনে টেনে বলে পৃথা।
এরপরও কোন উত্তর আসে না অশরীরির থেকে। অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে পৃথা… হাতের মুঠোয় ধরা অদৃশ্য হাতটাকে ধরে ঝাঁকিয়ে বলে ওঠে… ‘কি হোলো… বলো কিছু… এই ভাবে তুমি চুপ করে থাকতে পারো না…’ বলতে বলতে হাঁফাতে থাকে উত্তেজনায়।
‘দেখো… তুমি অসুস্থ… এখনো অনেক দুর্বল… সবে তোমার জ্বরটা ছেড়েছে… এখন এই ভাবে উত্তেজনা তোমার পক্ষে ঠিক নয়… আমরা পরে না হয় এই নিয়ে কথা বলবো…’ শান্ত গলায় বোঝায় শরীরহীন স্বর।
‘না… পরে নয়… আজ… এক্ষুনি…’ জেদি গলায় বলে ওঠে পৃথা… অর্নবের না দেখা হাতটা তুলে গালের ওপরে ছোয়ায়… নিজের ত্বকের ওপরে অর্নবের স্পর্শে এক অপরিসিম ভালো লাগায় ভরে ওঠে মনটা।
এবার আর হাতটা টেনে নেবার প্রয়াশ করে না অশরীরি… একটুক্ষন চুপ থেকে ফের বোঝানোর সুরে বলে, ‘তুমি যা চাইছ, সেটা হয় না তিতির… আমি… আমি…’ বলতে বলতে থেমে যায়।
‘কি আমি? বলো…’ অধৈর্য পৃথা তাড়া দেয়।
‘দেখো তিতির… আজ আমি যদি একটা সাধারণ স্বাভাবিক আর পাঁচটা লোকের মত হতাম, তাহলে অন্য কথা ছিল… কিন্তু আমি যে থেকেও নেই… বুঝতে পারছ, আমি কি বলতে চাইছি?’ শেষের কথাটা বলার সময় গলাটা ধরে আসে কায়াহীনের।
‘এই তো তুমি আছো… আমার পাশে… আমায় ছুঁয়ে… তবে কেন বলছো তুমি নেই?’ বাচ্ছা মেয়ের মত অবুঝ গলায় প্রশ্ন করে পৃথা।
‘আমার এ থাকা যে না থাকার থেকেও কতটা নির্মম, তুমি বুঝবে না তিতির… এ যে কত কষ্টের সেটা কি করে বোঝাই তোমায়…’ ধরা গলায় বলে ওঠে না দেখা শরীরের স্বর।
তাড়াতাড়ি অর্নবের হাতটাকে ছেড়ে দিয়ে উঠে বসে পৃথা… শূন্যে নিজের হাত বাড়িয়ে দিয়ে হাতড়ায়… হাত ঠেকে একটা লোমশ প্রশস্ত বুকের ওপরে… হাত বোলায় হাতের নাগালে পাওয়া অদৃশ বুকটায়… অনুভব করতে থাকে সেই না দেখতে পাওয়া শরীরটাকে… পেশিবহুল লোমশ বুক, হাত, কাঁধ, গলা… হাতে ঠেঁকে ঝুলতে থাকা মোলায়েম বড় বড় দাঁড়ির গোছায়… দুহাত তুলে আঁচলা করে ধরে মুখটাকে… তারপর আবার ডান হাতের তালু ঘসতে থাকে সেই মুখটার ওপরে… দাঁড়ি, ঠোঁট, গোঁফ, নাক, চোখ, ভুরু, কপাল, চুল… নিজের চোখটাকে বন্ধ করে ছবিতে দেখা অর্নবের মুখটাকে ভাসিয়ে রাখে চোখের সন্মুখে… আহ্… এই তো আমার অর্নব… এই তো… দুহাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরে অর্নবের নিরাররণ শরীরটাকে… মুখটাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে রাখে তার সেই প্রশস্ত বুকের ওপরে… ‘আহহহহ… কি শান্তি… আমার অর্নব… উম্ম্… শুধু আমার…’ জড়িয়ে ধরে বিড়বিড় করে বলে ওঠে পৃথা… নিজের মুখটা ঘসতে থাকে ওই লোমশ বুকটায়… ‘মন খারাপ করো না গো… আর কোন কষ্ট তোমায় পেতে দেবো না… আমি তো আছি… আমি তোমাকে আর মন খারাপ করার সুযোগ দেবো না… দেখে নিও.. শুধু তুমি আমাকে নাও… আমাকে তোমার করে নাও অর্নব… আমি যে আর তোমাকে ছাড়া থাকতে পারছি না…’ বলতে বলতে আরো এগিয়ে বসে পৃথা, নিজের শরীরটাকে প্রায় ঢুকিয়ে দেয় সেই অশরীরির শরীরের মধ্যে… নিজের বুকের ওপরের ব্রা-হীন নরম গোল সুগঠিত মাংসপিন্ডদুটো একেবারে চেপে বসে যায় বিদেহী পুরুষালী নগ্ন পেটের ওপরে।
এই ভাবে ওকে জড়িয়ে ধরার ফলে কি করবে বুঝে উঠতে পারে না অশরীরি… চেষ্টা করে নিজের শরীরটাকে পৃথার আলিঙ্গন থেকে পেছিয়ে নিতে, কিন্তু যে ভাবে পৃথা ওকে জড়িয়ে ধরে রয়েছে, তাতে ওর পক্ষে সম্ভব হয়না নিজেকে বাঁচাতে… খুব কুন্ঠিত গলায় বলে, ‘এই রকম পাগলামী করে না তিতির… ছাড় আমায়… তুমি এখনও অসুস্থ… শুয়ে পড়ো…’
‘না ছাড়বো না… আমার অর্নবকে আমি পেয়ে গিয়েছি… আর ছাড়বো না কোনদিন…’ লোমশ বুকের মধ্যে মুখটাকে গুঁজে বলে ওঠে পৃথা… শ্বাস টেনে ঘ্রাণ নেয় নিজের কাছে পাওয়া প্রিয়তমের শরীরের।
‘কিন্তু এই রকম ভাবে কি একটা সম্পর্ক তৈরী হতে পারে? তুমিই বলো?’ বলে অর্নব।
‘পারে… নিশ্চয়ই পারে…’ জেদি গলায় বলে ওঠে পৃথা… মুখটাকে ঘসে বুকের লোমে… আজ তার মনে হয় যেন পৃথিবীটাই পুরো পেয়ে গিয়েছে এই বুকটার মধ্যে।
‘না… পারে না…’ এবার একটু দৃঢ় কন্ঠেই বলে অশরীরি… ‘এটা হয় না… বোঝো তুমি… আমার কোন শরীর নেই… আমি শুধুই শূণ্য… সেখানে তুমি এই নিরাকারের সাথে জীবনটাকে জড়াতে পারো না… এই সম্পর্কের কোন ভবিষ্যত নেই তিতির…’ বলে এবার পৃথার বাহুদুটোকে হাতের মুঠোয় ধরে প্রায় জোর করেই নিজের শরীর থেকে টেনে আলাদা করে দেয়…
জলে ভরে ওঠে পৃথার চোখদুটো… শুধু একবার চোখ তুলে শূন্যের পানে তাকিয়ে মুখটা নামিয়ে নেয়।
‘তুমি কাঁদছ?’ শশব্যস্ত হয়ে ওঠে অশরীরি… ‘প্লিজ কেঁদো না…’
মুখে কিছু বলে না পৃথা, চুপ করে মাথা নামিয়ে বসে থাকে সে, গাল বেয়ে টসটস করে গড়িয়ে পড়ে জলের ফোঁটা।
‘আছা পাগল মেয়ে তো…’ বলে নিজেই আবার পৃথার বাহু ধরে টেনে নেয় নিজের বুকের মধ্যে… বাঁধ ভেঙে যায় যেন… অশরীরির বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে এবার হাউহাউ করে কাঁদতে শুরু করে পৃথা… কান্নার দমকে কেঁপে কেঁপে উঠতে থাকে তার শরীর।
মাথায় হাত রেখে চুলের মধ্যে বিলি কেটে দিতে দিতে স্বর বলে ওঠে, ‘লক্ষ্মীটি… কাঁদছো কেন তিতির… আমি কি বলেছি যে তাতে এত দুঃখ পেলে?’
ফোঁপাতে ফোঁপাতে কান্না জড়ানো গলায় পৃথা বলে ওঠে, ‘আমাকে তোমার থেকে সরিয়ে দিলে কেন?’ বলে ফের হাউহাউ করে কাঁদতে শুরু করে দেয়।
‘আরে আমি তো…’ বলতে গিয়ে চুপ করে যায় অশরীরি… তারপর একটু থেমে বলে, ‘আচ্ছা, অন্যায় হয়ে গেছে… এবার থামো… এই তো… তুমি আমার বুকের মধ্যেই আছো… আর কেঁদো না তাহলে…’ বলে আরো ভালো করে জড়িয়ে ধরে পৃথাকে নিজের শরীরের সাথে… পৃথাও দুহাতের বেড়ে আঁকড়ে ধরে অদৃশ্য শরীরটাকে, নতুন করে মুখটাকে গুঁজে দেয় লোমশ বুকের মধ্যে… বেগ থামলেও, তখনো মাঝে মধ্যে শরীরটা কেঁপে কেঁপে ওঠে কান্নার ধমকে… ‘তুমিই আমার অর্নব? তাই না?’ ফোঁপানোর মাঝেই প্রশ্ন করে পৃথা।
‘কেন? সন্দেহ হচ্ছে?’ এবার অশরীরির গলায় কৌতুকের মিশেল।
‘না… আমার কোন সন্দেহ নেই… তবুও তোমার মুখ থেকে একবার অন্তত শুনতে ইচ্ছা করছে… বলো না… তুমিই অর্নব… তাই না?’ আসতে আসতে স্বাভাবিক হয়ে আসে পৃথার গলার স্বর।
‘আমি তো মিথ্যাও বলতে পারি… নিজেকে অর্নব বলে চালিয়ে দিতে পারি… তুমি সত্যিটা বুঝবে কি করে?’ প্রশ্ন করে অশরীরি।
‘সেটা আমার ওপরেই ছেড়ে দাও না… আমি তো ইতিমধ্যেই সুনিশ্চিত হয়েই গিয়েছি… তাও… তোমার মুখ থেকে একবার শুনতে ইচ্ছা করছে আমার…’ আরো গভীর হয় পৃথার গলার স্বর।
‘হুম… আমিই তোমার সেই অর্নব… যাকে তুমি এতদিন ওই ছবিটাতেই দেখেছ… সেই আমি…’ খানিক চুপ থাকার পর গাঢ় স্বরে উত্তর দেয় অশরীরি।
হটাৎ কানে আসে বাইরের দরজায় চাবি খোলার আওয়াজ… দুজনেই দুজনকে ছেড়ে সোজা হয়ে বসে… ‘কাজল ফিরে এসেছে মনে হচ্ছে…’ ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে কায়াহীন অর্নব। পৃথা হাতড়ে অর্নবের হাতটাকে ধরে নিজের হাতের মধ্যে… তারপর তাড়াতাড়ি করে ফিরে যায় বালিশের দিকে, হাতটাকে সাথে টেনে নিয়ে গিয়ে।
‘আমার হাতটা ছাড়ো এখন…’ ফের ফিসফিস করে বলে ওঠে অর্নব।
‘নাঃ… নাঃ… তুমি যাবে না… তুমি এখানেই থাকবে… আমার পাশে… আমাকে ছুয়ে থাকবে…’ বলতে বলতে টান দেয় অর্নবের হাতে পৃথা।
অর্নব প্রায় বাধ্য হয়েই এগিয়ে যায় পৃথার দিকে… ‘আমি তো আছিই… এবার ছাড়ো…’
‘তুমি আমার বিছানার ওই দিকটায় চলে এসো চট করে… এসো…’ তাড়া দেয় পৃথা।
নিরুপায় অর্নব পৃথার শরীর টপকে বিছানার ভিতর দিকে গিয়ে বসে।
পৃথা আন্দাজ করে সরে যায় অর্নবের পানে… ওর অদৃশ্য বুকের ওপরে নিজের কাঁধটাকে ছুঁইয়ে রাখে।
ঘরে ঢোকে কাজল, আর ওর পেছন পেছন ঢোকেন প্রণববাবুও… ‘এই নাও দিদিমনি… তোমার টাকার ফেরত… ছ’টাকা ফিরেচে… আমি কিন্তু মুর্গির মাংস, পাঁউরুটি, গাজর, পেঁপে আর বিন্ নিয়ে এয়েচি।’ বলে ওঠে পৃথাকে লক্ষ্য করে… তারপর পৃথার দিকে একটু অবাক চোখে তাকিয়ে বলে, ‘এই রকম বেঁকে বসেচো কেন দিদিমনি? বালিসটা ঠিক করে দেব?’
‘না, না, ঠিক আছি আমি… তোকে কিছু করতে হবে না…’ তাড়াতাড়ি বলে ওঠে পৃথা। নিজেও একটু সরে ভালো করে শোয় বালিশের ওপরে… কিন্তু এমন ভাবে থাকে যাতে একটু হলেও অর্নবের ছোঁয়া লেগে থাকে তার শরীরের সাথে। প্রণববাবুর সামনে রয়েছে বলে গায়ের ওপরে চাঁদরটাকে গলা অবধি টেনে দেয়, যতই হোক, টি-শার্টের ভেতরে ব্রা পরে নেই সে, বুকগুলো বিশদৃশ্য দেখাচ্ছে হয়তো।
‘এই যে মিস মুখার্জি… আপনার অসুধ… এই টেবিলের ওপরেই রাখলাম… প্যাকেটটার ভেতরে প্রেসক্রিপশনটাও আছে, আমি কাজলকে বরং বুঝিয়ে দিচ্ছি কখন কোন অসুধটা দিতে হবে।’
‘আরে আপনি এত ব্যস্ত হবেন না মিঃ কর্মকার… আমি দেখে নেব’খন… আর আপনি কেন শুধু শুধু আবার ওপরে উঠলেন, কাজলের হাত দিয়েই তো পাঠিয়ে দিতে পারতেন…’ বলে পৃথা।
‘পারতাম হয়তো, তবুও… আসতেই হলো…’ পৃথার মনে হলো কথাটা তাকে নয়, অন্য কাউকে খোঁচা মেরে বললেন প্রণববাবু। শুনে বুঝতে অসুবিধা হয় না পৃথার, কার উদ্দেশ্যে কথাটা ভদ্রলোক বললেন, তাই ফিক করে হেসে ফেলে।
‘হাসছেন যে?’ অবাক হয়ে প্রশ্ন করেন ভদ্রলোক।
‘না, আপনার অবস্থা দেখে…’ এবার হাসি আরো ছড়ায় মুখের ওপরে।
ব্যাপারটা না বুঝে মাথা চুলকান ভদ্রলোক।
পৃথা কাজলের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘তা হ্যারে, একটু মিঃ কর্মকারকে চা করে দিবিনা?’
‘এ বাব্বা, হ্যা তো…’ বলে একটা এত্ত বড় জিভ কাটে কাজল, ‘আমি এক্কুনি করে আনচি…’ বলে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে।
‘আমার জন্য আপনার ওপর দিয়ে খুব ঝড় গেলে যাহোক… অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে…’ কৃতজ্ঞ চোখে তাকায় ভদ্রলোকের পানে পৃথা।
‘না না, এ আর কি… আপনি একা থাকেন, সেখানে এতো আমার কর্তব্য…’ বলেন প্রণববাবু।
‘শুধুই কর্তব্য?’ প্রশ্ন করে পৃথা।
ভুরু কুঁচকে তাকান পৃথার দিকে ভদ্রলোক, ‘মানে? বুঝলাম না ঠিক…’
‘না বলছি শুধুই কর্তব্যের খাতিরে করলেন, নাকি…’ বলে থামে পৃথা।
‘না, মানে, এটা আর কি… আপনি অসুস্থ হলে…’
‘হ্যা, সেটাই তো বলছি, আমি অসুস্থ হলে আর সেই ইন্সট্রাক্সনটা যদি বন্ধুর কাছ থেকে যায়, তাহলে তো করতেই হবে… তাই না?’ হেসে বলে পৃথা।
‘মানে?…’ এবার থতমত খাবার পালা ভদ্রলোকের।
‘অবাক হবার কিছু নেই মিঃ কর্মকার… আপনি যার ইন্সট্রাক্সনে আমার এত উপকার করছেন, উনি এই মুহুর্তে আমার পাশেই বসে রয়েছে…’ মুচকি হেসে বলে পৃথা।
‘অ্যাঁ?…’ এদিক ওদিক তাকান প্রণববাবু… তারপর নজর রাখেন পৃথার পেছন দিকে।
‘হ্যা… ঠিক দিকেই তাকিয়েছেন… আমি জানি আপনি জানেন অর্নব এখন কোথায়… তাই না মিঃ কর্মকার…’
‘না, মানে…’ মুখটা কাঁচুমাচু করে তাকায় পৃথার দিকে প্রণববাবু।
‘মানে আপনার বন্ধু আমার কাছে ধরা পড়ে গেছে মিঃ কর্মকার… সে আমার হাতে বন্দি হয়ে গেছে… আর তার পালাবার পথ নেই…’ হাসতে হাসতে উত্তর দেয় পৃথা।
কথাটা শুনে একটু খানি চুপ করে থাকেন ভদ্রলোক, তারপর হাঃ হাঃ করে অট্টহাসিতে ফেটে পড়েন… ‘জানতাম… আমি জানতাম… ও আপনার কাছেই ফাঁসবে… বেশ করেছেন মিস মুখার্জি… সারা জীবন বন্দি করে রেখে দিন আমার বন্ধুটাকে… আমার চেয়ে বেশি খুশি আর কেউ হবে না এতে… উফ্, একটা কাজের মত কাজ করেছেন ব্যাটার জন্য… অনেক ভুগিয়েছে আমায়… এবার আপনার কাছেই বন্দি হয়ে থাকুক একেবারে…’
পৃথার ঠিক পেছন থেকে চাপা স্বরে বলে ওঠে অর্নব, ‘হ্যা, তুই তো খুশি হবিই… হবি না… বন্ধুর সর্বনাশেই তো বন্ধু খুশি হয়… ব্যাটা স্বার্থপর…’
‘আরে ভাই, এই খুশিটার জন্য কতদিন অপেক্ষা করেছি বল তো…’ বলে ওঠে প্রণববাবু।
‘আরে মাকাল, আস্তে কথা বল, কাজল রয়েছে, ও শুনলে ভিমরি খাবে… ভাববে তোরা ভুতের সাথে কথা বলছিস…’ ফের চাপা গলায় ধমকায় অশরীরি অর্নব।
‘না, সেটা ঠিক বলেছিস… সরি রে ভাই…’ এবার প্রণববাবুও গলা নামান।
তারপর পৃথার দিকে ঘুরে হাতটাকে বাড়িয়ে দিয়ে ওর হাতটাকে নিজের হাতের মধ্যে ধরে বলে ওঠেন, ‘থ্যাঙ্কস্ মিস মুখার্জি… অসংখ্য ধন্যবাদ… আমার এই বন্ধুটার ভিষন দরকার ছিল একটা কাঁধের… বড্ড অভাগা ও… অনেক কষ্ট পেয়েছে… ওর পাশে থাকার জন্য আপনার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার সীমা রইল না…’
স্মিত হাসে পৃথা, বলে, ‘চিন্তা করবেন না মিঃ কর্মকার, আজ থেকে আপনার বন্ধুর পাশে আমি সর্বদা থাকবো… কথা দিলাম।’
পেছন থেকে অদৃশ্য অর্নব বলে ওঠে, ‘হ্যাঃ, নিজেই রুগী, ও দেখবে আমাকে…’
কপট রাগ দেখিয়ে চোখ পাকায় ঘাড় ফিরিয়ে পৃথা, তারপর হেসে ফেলে বলে, ‘দেখো… দেখি কি না…’
ঘরের বাইরে কাজলের পায়ের শব্দ শোনা যায়।
টেবিলের ওপরে প্রণববাবুর জন্য চা আর বিস্কুটের ট্রে নামিয়ে প্রণববাবুর উদ্দেশ্যে বলে ওঠে, ‘প্রণবদাদাবাবু, দেকো তো, সেই আগের মতই চা করেচি কি না… ঠিক আপনি যেমনটি খেতেন, চিনি কম দিয়ে, সেই রকমই করেচি… একটুও কিচু ভুলি নি, হ্যা…’
ট্রে’এর ওপর থেকে চায়ের কাপটা তুলে নিয়ে চুমুক দিয়ে মুখ তোলেন ভদ্রলোক, ‘নাঃ, সত্যিই, এখনও ভুলিসনি দেখছি…’ তারপর আরো একটা চুমুক দিয়ে বলেন, ‘তা একদিনেই তো দেখছি দিদিমনির সংসারটা ধরে নিয়েছিস…’
‘নেবো না? আরে এটা দাদাবাবুর ফ্ল্যালাট, দাদাবাবু একোন নেই তো কি হয়েচে… দেকবেন, কেমন গুচিয়ে রাকি সংসারটাকে… কাজল এসে গেচে… দিদিমনির আর কোন চিন্তা নেই…’ বলেই ফেরে পৃথার পানে, ‘দিদিমনি, একন একটু চিকেন সুপ করে দিই?… আর সাথে পাঁউরুটির সেঁকা… খেয়ে তাপ্পর অসুদ খেও… বুজেচ… আর দুপুরে চিকেন ইস্টু করে রেকে দিয়ে যাবো, সেই জন্য গাজর, বিন, নিয়ে এয়েচি’ বলে আর দাঁড়ায় না, বাইরের দিকে যাবার জন্য পা বাড়ায়।
‘হ্যারে কাজল, প্রণবদাদাবাবুর জন্য কিছু ব্রেকফাস্ট করবি না? উনিও সেই সকাল থেকে না খেয়েই রয়েছেন…’ পেছন থেকে বলে ওঠে পৃথা।
কাজল উত্তর দেওয়ার আগেই তাড়াতাড়ি করে প্রণববাবু আধখাওয়া চায়ের কাপটা ট্রে’এর মধ্যে রাখতে রাখতে উঠে দাঁড়ান, ‘না, না, মিস মুখার্জি… আমার এখন আর দাঁড়াবার সময় নেই, আমি ফিরেই স্নান করে অফিস বেরুবো… ব্যাটা সব দ্বায়ীত্ব তো আমার ঘাড়েই দিয়ে রেখেছে, না?’
‘তাও, ব্রেকফাস্টটা অন্তত করে যান… বেলা অনেক হয়ে গেল আমার জন্য…’ পৃথা অনুরোধ করে।
‘হবে না মিস মুখার্জি, ওদিকে গিন্নি রেডি হয়ে রয়েছে আমার ব্রেকফাস্ট নিয়ে, এখন আমি যদি এখান থেকে ব্রেকফাস্ট সেরে যাই তাহলে যুদ্ধের দামামা বাজবে… তার থেকে এখন আমি পালাই…’
প্রণববাবুর বলার ধরণে হেসে ফেলে পৃথা আর কাজল দুজনেই। হাসতে হাসতেই পকেট থেকে সিগারেটএর প্যাকেটটা বের করে খুলে একটা সিগারেট বের করে ঠোঁটের কোনে রেখে জ্বালাবার জন্য লাইটার বের করে, কিন্তু তারপরই থমকে যান, ‘নাঃ, রুগির ঘরে সিগারেট ধরানো ঠিক হবে না, থাক, পরে খাবো’খন… বলে ফের প্যাকেটের মধ্যে সিগারেটটা ঢুকিয়ে রেখে নিজের পকেটে চালান করে দেন।
‘একটা কথা বলবো মিঃ কর্মকার, এবার অন্তত ওই ফর্মাল সম্বোধনটা ছাড়ুন, আমাকে পৃথা বলে ডাকলেই বেশি খুশি হবো…’ স্মিত হেসে বলে পৃথা।
‘হু, বলতে পারি, যদি আমাকে মিঃ কর্মকার থেকে প্রণবদায়ে নামাতে পারেন, তবেই’ হাসতে হাসতে উত্তর দেন ভদ্রলোক।
‘তাহলে তো আমিও বলতে পারি ছোট বোনকে কেউ আপনি আঁজ্ঞে করে?’ ঘুরিয়ে বলে ওঠে পৃথা।
মাথা নাড়েন ভদ্রলোক, ‘ঠিক, ঠিক, সেটাও একেবারে ঠিক কথা বলেছেন… থুড়ি… বলেছ… বেশ… আর আপনি আজ্ঞে নয়… একেবারে তুমি… ঠিক আছে? কিন্তু উল্টো দিকে তোমাকেও তাহলে ওই আপনি আঁজ্ঞেটা ছাড়তে হবে কিন্তু…’
‘আচ্ছা, আচ্ছা, তাই হবে, আর আপনাকে…’ বলেই জিভ কাটে পৃথা… ‘তোমাকে আর আটকাবো না… তবে একদিন কিন্তু বৌদিকে নিয়ে আসতে হবে… বৌদির সাথে আলাপ করাবে না?’
‘আরে তুমি কি বলছো? তোমার বৌদি যদি শোনে আজকের ঘটনাটা, ওকে আর আসতে বলতে হবে না, দেখ না, আজ সন্ধ্যেবেলাতেই না নাচতে নাচতে চলে আসে… তোমাকে আর নতুন করে ইনভিটেশন পাঠাবার দেখবে দরকার পড়বে না…’ বলে হা হা করে হেসে ওঠেন প্রণববাবু।
কাজল কিছু না বুঝেই সেও হাসতে থাকে প্রণববাবুর হাসিতে।
‘তুই কেন হাসছিস রে ব্যাটা?’ ওর দিকে কপট চোখ পাকিয়ে বলে ওঠেন ভদ্রলোক।
‘ও মা, তুমি হাসচো, তাই তো হাসলাম… আমি আবার কি দোস করলাম?’ বলে বেরিয়ে যেতে যায় ঘর থেকে।
‘ওরে শোন শোন…’ পেছনে ফের ডাকে পৃথা। পৃথার ডাক শুনে ঘুরে দাঁড়ায় কাজল।
‘স্যুপ কতটা করবি?’
‘কেন? তুমি একা খাবে, এক বাটিই করবো… আর সেই সাতে দু পিস পাঁউরুটি সেকে দেবো…’ সহজ গলায় বলে কাজল।
‘এক বাটি না, তুই বরং তিন বাটি করিস… একটা তোর জন্য আর বাকি দু বাটি আমাকে এখানে দিয়ে যাস… আর তার সাথে ছ’পিস ব্রেড টোস্ট করিস…’ বলে আড় চোখে প্রণববাবুর দিকে তাকায় পৃথা।
‘দু বাটি?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করে কাজল।
‘না, মানে…’ কি বলবে ঠিক করে উঠতে পারে না পৃথা।
‘আসলে দিদিমনি কাল রাত থেকে কিছু খায়নি তো, তাই এখন একটু বেশি করে খেতে হবে, আর অত অসুধ খাবে তো, সেই জন্য… তোকে বলছে যখন তুই করে দে না, এত প্রশ্নের কি আছে রে বাবা?’ বলে পরিস্থিতি সামলায় প্রণববাবু।
‘হ্যা, সেটাও ঠিক… কাল রাত থেকে খায় নি দিদিমনি, না? তবে আমি ও’সব সুপটুপ খাবো না, ও সব আমার সয়ে না, আমি বরং ক’টা পাঁউরুটিই খেয়ে নেব’খন, ও তোমায় ভাবতে হবে না।’ বলে মাথা নাড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
ঘরের মধ্যে দুজনেই হেসে ওঠে।
পৃথার পেছন থেকে ফিসফিসিয়ে প্রশ্ন করে অর্নব, ‘তুমি একাই দু বোউল স্যুপই খাবে? পারবে?’
ওর কথায় দুজনে আরো জোরে হেসে ওঠে… পৃথা ঘাড় ঘুরিয়ে অর্নবের মত করে ফিসফিসিয়ে বলে, ‘না, মশাই, শুধু আমার খাবার কথা চিন্তা করলে তো হবে না, আমার আর একজন আছে, যার সকাল থেকে তার তিতিরের জন্য পেটে কিচ্ছুটি পড়ে নি, তাই তার জন্যও স্যুপের অর্ডারটা দিয়ে দিলাম, বোঝা গেল? প্রণবদা বুঝে গেলো, আর এই লোকটা বুঝলো না… ইশ… এই নাকি ও আমাকে সামলাবে…’
অর্নব কিছু বলার আগেই প্রণববাবু বলে ওঠেন, ‘আপনারা দুজন দুজনকে সামলাও, আমি পালালাম, পরে দেখা হবে…’ তারপর পৃথার পেছনদিকে শূন্যতার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘এই মর্কট, পরে আমাকে ফোন করিস, বুঝলি…’
পৃথার পেছন থেকে ভেসে আসে গম্ভীর স্বরে… ‘হুম’।
5
২১।।
পৃথা কিছ বলার জন্য উদ্যত হয়, কিন্তু তার আগেই পাশে রাখা মোবাইলটা বেজে ওঠে… হাতে তুলে নিয়ে দেখে সুশান্ত… ‘ওহ্ ও… একবার অফিসে ফোন করা উচিত ছিল অনেক আগেই…’ সুশান্তর নামটা মোবাইল স্ক্রিনের ওপরে দেখে ভাবে পৃথা… ‘হ্যালো…’
‘আরে, তুমি এখনও অফিসে এলে না? মেট্রোর প্রবলেম নাকি? এদিকে ম্যানেজার বলছিল…’ ওপার থেকে সুশান্তর উদ্বিগ্ন গলা ভেসে আসে।
‘সরি সুশান্ত, আমার আগেই ফোন করা উচিত ছিল, আসলে…’ বলতে শুরু করে পৃথা।
‘কেন কি হয়েছে? আসবে না আজকে?’ প্রশ্ন ভেসে আসে সুশান্তের… ‘কাল তো কিছু বললে না যে ছুটি নেবে বলে… এদিকে…’
‘না, আসলে আমার গতকাল রাত থেকে একটু জ্বর মত হয়েছে, তাই আজকে আর ভাবছি অফিস যাবো না… একটু আজ রেস্ট নিয়ে নিই… কাল চেষ্টা করবো যাবার… তুমি একটু ম্যানেজারকে ইনফর্ম করে দিও না প্লিজ… আমি কাল গিয়ে বরং একটা মেল করে দেবো…’ বলে পৃথা।
‘জ্বর হয়েছে… আরে আমাকে আগে বলো নি কেন? আমি আসবো… ডাক্তার দেখাতে হবে তো…’ ব্যস্ত গলায় উদ্বেগের আভাস পাওয়া যায়।
‘না, না, আমি এখন মোটামুটি ঠিক আছি, ডাক্তার এসেছিল, দেখেছে আমাকে, ওই সামান্য জ্বর শুধু, অসুধ দিয়ে গেছে, কাল মনে হচ্ছে যেতে পারবো…’ তাড়াতাড়ি চেষ্টা করে সুশান্তের উদ্বেগটা কাটাবার।
কানের মধ্যে অর্নব ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে, ‘তুমি কথা বলো, আমি একটু আসছি…’
তাড়াতাড়ি করে ফোনটাকে বুকের মধ্যে চেপে ধরে পৃথা, যাতে তার কথা সুশান্তের কানে না যায়, সেও ফিসফিসিয়েই বলে ওঠে, ‘না… কোথায় যাচ্ছ… আমার পাশেই থাকো…’ চোখ পাকায় ঘাড় ফিরিয়ে।
‘আরে, আমি আসছি… একটু বাথরুমে যাবো… তুমি কথা বলো না…’ ফের সেই ভাবে বলে ওঠে অর্নব।