তুমিই আমার মা.... - অধ্যায় ১
পর্ব:০০১
ছয় বছরের অর্ণব সেন বাবার হাতের আঙ্গুল ধরে বাবা-মায়ের সঙ্গে কলকাতা শহরতলির ছোট একটা রাস্তায় হাঁটছিল।
সকালটা স্নিগ্ধ, হালকা কুয়াশা আর দূরের রাস্তার ধুলো মিলিয়ে একটা অদ্ভুত শান্তি ছড়াচ্ছিল।
বাবার হাতে ছোট্ট অর্ণবের হাত, মা পাশে হাঁটছেন, ছোট ছোট হাসি আর চোখে ঝিলমিলানো আনন্দ।
“বাবা, দেখো! সেই দোকানের পাশে কতগুলো পাখি বসে আছে!” অর্ণব কণ্ঠে চঞ্চলতা। সে ছুটে গেল দোকানের দিকে, পাখিদের দিকে হাত মেলে যেন তাদের ভাষাতেই কথা বলতে চাইলো।
বাবা হেসে বললেন, “শান্ত হও, বাবা। পাখিরা ভয় পাবে। কিন্তু তুমি চাইলে আমরা আরও কাছাকাছি গিয়ে দেখব। তবে ওরা যেন ভয় না পায়। ভালোবাসলে ভালোবাসা পাওয়া যায়।” অর্ণব কিছু বুঝলো কিনা জানা নেই, তবে বাবার কথায় ফুকড়া দাত মেলে হাসতে লাগলো।
মা অর্ণবকে কোলে তুলে বুকে জড়িয়ে বললেন, “সাবধানে চলতে হয় সোনা। রাস্তায় অনেক গাড়ি। আমি পাশেই আছি, যা লাগবে আমাকে বলবে। দৌড় দেবেনা।”
অর্ণব মাথা নেড়ে চুপচাপ ভদ্র ছেলে হল, তারপর আবার বাবার হাতে হাত রেখে এগোতে লাগল।
রাস্তার দু’পাশে ছোট ছোট দোকান, চকচকে ফল, রঙিন খেলনার ঝুলানো—সবই তার চোখে নতুন, অদ্ভুত আনন্দের। নতুন কোলকাতা, মানে সব নতুন।
“বাবা, আমি এই খেলনা নিতে চাই!” সে চিৎকার করে বলল, কিন্তু বাবা শুধু হাসলেন।
“আগে চল, বাবা। আমরা একটা জায়গা দেখব, তারপর কিনব।”
মা তাকে চুমু দিয়ে বললেন, “হ্যাঁ, একটু ধৈর্য ধরো। আনন্দ সবসময় দ্রুত আসে না। চলো খানিকটা ঘুরে বাসায় যাওয়ার সময় খেলনা কিনবো। নাহলে এখন এসব হাতে করে বয়ে নিয়ে বেড়াতে হবে।”
তারা হাঁটতে হাঁটতে এক ব্রীজের পাশে এসে পৌঁছালো। ছোট নদীটি হালকা ঢেউয়ের সঙ্গে ঝলমল করছে। অর্ণব নদীর দিকে তাকিয়ে বলল, “বাবা, আমরা কি নৌকা উঠবো?”
বাবা হেসে বললেন, “উঠবো, বাবা। কিন্তু আগে দেখব, কোথায় কোথায় ঘুরলে বেশী ঘুরে বেড়ানো যাবে।”
মা পাশে এসে হাত ধরে বললেন, “ভালোভাবে দেখো। নদী খুব গভীর।”
অর্ণব ছোট্ট পা নিয়ে নদীর ধারে গেল। পাখির ডাক, ঢেউয়ের শব্দ—সব মিলিয়ে যেন একটি নতুন জগৎ তার চোখে ভেসে উঠল। সে হঠাৎ তার মায়ের দিকে তাকাল, “মা, আমি সবসময় তোমার পাশে থাকতে চাই। ভয় লাগলে তুমি হাত ধরো।”
মা হেসে বললেন, “আমি সবসময় থাকব, সোনা ছেলে। তুমি বড় হলেও মনে রেখো, মা তোমার পাশে থাকবে, আর আছে।”
বাবা সঙ্গে বললেন, “ঠিক আছে, এবার একটু এগোই, আমরা শহরের পার্কটা দেখতে চাই।”
অর্ণব ছুটতে লাগল মা বাবাও ছেলেকে থামাতে পিছু দৌড়ালো। হঠাৎ, রাস্তার বাঁক থেকে দ্রুত একটি গাড়ি চলে আসল।
অর্ণব চোখ বন্ধ করলো। গাড়ির বিকট শব্দ, হঠাৎ ধাক্কার সঙ্গে সবকিছু মিলিয়ে গেল।
অর্ণব কিছুটা সে চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু কোনো শব্দ বের হলো না।
পরিবেশ থমকে গেল। মানুষের চিৎকার, গাড়ির ধাক্কা, ধূলোর ঘ্রাণ—সব মিলিয়ে অর্ণবের মাথার ভেতর এক বিশাল ঝড়ের মতো ছড়িয়ে পড়ল। সে শুধু হাত শক্ত করে আঁকড়ে ধরে, মনে মনে চিৎকার করছিল।
কয়েক মুহূর্তের জন্য অন্ধকার। তারপর হাসপাতালের শীতল দেয়ালের ভিতরে তার জ্ঞান ফিরল। চারপাশে অচেনা সাদা বাতাস, যন্ত্রের শব্দ, দূরের ডাক। সে হাত নড়ে দেখল, বাবা-মায়ের কোনো হাত নেই। অর্ণব শুধু কাঁপতে লাগল। চোখে জল, বুক ভেতর ভীষণ শূন্যতা।
সে জানত, জীবন এখন আগের মতো নয়। বাবা-মা চলে গেছে মাস খানেক আগেই। একমাস পর তার কিছুটা জ্ঞান ফিরেছে গতদুইদিন।
ছোট্ট হৃদয় ভাঙছে, আর একা থাকা ভয়ংকর মনে হচ্ছে। সে নিঃশব্দে কেঁদে বসল।
চোখে জল, চারপাশে নিঃশব্দতা, হৃদয়ে এক অদ্ভুত শূন্যতা। অর্ণবের মনে হঠাৎ একটি সংকেত—যে জীবন শুরু হতে যাচ্ছে, সে একা বাঁচতে পারবেনা।
রাত্রি গভীর হচ্ছে। হাসপাতালের ঠান্ডা বাতাসে অর্ণব নিজের ছোট্ট হাত গুটিয়ে ধরল। সে জানল, জীবনের গল্প এখন শুরু। আর তার জন্য এক নতুন অধ্যায় অপেক্ষা করছে। যেখানে শুধু শূন্যতা ছাড়া কিছুই নেই।
ক্রমশ.....