তুমিই আমার মা.... - অধ্যায় ২
পর্বঃ ০০২
হাসপাতালের ঘরটি ভীষণ শান্ত। সূর্যরশ্মি হালকা আলো ভেসে আসছিল জানালা দিয়ে।
এসির বাতাসে চারপাশে নরম কম্পন তৈরি করছিল। ছোট্ট অর্ণব সেন শুয়ে আছে, মাথায় ব্যান্ডেজ, চোখ কপালে ভরা হতাশা আর অজানা ভয়।
সে ঠিক বুঝতে পারছিল কী ঘটেছে, মনে হচ্ছিল কষ্টের এক বিশাল ঢেউ তার ভিতর দিয়ে ছুটে যাচ্ছে।
চোখ খুলতে চাইলেও তীব্র আলোতে চোখ জ্বলে উঠল, তাই সে ভ্রু কুঁচকিয়ে মাথা টেনে রাখল।
তখনই তার কানে ধীরে ধীরে কিছুর স্পর্শ লাগল। আর হাতের উপর আরেক হাত।
নরম হাত তার মাথা বুলিয়ে দিচ্ছিল।
অর্ণব চমকে উঠল, ঝাপসাভাবে চোখ খুলল। সামনে দাঁড়িয়ে একজন মহিলার ছায়া। চোখে কোমলতা, মুখে অদ্ভুত দুঃখ, কিন্তু পুরোপুরি দেখা যাচ্ছে না। তার মুখ আবছা, চোখ অন্ধকারে ঢেকে গেছে।
অর্ণব একটু কেঁপে উঠল। “মা?” সে কণ্ঠে কেঁপে কেঁপে জিজ্ঞেস করল।
মহিলা কোনো উত্তর দিল না। ধীরে ধীরে সে অর্ণবের মাথা নিজের বুকে টেনে নিলো।
ছোট্ট অর্ণব প্রথমবার অনুভব করল, কেউ আছে, তার মাথা আঁকড়ে ধরে আছে।
সেই স্পর্শ, কোমলতার ছোঁয়া—সব মিলিয়ে মনে হলো, এটা মায়ের মতো।
অর্নবের পাশে থাকা নারীটি যেন এক অনন্য মার্তৃত্বের প্রতীক।
তার চলাফেরার ভঙ্গিতেই এক ধরনের শীতল আশ্রয় আছে। বয়স মাত্র ২৭, কিন্তু তার চেহারায় যেন এক ধরণের প্রশ্রয় মিশ্রিত ধৈর্য জমে আছে।
দেহের গড়ন গাম্ভীর্যপূর্ণ; ওজন আনুমানিক ৫৪ কেজির মতো—না অতিরিক্ত শুকনো, না অত্যধিক ভারী—একটা পরিপাটি ভারসাম্য, যা তাকে দেখলেই বোঝা যায়, সে নিজের শরীর ও উপস্থিতি সম্পর্কে সচেতন।
তার গায়ের রঙ মসৃণ উজ্জ্বল, যেন সকালের প্রথম রোদে ধুয়ে নেওয়া কোনো দুধ-রঙা পর্দা, নরম আর শান্ত। চোখদুটো—গাঢ় বাদামি—চোখে তাকালেই বোঝা যায়, তিনি কারো জন্য গভীর অনুভব রাখতে পারেন। ঠোঁটের কোণে সবসময় যেন একটা ক্ষীণ হাসির রেখা থাকে।
চুল একদম কোমর ছোঁয়া, কখনো খোলা থাকে কখনো প্রতিটি বিনুনিতে থাকে সুব্যবস্থাপনার ছাপ—যেমন তার জীবন, তেমনি তার উপস্থিতিও। চলার সময় তার শরীরের ছন্দ এতটাই স্বাভাবিক, মনে হয় যেন এক অভ্যস্ত মায়ের ছায়া প্রতিটি পদক্ষেপে অনুরণিত হয়।
তার কণ্ঠস্বর নরম, গভীর এবং ধীরে বলা—প্রতি শব্দে মা হওয়ার দায়িত্ব যেন কাঁধে তুলে নেয়।
কোনো রকম বাহুল্য নেই তার ভঙ্গিমায়, অথচ যে কেউ বুঝে ফেলবে, এই নারী শুধু মাতৃত্বের নাম নয়, এক ধরনের নিরাপত্তার প্রতীক।
মাথা বুকে রাখা, হাতের কোমল স্পর্শ—সব মিলিয়ে অর্ণবের ছোট্ট হৃদয় অদ্ভুত শান্তি পেল।
চোখে জল, বুকের ভিতরে শূন্যতার অনুভূতি ধীরে ধীরে কিছুটা কমতে লাগল।
কিন্তু এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বও তৈরি হলো। সে বুঝতে পারছিল চোখে যা দেখছে তা মায়ের অবয়ব নয়। কিন্তু অনুভূতি, সেই মার্তৃঘ্রান—মায়ের মতো।
“আমি এখানে আছি, তুমি একা নও,” মহিলা বলল। কণ্ঠে কোমল সুর, যা ভয়ে কেঁপে থাকা শিশুর হৃদয়কে শান্তি দিচ্ছিল।
অর্ণব ধীরে ধীরে হাত নেড়ে বলল, “তুমি… তুমি আমার মা?”
মহিলা হেসে দিলো, শুধু মাথা কিছুটা নাড়ল। যেটা হ্যা শব্দটাকে ইঙ্গিত করে।
ধীরে ধীরে অর্ণব বুঝতে পারল, চোখে যা দেখছে তা মায়ের মতো নয়, কিন্তু স্পর্শ, শক্তি, স্নেহ—সব মিলিয়ে মনে হলো মা যেন তার পাশে আছে।
ছোট্ট অর্ণব তার মাথা আরও শক্ত করে মহিলার বুকের কাছে রাখল।
ভিতর থেকে একটি অদ্ভুত মার্তৃঘ্রান ভেসে এল। সে ভাবল, “মা… এটা কি সত্যিই তুমি?” সে জানে মা বাবা কেও আর নেই। তবুও কল্পনার জোরে তাদের ফিরিয়ে আনতে চায়।
সে চোখে যা দেখছে, তা মা নয়। মনে হল, মায়ের কোনো ছায়া যেন সেখানে আছে।
ঘরের নিঃশব্দতা, দূরের যন্ত্রের টিকটিকি, ভেতরের নিঃশ্বাসের প্রতিধ্বনি—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত শান্তি। অর্ণব বুঝতে লাগল, যদিও চোখে মায়ের অবয়ব নেই, হৃদয় কিছুটা শান্তি পাচ্ছে।
মহিলা ধীরে ধীরে বলল, “ভয় পেও না, সোনা। আমি তোমার পাশে আছি। সব ঠিক হয়ে যাবে।”
অর্ণব চোখ বন্ধ করে তার বুকে মাথা রেখে ভাবল, সত্যিই কেউ আছে তার পাশে।
হাত ধরে থাকা, বুকের স্পর্শ, সেই কোমলতার অনুভূতি—সব মিলিয়ে সে শান্তি অনুভব করল।
মহিলা অর্ণবকে গল্প বলতে লাগল। ছোট ছোট শব্দ, হালকা হাসি, ধীরে ধীরে তার মন হালকা হতে লাগল।
সে শিখল, যদিও মা-বাবা কাছে নেই, কেউ আছে, যে তার পাশে থাকবে। মা হয়ে, দিনশেষে হয়তো অর্নব বলবে, “তুমিই আমার মা…”
সকালে প্রখর হতে হাসপাতালের আলো আরও বেড়ে আসে। অর্ণব বুঝতে লাগল, সে ধীরে ধীরে নতুন জীবন শুরু করছে। কষ্ট, ভয়, শূন্যতা—সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে ধূসর আলো থেকে রঙিন আলোর দিকে যাচ্ছে।
নারীটি আবার তার মাথা আঁকড়ে ধরে বলল, “তুমি বড় হয়ে অনেক কিছু শিখবে। ভয় পেও না। আমি তোমার পাশে আছি। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত আছি”
কিছুদিন আগে মাও এই কথা বলে হারিয়ে গেছিলো ভাবতেই অর্নব কেপে ওঠে। ঝাপটে ধরে নতুন মাকে।
অর্ণব চোখ বন্ধ করে আবার ভাবল, “হয়তো সত্যিই কেউ আছে, যে আমাকে হারাতে চায় না।” ছোট্ট হৃদয়টি ধীরে ধীরে শক্তি পেল।
দিন কাটতে লাগল। হাসপাতালে শুধু যন্ত্রের টিকটিকি, বাতাসের হালকা নড়াচড়া। অর্ণব ধীরে ধীরে বুঝল, সে একা নয়। তার পাশে কেউ আছে, যে তাকে আঁকড়ে ধরে রাখছে, শক্তি দিচ্ছে।
অল্পক্ষণ পরে অর্ণব বলল, “আমি আমার মা-বাবা খুব মিস করি।”
মহিলা কণ্ঠে কোমলতা রেখে বলল, “আমি জানি, সোনা। তারা তোমাকে সবসময় ভালোবাসত। আর আমি এখানে আছি, তুমি একা নয়।আমি তাদের থেকে একটু কম ভালোবাসবোনা, কথা দিলাম।”
অর্ণব ধীরে ধীরে বুঝতে পারল, চোখে যা দেখছে তা মায়ের নয়, কিন্তু অনুভূতি মায়ের মতো।
সে মাথা আরও শক্ত করে মহিলার বুকে রাখল। ধীরে ধীরে শীতল বাতাস, হাসপাতালের নিঃশব্দতা—সব মিলিয়ে হৃদয়কে শান্তি দিচ্ছে।
বিকেল হয়ে আসল। হাসপাতালের জানালা দিয়ে হালকা বাতাস ভেসে আসছে। অর্ণব জানল, আজ থেকে সে একা নয়। পাশে কেউ আছে, যে তার কষ্ট কমাচ্ছে, ভয় দূর করছে।
রাত গভীর হল। হাসপাতালের বাতাসে অর্ণব শুয়ে থাকল, চোখ বন্ধ করে।
পাশে কেউ আছে, যে তার পাশে থাকবে। মনে হলো, নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। যে তার মাথার কাছ থেকে সরছেনা এক মুহুর্তের জন্য।
দিন শেষে এই ভালোবাসায় সাড় দিয়ে অর্নব হয়তো বলবে, “তুমিই আমার মা”।
ক্রমশ…
বিঃদ্রঃ গল্প প্রতিদিন দেবোনা। ফ্রি থাকলেই দেবো।