তুমিই আমার মা.... - অধ্যায় ৩
৩য় পর্ব
দিনদিন পার হয়েছে, গত ২০ দিনে সুমিতা অর্নবের কাছ থেকে নড়েনি। তার স্বামী মাঝে মাঝে এসে তাদের খোজ নেয় প্রতিদিন। সুমিতার জন্য কাপড় দিয়ে যায়।
তিনি সুমিতাকে বাড়িতে যেয়ে স্নান করে আসার কথা বলেছিলেন কিন্তু সুমিতা ছেলেকে ফেলে কোথায় যাবেনা এক সেকেন্ডের জন্য। বাধ্য হয়ে স্ত্রীর কথা শুনতেই হয় তাকে।
রোদঝলানো বিকেলের আলোর মধ্যে হাসপাতালের কোয়ার্টারগুলো নিঃসঙ্গ মনে হচ্ছিল। অর্নবের চোখের পাতা ধীরে ধীরে খোলা, বাতাসের ঠান্ডা স্পর্শে সে হালকা কাঁপছিল।
মনে হচ্ছিল, এখনো পৃথিবীর রং, শব্দ আর গন্ধ তার কাছে অচেনা।
তবে পাশেই কেউ আছেন, যেন প্রতিটি ভয়কে ধীরে ধীরে মুছে দিচ্ছেন।
সুমিতা চুপচাপ বসে আছেন। চোখে খানিকটা ক্লান্তি, তবে মৃদু হাসি।
অর্নব প্রতিদিন তার এই উপস্থিতি খুঁজে পেত। কখনও হাত ধরে রাখতেন, কখনও ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি দিয়ে চোখের কোণ মুছতেন। প্রতিটি ছোট স্পর্শে অর্ণব অনুভব করত—যেন এই মানুষটিই তার পৃথিবী, তার নিরাপত্তা।
আজ অর্নব একটু সেরে উঠেছে। ডাক্তাররা জানিয়েছে, তার মাথার ব্যান্ডেজ খুলে ধীরে ধীরে চলাফেরা শুরু করা যাবে। কিন্তু এখনো শারীরিকভাবে ভঙ্গুর, তাই একেবারে মুক্তভাবে হাঁটতে পারছে না। সুমিতা তার পাশে বসে, হাত ধরে খাট থেকে তুললেন, চোখে এক রকম সতর্কতা।
— “আন্টি… আমি কি আজ একটু বাইরে হাটতে পারি?”
— “হ্যাঁ, তবে খুব ধীরে ধীরে। আমি আছি পাশে,” — বললেন সুমিতা, মৃদু হাসি দিয়ে।
অর্নব ধীরে ধীরে কোয়ার্টারের ছোট বারান্দার দিকে গেল। বাইরের বাতাসে ফুলের গন্ধ, দূরের ট্রাফিকের শব্দ, সবই তার মনে নতুন উদ্দীপনা জাগাচ্ছিল। সুমিতা পাশে দাঁড়িয়ে, তার কাঁধে হাত রেখেছিলেন যেন অর্নব কখনো নড়বড়ে না হয়।
— “আন্টি, আমি… আমি সত্যিই বেচে আছি?”
সুমিতা হাটু গেড়ে বসে অর্নবের কপালে চুমু দিয়ে তার মাথাটা আলতো করে নিজের নরম বুকে রাখলো।
— “হ্যাঁ, তুমি বেচে আছো, সোনা। আর আমি চাই তুমি পুরোপুরি সুস্থ হও। তোমার হাসি মাখা মুখ দেখার জন্য আমি বড্ড ব্যাকুল হয়ে আছি, সোনা।”
অর্নবের চোখে অজানা শঙ্কা—মা -বাবা নেই—সব মিলিয়ে তার মনে এক ধরনের শূন্যতা। কিন্তু আন্টির হাতের স্পর্শ, বুকের কাছে টানা, সব ভয়কে মুছে দিচ্ছিল।
বিকেলের আলো নরম হয়ে আসছে। অর্নব বারান্দার লোহার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে। সুমিতা তার পিছনে দাঁড়িয়ে, চুপচাপ তাকিয়ে আছেন তার দিকে, যেন মন ভরে অর্নবকে দেখছে।সে যেন কোনো শব্দ ছাড়াই অর্নবের মনে কথা, অনুভূতি বুঝতে পারছে।
হঠাৎ অর্নব বলল—
— “আন্টি, আমি যদি… আমি যদি আপনাকে হারিয়ে ফেলি?”
— “তুমি আমাকে হারাবে না, কথা দিলাম। আমি এখানে আছি, তোমার পাশে। তুমি শুধু নিজেকে সুস্থ করো,” — বললেন সুমিতা, ধীরে ধীরে তার কাঁধে হাত রাখলেন।
বিকেলের আলো কমছে, কিন্তু অর্নব চোখ বন্ধ করে সেই উষ্ণতা অনুভব করতে থাকে। সে বুঝল, শারীরিক আরোগ্য ছাড়া মানসিক শান্তি কতটা জরুরি। সুমিতার উপস্থিতি, তার নিঃশ্বাসের ধাক্কা, হাতের স্পর্শ—সব মিলিয়ে অর্ণবের মনে জন্ম দিল এক নতুন শক্তি।
সন্ধ্যা নামতেই হাসপাতালের ছাদের দিকে তারা হাঁটলেন। বাতাসে হালকা ঠান্ডা, আকাশে লালচে আভা। অর্নব জানল, এই মানুষটার পাশে থাকা শুধু রক্ষা নয়, এক ধরনের মাতৃত্বময় উষ্ণতা।
— “আন্টি… আমি কি… সব ঠিক হয়ে যাবে?”
— “সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি তোমার পাশে আছি,সোনা” — বললেন সুমিতা, অর্ণবকে ধীরে ধীরে বুকের কাছে টেনে নিয়ে।
অর্নব হঠাৎই বলল—
— “কিন্তু… আমি কি সত্যিই মা-কে আর দেখতে পাব না?”
— “আমি তো তোমার মা হতেই এসেছি, সোনা। একবার মা বলে ডেকেই দেখো না! আমার কলিজাটা কেটে তোমার হাতে দিতে দেবো।” — মনে মনে সুমিতা, মৃদু হাসি দিয়ে।
রাতের অন্ধকার নেমে এলো। অর্নব জানালা দিয়ে বাইরে তাকাচ্ছিল, দূরের আলো ঝলমল করছে। সুমিতা তার পাশে বসে চুপচাপ। মাঝে মাঝে অর্ণবের চুলে আঙুল চালাচ্ছেন, হাতে ছোট ছোট স্পর্শ, বুকের কাছে টানা—সব মিলিয়ে অর্ণবের মনে গভীর এক নিরাপত্তা তৈরি হলো।
হঠাৎ অর্নব প্রশ্ন করল—
— “আন্টি… আপনি যদি না থাকতেন?”
— “তাহলে তুমি এইভাবে আমাকে প্রশ্ন করতে পারত না। আমি আছি, এবং থাকব।”
এই মুহূর্তে অর্নব বুঝল, সুমিতা আন্টি শুধু সঙ্গী নয়, তার পৃথিবী, তার আশ্রয়। চোখের কোণে ধীরে ধীরে জল জমতে শুরু করল, কিন্তু অর্নব নিজেও জানত, এটি কেবল কৃতজ্ঞতার জল।
রাত গভীর হলো। তারা দুজনই চুপচাপ বসে আছে, কখনও কথা বলছেন না, শুধু একে অপরের নিঃশ্বাস শুনছেন। অর্নব জানল, হাসপাতালে এই সময়টাই তাকে মায়ার মতো এক নিরাপদ স্পর্শ শিখাচ্ছে—মা-বাবার শূন্যতার মধ্যে।
সুমিতা মাঝে মাঝে অর্নবকে জিজ্ঞেস করলেন—
— “কিছু মনে হচ্ছে কি?”
— “না, শুধু… আমি এখানে থাকতে চাই, আর আপনি থাকুন পাশে,” — বলল অর্নব।
হাসপাতালের আলো কমে আসছে, ছাদে ধীরে ধীরে চাঁদ উঠেছে। তারা দুজন চুপচাপ বসে আছে, একে অপরের উপস্থিতি অনুভব করে। আর এই অনুভূতিই অর্ণবকে ধীরে ধীরে শক্তিশালী করছে, ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করছে।
—----
হাসপাতালের ঘড়ির শব্দ ক্রমশ কমতে শুরু করেছিল। ডাক্তাররা পরামর্শ দিলেন, ধীরে ধীরে একা চলাফেরা শুরু করতে। অর্ণবের চোখে হালকা আলো, মনে শক্তি আর আত্মবিশ্বাস জাগতে লাগল।
সুমিতা পাশে বসে অর্ণবকে দেখছিলো। তার চোখে হালকা সতর্কতা, কিন্তু সেই সঙ্গে সন্তুষ্টি। প্রতিদিনের ছোট ছোট পদক্ষেপ—সুস্থ হওয়ার লক্ষ্যে—অর্ণবকে ধীরে ধীরে নতুন জীবন শেখাচ্ছিল।
— “আন্টি, আমি কি সত্যিই ঠিক হয়ে যাচ্ছি?”
— “হ্যাঁ, তুমি ঠিক হয়ে যাচ্ছো। এখন শুধু ধীরে ধীরে একা হাটতে হবে,” — বললেন সুমিতা।
করিডরের এক কোণে অন্যান্য রোগীরা তাদের দিকে তাকাল। আর্নবের শরীর এখনও ভঙ্গুর, কিন্তু চোখে দৃঢ়তা। সে বুঝতে পারল, মানুষ তার দিকে তাকালেও ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আন্টির উপস্থিতি তাকে সাহস দিচ্ছিল।
পরের কয়েক দিন ধরে অর্ণব শিখছে: ছোট ছোট কাজ নিজে করা—জুতো পরা, জল খাওয়া, হালকা হাঁটা। প্রতিটি নতুন অভিজ্ঞতা তার আত্মবিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করছে।
সুমিতা মাঝে মাঝে তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলছে—
— “দেখছো, তুমি পারছো। আমি জানতাম তুমি পারবে।”
এক দুপুরে, হাসপাতালের ছাদে বসে আর্নব আকাশের দিকে তাকালো। হালকা বাতাসে পাতা নড়ছে, দূরের ট্রাফিকের আওয়াজ আসছে। মনে হলো, এই ছোট্ট সময়েই সে পৃথিবীকে নতুন চোখে দেখছে।
ছাদে হালকা আলোয়, আর্নব বুঝতে পারল, নিরাপত্তা শুধু রক্তে নয়, মানসিক উপস্থিতি থেকেও আসে। আন্টির নিঃশব্দ উপস্থিতি, তার চোখে সতর্কতা এবং ধীরে ধীরে শেখানো ছোট ছোট কাজ—সব মিলিয়ে অর্ণবকে নিজের উপর বিশ্বাস করতে শেখাচ্ছে।
সন্ধ্যা নামতেই হাসপাতালের আলো কমতে লাগল। আর্নব জানালার বাইরে তাকাল—দূরে শহরের আলো, ট্রাফিক, মানুষ। অল্প কিছুক্ষণের জন্য মনে হলো, সে এই সবকিছু সামলাতে পারবে, আন্টি পাশে থাকলে।
সুমিতা পাশের চেয়ারে বসে, অর্ণবের মাথায় হাত বুলাচ্ছেন। মাঝে মাঝে অর্ণব তার কাঁধে হালকা হাত রাখে। এই ছোট ছোট স্পর্শগুলো অর্ণবের জন্য এক ধরনের মানসিক শক্তি।
রাত নামার পর, আর্নব জানালার পাশে বসে হালকা বাতাসে চোখ বন্ধ করে মনে করল—সুমিতা আন্টি তার জীবনের স্থিরতার প্রতীক। এই উপস্থিতি ছাড়া সে কখনোই এতটা শক্তিশালী হতে পারত না।
পরবর্তী দিনগুলোতে অর্ণব ধীরে ধীরে আরও সুস্থ হতে লাগল। ছোট ছোট কাজ নিজে করা, ডাক্তার-নার্সদের নির্দেশ মেনে চলা, খাবারের স্বাদ নতুনভাবে উপলব্ধি করা—সব মিলিয়ে অর্ণবকে নতুন শক্তি এনে দিচ্ছিল।
সুমিতা চুপচাপ তার পাশে থাকত, শুধু প্রয়োজনমতো সাহায্য করত। কখনও হাসি, কখনও মৃদু হুকুম—সব মিলিয়ে অর্ণব শেখছিল, সহানুভূতি, ধৈর্য এবং যত্ন কতটা জরুরি।
এভাবেই অর্ণবের দিন কাটতে থাকল। ধীরে ধীরে, অল্প অল্প করে সে বুঝতে পারল—পৃথিবী শুধু শারীরিক শক্তির জন্য নয়, মানসিক শক্তির জন্যও স্থান।
এই শক্তির অনেকটা ক্রেডিট সুমিতার, দিন শেষে তাকে তো এই কথাটা শুনতেই হবে, “তুমিই আমার মা।”
ক্রমশ……