যার যেখানে নিয়তি/ কামদেব - অধ্যায় ৪
চতুর্থ পর্ব
ট্যাক্সি সারকুলার রোড থেকে রাজা দীনেন্দ্র মিত্র স্ট্রীট ধরে দেশবন্ধু পার্কের পাশ দিয়ে গিয়ে আরজিকর রোড ধরে চলল।জানলা দিয়ে হাওয়া এসে মাথার চুলে লুটোপুটি করে। অতনু জিজ্ঞেস করে,কাঁচ নামিয়ে দেবো?
--না থাক। দরকার হলে আমি নামিয়ে নেবো।
বুকের কাপড় যাতে আলগা না হয়ে যায় আঁচল গলায় জড়িয়ে নিলাম। খুব ভাল লাগছে মনে হচ্ছে মুক্ত বিহঙ্গ।শ্বশুরবাড়ি দোতলা নীচে একটা ঘর বৈঠকখানা হিসেবে ব্যবহৃত হয় বাকী সব দোকান।দোতলায় দুটো বড় ঘর আর একটা ছোট প্যাসেজ আসবাব দিয়ে ঘর করা হয়েছে।ঐ ঘরে তনু থাকে।একটা ঘরে শ্বশুর-শাশুড়ি অন্য ঘরে আমি।আড়চোখে দেখলাম অতনু এতক্ষন আমাকে দেখছিল আমাকে নিষ্পৃহ দেখে জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। ট্যাক্সি ইন্দ্র বিশ্বাস রোডে ঢুকল।পাশে আর্ম পুলিশের ব্যারাক টালা পার্ক,পার্কের মধ্যে একটা দিঘী আবার দিঘীর মাঝে দ্বীপের মত। বন্ধুবান্ধব নিয়ে আগে এদিকে পুজোর সময় ঠাকুর দেখতে এসেছি। এখন সব
কোথায় ছড়িয়ে গেছে।কারো হয়তো তার মত বিয়ে হয়ে গেছে। তে-রাস্তার মোড় দেখা যাচ্ছে।মনে হচ্ছে কতদিন পরে ফিরছি। বারান্দায় ডলিপিসি দাঁড়িয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে উদাস দৃষ্টি।
বুকের মধ্যে ধক করে ওঠে,ওটা কে? উস্কোখুস্ক চুল হাতে কুশাসন গলায় কাছা গায়ে চাদর ধুতি পরা? মণিদা মনে হল ?পিছন ফিরে ট্যাক্সির কাচের মধ্যে দিয়ে দেখি মণিদাই তো,কে মারা গেল?মন খারাপ হয়ে যায় মণিদার কেউ মারা গেছে। ইস মণিদার ভাগ্যটাই খারাপ। গাড়ী বাড়ির সামনে দাড়াতে মা বেরিয়ে এল,মায়ের পিছনে ফাল্গুণি। অবাক হলাম ফাল্গুণী এখানে কেন?অতনু মিষ্টির প্যাকেটা মায়ের হাতে দিতে মা ফাল্গুণীর হাতে দিয়ে বলল,টুসি এটা ভিতরে নিয়ে যাও।
টুসি? টুসি ফাল্গুণীর ডাক নাম আমি জানতাম কিন্তু মা ওকে টুসি বলে ডাকছে তারমানে কিছু ব্যাপার আছে।ফাল্গুণী আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে ভিতরে চলে গেল। মা অতনুর চিবুকে হাত দিয়ে চুমু খেয়ে বলল,এসো বাবা ভিতরে এসো।
বাবার ঘরে ঢুকে দেখলাম বাবা শুয়ে আছেন,আমাকে দেখে উঠে বসে বললেন,কেমন আছিস মা?
--ভাল,তুমি কেমন আছো বাবা?শুয়ে আছ কেন?
--কদিন ধরে বুকে একটা ব্যথা হচ্ছে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়।
অতনু ঢুকে বাবাকে প্রণাম করল। বাবা বললেন,বেঁচে থাকো বাবা।বেয়াই মশাই কেমন আছেন? বাড়ীর সব ভাল তো?
--হ্যা সবাই ভাল আছেন।
আমি বেরিয়ে ছোড়দার ঘরে যেতে দেখলাম সোফায় বসে ফাল্গুণীকে জড়িয়ে ধরে চুমু খাচ্ছে ছোড়দা।দরজাটা বন্ধ করে নিতে পারেনা। দ্রুত
বেরিয়ে আসবো ছোড়দা ডাকল,এ্যাই মণি শোন।
ফাল্গুণী কেন বউভাতে গেছিল আর কেনই বা এখন এ বাড়ীতে জলের মত পরিস্কার হয়ে গেল।ওর স্টকে তিন চারটে প্রেমিক ছিল এখন ছোড়দাকে নিয়ে পড়েছে? ছোড়দা জিজ্ঞেস করল,কখন বেরিয়েছিস?
ছোড়দার সঙ্গে কথা বলতে অস্বস্তি হচ্ছে না তাকিয়ে বললাম, নটা নাগাদ।তোর অফিস নেই?
--এখনই বের হবো।আজ মনে হচ্ছে খাওয়া দাওয়া ক্যাণ্টিনে সারতে হবে।
--হ্যারে ছোড়দা মণিদার কি খবর?
--ওর বাবা মারা গেছে,ব্যাটা খুব লাকি।
বাবা মারা যাওয়ার সঙ্গে লাক-এর কি সম্পর্ক বুঝলাম না বললাম,ছি ছোড়দা তুই এভাবে বলছিস কেন?ও তো তোর বন্ধু?
--কি ভাবে বললাম?জানিস শালা বিরাট চাকরি পেয়েছে,এখন ওকে দেখলে চিনতেই পারবি না।
--মনে হল তে-রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ছোড়দা হো-হো করে হাসল।হাসিতে তাল মেলাল ফাল্গুণীও।আমি অবাক হলাম হাসির কথা কি বললাম?
--বস্তিতে ,গাড়ী ঢোকার রাস্তা নেই।অফিসের গাড়ী আসবে ওইখান থেকে তুলে নিয়ে যায়।
টুসি বলল,মণি তুই তো ছিলি না কদিনে অনেক ব্যাপার ঘটে গেছে সব বলবো তোকে।
এরকম কিছু ভেবেছিলাম,মণিদার বাবা মারা গেছে।কদিন এজন্য মেসেজ করেনি? বাবা মারা যাবার খবরটা দিতে পারতো,আজ এখানে না এলে জানতেই পারতাম না।নিজের দুঃখের ভাগ মণিদা হয়তো কাউকে দিতে চায় না।অফিস যাবার জন্য ঐখানে দাড়িয়েছিল। বড়দা ছোড়দা অফিস চলে গেল।মা এমন বাড়াবাড়ি শুরু করেছে জামাই নিয়ে বিরক্তিকর।জামাইয়ের পঞ্চ ব্যঞ্জন করতে গিয়ে দাদারা ডাল্ভাত খেয়ে অফিস গেল। মা এবার জামাইকে আদর করে খাওয়াবে।টুসিও আমাদের এখানে খাবে,মার সঙ্গে অনেক খেটেছে সারাদিন।এর মধ্যে কি করে ছোড়দাকে পটালো?আগে থেকেই ছোড়দা ওর তিন-চার প্রেমিকের একজন ছিল নাকি? কিছুই বলেনি আমাকে।খাওয়া দাওয়ার পর দিনের বেলা দরজা বন্ধ করে ওর সাথে শুতে লজ্জা করল। অতনুকে শুইয়ে দিয়ে ছোড়দার ঘরে গেলাম।আমাকে দেখে টুসি কি যেন লুকিয়ে ফেলল।সেই বই নয়তো?
--আয় মণি।
--কখন এসেছিস তুই?
--মা বলল ঘুম থেকে উঠে চলে আসতে,আসতেই হল।
আমার মা এখন ওরও মা হয়ে গেছে। কত সহজে মাসীমা এখন মা হয়ে গেল? জিজ্ঞেস করলাম,কি করে পটালি ছোড়দাকে?
মিটমিট করে হাসে টুসি,আমার দিকে আড়চোখে দেখে বলল,তুই ছিলি এ বাড়ীর মেয়ে এখন অতিথি আর আমি হি-হি-হি---রাগ হচ্ছে?
ইঙ্গিতটা বুঝতে পারি,গায়ে না মেখে জিজ্ঞেস করি,বললি না কি করে পটালি?
--সোমেনকে পটাতে হয় না,ও নিজেই পটে বসে আছে।আমি বলে দিয়েছি উপরে উপরে যা হচ্ছে ঠিক আছে কিন্তু বিয়ের আগে আর নীচে নামতে দেবোনা।
কান ঝা-ঝা করে ওঠে অবলীলায় কথাগুলো কি করে বলল টুসি,সোমেন আমার ছোড়দা ও জানে।একটু আগে দেখেছি উপরে উপরে হচ্ছিল।
টুসি জিজ্ঞেস করে,ভাবছিস ফাল্গুণী মন্ত্র জানে নাকি?মন্ত্র নয় যন্ত্র দিয়ে বশ করেছি।কামদেবের একটা গল্প পড়েছিলাম "ভোদার সামনে সবাই কাদা।" সেই ফর্মুলা এ্যাপ্লাই করলাম।
কে কামদেব কি ফর্মুলা কিছুই বুঝতে পারি না। টুসি আমার কাছে রহস্যময় হয়ে উঠছে।
ফাল্গুণী এক সময় বলল,মণি তোরা ভাবতিস আমি গুল মারছি। দেখ অনেক ছেলে এসেছে আমার জীবনে,সব ধান্দাবাজ নানা ছুতোয় গায়ে হাত দিতে চায়।আমার চালচলন খোলামেলা ব্যবহার দেখে ভুল বোঝে মনে করে সস্তা।প্রথম প্রথম আমিও ভুল বুঝেছি ভেবেছি প্রেম। মনে মনে স্বপ্নের জাল বুনেছি। ভুল ভাঙ্গতে দেরী হয়নি বুঝেছি প্রেম নয় আসলে গেম।ঘেন্না ধরে গেল প্রেমের উপর।বানিয়ে বানিয়ে বলতাম যা মনে আসতো।
টুসির কথা শুনে আলোর কথা মনে পড়ল।কলেজে যাকে চিনতাম এ সে ফাল্গুণী নয়। সবার মনেই চাপা বেদনা থাকে আমরা জানি না বলেই তাকে বিচার করতে ভুল করি।একটু আগে ব্যঙ্গ করছিলাম বলে খারাপ লাগল জিজ্ঞেস করলাম,ছোড়দার সঙ্গে তোর কতদিনের যোগাযোগ?
আমার দিকে তাকিয়ে ফাল্গুণী হাসল তারপর বলল,একটা কথা বলছি কাউকে বলবি না।তে-রাস্তার মোড় দিয়ে যেতে সোমেনকে অনেকবার দেখেছি কখনো তেমন মনে হয়নি বরং একটা ছেলে ছিল ওর বন্ধু মণিশঙ্কর--ওর একটা আকর্ষণ ছিল।
মণিদার উপর নজর পড়েছিল? ফাল্গুণী বলতে থাকে,তুই বিয়ের কার্ড দিলি যদি না আসি রাগ করবি,এলাম। আমাকে দেখে সোমেন এগিয়ে এসে কফি বাড়িয়ে দিল।ও বুঝতে পারেনি কাপটা ফুটো ছিল টপ টপ আমার বুকে পড়ল ক-ফোটা।আমি বললাম,এমা কাপটা ফুটো।
আমাকে বেসিনের কাছে নিয়ে জলে হাত ভিজিয়ে কফিভেজা জায়গায় হাত বোলাতে লাগল।বুকের ভিতর শির শির করে ওঠে,তাকিয়ে দেখছি সোমেনের চালাকি কি না?একসময় খেয়াল হয় বুঝতে পারে এতক্ষণ আমার স্তনে হাত বোলাচ্ছিল। হাত সরিয়ে নিয়ে বলল,স্যরি।
মজা করে বললাম,হাত বোলালে দোষ নেই,আপনি তো টেপেন নি। তুই যদি তখন তোর ছোড়দাকে দেখতিস হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেতিস।সেই মুখ দেখে মনে হল আমি প্রেমে পড়ে গেছি।আমাকে অন্য একটা গেলাসে কফি এনে দিল।আমার দেখভাল করতে গিয়ে ভুলে গেল সবাইকে আপ্যায়ন করার দায়িত্ব ওর। বারবার জিজ্ঞেস করছিল আমি খেতে বসবো কি না? আমি ইচ্ছে করেই দেরী করছিলাম। সোমেন এক সময় বলল,একটা কথা বলবো কিছু মনে করবেন না?
আমি অবাক হলাম বুঝলাম কাহিনী বাধা পথে এগোচ্ছে।'আপনাকে দেখতে সুন্দর' আপনাকে আমার খুব ভাল লেগেছে' এরকম কিছু বলবে জিজ্ঞেস করলাম,কি কথা বলুন?
--মণির বউভাতে আপনি যাবেন?
ভাল লাগল বললাম,যেতে পারি যদি আপনি এই 'আপনি-আজ্ঞে' ছাড়েন।
--তাহলে তুমিও আমাকে তুমি বলবে।সোমেন বলল।
ফাল্গুণী হেসে বলল,এইভাবে এগোতে এগোতে এখানে পৌছেছি।
মা চা নিয়ে ঢুকে বলল,ওকে একা রেখে তোরা এখানে আড্ডা দিচ্ছিস? অতনু ঘুমোচ্ছে চা দিইনি,উঠলে বলিস।আমি তোর বাবার কাছে আছি।
মা চলে গেলে চায়ে চুমুক দিয়ে জিজ্ঞেস করি,তুই মণিশঙ্করের কথা কি বলছিলি?
--ওর বাবা মারার যাবার পর খাটিয়ায় ফুল দিয়ে সাজাচ্ছে।লোকজন নেই গাড়ী করে নিয়ে যেতে পারে।দেবযানী আণ্টি ভেবেছিলেন টাকার জন্য হয়তো গাড়ী বলেনি।রাস্তায় এসে জিজ্ঞেস করলেন,মণি তুমি কি টাকার জন্য শববহনের গাড়ি আনতে চাইছো না?মণিশঙ্কর বলল,না আণ্টি এখুনি বাজার থেকে লোক এসে যাবে।কিছুই তো করতে পারলাম না বাবার জন্য অন্তত শেষযাত্রাটা আমি কাধে করে নিয়ে যেতে চাই।ভেবেছিলেন টাকা দেবেন,আণ্টি আর কোনো কথা না বলে চলে এলেন। কেমন অদ্ভুত তাই না?
--একসময় ছোড়দার বন্ধু ছিল।
--জানি ওর নিজের কম্পিউটার ছিল না এর তার কম্পিউটারে কাজ চালাতো,সোমেনের কম্পিউটার কত ব্যবহার করেছে।ফাল্গুণী বলল।
--ছোড়দা বলেছে?
--সোমেন আমাকে কোনো কথা লুকোয় না।তোর বন্দনাকে মনে আছে?
--মনে থাকবে না কেন?এ পাড়া ছেড়ে কোথায় চলে গেল নেমন্তন্ন করতে পারিনি।
--বন্দনা নাকি একবার মণিশঙ্করকে প্রেম নিবেদন করেছিল।হি-হি-হি।
--তাই-ই-ই?অবাক হয়ে ভাবি,মণিদার উপর বন্দনারও নজর পড়েছিল?
--এত অসভ্য ওকে কি বলেছিল জানিস?বন্দনা তোমার প্রস্তাব মন্দনা কিন্তু আমি এনগেইজড।
--জিজ্ঞেস করেনি কে?হি-হি-হি।হাসি পেয়ে গেল মণিদাটা ভারী চ্যাংড়া।
--ধুর ইয়ার্কি করেছিল তুই যেমন।সমুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম,সমু বলল ফালতু মেয়েদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে প্যাণ্ট ভিজে যায়--এনগেইজড।
ঠিকই মণিদা একটু সাই টাইপ।সেদিনের কথা মনে পড়তে রক্তিম হল মণিমালা।
--তুমি এখানে?আমি সারা বাড়ী তোমাকে খুজে বেড়াচ্ছি। ঘুম চোখে উঠে এসেছে অতনু।
--খোজার দরকার কি,ডাকলেই পারতে?মা তোমাকে চা দিতে এসে ফিরে গেছে।
--তা ঠিক এখন কম্পিউটারের যুগ ক্লিক করলেই সব হাতের মুঠোয়।আপনি মণিমালার বন্ধু?
অমনি নজর পড়েছে। বন্ধু না শত্রূ তাতে তোমার দরকার কি?বললাম,আমরা এক কলেজে পড়তাম।
--তাই?আপনার সঙ্গে আলাপ করে ভাল লাগল।অতনু বলল।
আলাপ আর কোথায় হল।আমাকে খুজতে এসে এখানে সেটকে গেছে। মজা করার জন্য বললাম,তুমি ওর সঙ্গে গল্প করো,আমি তোমার চা নিয়ে আসছি।
আমার প্রস্তাবে দেখলাম মক্কেল খুব খুশি।আমি চা আনতে গেলাম। ধীরে ধীরে সন্ধ্যে নামে,অফিস থেকে ফিরে এল বড়দা। মা যথারীতি রান্না ঘরে ঢুকেছে। মক্কেল তখনো ফাল্গুণির সঙ্গে মেতে আছে গল্পে।ছোড়দা আসার পর অতনু বের হল।মণিদা পিতৃহারা,এতদিন যা করিনি আজ মনে হল একটা মেসেজ পাঠাই। বোতাম টিপে লিখলাম, বাবা মারা গেছেন আমাকে বলোনি তো?