যেমন করে চাই তুমি তাই/কামদেব - অধ্যায় ২
।।২।।
বলদেব পাকাপাকিভাবে চৌধুরী বাড়ীতে বহাল হয়ে গেল।কাজ তেমন কিছু নয়, বাড়ীর সামনে গাছ গাছালি দেখাশুনা করা,গরুকে জাব দেওয়া,টুকটাক ফাইফরমাশ খাটা।তারপর হাতে তার অখণ্ড অবসর। যে যেমন ভাবে চায় বলদেব তারে সেইভাবে সেবা করে।মুখে বিরক্তি বা না নাই।বলদেব খুব সহজ সরল খোলা মনের মানুষ, এমন একটা লোকের অঞ্চলে জনপ্রিয় হতে সময় লাগেনা।বলদেব চুপচাপ অলস বসে থাকতে পারে না। হাতে যখন কাজ থাকে না বলদেব গ্রাম ঘুরতে বের হয়।
গ্রামের পুব দিকের সীমানায় কয়েক ঘর কুমোরের বাস।লোকে বলে কুমোর পাড়া। কিছুটা গিয়ে থমকে দাড়ায়।দুজন মহিলা পিছন ফিরে মাটির
ফুলদানীতে রঙ করছে।কিছুটা এগিয়ে দেখল একটা বাড়ির দাওয়ায় সারি সারি রঙ নাকরা কাচা মাটির পুতুল রোদে শুকোতে দেওয়া হয়েছে।উঠানে কাদামাটির উপর মধ্য বয়সী এক মহিলা হাটু অবধি কাপড় তুলে পা দিয়ে নেচে নেচে মাটি মাখছে।বলদেব দাঁড়িয়ে পড়ে মাটি মাখা দেখতে থাকে। মহিলার নজরে পড়তে নাচ থামিয়ে জিজ্ঞেস করে,কি দেখতেছো।
--এত মাটি দিয়ে কি হবে?
--এ গিরামে তুমারে আগে তো দেখি নাই।থাক কই?
--নতুন এসিছি।মোবারক সাহেবরে চিনেন?
--বড় কত্তা?তানারে কে না চেনে।
--হ্যা ওনার বাড়ি কামে লেগেছি।
--কি কাম করো?
--গরুরে জাব দেওয়া বাগানে নিড়েন দেওয়া যখন যেমন কয়।
--তুমি হিদু না?
--তা বলতি পারেন।
মানুষটা বেশ মজার চোখ বড় করে বলে, সেইটা কি কথা?তুমার নাম কি?
--আমার প্রকৃত নাম বলদেব সোম কেউ বলে বলা কেউ বলে বলদা।যার যেমন মন চায়।
মহিলা খিল খিল করে হেসে ফেলে।নাম শুনে মনে হচ্ছে মোছলমান নয়।
একটি বছর পনেরোর মেয়ে বাটিতে করে চা নিয়ে এল।মহিলা মাটি হতে নেমে পায়ের কাদা কেখে বালতির জলে হাত ধুয়ে মেয়েটির হাত হতে এক ভাড় চা নিয়ে বলল,চা খাবা?
--কেউ বললি না বলতি পারিনে।
মুচকি হেসে মেয়েটিকে আরেকটা ভাড় আনতে বলল।বলদেবকে এক কাপ চা এগিয়ে দিয়ে বলল,আমরা কুমোর আমার স্বামী--এই ছেড়ি তোর বাপের নাম কি বল।
--নিতাই চন্দ্র পাল।
--পোতিমা গড়ে।একডাকে গিরামে সবাই চেনে।বেশ জাঁক করে স্বামীর গুন গায়।
--কি প্রতিমা গড়ে?
--যে যেমন বায়না দেয়।দুগগা কালি শেতলা।
নিতাই পালের বউ সাধারনত পরপুরুষের সঙ্গে এত কথা বলে না।এই মানুষটা অন্যরকম অনাবিল চোখের দৃষ্টি।বেশ কথা বলে শুনতে ইচ্ছে করে।জিজ্ঞেস করে।কিছু বলতিছেন না?
--ভাবতিছি আপনে পা দিয়ে মাটি ছানতিছিলেন কিন্তু প্রতিমা হয়ে গিলি পা দিতি পারবেন না।
শিউরে ওঠে নিতাই পালের বউ।এইভাবে তো কখনো ভাবেনি।
বলদেব বলে,জলে ভিজোলে আবার যেকে সেই মাটি।মানুষের মত।এক মাটিতে কতরকমের প্রতিমা একমানুষের কত রকম রূপ।যে যেমন পারে কাজে লাগায়।
নিতাই পালের বউ মুগ্ধ বিস্ময়ে বলদেবের কথা শোনে।মায়া বোধ হয় জিজ্ঞেস করে,মুড়ি খাবা?
বলদেব লাজুক হাসে।এই এক দোষ, খাবার ব্যাপারে না বলতে পারে না।
নিতাই পালের বউ মেয়েকে বলল,যাতো এক বাটি মুড়ি নিয়ে আয়।
মুড়ি দিয়ে গেলে বলদেব মুড়ি চিবোতে শুরু করে,নিতাই পালের বউ মাটির উপর উঠে থুপকে থুপকে মাটি ছানতে ছানতে লক্ষ্য করে।
--আপনেরে একখান কথা জিজ্ঞেস করব?
--যত ইচ্ছা করতি পারেন।
--আপনে তো হিন্দু,মোছলমান বাড়িতে কাজ করতিছেন?
বলদেব একটু ভেবে বলল,আপনেরে বৌদি বলি?
--কেন বলবেন না।
--দ্যাখেন বৌদি বিয়ের পর আপনে বৌদি হয়েছেন।বিয়ে নাহলি আপনেরে দিদি বলতাম।
নিতাই পালের বৌ মুচকি হাসল।
--আপনে মাটি ছানতেছেন,পাল মশাই মাটি দিয়ে দুগগা গড়লি দুগগা কালী গড়লি কালী। কেউ হিদু কেউ মোছলমান কেউ কেরেস্তান হলিউ আসলে সবাই মানুষ।
নিতাই পালের বউয়ের মাটি মাখা থেমে যায়।মানুষটা কয় কি?এইভাবে তো কখনো ভাবেনি।
খাওয়া শেষ হতে বলদেব বলল,বেশ খালাম।
--সময় পেলি আবার আসবেন।